সে আমার প্রেম : আলাউদ্দিন আল আজাদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

আমার দক্ষিণ খোলা বড় জানালাটা কেউ জানে না আর আমিও জানি শুধু চুপি-চুপি, যেন অনন্তের এক চলমান সিঁড়ি যার উপরে আমর কোমল পা জোড়া রেখে যে কোনো দিকে চলে যেতে পারি। এ আমার স্বপ্নের দরজা। এখানে একলা এসে যখন দাঁড়াই, তখন কোনো অজানা রাজ্যের অচেনা রাজকুমার বিচিত্র পাখার পঙ্খিরাজ চড়ে এসে যদি নামত এবং আমাকে হাত ধরে তুলে নিয়ে যেত, তাহলে মন্দ ছিল কি? আসলে আমার শরীরে যদিও মাটির গন্ধ আছেআমি সৃষ্টির আশ্চর্য সম্ভার ছায়াপথ জ্যোতিষ্কপুঞ্জ ছাড়িয়ে অসীম গন্তব্যে চলে যেতেই ভালোবাসি। আকাশের কালো গর্তেও যদি হারিয়ে যেতে পারতাম, তাও হতো আমার সফলতা।

এখন আমার এই প্রিয় জানালাটা অন্ধকারে ছেয়ে আছে, নিñিদ্র অন্ধকার। একটু আগে যে কারেন্ট চলে গেছে, আর আসছে না। ওই বড় রাস্তাও নিষ্প্রদীপ।

আমি শুয়ে পড়েছিলাম। এলোমেলো ভাবনার জোয়ার, হঠাৎ আমার সারা ভিতরটা জুড়ে একটা উদলা-উদলা আলোড়ন-মোচড় দিয়ে দিয়ে ক্রমে কণ্ঠনালির দিকে ঠেলে উঠতে লাগল। আমি ঝট করে উঠে এসেছি এইখানে, নেটের কপাট দু’হাতে খুলে দিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি। আমি কি অসুস্থ হয়ে পড়েছি? মাথার ভিতরটা অমন ঘুরছে কেন, আগের মতোই হাত জড়িয়ে আম গাছের পাতার ঝোপড়া ধরতে গিয়েও পারলাম না।

এই আম গাছটা আমার নিত্যসঙ্গী। ধানমণ্ডির তেরো বাই দুই রাস্তার কোণে এক বিঘা জমির উপরে দোতলা বাড়িটার দেয়ালের ভিতরের চৌহদ্দীতে আরও অনেক প্রকার গাছ আছে, নিম, ঝাউ, কাঁঠালিচাপা, শিউলি; কিন্তু সিঁদুরে আমের এই আম গাছটা মাটি থেকে উঠে আমার কাছে এসেছে। আমি একান্ত নিঃসঙ্গ, সে কি তা গোপন প্রক্রিয়ায়উপলব্ধি করেছে? ঋতুতে ঋতুতে তার কত রূপ, কখনো কঠিন কোমল, যেন আমারই জন্যঅজস্র উপহার। কিছুকাল আগেও, পুঞ্জ পুঞ্জ বোলে ছেয়ে গিয়েছিল; হাওয়ায় সোঁদালো গন্ধের মৌ মৌ শিহরণ। এখানে এসে দাঁড়ালেই হাত দিয়েআলতোভাবে আদর করতাম, ধরেধরে দেখলাম। ভাবতাম, এটাই কি জীবন? অফুরন্ত মুকুল ধরেছে, যা আস্তে আস্তে গুটিতে রূপান্তরিত হবে, তারপর আরও বড় হবে, ফল তারপর পাকবে, ঝরে যাবে। থাকবে তাদের আঁটি। সেখান থেকে আবার চারাগাছ, বড় গাছ। তাদের আবার ফুল-ফল একটা সুনির্দিষ্ট চক্রমাত্র, যার আর কোনো সৌন্দর্য,বৈচিত্র্য নেই।

আমাদের এই মানব জীবনটারও তো একই আঙ্গিক একান্ত একঘেয়ে, গতানুগতিক। তাতে না আছে উচ্চতা, না কোনো গভীরতা কেবলি দেখা যায় একটা ভঙ্গি, তাও হামেশাই বিশৃঙ্খল।

অনিবার্য একটা অন্ধস্রোত কখনো উচ্ছ¡াসে কখনো সমানে বয়ে চলেছে, যার মধ্যে আরমরা বুঝি কচুরিপানা, খড়কুটো মাত্র।

এসব অনুভূতি আমার মনে যেন বুদবুদের মতো উঠছে, পড়ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে, আমি জানি না।

কিন্তু এখন এই যে কিছু একটা আমার গলার ভিতর থেকে ছিটকে পড়তে চাইছে, তাকে তো বুঝতে পারছি। কারণ সে এক বিশ্রী যন্ত্রণা।

‘ছোট আপা মোমবাত্তি আনছি।’ পিছন দিকে আমার ঘরটা আলোকিত হয়েছিল তা খেয়াল করিনি, কিন্তু আমিরণ কথা বলতেই চমকে উঠলাম।

অনেক কষ্টে রোধ করছিলাম, মুখটা না ফিরিয়েই বললাম, ‘বাতি লাগবে না আমিরণ, নিয়ে যাও’।

‘না না, লাগব আপা। আম্মা কইছেন বাত্তি দিতে, আন্ধাইরে আপনের ডর লাগবো না?’

‘ডর লাগবে কেন।’ আমি বললাম, আমি অনেক বড় হয়েছি না?

ইস কত বড় রে, আপনের শাদি অইছেনি? শাদি না অইলে মাইয়ামানুষ আবার বড় অয় কেমনে।

হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু এখন হাসতে পারব না। এই বোধহয় ওয়াক ওয়াক করেই ফেললাম। কোনোক্রমে সহ্যকরতে করতে বললাম, ঠিক আছে, রাখো। জলদি যাও। আমি শুয়ে পড়ব।

আম্মার উপরে উঠতে আরও দেরি অইবো ছোড আপা। আমারে আপনের কাছে-

না না, লাগবে না। অন্যসময় কাছে ডেকে রঙতামাশা করি আর এখন তাড়িয়ে দিচ্ছি, ও কিঞ্চিত অবাক হলো। আমার মুখের দিকে তাকাল সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে।

আর কোনো কথা বলল না। যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু গলিত মোমের ফোটা ফেলে মোমবাতিটা আমার টেবিলের কোণে লাগাবার সময় হলো না, ততক্ষণে আমার পেটের তলা থেকে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা উঠে আমাকে ঝাঁকুনি দিল। আমি দিশেহারা। এক দৌড়ে এটাচট বাথরুমের ভিতরে চলে গেলাম।

ছোড আপা, কি অইছে আপনের! আজগা তো কলেজে গেছিলেন, বাইরে কিছু খাইছিলেন? সিঙ্কের কাছে আমাকে দু’হাতে জাবড়ে ধরে জিজ্ঞেস করল আমিরণ।

ঘন ঘন উঠছে ভয়ষ্কররূপে, সে বমির উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল। এক ফাঁকে বললাম হ্যাঁ চটপটি খেয়েছিলাম।

আহ হায়রে কি কষ্ট। আম্মজানের কইগা, টেলিফোনে ডাক্তার সাহেবের খবর দিবেন নে।

কিচ্ছু লাগবে না আমিরণ বিবি। এই তো আমি ঠিক হয়ে গেছি। আম্মা এসে মিছিমিছিহৈ-চৈ করবেন। কি দরকার? আজ রাতে খাওয়ার ইচ্ছে হয়নি, খাইনি : খাদ্যদ্রব্য বিশেষ কিছুই পড়লনা, কেবল তরল পদার্থ নিঃসারিত হলো। আমি কয়েকবার কুলি করে বললাম, ‘আমাকে ধরে শুইয়ে দাও।’

আমি না চাইলে কি হবে, মনে হয়, যে জগতে আমরা বাস করি তার নিজস্ব একটা শৃঙ্খলা আছে, আছে আপন প্রবাহ ও গতিধারা।আমরা চাই বা না চাই, নিজের নিয়মে সে চলবেই; সে অনিবার্য কেননা একান্তই অপ্রতিরোধ্য। আব্বা ক্লাবে গেছেন, ফিরতে দেড়টা দু’টোর কম হবে না। অবশ্য আম্মা কিচেনের তদারক করে, ড্রয়িং রুম আগামি সকালের জন্যসাজিয়ে-গুছিয়ে কিছুক্ষণের উপরে আসতেন; কিন্তু আমার উদগীরণের আওয়াজটা একটু বড়ই হয়েছিল সম্ভবত।তিনি দ্রুত উঠে এলেন উপরে।আব্বা-আম্মার শয়নকক্ষের পাশেই আমার ছোট কক্ষটা, তিনি প্রবেশ করতে করতে বললেন, ‘কিরে লোপা, এদিকে ভমিটিংয়ের শব্দ শুনলাম!’

হ্যাঁ আম্মা।আমার বমি হয়েছে।বিছানায় বালিশে ঠেস দিয়ে বসলাম, ক্যান্টিনে খেয়েছিলাম।

আম্মা কাছে এলেন, আমাকে ধরলেন এবং আমার চুলগুলো পাট করতে করতে বললেন, একশোবার মানা করেছি। অথচ কেন যে বাইরে ছাতা-মাতা খাস। তোদেরকে নিয়ে আর পারলাম না। ওদিকে তোর ছোট ভাইটি, শুভ আমার হাড়মাংস একেবারে কালি করে ছাড়ল। তোদের বাপজান তো অফিস কনফারেন্স আর ক্লাব নিয়েআছেন।মনের মধ্যে অনেক চালাকি। কানের কাছে চেঁচাতে থাকলেও কিছুই বলেন না। কত করে বলছি, কট্রোল যখন করা যাচ্ছে না বিদেশেই পাঠাবার ব্যবস্থা করো।শুধু হু হ্যাঁ করেন।

এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন আম্মা। শুভ তো ফেলটা দিক।

দেবে আর কখন, লেখাপড়ার দিকে কি ওর কোনো খেয়াল আছে?সারারাত জাগে, সারাদিন ঘুমায়, কি যে হলো ওর। তুই আমার লক্ষী মেয়ে লোপা। আর তিন-তিনটা ছেলেমেয়ে স্টেটস-এ, তুই কাছে আছিস বলেই- বলতে বলতে চোখে পানি ছেড়ে দিলেন। এটাই আশ্চর্য আমার আম্মা এমন কঠোর ব্যক্তিত্ব কেউ-কেউ অগোচরে জাঁদরেল মহিলাও বলেছেন; অথচ ভিতরে যথেষ্ট কোমল। বিশেষত, ছেলেমেয়েদের জন্যজান দিতে পারেন, যদিও বাইরে থেকে তার শুধু উল্টোটাই চোখে পড়ে।

আমার মায়েরবৈশিষ্ট্য যে শাসন ও কর্তৃত্ব তা যতটা না তার নিজের চরিত্রে তার চেয়ে বেশি তার পারিবারিক ইতিহাসের গোপন স্মৃতি। আমার নানা মরহুম তাজ মোহাম্মদ। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি। যদিও লিখিত হয়নি, তার জীবনটা এক কিংবদন্তী। গরিব কারিগর ছিলেন। কেবল নিজের উচ্চকাক্সক্ষা, পরিশ্রম, ও অধ্যাবসায়ের গুণে বড় হয়েছিলেন। সততা ও সংযম ছিল অসাধারণ, কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত পয়সার মালিক হয়েও তিনি অপব্যয় করতেন না। একটা পিন নিচে পড়ে থাকতে দেখলে সেটা তুলে যতœসহকারে রেখে দিতেন। তার তিন পুত্র, চার মেয়ে।দৈনন্দিন তেজারতিন ধান্দায় ওদের লেখাপড়ায় দিতে পারেননি। একমাত্র ব্যতিক্রম আমার মা, তার তৃতীয় কন্যা তহমিনা, যাকে প্রবেশিকার দরজা পর্যন্ত যেতে দিয়েছিলেন। তার দৃঢ় সংকল্প ছিল, মেয়েটি যখন সুন্দরী, যত খরচ করতে হয় একজন সিভিল সার্ভেন্ট জামাই ধরবেন। তার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স পারমিট পারমিশন আদায়ের জন্যঢাকা করাচী পিণ্ডি করতে করতে সে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। সে তারই একটি অনুসিদ্ধান্ত, নিজে বকলম হলেও অনন্য বিচক্ষণতায় উপলব্ধি করেছিলেন এদেশে আমলাবাদ রাজা, প্রকৃত ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অধিকারী। তেমন একজন নিজের বাড়িতে থাকলে মন্দ কি। আবার আব্বা সেবার পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছিলেন। এবং আমার বাবার বাবা ছিলেন একজন কেরানি; তার নয় পুত্র দুই কন্যার বিশাল পরিবারের দায় মেটাবার জন্য হয়তো ভেবেছিলেন একজন ধনপতি মুরব্বির থাকলে মন্দ হয় না। মুতাশা প্রস্তাব আনলে মেয়েটা যখন পছন্দ হলো, তিনি রাজি হয়ে গেলেন। সে যেন ছিল সোনায় সোহাগা। আমার মা কিন্তু তার পরিবারের লেখাপড়ার অভাবটার কথা কখনো ভুলতে পারেননি।পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে তিনি বনানীর একটা বাড়ি ও নারায়ণগঞ্জের একটি মিলের অংশ পেয়েছেন-এগুলোর সমস্ত আয় আমাদের বিদ্যার্জনের খাতেই খরচ করছেন। বড় মেয়েকে হার্ভার্ড স্কলারের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে পাঠিয়েছেন, দুই ছেলেকে নিউইয়র্কে ভর্তি করিয়েছেন।

আমার বাবা এনসান আহমদ একজন প্রবীণ সচিব। সরকারের উচ্চতম এক স্তম্ভ, সারাদেশে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। এ বিষয়েও আমার মা যথেষ্ট গর্ব অনুভব করেন।

আমার মায়ের ইচ্ছেগুলো প্রায় সবই সুচারুরূপে পূর্ণ হয়ে চলছিল, কিন্তু বিধির বিধানে বোধহয় একেবারে নিখাদ কিছু অসম্ভব-কাঁটা ছাড়া ফুল হয় না, কলঙ্ক ছাড়া চাঁদ হয়না। হয়তো সেজন্যই, আনন্দের সঙ্গে, দুঃখকেও পেয়েছেন।

এই মুহূর্তে আমার প্রতি তার সহানুভূতি এটা যেমন স্বাভাবিক, তিনি মনে-মনে দারুণ একটা বিতৃষ্ণা পোষণ করেন তাও সত্য। দূষিত পরিবেশে শুভ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এটাও তার কাছে অসহ্য। আমি একটু চুপ থেকে বললাম, কাঁদছ কেন আম্মা আমরা তো খারাপ হয়েযাইনি?

‘না, মা।খারাপ হবি কেন, ভালোই আছিস। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে আম্মা যখন নিজেকে সামলে নিচ্ছেন, এতমন সময় চতুর্দিকে বাতি জ্বলে উঠল। অন করে রাখা পাখাগুলো সাসা করে চলতে লাগল। আম্মা আমার বিছানার ধারে, কাছেই বসেছিলেন, আমাকে পূর্ণদৃষ্টিতে দেখলেন, তারপর আমিরণকে নিচে রান্নাঘরে যেতে বলে হাত বাড়িয়ে আমার দু’কাধ ধরলেন।

হঠাৎ একটা শঙ্কার ছায়া আমার ভিতরে কেন জানি, আমার কলজেটা ছাৎ করল। তবু শান্তস্বরে বললাম, ‘কি হয়েছে আম্মা? এমন করে কি দেখছো?

‘তোরে দেখছি লোপা, তোকেই দেখছি। আমার লগের বাড়ির মুরব্বিরা বলেন লোপা তো তহমিনাই- একদম এক চেহারা।’

‘অথচ তুমি আর আমি কত আলাদা।’ আমি বললাম, ‘আম্মা সময় আমাদেরকে দ্বিখণ্ডিত করেছে, তাতে দুঃখ করে লাভ কি।’

‘দুঃখ করব কেন, দুঃখ আমি করছিনা।কালের সঙ্গে তাল মিলিয়েনতুন কালে তোরা নতুনভাবে চলবি এই তো চাই। কিন্তু লোপা, চিরকালীন একটা জিনিসও আছে। বিশেষ করে নারীর পুরাতন রূপটাই সবচেয়ে সুন্দর।

আম্মার চাউনিতে একটা কারুণ্য নেমে এলো, কিন্তু মুহূর্তেই তার মধ্যে একটা জিজ্ঞাসা ঝলকে ওঠে, তিনি উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু কি লোপা। একি চেহারা হয়েছে তোর! মুখটা ফ্যাকাশে হলদে হয়েযাচ্ছে!’

কলেজে ক্লাসটাস নেই তো, এজন্যেই বোধ হয়।

‘না, না।’ হঠাৎ আমার দু’কাঁধে নাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস কররেল, ‘আমার কাছে কিছু লুকাসনি তো মা?

লুকাব! কি লুকাব আম্মা? বুকের ভিতরটা আমার ধড়ক করে উঠেছিল, কিন্তু নিজেকে সামলে নিলাম।

আম্মা খুশি হলেন না, উঠতে উঠতে বললেন, কি জানি কি লুকোবি! তোকে দেখে আমার মোটেই ভালো লাগছে না। ঠিক আছে, ঘুমিয়ে থাক। কালই ডক্টর ইসলামকে একটু ডাকব। দেখে যাক। আজকাল অজানা-অচেনা, কতরকম জটিল রোগ হচ্ছে।’

আম্মা যখন উঠছিলেন আমি প্রায় বলতে যাচ্ছিলাম, ‘আমি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মরেই যাই, কি এমন ক্ষতি হবে তোমাদের সাজানো সংসারে. আম্মা? বিশেষ কিছুই না।’

কিন্তু আম্মা চলে যাওয়ার সময় কিছুই আমার বলা হলো না, কেবল মনে মনে তার অন্তর্দৃষ্টি সুক্ষè বুদ্ধির তারিফ করছিলাম। তিনি একটা কিছু আঁচ করতে পেরেছেন, এখন কি আরও করবেন সেটাই দেখার বিষয়। এতক্ষণ খেয়াল ছিল না, এমন গুড়গুড় মন্দ্রধ্বনি উঠছে এবং কিছুক্ষণে বাতাসও বইতে শুরু করল। হাত বাড়িয়ে সুইচ অফ করে দিলাম। প্রথমে দূরে সাস শব্দ তারপরে কাছে সমসম, জোর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। মনে পড়ল, আজ বৃহস্পতিবার, একত্রিশেবৈশাখ। অনন্তের সিঁড়ি, আমার জানালাটা বন্ধ করলাম না। কৃষ্ণ অন্ধকার, আমি মশারির ভিতর থেকে তাকিয়ে অবিচ্ছন্ন বারি পতনের শব্দ শুনছি। ওই ওটা কার মুখ? আশ্চার্য, আশ্চার্যই ভাববে সবাই যখন সব জানতে পারবে প্রথমে নিচুস্বরে ফিসফিস আলোচনায়, তারপরে প্রকাশিত সত্যের আলোকে অথচ যে ঘটনাটি কোনোক্রমেই প্রচলিত সামাজিক মানদণ্ডে, গোপন রাখা উচিত ছিল না আমি তাকেই কেন প্রকাশ করলাম না সে বিষয়ে এতদিন এতরাত ধরে নিভূত নিস্তার পরেও কোনো মীমাংসার পৌঁছতে পারিনি। আমার অস্তিত্ব, আমার অধিকার। কিন্তু আমার অস্তিত্বের কাঠামোতেও এমন উপাদান রয়েছে যার সঙ্গে সংযুক্ত বাইরের সহস্র স্রোতোধারা। সেসব ্উপাদানকে কেমন করে বিশ্লেষণ করব? সবাই বলবে, আমার মঙ্গলামঙ্গলটাই হবে প্রধান মাপকাঠি। আমার বিকাশ, আমার ভবিষ্যৎ। কোনো অজানা সম্মোহন আচ্ছন্ন হয়ে সেদিন আমি কি বিস্মৃত হয়েছিলাম?না, নিশ্চিত ধ্বংস কামনাটাই আমার রক্তের স্বাভাবিকবৈশিষ্ট্য।’

এখন ও আমার কাছে সব ধোঁয়াটে, অষ্পষ্ট। এই যে আমার জানালায় অপার বৃষ্টিধারার ধ্বনি প্রতিধ্বনি, সে যেন এমন এক অন্ধকার যার মধ্যে আমি নিরুদ্বেগে নগ্ন হয়েও হাত-পা মেলে সাঁতার কাটতে পারি, কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। আমি স্তব্ধ আছি, ক্রমে জমে যাচ্ছি। যখন আধোতন্দ্রায় নিমগ্ন হয়েছিলাম, তখন হয়তো কিছু টুকটাক শব্দ হয়েছিল পাশে আব্বা-আম্মা বড় শয়ন কক্ষে, তারা এসে শয্যাগ্রহণ করেছেন। হয়তো কিছু আলাপও করেছেন। শিয়রের একদিকে টেবিল ল্যাম্পের শেড, নীলচে, মৃদু আলো। এবং একবার মেঘের প্রবল গুড়গুড় আওয়াজে আকাশ-মাটি, গাছ-পালা, বাড়ি-ঘর যখন কেঁপে উঠল, আমার চোখের পাতা আমার খুলে গেছ, কোনো বিদঘুটে স্বপ্নও নয় তবু আমি উঠে বসলাম। পিছনে কোমর ছাড়িয়েছড়িয়ে পড়েছে চুল, আর কাপড় চোপড় আলগা এলোমেলো।

আমি নাকি খুব জেদী মেয়ে, বিশেষ করে আম্মার ধারণা এবংমন্তব্য।এটা মিথ্যা নয়। কারণ একমাত্র তার সঙ্গে ভাবলে আমি দেখতে পাচ্ছি, গত দেড় বছরে এমন কতগুলো ব্যবহার করেছি, যা অবাধ্যতার শামিল। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবার এই যে প্রচেষ্ঠা তার যৌক্তিকতা সম্পর্কে আমার কোনো সন্দেহ ছিলনা।

একটা বজ্রপাত হলো অনেক দূরে, হয়তো শীতলক্ষ্যা নদীর কিনারে কিংবা কোনো বিজন প্রান্তরে একা দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছের উপর, কিন্তু আমি চমকে উঠলাম। কাঁপছে আমার হাতের পাতা, আমার আঙুলগুলো কাঁপছে যখন নিজের শরীরটাকে আমি হাতড়ে হাতড়ে দেখছি, আস্তে আস্তে উপর থেকে নিচে। আমি কি আদর করছি, নিজেকে আদর করছি? এই মুহূর্তেও আমি ভাবছি আমার অস্তিত্ব স্বর্গীয়। আমার দেহ পবিত্র। আমারবৈচিত্র্য দেহে ধূলি-মাটির পৃথিবীর এঁকে দেওয়া কোনো ক্ষতচিহ্ন যদি থাকে তাকে আবিষ্কার করতে চাই। তাকে দেখতে চাই, বুঝতে চাই তার প্রতিপাদ্য। হয়তো বা, গত আড়াই মাস ধরে আমি বিভিন্ন জ্ঞানগ্রন্থ গ্রোগ্রাসে পড়ছি এ তারই ফল। আমি মরব, হয়তো মরেই যাব, কিন্তু অন্ধভাবে মরব না। এও আমার খেয়ালী জেদ, আমার প্রতিজ্ঞা।

আমি উঠে পড়লাম। আব্বা-আম্মা সর্বদাই হুশিয়ার, রাতে ঘুমোবার সময়দুই কক্ষের মধ্যবর্তী দরজাটা ভেজিয়ে রাখেন। একরাতে আমাকে বোবায়ধরেছিল, আমি গুঙিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম-ওরা দুজনেই শুনতে পাওয়া মাত্র উঠে এসে আমাকে ধাক্কা দিয়েজাগিয়েছিলাম।

কি মা, কি দুঃস্বপ্ন দেখছিলি তুই? এমন চিৎকার? আম্মা আমাকে আগলে ধরে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

আমার বাবা এনসান আহমদ গুরুগম্ভীর লোক, বড় বড় সমস্যার মুখে পাষাণ প্রতিম কিন্তু এই ধরনের ছোটখাটো ব্যাপারে সহজেই মুষড়ে পড়েন একয় একটু উত্তেজিত বোধ করলেই পাইপে আগুন দেওয়া তার অভ্যাস। এখনও তাই করলেন। আমার মাথায় একটা হাত রেখে অভয় দিয়ে বললেন, ‘এ কিছু না মা। বেঘোরে শুলে এরকম হয়। তোর ভয় করছে?

‘না আব্বা, ভয়করছে না।’ হয়তো মিথ্যেই বলেছিলাম কারণ তখনো আমার বুকের ভিতরটা কপোতীর মতো মৃদু ধুক ধুক করছিল।

‘রাত তো এখন মাত্র একটা।’ আমার টেবিলঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আম্মা বললেন, ভয় করলে তুই আমার কাছেআয়-

‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছো। অস্পষ্টভাবে এমন একটা সমস্যার কথাই যেন ভাবছিলেন, বাবা উৎসাহিত হয়ে বললেন, তোমরা দুজন আমাদের বিছানায় গিয়ে শোও। আমি ইজিচেয়ারে ঘুমাতে পারব।

কেন, আমাদের খাটটা তো বেশ বড়ই ডবলের একটু বেশি। একসঙ্গে থাকলে অসুবিধা কি? আমি মাঝখানে, তুমি ওধারে। আম্মা ভারী গলায়বলেনে, বাপ-মায়ের কাছে ছেলেমেয়ে কখনো বড় হয় নাকি?

ও হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক আছে, ঠিক আছে। চলমা লোপা, আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমি আপত্তি করিনি এজন্য যে তখনো স্বপ্নের দৃশ্যটা আমার মনে জ্বল জ্বল ভাসছিল। এবং তা কিপৈশাচিক। কালো-কালো মূর্তি, ছয়-ছয়টা, মুখোশ পরা, ভয়ঙ্কর। তিনজনের হাতের মুঠোয় ঝকঝকে ছুরি, আর তিনজনের হাতে ধারালো খড়গ। উষ্ক খুষ্ক মাথা ভরা চুল, উজ্জ্বল চোখজোড়া, এক তরুন হেঁটে যাচ্ছিল। ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। কয়েকবার আর্তনাদ। ওরা হৈহৈ করে উঠে জান্তব উল্লাসে প্রাণপণে কোপাতে লাগল। কিছুক্ষণেই শেষ। পড়ে থাকে তার রক্তাক্ত মৃতদেহ। এখনো দেখতে পাচ্ছেনা, কষ্ট হচ্ছেতবু এখনো দেখতে পাচ্ছে না লোপা ভার মুখটা, যা একদিকে কাত হয়ে আছে। কিন্তু মুহূর্ত মাত্র : দুটি গুণ্ডা তার চুলে মুঠো করে ধরেছে, আরেকটি ছুরি লাগিয়ে দু’হাতে গলা কাটতে থাকে। গলাটা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে দেরি হলো না। উহ, একি দৃশ্য! এখন চেনা যাচ্ছে। চিনতে পারছি, যখন চুলে ধরে মস্তকটা উপরে তুলল। হ্যাঁ হ্যাঁ, এ যে গোরা ভাই, শওকত মাহমুদ। প্রকাশ্য দিবালোকে দল বেধে, নৃশংসভাবে ওরা তাকে হত্যা করেছে। স্বপ্নের মধ্যেই চেঁচাতে শুরু করেছিলাম কিন্তু গলার ভিতরটা তখন যেন বন্ধ হয়ে গেছে, প্রাণপণ চেষ্টা করেও আওয়াজ বার করতে পারছিলাম না। কেবল ছটফট করছিলাম। গুণ্ডাদল আমাকে দেখতে পেয়েছে, মুহূর্তে ধেয়ে আসছিল, তক্ষুনি ছুট দিলাম। কিন্তু দৌড়াতে গিয়ে দেখলাম শক্ত মাটির গর্তের মধ্যে আমার ডান পাটা আটকে গেছে। আমি টানছি, টানছি।

আমি কোনো কথা বলতে পারছিলাম না, আব্বা, আম্বার বিছানায় একবারে নিস্তেজভাবে শুয়ে রইলাম।

আজকে যদিও দুর্যোগঘন রাত্রি, তবু আমি তো চিৎকার করিনি। কাজেই ওরা উঠে আসবেন না।

অনন্তের সিঁড়ি আমার জানালাটা তো খোলাই রেখেছি এবংযদিও অনবরত বৃষ্টির ছাট আসছে, বন্ধ করবা না।

এই বর্ষণ মুখর রাতে জানালার কাছাকাছি, যখন ঘনঘন বিজলি জলছে নিভছে, তখন আমার ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখব।

খাটের উপর থেকে নামলাম। জানালার কাছে গিয়েহাতের পাতা বাড়াই হাতের এক পাতা বৃষ্টি ছাট নিয়ে মুখের ওপরে প্রলেপ দিলাম।

সেই রাতে এমন একটা দুঃস্বপ্ন কেন দেখেছিলাম, তা বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম, তা কিন্তু দুর্বোধ্যই রয়ে গেল। স্বপ্নেরবৈজ্ঞানিক বৃত্তন্ত পড়েছিলাম কিন্তু আমার অচেতন কোনো বিরুদ্ধ কামনা যদি থেকেই থাকত এমন একটা ঘটনার মধ্যেতার কি প্রকাশ হয়েছিল? অথবা সে যদিচৈতন্য ভাণ্ডারে জমা হয়ে থাকা দূরবর্তী কোনো বিকৃত স্মৃতি তাকেও বর্তমানের পাশে রেখে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আর সেদিন বিকেলবেলায় যেটুকু ঘটেছিল তা তো আরও সুকুমার একটি প্রফুল্ল কুসুমস্তবক।

সবে ভর্তি হয়েছি ইডেন কলেজে, ক্লাস শুরু হয়নি। আগের খবর অনুসারে বাইরে বেরিয়েএসেছিলাম।

নিউ মার্কেট গেটের অদূরে গাড়ি। ভিতরে স্টিয়ারিং হুইল ধরে প্রতীক্ষায়ছিল। গোরার চোখে গলস হাত নেড়ে ডাকতেই ওদিকে গেলাম।

বান্দাতৈয়ার। গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে কুর্নিশ করার মতো ভঙ্গিতে বলল, কোথায় গন্তব্য রাজকন্যার? আজ্ঞা হোক।

ইস, বাহাদুর। পাশের সিটে বসে আমি বললাম, যেখানে বলব সেখানেই যেন আনায়াসে যেতে পারবেন?

পারব না? তাহলে এই জিন্দেগি কোরবান করে দেব এখনই। গাড়ি স্টার্স্ট দিয়ে গম্ভীরস্বরে আবৃত্তি করে, যদি মৃত্যুর মাঝে নিয়েযায়; কত সুখআছে সেই মরণে!

এত সেন্টিমেন্ট কিন্তু ভালো না, জানো?

কেন? খারাপ কোথায়?

একমাত্র যে জিনিসটা ফস করে ওঠে আর ফস করে নিভে যায়তার নাম ফানুস।

ও এই কথা। ইউনিভার্সিটির দিকে যেতে বলল, আচ্ছা বল তো লোপা, তোমার সঙ্গে পরিচয় মাত্র এক মাস-এর মধ্যে এমন কিছু কি দেখেছ যাতে আমি নির্ভর করার অযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারি?

আমি হেসে জবাব দিলাম, না সেরকম কিছু এখনো চোখে পড়েনি। আমার সব কথা তুমি শুনেছ।

‘কিন্তু আজ শুনব না।’ দুষ্টুমির ভঙ্গিতে আড়চোখে আমার দিকে একটু তাকাল, তারপর প্রশ্ন করল, ‘বুঝতে পেরেছো’?

কি আর বুঝব আমি, ছাইভস্ম। আমি কিছু না বুঝেই, মৃদু হেসে বললাম ‘হুঁ?’

তখন সে কি উল্লাস। হঠাৎ চিৎকার করে উঠল এবং ছেলেমানুষের মতো স্টিয়ারিং হুইলটায় টোকা মারতে মারতে, গুনগুন করতে করতে গাড়ি চালাতে লাগল। এরপর একটু থেমে বলল, ‘থ্যাস্কইউ ভেরি মাচ ফর ইউর স্মার্টনেস, মিন লোপা আহমদ।’

‘তুমি জানো তো গোরাভাই, মায়ের মেজাজ কেমন কড়া?’

‘এবং যাকে বলে, তোমার ওপর সর্বদা শ্যেনদৃষ্টি রাখেন!’

‘হ্যাঁ ঠিক তাই। আমাকে ঠিক একটার মধ্যে ফিরতে হবে কিন্তু।’ এসময় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের নিকটবর্তী সড়কদ্বীপকে ঘুরে বাঁ দিকে মোড় নিলে, আমি বলে উঠলাম, ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?

‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, আমরা দুজনা চলতি হাওয়ার পন্থী।’ গোরা একটু বাঁকা হেসে বলল, এত অস্থির হচ্ছ কেন।’

‘না, না। ঠাট্টা নয়, গোরাভাই, কোথায় যাচ্ছ বলো।

‘জাহান্নামে! গোরা সংক্ষিপ্ত জবাব দিল।

‘ওটা তো খুব ভালো জায়গা বলে মনে হয়না।’

তাহলে-তাহলে, সুবর্ণগ্রাম।’

‘সে আবার কি?’ কিঞ্চিৎ বিব্রত আমি, বললাম। ‘বুঝিয়ে বলো।’

‘উই, তুমি একদম বেরসিক। আমরা সোনারগাঁও হোটেলে যাচ্ছি। দুই কাপ গরম চায়ে গলাটা গরম করে নেব।’

‘কিন্তু এটা তো শীতকাল নয়। আর দুপুরবেলায় গরম চা! তোমার আইডিয়া চমৎকার!’

‘তাহলে আইসক্রিম! এবার গোরা অনেকটা সিরিয়াস। একটু বামে তাকিয়ে বলল, ‘আসলে কি জানো লোপা, তোমাকে তো এভাবে গাড়িতে আর পাইনি। এই প্রথম। এটা আমাদের সোনালি ভবিষ্যতের প্রান্তর। একটু মিলাব্রেট করব, ভেবেছিলাম।আজকের দিনটি আমর ডায়েরিতে সবুজ অক্ষরে লেখা থাকবে।’

‘বাব্বাই, এতকিছু! তোমার সঙ্গে একটু বেড়াতে বেরিয়েছি, আমার কাছে এছাড়া তো আর কিছু মনে হয়নি।’

কিছু মনে করে না লোপা, তুমি একটা অপ্রস্ফুটিত গোলাপি গোলাপ, তোমাকে ফোটানো প্রয়োজন।

আশ্বিনের দুপুরবেলা সেদিন, ঝলমলে রোদ। ওপরে স্বচ্ছ নীল আকাশ, কেবল এখানে-ওখানে ছড়ানো-ছিটানো পেজাতুলোর মতো হালকা শাদা মেঘ। গাছে গাছে সবুজ পাতার গুচ্ছ, মরসুমি ফুলের সমারোহ। বেশ ভালো লাগছিল আমার, বিশেষ করে কলেজের ভিড় কলকাকলি থেকে পালিয়েকিছুদূরে এসে : এখন তো দেরিতে পরীক্ষা, দেরিতে রেজাল্ট, দেরিতে ভর্তি, দেরিতে ক্লাস, সর্বত্র একটি বিরাট ছন্দপতন। মাঝে মাঝে টের পাই, আব্বা-আম্মা আমাকেও বাইরে পাঠিয়ে দেবার চিন্তা-ভাবনা করছেন। আমেরিকায় বড় আপা নীপার ঘর-সংসারের চিত্র-বিচিত্র রঙিন ছবি দেখা আরও বেশিউৎসাহিত; একদিন শুনছিলাম, দুলাভাইকে লেখার আলোচনা করছেন, যার মধ্যে ওখানেই অধ্যয়নরত কোনো উজ্জ্বল পাত্রের খোঁজ পাওয়া যায়কিনা, সেদিকে একটু খেয়াল রাখতে। তাহলে ওরা কন্যা সাজানো ছাড়াও বরের লেখাপড়ার আংশিক খরচ বহন করতেন। সুস্বাদু চাটনির মতো, মুরব্বিদের এসব গেজানো শুনতে মন্দ লাগত না। আর শুধু এই? কখনো ভাবেন ফরেন সার্ভিসের সম্ভাবনাময় অফিসার, কখনো শিল্পপতি, কখনো আমদানি রফতানি ব্যবসায়ী।আর একলা-একলা ভীষণ হাসি পায়আমার।একটাকে ভালো মতোই পার করেছেন, আর পুঁজি তো মাত্র একটাই, একে দিয়েই যেন বিশ্ব জয় করতে চান। এই জন্যই সম্ভবত আমার কোনো ছেলেবন্ধু থাক, ওরা তা মোটেই পছন্দ করেন না, অথচ আমার ছেলেবন্ধুর সংখ্যা তো কম নয়।কাউকে কাউকে তারা দেখেছেন। আর এই যে আমাকে পাশে ড্রাইভ করছে, এ তো প্রশ্নের অতীত : আমাদের লাগালাগি প্রতিবেশী। সর্বদা যাওয়া-আশা এবং দাওয়াত বিনিময় চলছেই। বিশেষ করে বর্তমানে নিউ ইয়র্কেঅধ্যয়নরত আমার বড় ভাই মণির জানের জান দোস্ত গোরা। বোরহান আহমদ মণি আর শওকত মাহমুদ গোরা অবিভাজ্য ছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমেই বোধহয় বিচ্ছিন্ন। তবে দূরত্বটা শুধু ভৌগোলিক, মানসিক নয়। মানসিকভাবে এখনো একান্ত কাছাকাছি।মাসে অন্তত দুটো করে পত্র আদান-প্রদান চলছে এবং গোরা শুধু অনার্স পরীক্ষাটা দেয়ার অপেক্ষায়, তারপর পক্ষবিস্তার করে উড়ে চলে যাবে। তার এই প্লান। কথায় কথায় প্রকাশিত হয়েছে। এর সঙ্গে আমারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি? চিন্তাধারার কোনোনৈকট্য? এখনো জানি না, উপরন্ত ওর ছোট বোন নোরা আমার বান্ধবী। সেদিন হোটেল সোনারগাঁওয়ে লাচ্ছি পান করতে করতে পরস্পর তাকিয়েছিলাম এবংতখনো আমার চাউনিতে হ্রদের মতো শান্ত গভীরতা, কিন্তু পরে সংসদ ভবনের সামনে, ক্রিসেন্ট লেকের দিকে যাওয়ার সময় একটা আচ্ছাদন দেখতে পেলাম ওর চেহারায়।একটা গাছের ছায়ায় গাড়ি থামিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল এবং লোকজন দেখতে না পেরে আচমকা হেচকা টানে আমাকে নিয়েই ঠোঁটে পাগলের মতো ব্যাকুলভাবে চুম্বন করল। আমার বাধা দেবার কিংবা আশ্চার্য হওয়ার অবকাশ ছিল না। আমি সজোরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম ঝাপাট করে দরজা খুলে বাইরে দাঁড়ালাম। তখন হাঁপাচ্ছে গোরা, যেন থর থর কাঁপছে। তার হাতটা শিথিল হয়ে পড়ে গেছে স্টিয়ারিং হুইল থেকে, ভিতর থেকে কোনোরকমে ডাক দিল, ‘লোপা’-

কিন্তু আর কিছু বলতে পারল না, সে স্তব্ধবাক। আমি গুরুগম্ভীর হয়ে আছি। সালোয়ার, কামিজ পরা ছিল- মুখটা ওড়নাতে মুছে বললাম, ‘একটা বেজে যাচ্ছে আমাকে জলদি পৌঁছে দাও।’

এতক্ষণে, বর্ষণ পড়ে আশা দূরের কথা তার জোর আরও বেড়েছে। এক ঘোর দুর্যোগ। একটানা ঝর-ঝর ঝম-ঝম। রন্দ্রহীন শব্দের তমশা।

আরও ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাতে থাকলে আমি শ্লথচরণে হেঁটে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আয়নার ভিতরে আমার ছায়া। একটা বিশ্রী অনুভূতি পিচ্ছিল সাপের মতো ধমনীতে যেন প্রবাহিত হয়ে গেল। আমি সব কাপড় ছেড়ে দেব। আমি নিজেকে দেখব এখন। নিজেকে দেখব।

এখনো মনে পড়ছে সেদিন দুপুরে গোরার কাণ্ডে ভীষণ বিরক্ত হয়েছিলাম। এটা কি রকম ব্যবহার। এরই নাম কি ভালোবাসা? বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ হিংস্র জন্তুর মতো আক্রমণ?

ওর গাড়িতে করে ফেরা ছাড়া উপায় ছিল না, কিন্তু পাশে বসে ভিতরে আমার তোলপাড় হচ্ছিল।

তোমার কাছ থেকে এটা আমি মোটেই আশা করেনি, গোরাভাই, তোমাকে আমি বিশ্বাস করতাম। আমি যেন বলেছিলাম। কিন্তু আসলে বলিনি কিছুই। চুপ হয়ে ছিলাম। এবং আনমনা। গাড়ির আশেপাশে কি সব দৃশ্য এসে যাচ্ছে, মনে হলো, আমি দেখছি-চোখের পাতি কেটে আগে বড় করে তাকালাম-হ্যাঁ আমি সত্যিই দেখছি পাঁচ জন যুবক, হঠাৎ দাঁড়িয়ে আমাদের গাড়িটার দিকে তাকাল। মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। তারপরহৈহৈ করে উঠল। এবং হাততালি দিল। গোরা একটু তাকিয়ে দেখল, ওদের চেনে বলে মনে হলো না।

এদের মধ্য থেকে একজন শেখ মুজিবের মতো তর্জনী উুঁচিয়ে চিৎকার করে কি বলল। কিন্তু কিছুই শোনা গেল না।

আমি দেখলাম, গোরা ড্রাইভ করতে করতেই একটু নাক সিটকাল এবং ডানদিকে খোলা সাইড গøাসের উপর দিয়ে থু থু ফেলল।

এদেরকে আমি দুঃস্বপ্ন দেখেছিলাম? এই গ্রুপটা কি গোরাভাইয়ের প্রতিপক্ষ?কিন্তু কেন তা হতে যাবে? শান্তশিষ্ট, নিরীহ প্রকৃতির ছেলে : বিশেষত ভালো ছাত্র হিসেবে প্রায়বিখ্যাত প্রত্যেক ক্লাসেই প্রথম হয়ে উপরে উঠেছে, পবেশিকা পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় বিজ্ঞান গ্রুপে তৃতীয় হয়েছিল। ইন্টারমিডিয়েড সায়েন্স পরীক্ষায় দ্বিতীয়। এখন ফিজিক্সে অনাস পড়ছে। তার স্বপ্ন নিউক্লিয়ার ফিজিকস।যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আণবিক পদার্থবিদ্যায় ডক্টরেট করার প্রস্তুতিই নিচ্ছে।

‘দুত্তর! আমি একটা- আমি একটা- সাতাশনম্বর দিয়েছুটতে ছুটতে বিড়বিড় করল, আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও লোপা! হঠাৎ একটা খারাপ কাজ করে ফেলেছি। নাহ; খারাপ কিসের। ভালোই তো। আমি তো তোমায় ভালোবাসি।

ভালোবাসা! হ্যাঁ ভালোবাসা, প্রেম। মিলন, বিরহ। কতকগুলো অদ্ভুত শব্দ।কৈশোরকাল থেকে প্রায় শুনতাম। নানা জায়গায়। নানাভাবে, বিভিন্ন বইয়ের পাতায়ও দেখেছি। এগুলো মোটেই বুঝতাম; কিন্তু মনে হতো সত্য।

ছি : লোপা। একলা পেয়ে একটা কাণ্ড নাহয় করেই ফেলেছে, তাই বলে এতবড় শাস্তি দিবি?

‘কই, কিছুই তো আমি করছি না? গোরার ছোট বোন নোরা, আমার সহপাঠিনী ও বান্ধবী, এসে ওই ধরনের আলাপ শুরু করলে আমি উত্তর দিয়েছিলাম।

‘কই করছিস না, কিন্তু এটাই অনেক কিছু। আজ সাতদিন ধরে আমাদের বাসায় যাসনে তুই।আর গোরা ভাই তোদের বাসায়এলে দেখা করিস না।’

‘তাতে ওর কি আসে যায়।’

‘ও এটা দেখছি অভিমান!’ অভিমান?বলে কি নোরা? নতুন নতুন সাজানো অক্ষর। আদর করে আগলে ধরে আমার খোলা লম্বা চুলগুলো পাট করতে করতে বলল, ‘এত আদিখ্যেতা করিসনে লোপা, বুঝলি? একটা কিস করেছে। তাতে হয়েছেটা কি? পুরুষ মানুষের রক্ত গরম, বিশেষত তোকে যখন-

বুঝেছি।’ আমি থামিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, ‘এসব বিষয়ে আমি আর আলাপ করতে চাই না নোরা।’

‘না। তোকে করতেই হবে। তোর জন্য আমার এমন গুণের ভাইটা নষ্ট হয়েযাক সে আমি চাই না।’

হবে না কেন? কেবল লোপা লোপাই তো করছে।খায়না, ঘুমায় না।কিছুকাল বাদে ফাইনাল।’

‘আমি দুঃখিত নোরা।’ আমি মুখনিচু করে বললাম, আই কান্ট ডু এনিথিং ফর ইউ।’

আমার কথায় নোরা যেন বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। সে আমার বালিশটা টানে এবংশুয়ে পড়ে ভাবতে লাগল। পরে হঠাৎ ইউরেকা বলে উঠে বসল এবং আমার হাত ধরে বলল, ‘অলরাইট, তোকে একটা পার্টিতে নিয়ে যাব।

তখন মন খারাপ কোথায় পালিয়ে যাবে! যাবি তো লোপা? বলনা।’

হৈ চৈ আমার ভালো লাগে না, সে তো জানিস?

জানি, তবু নিয়ে যাব। নোরা আমার চিবুক ধরে বলল, সব আমাদের বয়সী ছেলেমেয়ে দেখিস কি চমৎকার লাগে। তারপর ফ্লোরা ও সাবাকে নিয়ে আসব তোর কাছে!

নোরার ঠোঁট জুড়ে রহস্যময় হাসি, উচ্ছ¡াসে সে আমার গলাটা বাঁ হাতে বেষ্টন করল এবং আদরের মতো করে ঝাঁকুনি দিল।

একদিন বিকেলবেলায় যেখানে সে নিয়ে গিয়েছিল সে গুলশান, এক ইউরোপীয় ক‚টনৈতিকের প্রসাদোপম সজ্জিত ভবন। ক‚টনৈতিকের তরুণ পুত্র ডেবিড এবং কন্যা এসিলি। ওরাই দাওয়াত করেছে। ক‚টনৈতিকদের এক বয়সী ছেলেমেয়েরা হাজির তাদের মধ্যে বাঙালি ছেলেমেয়ে আমরা কয়েকজন। হংসমধ্যে বক যেন। ছোট ছোট টেবিলে সাজানো হার্র্ড ড্রিঙ্ক সফট ড্রিঙ্ক। যার যেটা ভালো লাগে। চতুর্দিকে কথাবর্তা, কেবল গুঞ্জন ধ্বনি। হাসিঠাট্টাও হচ্ছে। মাঝেমাঝে চিকন চিৎকার। প্রত্যেকের পরনে ফ্যাশন পোশাক, একেবারে হালেরবৈদগ্ধ। বিদেশি কয়েকজন আমার সঙ্গে কথা বলে গেল, তবু নিঃসঙ্গ বোধ করছিলাম। এমন সময় পাশের মিউজিক রুমে স্থাপিত বড় বড় স্পিকারে ঝড়তুফানের মতো সংগীত তরঙ্গ উঠল। ওরা নাচতে শুরু করল। নাচতে লাগল, ছেলেমেয়ে সামনাসামনি, মোচড় নৃত্য। বাজনার তালে তালে। একটি ছেলের সঙ্গে শুরু করল নোরাও। আরেকজনের সঙ্গে শুরু না করে আমারও উপায় রইল না। দেখলাম, কিছুদূরে গোরাও আছে।

অদ্ভুত, ক্ষিপ্তপ্রায় শারীরিক ঝাঁকুনিতে চিত্তের মেঘভার কেটে যায় বটে এবং পানীয় চুমুক দিতে কিঞ্চিৎ ফুর্তি-ফুর্তিও লাগে, কিন্তু কিছুক্ষণেই আমি বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। পালাতে চাইলাম। নৃত্যরতা নোরাকে ধরে বললাম শিগগির। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আম্মা রাগ করবেন।

আহ, কি বেরসিককে নিয়েএলাম রে।আজকের দিনটাই মাটি হয়ে গেল।

হোক একটা দিন মাটি। আমি নরম স্বরে মিনিতি জানালাম। চলনা লক্ষী বোনটি আমার।

তাহলে কথা দে। আমেরিকান ছেলেটার হাত ছেড়ে নোরা বলল, গোরাভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়ে ফেলবি?

আমি তো কোনো ঝগড়া করিনি?

আবার তর্ক, না? ঠিক আছে, আমিও যাব না।

না ভাই আর দেরি করিস না। আমার খুব অসুবিধে হবে।

কথা না দিলে যাচ্ছি না।

আমি একটু ভেবে বললাম, ঠিক আছে।

নোরা হাততালি দিয়ে উঠল, রাজি হয়েছিল?

হ্যাঁ। অনন্যোপায় হয়ে আমি বললাম।

তাহলে একসঙ্গে নাচতে হবে। হঠাৎ নোরা দৌঁড়া গিয়ে গোরাভাইকে টেনে নিয়ে এলো এবং আমার সামনে দাড় করিয়ে দিয়ে হুকুম করল, নাচো।

আপাতসরল গোরোচোখে নোরা মেয়েটার মধ্যে যে এত কিছু লুকিয়ে ছিল তা আমি ভাবতে পারিনি। আস্তে আস্তে প্রকাশ পেতে থাকলে একটু থমকে গেলাম। বলা বাহুল্য আমি গোরাভাইয়ের সামনে কেবল কাঠের পুতুলের মতোই দাঁড়িয়ে ছিলাম।

আমার কাছে নোরা আরেকটি চমকপ্রদ অবদান, এক সন্ধ্যায় আমার কক্ষে ফ্লোরাকে নিয়ে আগমন।

প্রসাধন, তুখোড় প্রসাধন। সারা কলেজে সবচেয়ে চৌকস প্রসাধনসিদ্ধ মেয়ে হিসেবে ফ্লোরা অনেকের ঈর্ষার পাত্রী।

গ্রীবা দুলিয়ে, মনোরম ভঙ্গিতে ঘুরে এমন একটা ভাব দেখল যেন কতকালের প্রিয় সখি।

আমার হাত ধরে টেনে বলল, ইস একেবারে সতী সাবিত্রী! নাক টিপলে দুধ বেরোয়। প্রথম প্রথম আমরাও করেছি, কিন্তু তাই বলে মাসের পর মাস গাল ফুলিয়ে থাকিনি। প্রেমের প্রথম পর্বকি জানিস?

লজ্জায়, আমি মুখ নিচু করে রইলাম। নোরা বলল জানে না, তুইই বলে দে।

ফ্লোরা আমার গাালে একটা ঠোনা মেরে বলল, প্রেমের প্রথম পাঠ দরশন। এর মানে কি তুই যদি মেয়ে হোস, একটা ছেলেকে বারবার দেখার সাধ জাগাতে হবে। বাপরে মাপ, দরশন কি ভীষণ! যুগ যুগ তার চোখের ভিতরে তাকিয়ে থাকা যায়।তাকিয়েথাকা যায়অনন্তকালও।

হয়েছে রাখ। কবিত্ব করিসনে।এমনিতে কবিতে কবিতে ঢাকা শহর ছেয়ে গেছে। একডজন রেশমি চুড়ি পরে এসেছে, বাঁ হাতে সেগুলো বাজিয়ে নোরা জিজ্ঞেস করল, আর দ্বিতীয় পাঠ? প্রেমের দ্বিতীয় পাঠকি?

ফ্লোরা আমার খোঁপা খুলতে খুলতে বলল, প্রেমের দ্বিতীয়পাঠ-পরশন। স্পর্শ করা, ছোয়া ধরা। এই ধরা-ছোঁয়ার মধ্য দিয়ে পরস্পরের মধ্যে সেতুবন্ধন রচিত হয়। একজন আরেকজনকে ছুঁলেও দেহের মধ্যে যে বিজলি প্রবাহ খেলে যায় তা প্রণয়ের একটি আসল প্রমাণ। এখানে অপার পিপাসাও বটে।বৈষ্ণব কবি বলেছেন, নরক অবধি হাম রূপ নেহারিনু নয়ন না তিরপিত ভেল। লাখো লাখো যুগ হিয়ে হিয়া রাখুন; তবু হিয়া জুড়ন না গেল।

ফ্লোরা! ইউ আর সিম্পলি ওয়ান্ডারফুল। নোরা ওর প্রশংসা করে বলল, তোর পেটে এত বিদ্যা জমা হয়েছে জানতাম না।

ফ্লোরা হেসে বলল, তোর পেটেও কি কিছু কম? আমি সব জানি। সিংকিং সিংকিং ড্রিংকিং ওয়াটার!

নোরা বলল, তুই কিন্তু ভেসে ভেসেই জলপান করছিস, ফ্লোরা।

ও শিউর। ফ্লোরা অ¤øানবদনে বলল, ওতেই আমার আনন্দ। কিন্তু নোরা একটা কথা সথ্য। আমিও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী। কখনো বর্ডার ক্রস করতে দিই না।

ওরা নির্বিচার চালিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু বাইরে মাঝে মাঝে, ম্লান, হাসলেও, ভিতরে ভিতরে আমি গরম হয়ে উঠেছিলাম। ওদের কবল এড়াবার জন্য চা আনতে নিচে চলে গেলাম।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

হাত-পা ছড়িয়ে একটা টুল টেনে বসলাম, গালে হাত দিয়ে।

নিচে, গাড়ি বারান্দা ও ড্রয়িং রুমের দিক থেকে বিচিত্র কণ্ঠস্বর এসে কানে বাজছিল; কিন্তু সে শুধু কিছুক্ষণ।

একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে গহীন স্মৃতির ভিতর থেকে, বুদবুদের মতো, পরে পল্লবিতে আপন সম্পূর্ণতায়। একটি গানের ক্লাস। আমি তখন ছায়ানটে ভর্তি হয়েছি, একটা হারমনিয়াম সুর তুলছিলাম। কাছাকাছি, সেই গান। কথাগুলো নিবিড় স্রোতের মতো বয়ে এলো। আমার হাত থেমে রীডের উপরে আমি শুনতে পেলাম-

দিবস রজনী আমি যেন কার

আশায় আশায়থাক

তাই চমকিত মন, চকিত শ্রবণ

তৃষিত আকুল আঁখি।

আমি মন্ত্রমুগ্ধ, আচ্ছন্ন। আমি তো জানি না কেন আমার বুকের ভিতরটা টিবটিব করছিল। কেবল ভেসে যাচ্ছিলাম একটা অজানা স্রোতে, যেমন এখনো যাচ্ছি। আমার হৃদয়ের আলোক। ছায়াতে কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না- অথচ কি যেন ছিল, কি যেন হারিয়েছি। আমি কি কখনো কারো আশায় ছিলাম? জানি না, জানি না। হতে পারে এই ব্যাকুলতা, অবচেতনের পিপাসা।

হঠাৎ আবার গুরু গুরু মন্ত্র ধ্বনিতে অনন্ত চরাচর, এই পৃথিবীটা, গাছপালা, বাড়িঘর প্রকম্পিত হলো। মুহূর্তে আমি সতর্কিত, এমনি শব্দে ঘুমও ভেঙে যায়, আব্বা-আম্মা উঠেও পড়তে পারেন, দরজা ঠেলা দিয়ে এসেও পড়তে পারেন আমার খবর নেয়ার জন্য। অল্পেতেই আমি ভয়পাই, এই ওদের ধারণা। এই ধারণাটা অবশ্যমিথ্যা নয়। ছোটবেলায় দাদির সঙ্গে শুয়ে রাক্ষস খোক্ষসের রূপকথা শুনতে শুনতে একেক সময়তার বুকের মধ্যেমিশে যেতাম। সবচেয়েবড় বয় পেয়েছিলাম, একত্তরে মুক্তি যুদ্ধের সময়, যখন এই জানালাতে দাঁড়িয়েই তিনটা মিলিটারি গাড়ি আমাদের বাড়ির দিকে আসতে দেখেছিলাম।

ভয়, ভয়।আমার এই আঠারো বছর জীবনে সেই ভয়ের ইতিহাস বিচিত্র, যেন এক সূত্রে গাঁথা আছে। একটু নাড়া পেলেই এক নিমিষে সব ভেসে ওঠে, আমি উজ্জ্বল দেখতে পাই সেই দৃশ্যমালা।

কিন্তু আশ্চার্য, আজ এই মুহূর্তে, যখন একত্রিশেবৈশাখ বাইরে সঘন গহন রাত্রি আর বইছে বাদল ধারা, তখন আপন কক্ষের মেঝেতে একলা দাঁড়িয়ে আমি এতটুকু ভয় পাচ্ছি না। আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী নই, কিন্তু বিজ্ঞানকে ভালোবাসি। সবদিকে যুক্তি ও বিশ্লেষণে একটু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ইচ্ছেহয়।আটই ভাল্গুন, একুশে ফেব্রুয়ারি- হ্যাঁ এ বছরের সে দিবসটার কথাই মনে পড়ছে আমার। এই দিনের একটা আলাদা মহিমা আছে, কে যেন বলেছেন। কোনো একটা বক্তৃতায়। ওসব টাকটা সময়, এইদিন, যা আমাদের জন্য বছরের অন্যান্য দিন থেকে সস্পূর্ণ আলাদা- এই দিনে আমরা সীমানা ছাড়িয়ে আসি। নিজেদের অজান্তেই বড় হয়ে যাই। আমার তো ভুলোমন চায়, তবু বিকেলে সহজেই বেরিয়ে গিয়েছিলাম।

আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, একুশের সেই সন্ধ্যে রাতের পর থেকে আজ আমার এই অসুস্থতা পর্যন্ত আমার অস্তিত্বের একটা সম্পূর্ণ আলাদা স্তর। স্বতন্ত্র ভেদ রেখা। আম্মার আশঙ্কা মিথ্যে নয়। অবশ্য আমি সবকিছু তক্ষুনি বলে দিতে পারতাম, একটাহৈচৈ বাঁধাতে পারতাম। অথচ আশ্চর্য, আমি ফিরে এসে শুধু নিঃশব্দে বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। কেন এমনটা করলাম। সেখানেও কি কোনো অজানা ভয় সঞ্চিত ছিল?

আমি কিছুই প্রকাশ করিনি, যদিও শুনেছিলাম যা প্রকৃত সত্যতা কখনো অপ্রকাশিত থাকে না। সত্যের একটা নিজস্ব গতিধারা আছে, সে প্রাকৃতিক। মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মানুষ না চাইলে, মানুষতাকে ধামাচাপা দিলেও কোনো কোনোদিন সে জেগে ওঠে-কখনো দুর্যোগের মতো, কখনো কাঁটার মতো।

আমার সত্য গোপন করার মধ্যে আমার কি সর্বস্বত্ব কাজ করেছে, প্রায় তিন মাস ধরে তাই বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কোনো ক‚ল কিনারা পাইনি। কথায় আছে, পাপ যে করে সে যেমন পাপী, পাপ যে গোপন করে সেও সমান পাপী। পাপের শাস্তিই পাপের নিস্কৃতি।

আমার আত্মমীমাংসার পথে একটিই ছিল প্রধান বাঁধা : ঘটনার শুরুতেই আশ্চার্য, আমার মনে হয়েছিল, যে এই কাজটা করছে সেকি প্রকৃতই গোরা না অন্য কেউ? অবয়বে তো গোরাই ছিল, কিন্তু ব্যবহারে আমি তাকে চিনতে পারছিলাম না।

কিন্তু আশ্বিনের দুপুরের সেই সিঁড়ি থেকে এ পর্যন্ত আসতে যে পথ পঞ্জিকার হিসাবে তা আট মাস হলেও আমার অন্তজগতে এমনই দীর্ঘ পিছনে তাকালে অনেক সময় তার সীমারেখা দেখতে পাই না। আলো-আঁধারিতে ভাসে নেভে; কোনের কোনো মুহূর্তে যেন একটা মহাসড়ক। ওদিকে পাহাড় শ্রেণি, এদিকে গ্রামের সবুজরেখা। আশেপাশে কর্ষিত ভূমি, সবুজ শস্যখেত। শীতল পানির বিলগুলোতে শালুকপাতায় আচ্ছাদন, মাঝেমাঝে শাপলা ফুটে আছে। গাছের ডালে হলদে পাখি, নিচের ঢালুতে কয়েকটি বক। আমি হেঁটে যাচ্ছি। কখনো দৌঁড়াচ্ছি, একলা। আমার খোলা চুল উড়ছে হাওয়ায়। আমি এক চঞ্চল কিশোরী। জঙ্গলের ধারে কনকচাঁপা, কয়টা ফুল তুলেনিলাম। সম্ভবত সবই দূর কল্পনার ভাসা-ভাসা নানা ছবি, কিন্তু আমার অস্তিত্বের মধ্যে বর্তমান।

এমনি একটা ছবি অবশ্যই বাস্তব ছিল, যখন আমার বয়স তেরো বছর। এইটে উঠেছি। সেবার কি হলো। একটু ব্যতিক্রম। আমাদের দেশের বাড়ি। মেঘনা তীরবর্তী বায়হরা গ্রাম। ঈদের ছুটিতে বেড়াতে গেলেন আব্বা, আম্মা আমাদের সবাইকে নিয়ে। আমার দাদা নামকরা ইস্কুল শিক্ষক একরাম আহমদ অসুস্থ ছিলেন। শুনেছিলাম বয়স সত্তর বছর। অথচ যথেষ্ট শক্ত ছিলেন। আমাদের দেখতে মাসখানেক আগেই এসেছিলেন। এনেছিলেন আম, জাম আর কুলিপিঠা। আমরা যাওয়ার আগে একটু আলাপ শুনেছিলাম; আব্বা তখন অফিস থেকে ফিরছেন। বেডের ধারে বসে জুতোজোড়া খুলছিলেন, ড্রেসিং টেবিলের সামনে আম্মা, চুল আঁচড়াচ্ছেন। আব্বা বললেন রূছমত এসেছিল অফিসে, একটা চিঠি নিয়ে।

কে রূছমত। ও তোমার গ্রামের লোক! ফুফাতো ভাইই তো? মুখনা ফিরেয়েই আম্মা বললেন, তা কিসের চিঠি?আছে তো শুধু মারার ফিকির। জিনিস পাঠাও চাকরি দাও। টাকা দাও, টাকা দাও। অসহ্য অবস্থা।

‘না, না। সে সব কিছু না। বাবা খুব অসুস্থ। লিখে পাঠিয়েছেন যদি শেষ দেখা দেখার ইচ্ছে থাকে তাহলে যেন যাই। ছেলেমেয়েদের নিয়ে যেতে বলেছেন। উনি ওদেরকে শেষ দেখা দেখতে চান।

‘হুঁ, বুঝেছি; মুহূর্তে আম্মার মুখথমথমে, উনি আব্বার দিকে ঘুরে বললেন, ‘এটা মতলবও হতে পারে। অসুখের নাম করে, নাকে দড়ি বেঁধে আমাদেরকে গ্রামে নিতে চায়, বড় কিছু আদায়করবার জন্য। তোমার গ্রামের লোক নিয়ে তুমিই থাকো বাছা আমাকে এর মধ্যে টেনো না। আমি যাব না, এবং আমার ছেলেমেয়েরাও না। বুঝেছ’?

‘আহাহা, রাগ করো কেন। এটা ঠিক হবে না মিনা। আব্বা বুঝিয়ে বলতে লাগলেন, ‘তুমি তো জানো, আমার প্রতিটা বক্তবিন্দু বাবার মতো গড়া। প্রকৃতপক্ষে আমি ষোল আনা তাঁরই সৃষ্টি। ইচ্ছে ছিল, আব্বার শেষ বয়সটায় আমার সঙ্গে রাখব।

‘কিন্তু তা পারনি, তোমারা শহুরে উয়াইফের জন্য- এই তো বলতে চাও?আম্মা চোখ পাকিয়ে আব্বার মুখের দিকে তাকালেন।

আব্বা বিব্রত, ব্যস্ততার সঙ্গে বললেন, ‘না না ছিঃ একথা কি বলছ মিনা। তোমার জন্য কেন হবে! বাসায়আমার অনেক অসুবিধা, সে কথা উনিও জানেন।

কিছু মনে করো না। তোমার বাবা বুড়ো হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু গভীর জলের মাছ। আমার দিকে কেমন করে তাকায় দেখেছ। যেন চিবিয়ে খেয়ে ফেলবেন।

এবার আব্বা সত্যিই গম্ভীর হয়ে গেলেন। একটু থেমে বললেন, ‘তাহমিনা’! আমাদের পরিবার সম্পর্কে তোমার অনেক ভুলধারণা আছে, এও তার একটি। এত বছরেও যখন হয়নি, এখন আর সে ভুল ভাঙানোও যাবে না। তোমার মনের ভিতরে যাই থাক, বাইরের ভদ্রতায় অসুবিধা কি।

‘ও আমাকে ছোট ভাবছো তুমি? ঠিক আছে, আমার বয়েই গেছে অজ পাড়াগায়ে যাওয়ার।

আমি একটু উঁকি মেরে এগিয়ে গেলাম, দেখি আব্বার খাঁড়া নাকটা আরও তির্যক হয়েউঠল, তিনি তার সোনালি চশমাটা বাঁ হাতে ঠিক করে দৃঢ়স্বরে, অভ্রান্ত নির্দেশের ভঙ্গিতে বললেন, তোমাকে যেতেই হবে, তাহমিনা। ছেলেমেয়েরাও যাবে। কালসকালে গাড়িতে করে আমরা রওয়ানা দেব রাস্তা ভালো।

আব্বার গুরুতর কণ্ঠস্বরে আম্মা একটু তাকালেন শুধু, বললেন না; তার চেহারাটা কালো হয়ে গেল। আমি উপলব্ধি করলাম, হ্যাঁ এটাই আব্বার ব্যক্তিত্ব, যার জন্যতিনি একজন কড়া প্রশাসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। আম্মার আধিপত্যবাদী ব্যবহার তার কাছে নেহাৎ ঠুনকো। সব সময় আব্বা সহ্য করে যান, এইটুকু বুঝলাম। তবে ইচ্ছেকরলে যেকোনো সময়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

ওহো, এতসব ভাববার তো কথা নয়, আমার কেবল মনে পড়ছিল দেশে যাওয়ার পরদিন মেঘনা পেরিয়ে নানাবাড়িও গিয়েছিলাম। সে গ্রামের কাছাকাছি মধ্যচর। অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কোথাও কোথাও বালি চিক চিক করছিল, কিন্তু বেশিরভাগ জমিতেই সবুজ ফসল। এখন খিরা, বাঙ্গি আর তরমুজের মরশুম।

একটা ছোট ডিঙি। আমার মামাতো ভাই হাসু,ভৈরব কাদির বক্স হাই স্কুলের ক্লাস টেনের ছাত্র। এখন বাড়িতে আছে। সে এসে চুপিচুপি বলল, তরমুজ হয়েছে না? বিদেশি জাত।

‘আমি ভয় পাই যে! নৌকায় ভরতে হবে তো। বাব্বাহ, মেঘনায় যা ঢেউ। আর ঝড়-তুফান এলে তো সর্বনাশ।

‘আরে বোকা। এইটা তো মেঘনার মাথা, ঢেউ নেই। আর ঝড়-তুফান আসবে কেন, দেখছো না আকাশটা কি পরিষ্কার! ঠিক আছে, বাক্কা মিঞারে নিয়ে যাব। বেশপাকা ছোকরা।

বাড়ির বছরমুণি আবুবকরের নাম দিয়েছে কে রসিকতা করে, বাক্কা : অবশ্য সে কামকর্ম করে বেশ ভালো। বাক্কার অর্থ উত্তম। আম্মাকে বুঝিয়ে বলে ওদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম। মামাতো বোন ফাতুকে সঙ্গে নিলাম।

উজ্জ্বল সকাল, ঝকঝকে রোদ। লোপা সবুজ গামছা বাঁধা মাথায়, বাক্কা মিঞা পাক্কা মাঝির মতো ডিঙিটাকে শাখা নদী থেকে ক্রমে ঘুরিয়ে বড় নদীতে নিয়ে গেল। কারণ ওদিকেই জমি। এদিকে নামলে অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়। অথচ আমরা দুটি মেয়ে রয়েছি।

আধ ঘণ্টার মধ্যেগিয়ে জায়গায় পৌঁছবার পর তরমুজ খেতে যেয়ে সে কি ফুর্তি। ফাতু আর আমি, দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি করতে লাগলাম। জুতো ছেড়ে এসেছি ডিঙিতে : আমার ওড়না উড়ছে, চুল উড়ছে।

দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় পিছনে তাকিয়ে দেখি ফাতু নেই। কি ব্যাপার। দেখলাম কিছু দূরে সে আছে। সে বসে পড়েছে। আমি লাফিয়ে লাফিয়ে জলদি ওর কাছে গেলাম। সে তখন একটা বেশ বড়সড় তরমুজকে দু’হাতে পরম আদরে জড়িয়ে ছিল। যেন একটা ফল নয়, প্রিয়জনকে ধরে আছে। আমি হেসে উঠলাম ওর ভাব দেখে, বললাম, কিরে ফতি একি করছিস?

কিমুন সোন্দর দ্যাহ না লুপি বুবু, খুব ভালা লাগতাছে। ফকফকে শাদা দাঁত ফাতুর, সেগুলো বার করে বলল, তুমি নিবা? এই, এটা তাহলে ঢাকায়নিয়ে যাব।

এ সময়পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল ধাক্কা মিঞা ও হাসু ভাই। হাসু ভাই বলল, ঠিক আছে, নিও। এখন চল আমরা একটা ছোট্ট উৎসব করি।

কি উৎসব আবার! তরজুম উৎসব।

তুমি রাজধানীর লোক- তোমার নাম নওশিন আহমদ লোপা, বাবা কি খটখটে। তুমি যে এই নির্জন দ্বীপে এসেছ, এ আমাদের প্রথম পরম সৌভাগ্যস্মিত হাস্যে মুখ উম্ভাসিত, হাসু ভাই বলল, তোমার আগমনটাকে আমি স্মরণীয় করে রাখতে চাই।

হ, হ। খুব ভালো অইব। বাক্কা মিঞা বোকার মতো বলল, ক্যামেরা থাকলে ফডো তুইল্যা রাহন যাইত।

ফতু আমাকে ধরে বলল, চলো না বুবু, জলদি চলো। আমাগো খেতের তরমুজ যা মজা! হগগলতে ভালা কয়।

আমরা হুড়াহুড়ি করে ওখানে গেলে হাসু ভাই মাঝারি আকৃতির তরমুজটা দু’হাতের পাতায় আগলে ধরে বলল, লুপি তুমি কাটবে এই তরমুজ।

সত্যি? আমি ভীষণ খুশি, বললাম, কাটতে পারব তো?

হ্যাঁ নিশ্চয়ই। পারবে না কেন। হাসু ভাই বলল, তরমুজের ছিকলা খুব শক্ত নয়।

আগে থেকে ব্যবস্থা ছিল, বাক্কা মিঞা ছুরিটা এগিয়ে দিলে আমি নিলাম, এবং দু’হাতে তার বাট মুঠো করে ধরে মাঝামাঝি লাগিয়ে দিলাম। কাটছি, কাটছি। নিচে হাসু ভাইয়ের হাতের পাতা। মাটিতে রেখেও কাটা যেত। কিন্তু এতে যেন বিশেষ আনন্দ।

শেষ দিকে আমার হাতের চাপে হঠাৎ করে ছুরিটা নিচে নেমে গেলে হাসু ভাইয়ের হাতে লাগল।

সঙ্গে সঙ্গে তরমুজ ঝপ করে নিচে পড়ে যায় আর আমিও ছুরিটা ছেড়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলাম।

আড়াআড়ি ডান হাতের পাতায় লেগেছে, সেখানে লাল রক্তরেখা। আমি দিশেহারা, তার হাতটা চেপে ধরলাম।

আমরা বালুমাটিতে লেপটে বসে পড়েছিলাম; কাছেই ঝকঝকে রোদের মেঘনা ক‚লক‚ল বয়ে চলেছে, চরের বিভিন্ন জায়গায়-উড়ছে, বসছে পাখিরা। রক্তমাখা হাতখানা ওড়না দিয়ে বাঁধবার আগে যখন আমি চেপে ধরে ছিলাম, এক সময় কাতর দৃষ্টিতে মুখ তুলে তাকাতেই দেখি একটা গভীর চাঁদনি। পলক হারা স্থির প্রদীপের মতো। আমার চোখের ভিতরে তার চোখ। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। আমার হাতে ধরা তার হাতা ছেড়ে দিলাম। তখন আমার চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল। তা দেখে হাসু ভাই হেসে বললেন, পাগলী! কি হয়েছে?

এটা কি হয়ে গেল হাসু ভাই! আমি তো বুঝতে পারিনি!

আরে কিচ্ছু না, কিচ্ছু না। এইটুকু কাটা! এই দ্যাখ আমার ডান পায়ে কতবড় জখমের দাগ। ডাল কাটতে গিয়ে কুড়াল লেগেছিল। এইটুকু কিছু না-

এইটুকু ঘটনা, আমরা ফিরে এলাম। আমার নানা তাজ যৌবনে ভাগ্যান্বষণে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ঘুরেছেন বার্মা ও ভারতবর্ষের অনেক জায়গায়। আসামের গৌহাটিতে কয়েক বছর ছিলেন, তারপর যুদ্ধের পরে ঢাকায় এসে ছোট ব্যবসায় শুরু করেছিলেন। কিন্তু দেশের বাড়িটা ছাড়েননি ভাই-ভাতিজারা থাকে, পুকুরঘাট পাকা করে দিয়েছেন এবং একটা মসজিদও বানিয়ে দিয়েছেন। আমরা আর দুদিন ছিলাম। কিন্তু এমন এই দু’দিন মুহূর্তের জন্যও আমার কাণ্ডটা ভুলতে পারিনি যদিও একটা দুর্ঘটনা মাত্র আমার মন জুড়ে একটা অপরাধবোধ ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আস্তে আস্তে সব ভুলে গেলাম। তারপ অন্যদিকে। তিন বছর পর, ম্যাট্রিক পরীক্ষার দিন পনেরো বাকি।নৈর্বাচনিক গণিতের একটাঅঙ্ক বুঝতে পারছিলাম না, নোরার ওখানে গেলাম। ও ভীষণ খুশি। নিজে চেয়েও দেখল না বইয়ের পাতাটা, আমাকে ধরে বলল, চল গোরা ভাইয়ের কাছে, তার ব্রেন একটা কমপিউটার। অঙ্কটা এক নজর দেখবে মাত্র, কাগজ-কলম হাতে নেবে না। রেজাল্টটা বলে দেবে।

আমি তো তাজ্জব। উচ্চারণ করলাম, তাই নাকি!

হ্যাঁ, চল না। এক্ষণি দেখবি।

অদ্ভুত অভ্যাস গোরাভাইয়ের, বিছানার চারপাশে বইপত্র ছড়িয়ে রাখে, বালিশের নিচেও দু’একটা। কিছু চিত করা, কিছু উপুড় করা। ওগুলোর মধ্যেই কাত হয়ে একটা ইংরেজি জার্নাল দেখছিল, আমাদের দেখে উঠে বলল। নোরা এগিয়ে দিল। সত্যিই সেই যাদু। বইয়ের পাতাটার উপরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে গড়গড় করে মুখে মুখে অঙ্কটা কষে দিল।

তার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, কিন্তু এটা কিছু না। আমি ফিরে আসলাম, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লএবং একটু এগিয়ে এসে আমার ডান হাতটা টেনে দ্রুত বলল, শোনো একটু শোন লোপা। বোরহানের কোনো চিঠি এসেছে? আমি তো পাচ্ছিনা!

সেই প্রথম স্পর্শ, মুহূর্তে আমার মুখে রক্ত সঞ্চারিত হয়ে গেল। আস্তে আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিই, কিন্তু সে সময় চোখে চোখে স্থির গভীর চাউনি। মধ্যচর তরমুজ। রক্তমাখা হাত, নীলআকাশ।

এখন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়েআবারও একটি প্রশ্নের শীর্ষরেখা, আশ্বিনের দুপুরে কেন একলা গিয়েছিলাম?অস্পষ্ট অনুভূতি, সে আকারণ ছিলনা। একটা মনোভঙ্গিরই ফল। আসলে বড় হয়ে ওঠা ছেলেমেয়েতে বন্ধুত্ব, আমি ভাবি এটা স্বাভাবিক। আমরা মধ্যযুগের নারী নই যে ঘরের ভিতরে ঘোমটা দিয়ে বসে থাকব। আমার বান্ধবীদেরও এই অভিমত। ছেলেদের সঙ্গে হাসব, খেলব, গাইব, পড়ব কাজ করব, অসুবিধা কোথায়। বেশি আড়াল-আবডালই বরংখারাপ। তবে আমার অন্তত ব্যক্তিগতভাবে এই মনে হয়, এই সম্পর্কের একটা সীমারেখা থাকা উচিত।অথচ সর্বদা থাকে না, এও দেখা যায়। সেদিন অঙ্ক বুঝতে গিয়ে যেটুকু, শুধু নাম ধরে ডাকলেই পারত অথচ হাত ধরে ফেলল, যদিও এই আতিশয্যাটুকু আমার ভালো লেগে ছিল। ফিরে এসে শুয়ে গভীর আমেজে বুুঁদ হয়ে ছিলাম। এইটে কিছুদূর নিস্তেজ দুষ্টি তাকিয়ে আছি। আমার জানালায়। আম গাছের পাতার ঝোপড়া আরও সবুজ হয়েছে নিবিড় একটা প্রাগাঢ়তার প্রলেপ কিন্তু অন্য সময় যা করি তখন উঠে গিয়ে ইতি দিয়ে ধরে দেখতে ইচ্ছে হলো না।

প্রতিদিন আগের স্রোত, প্রতিদিন নতুন স্রোত। আগের স্রোতে ভেসে চলি, নতুন স্রোতে ডুবে যাই। আবার উঠি, আবার চলি। নতুন যেন এক অন্ধ গতিধারা। সেখানে কি থাকে, কি থাকতে পারে? বেঁচে যায় কতটুকু? একটি ছোট, দৃশ্য, তাও আমার স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেল। হারিয়ে গেল, কিন্তু মাধবীকুঞ্জে জোনাকির মতো মিটিমিটি জ্বলে হয়তো, দূর থেকে যাকে দেখতে পাই না।

এমনি করে আর একদিন। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর তিনদিন বাকি কিছু সাজেশন পেয়ে গেলাম। কেউ কেউ বলল পরীক্ষারই প্রশ্ন, চোরা পথে আউড হয়ে গেছে। কিন্তু আমি ভাবছিলাম, হোক বা না-হোকতৈরি করে রাখি। অঙ্কই বেশি। দুপুরে চুলে শ্যাম্পু করেছিলাম। কেন জানি ইচ্ছ হলো, অন্যদিনের বিকেলের চেয়েএকটু বেশি সাজলাম। শাড়ি পরেছি, পিঠের উপরে ছড়ানো কেশরাশি।আমার হাতে প্রশ্নর তালিকা ও একটি খাতা। খবর নিয়েছি নোরা আছে। মগরেবের আজান শুরু হয়ে গেল, থামলাম। আমাদের গেট পেরিয়ে বাইরে গেলে তাঁর পাশেই ওদের গেট, সন্ধ্যার পরে বেরিয়েটব থেকে একটি লাল গোলাপ ছিঁড়ে চুলের কাঁটায় জড়িয়ে নিলাম।

বাড়ির নাম আনারকলি। নোরার মায়ের নাম কিন্তু আনোয়ারা, তবে ডাক নাম আনার, সেজন্যই বোধ হয় বাড়ির এই নাম। বাড়ির নাম হিসেবে শধু আনার নিরর্থক, তাই আনারের পাশে কলি ফুটেছে। সিঁড়ির পরেই প্রশস্ত করিডোর। তার একপাশে বড়বৈঠকখানার নিকটবর্তী বাগানের দিকে গোরা ভাইয়ের ঘর। আমি সিঁড়ির দিকে না গিয়ে এদিকে হেঁটে এলাম, গোরা আছে কিনা দেখার জন্য। এদিক-ওদিক কেউ ছিল না। আমি গেলাম, কিন্তু কেন জানি, চুপি চুপি। জানালা খোলাই ছিল, ভিতরে তাকালাম। উজ্জ্বল টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। শেড কাত করা, সেখানে আলোর মধ্যে গোরা ভাইয়ের মুখ। নিচে টেবিলে, কাগজপত্র, বোধ হয় কোনো ফরমূলা একটু নিচে এক দৃষ্টে দেখছে। এখন ধীরস্থির, যেন ধ্যানস্থ। আমার চাউনিতে কখন ফুলের পাপাড়ির মতো কোমলতা নেমে এলো, বুঝতে পারিনি। কখন আনমনা হয়ে গেলাম। তন্ময় তাকিয়ে রইলাম। গোরাভাই বড় একজন সাধক হতে পারে, খুব বড় একজনবৈজ্ঞানিক। ওদিকে পদশব্দে চমকে উঠে ফিরে চললাম। ফিরে আসার সময় মনে হয়েছিল লাল গোলাপটা রেখে যাই জানালার কাঠের কিনারে কিন্তু কেমন একটা সংকোচ :

মাথার কাঁটা থেকে খোলা সত্ত্বেও তা ওখানে রাখতে পারলাম না। সিঁড়ি মাড়িয়ে উঠে গেলাম না আর নোরার কাছে, বাসায় ফিরে এলাম।

আব্বা-আম্মার ঘর পেরিয়ে যাওয়ার সময় ক্রিং ক্রিং টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভারটা খুলে কানে লাগালাম। হ্যাঁ, যা ভাবছিলাম, নোরা। সে বলল, কি ব্যাপার নোরা? আমি অপেক্ষা করছি, এখনো এলি না?

আমি যে গিয়েছিলাম তা বলব না কেন যে হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম তা জানি না। আমি বললাম, আজকে আসতে পারছি না।

কেন হয়েছি কি? গোরা ভাইয়ে বাইরে যাওয়ার কথা ছিল, আমি তাকে ধরে রেখেছি।

আমি অত্যন্ত দুঃখিত নোরা। তাকে বুঝিয়ে বলিস, আমার খুব মাথা ধরেছে।

ও তাই বল। হঠাৎ নোরা যেন ক্ষেপে গেল, নালিশের সুরে বলল, আচ্ছা সারারাত জেগে পড়ছিস কেন, বল তো? তুইও ফাস্ট হতে চাস নাকি? আমি মৃদু হাসলাম। বললাম, যদি হতে পারি দোষ কোথায়। যারা ভালো স্থানগুলো দখল করে, তারা আমাদের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান তা তো মনে হয় না!

তা হতে পারে। নোরা কিছুটা শান্ত, দরদি গলায়বলল, কিন্তু একজন প্রতিভাময়ী কণ্ঠ শিল্পীকে হারাতে চাই না যে।

কেন, হাসালে নোরা। পরীক্ষায় প্লেস রাখলে আমি গান ছেড়ে দেব এই ভেবেছিস? না, ছাড়ব নারে। অন্তত তুই যদ্দিন সঙ্গে আছিস। কেন থাকব না বলতে পারিস?

শুনতে পাই, তোর চতুর্দিকে মৌমাছিরা ভন ভন করেছে। উরন্ত বাজ, চিল কোনদিন না ছোঁ মেরে নিয়ে যায়।

এমন অবলা আমাকে ভেবেছিলি নাকি? বিরাশি সিক্কার ঘুষি মেরে উচামুখ ভোঁতা করে দেব না? হঠাৎ বলে উঠল নোরা। ও, তুই যখন অসুস্থ আমিই আসছি। একলা একলা ভালো লাগছে না।

বেশ আয় না। আব্বা সব সময়বলেন, কাছাকাছি আছি দুজনে কনসাল্ট করে পড়তে।

ঠিক আছে, আসছি আমি।

সেদিন আমার কক্ষে দুজনে মুখোমুখি পড়াশুনা করতে করতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ঘরির দিক চোখ পড়লে নোরা উঠে পড়ল তখন আমি বললাম বারোটা বেগে গেছে। এখন যাবি কিভাবে? এখানেই থাক না নোরা। বাসায় খবর পাঠিয়ে দিই? থাকব?

নোরা আমাকে চেয়ে দেখতে লাগল, তারপর মধুর হেসে বলল, তোকে আজ অপূর্ব লাগছে রে! কিন্তু একটি শর্ত।

বলনা।

সারা রাত গল্প করব।

ওকে, ম্যাডাম। তাকে কোনো অসুবিধা নেই। গল্পগুলো নায়কবিহীন যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রেখো। আমি টিপ্পনি কাটতেই দু’জনে হেসে উঠলাম।

একলা একলা থাকি, আমার নিঃসঙ্গতা সম্পর্কে আমার অভিভাবক, বিশেষ করে আব্বা খুব সচেতন। হয়তো ভাবেন কালক্রমে হয়তো সমস্যা হতে পারে। নোরা আসায়উনি খুশি এবংথাকতে ইচ্ছে করল, আরও আনন্দিত। দুজনেই শোওয়ার আগে আমার কক্ষে এলে। আব্বা বললেন, আমার তো মনে হয় মা, এখন মনটাকে রেস্ট দেওয়াই ভালো। জানিস, একটা মজার ব্যাপার। আমি তো সব পরীক্ষায়ই ফাস্ট হয়েছি এবংপরীক্ষা শুরু হওয়ার ত্রিশদিন আগ থেকে লেখাপড়া একদম ছেড়ে দিতাম। অনার্স পরীক্ষার সময় তো লায়ন সিনেমায় গিয়ে মারপিটের ছবি দেখেছি।

রাখো তোমার মারপিট। আম্মা এগিয়ে এসে বললেন, এখন আর সে যুগ নেই। তোমাদের সময় সেট-এর ব্যাপার-স্যাপার ছিল, তোতা পাখির মতো মুখস্থ করতে পারলেই চলত। কিন্তু এখন? পরীক্ষার আগের দিনেও শুনবে প্রশ্ন আউট হচ্ছে, গতবার শ’টাকা বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো সেন্টারে অ্যানসার পেপারও। প্রতি খাতা পাঁচশো টাকা মাত্র। তোমরা এখন দেশ চালাচ্ছো। পরীক্ষাটাও হয়ে গেছে পয়সার খেলা।

আব্বা একেবারে চুপ মেরে গেলেন। সোনালি ফ্রেমের চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, আমি যাচ্ছি তুমি এসো।

আকাশে অর্ধেক চাঁদ ছিল, রাত একটায় বাতি নেভাবার পর জানালায় আম গাছের পাতায় পাতায় জোৎস্ন্যার আভাস। ঝির ঝির বাতাস বইছে। পাশাপাশি বালিশ, দুজনে শুয়েছি। আলতো ভাবে হাত ধরে পরস্পর। নোরা কথা বলে যাচ্ছিল, কত কথা। কত গল্প। কত বিচিত্র ঘটনার রসালো বিবরণ। ক্লান্তিতে আমায় ঘুমঘুম ভাব তবু কান পেতে শুনছি।

এক সময় নোরা কিছুক্ষণ চুপ করে রাইল, তারপর বলল, হোপলেস আমি কোথাও আর আশার আলো দেখতে পাচ্ছি না। মনে হয়, আমাদের পতন ঘটছে। খুব দ্রুত পতন।

কি রকম? কিঞ্চিৎ ভাবনাও হলো, আমি মৃদুস্বরে বললাম, একটু বুঝিয়ে বল না?

কিন্তু অদ্ভুত, নোরা এক্ষুনি বলতে লাগল না। চুপ হয়ে থাকে, বাঁ হাতটা তুললে চুড়ির রিনিঝিনি।

অবশেষে নোরা মুখ খুলল। আস্তে আস্তে, মাঝে মাঝে নেমে, গাঢ়স্বরে বলে চলল, আমরা কেউ কাউকে দেখতে পারি না। পরস্পরকে ঘৃণা করছি। প্রত্যেকেই, নিজ নিজ আখের গুছাতে ব্যস্ত। দেশ, জাতি, মানুষ, মুখের বুলি মাত্র। এটাই ধ্বংসের, পতনের লক্ষণ।

তুমি আমি নারী। এ অবস্থায় তোমার আমার হৃদয়ের মূল্য কি?নট ইভেন এ হাইপেনি।

আই অ্যাম ফেড আপ উইথ দি বয়েজ। ওরা কথায় কথায় প্রেম ঝড়ে। কিন্তু বিয়ে করার সাহস নেই, হয়তো যোগ্যতাও নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এ সম্পর্কে তারা নিশ্চেতন। এরা মনে করে, একটা মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে পারাটাই বাহাদুরি। আচ্ছা লোপা, একটা প্রশ্ন করি, ঠিক উত্তর দিবি?

কি প্রশ্ন, বল না। আমি চেষ্টা করব।

আমার চুলে আদর করতে করতে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা লোপা, তুই কি এখনো প্রেমে পড়িসনি?

্একটা উদ্ভট প্রশ্ন, আপন মনে আমি হেসে উঠলাম। ওর একটা আঙুল ফুটিয়ে বললাম, কি যে বলিস নোরা। প্রেম আবার কি?

ন্যাকামি করিস না। প্রেম কি বুঝিস না, বুঝি? বেশ ঝাঝের সঙ্গেই মন্তব্যকরল নোরা, আরও বলল, বয়স তো আঠারো পেরিয়ে যাচ্ছে।

তা বটে। এবং আমাদের দেশে মেয়েরা তো কুড়িতেই বুড়ি। আমিও বুড়ি হতে চলেছি, একটু থেমে বললাম, কিন্তু তোর গা ছুঁয়ে বলছি, প্রেম কি আমি বুঝিনা। তুই বুঝিস নোরা?

বুঝলে আমাকে একটু বুঝিয়ে বল না?

কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপ নোরা বলল, প্রেম হচ্ছে ‘দিলি­কা লাড্ডু যো খায়া ও পস্তায়া আউর যো নেহি খায়া ওভি পস্তায়া!’

না না, নোরা। এটা একটা জোক মাত্র।

জোক নয়, মাই ডিয়ার লোপা। এখন না বুঝলেও তুইও একদিন বুঝবি। আমার বয়স তারই সমান। আঠারো বছর।কিন্তু আমি তোর চেয়েঅনেক বেশি দেখেছি জীবনকে।

হ্যাঁ, তা তো বটেই, আমাদের পরিবারকে তো জানিস। আমার অভিজ্ঞতা খুব সীমাবদ্ধ।

জানিস লোপা। একমাত্র তোকেই বলছি-

অনেকক্ষণ আর কিছু না বলায় আমি ঠেলা দিয়ে তাগাদা দিলাম, চুপ হয়ে গেলি কেন, বলনা।

ভাবছি বলব কিনা।

না বলতেই হবে। নইলে তোর সঙ্গে আমি আড়ি দেব।

উহ সেটা হবে অসহ্য। ঠিক আছে বলছি। জানিস লোপা, আমি এজনকে ভালোবেসে ফেলেছি-কিন্তু, কিন্তু তাকে পাব না।

সে আবার কি।

এটাই সত্য। আবার চারপাশে মাছির মতো যারা ভনভন করে সেই তথাকথিত বড়লোকের ছেলেরা বড়ই ঠুনকো। ওদেরকে আমি নাচাই একথা ঠিক কিন্তু তার বেশি কিছু না। আমি যার প্রেমে পড়েছি সে এক তরুণ বিপ্লবী। আমাদের সমাজটাকে চুরমার করে ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ার স্বপ্ন দেখে। কেবল স্বপ্ন নয়, কাজও করেছে।

হু।

আমাকে সেও ভালোবাসে। কিন্তু আমাদেরকে ঘৃণা করে।

তার মানে?

আমরা যে নব্য ধনিক, আত্মপ্রতারণা ও প্রতারণাই নাকি আমাদের ভিত্তি।

বুঝলাম না নোরা।

আমিও কি বুঝি ছাই। একটু থেমে নোরা ভেজা গলায় বলল, কেবল বুঝেছি আমি ওকে পাব না। এই ভাগ্য নিয়েআমি জন্মেছিলাম। আমি কেমন করে বাঁচব বল।

আমার বুকের কাছে মুখ লুকিয়েফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল, যদিও জানতাম অনাবশ্যক তবু সান্ত¡না দিতে লাগলাম, আহা নোরা। খুব বেশি সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়েছিস। শান্ত হ। প্রেমটাই জীবনের শেষ কথা নাকি?

আশ্চার্য, সত্যিই আশ্চার্য। এমন একটা মন্তব্য আমার ঠোঁট থেকে কেমন করে ঝরে পড়ল, নিজেই বুঝলাম না।

এটা তো কথামাত্র নয়, একটা জীবনদর্শন। জীবন ও প্রেম। জীবনের কতটুকু প্রেম, প্রেমের কতটুকু জীবন। এ সম্পর্কে আমার কোনো জ্ঞানই ছিল না।

তাহলে এমন কি কোনো আন্তঃপ্রবাহ আছে যা আমাদের অন্তর দিয়েও বয়ে চলে অবিরাম এবং কোনো কোনা মুহূর্তে, বাইরে থেকে কিঞ্চিৎ আঘাত পেলে, নিজে নিজেই ছিটকে ঝলক ঝলক?

তবে বুঝলাম, নোরার ব্যথা যদি কিছু থাকে তা ওর একান্ত কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়। অনেকেই আসে ওর কাছে,বৈঠকখানায়হৈ-চৈ করে, গুলতানী মারে। দেয়ালের এ পাশে, দোতলায় আমার এ কক্ষ থেকেও শুনতে পাই উল্লাসধ্বনি, কখনো চিৎকার এবং করিডোরে এলে তরুণদের অস্পৃষ্ট আকৃতিও। যে ছেলেটার কথা বলল, সে যে ওদের কেউ হবে না তা নিশ্চিত। ওর ওখানে সেও আসে কি? কখন আসে? না নোরাই খুঁজে বেড়ায় ওকে। হলে কিংবা লজিং বাড়িতে কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে সাক্ষাৎ করে ওর সঙ্গে? এসব আমার জানতে ইচ্ছে হলো না। তবে ছেলেটির বক্তব্যটা আলোচনাযোগ্য। নোরার বাবা সুলতান মাহমুদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাক্তন অধ্যাপক। ঢাকারই একটা সরকারি কলেজে কাজ করতেন। নোরার মা আনোয়ারা তার ছাত্রী ছিলেন। সেভাবে পরিচয় এবংবিয়ে। অধ্যাপক, বিয়ের এক বছরের মধ্যেই তার বড় লোক এক আত্মীয়ের বাসায় অপমানিত হয়েছিলেন শোনা যায়। এবংতখন থেকেই নাকি তার প্রতিজ্ঞা, ধন সঞ্চয় করবেন। তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ইনডেনটিং বারসায়ে নেমে পড়লেন। ইনি ভূঁইফোড় নন, প্রায় দশ বছর লেগেছে প্রতিষ্ঠিত হতে; এবং স্বাধীনতার পরে এসেছে সমৃদ্ধি। আগে পুরাতন ঢাকায়ই থাকত : বছর তিনেক আগে এখানে উঠে এসেছে। এটা ওদের নতুন বাড়ি, তিন-চারটে গাড়ি একটা না একটা মওজুর থাকে, কাছাকাছি। হয় মাইক্রেবাস, নয় জিপ। পিকআপ নয় ডাটসান বার।

অবশ্য সূ² বিচারে অধ্যাপক মাহমুদকে নব্য ধনীই বলতে হবে। কিন্তু তিনি ভূঁইফোড় নন : তার উৎপত্তি উন্নতি মূলত বুদ্ধিমত্তা ও পরিশ্রমেরই ফল। আধুনিক কালচার গ্রহণ করলেও অপসংস্কৃতিকে বর্জন করেননি; ছেলেমেয়েদের ডাক নামগুলো যথাসম্ভব বাংলায় রেখেছেন। আমার সঙ্গে নোরাও রবীন্দ্রসংগীত শিখছে, তাকে উৎসাহিত করেছেন।

ক্রমে রাত নিঝুম হয়ে এসেছিল, আমার জানালার পত্রগুচ্ছে ঈষৎ হাওয়ার নড়াচড়া এবং এর কথা শুনতে শুনতে আমার চোখ জোড়া যখন বুজে আসছিল আমার মগ্নচৈতন্যে তখন ভাসছে ডুবছে গোরার সাধূপ্রতিম প্রতিচ্ছবি। এর কোনো অর্থছিল না।

এর কোনো অর্থ ছিল না, তবু যেন ভাবছিলাম দরজায় একদম শব্দ না করে, চুপি চুপি যদি প্রবেশ করতাম। পা টিপে পিছনে চলে যেতাম এবং হঠাৎ পিছন থেকে দু’হাতে ঢেকে ধরতাম তার চোখ জোড়া? প্রথমে বুঝতেই পারত না, তারপর নিজের হাতে আমার হাত স্পর্শ করলে হয়তো বুঝতে পারত। আমি যখন ছেড়ে দিতাম। আর ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে আমাকে দেখে কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে যেত নাকি?

আমার নিভৃত ভাবনার একটি চিকন রেখা ওকে কেন্দ্র করে, কারণে অকারণে কেন আবর্তিত হয়তা আমি বুঝতে পারতাম না।

এটাও গভীরতর হলো। পরীক্ষার পর-পরই পড়েছিল আমার জন্মদিন। ভাবছিলাম ক্লান্ত, এবার করব না। কিন্তু বান্ধবীরা আবিষ্কার করে ফেলল, এবং বেশ কয়েকজন বাসায় এসে হাজির। ফোন আসতে লাগল। আমার ছেলেবন্ধুরাও এসে গেল। তারপর গাড়ি করে গিয়ে মিষ্টি আনা, মিষ্টি খাওয়া, উৎসব। পাল্লায় পড়ে, নোরা আর আমি গানও গাইলাম। পরে সোলো একটা গেয়েছিলাম, সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে-

ত্বরিৎ এ গানটাই কেন বেছে নিয়েছিলাম বুঝতে পারিনি। এত হট্টগোলের মধ্যেও লক্ষ করছিলাম, গোরা অনুপস্থিত। কাউকেই দাওয়াত করিনি, ওকে নয়। তবু অনেকে তো এমনিতেই এলো, সে এলো না! হাসতে হাসতেও একেবার আমার চেহারা ¤øান হয়ে যাচ্ছিল। প্রতি মহূর্তে আশা করছিলাম, কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় ফিরবে নিশ্চয়ই এবং বাসা এত কাছে-কলরব শুনতে পেয়ে চলে আসবে এখানে কিন্তু সময় পেরিয়ে গেল। আমাদের বাড়ি থেকে তার কামরাটার দিকে তাকিয়ে আমার চোখে যে চিকচিক পানি দেখা দিল, সেও নিরর্থক ছিল।

সবাই বলে গেছে। আমি বিমর্ষ, আস্তে আস্তে হেঁটে উপরে এলাম। করিডোর পেরিয়েনিজের কক্ষের কাছেএলে ক্রিং ক্রিংটেলিফোন বেজে উঠল। আমার ধরতে ইচ্ছে হলো না। টেলিফোনটা অনবরত রিংহতে বন্ধ হয়ে গেল।

উজ্জ্বল বাতি জ্বলছিল, কামরায় ঢোকা মাত্রই আমার চক্ষুস্থির। আমার টেবিলে একটা বড় ফুলের তোড়া। তাজা গোলাপের চতুর্দিকে সবুজ পাতা।আমি দ্রুত গিয়েহাতে তুলে নিতেই চিরকুটটা নিচে পড়ল। তক্ষুনি তুললাম। পড়লাম, লেখা ছিল, ‘অশেষ শুভেচ্ছা, গোরা।’ আশ্চার্য, সঙ্গে সঙ্গে আমার সারা মুখে রক্ত ছড়িয়ে গিয়েছিল, আমার চোখের দৃষ্টি যেন বন্ধ হয়ে আসছে। মাথাটা ঘুরছে। আমি হাত বাড়িয়ে বাতি নিভিয়ে দিলাম। এবংশুয়ে পড়লাম বিছানায়। আমার বুকের উপরে সে পুস্পসম্ভার: আমি যেন মৃত ওকেলিয়ার মতো একটা স্রোতস্বিনীর কুটিল স্রোতে ভেসে যাচ্ছি অনন্তের দিকে।

আশ্বিনের দুপুর সেই কুসুমিত পুকুর পার থেকেই, সহজ পায়ে হেঁটে এসেছিলাম, নিউমার্কেটে বাইরের চত্বরে গাড়িতে চড়তে মনের ভিতরে একটা অনাস্বাদিত অনুভূতির রেশ খেলে গিয়েছিল, কিন্তু বুকের ভিতরটা অজানার ভয়ে ঢিবঢিব করছিল। আমার নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, রুমাল বার করে মুছলাম। তার বুকের দিকটা খোলা, সরু সোনার চেইন ঝিকঝিক করছে। ক্রুশচিহ্ন লকেটটা দেখা যাচ্ছিল, সেদিকে একবার চেয়ে ফাল্গুনী জ্যোৎস্নার মতো স্নিগ্ধ হাসিতে আমার মুখটা ভরে গিয়েছিল। নতুন ঝকঝকে চাবিটা ঢুকিয়ে একটা মোচড়ে আনলক করল এবং গিয়ার দেবার পর একসিলেটরে চাপ দিয়ে মুচকি হাসল।

চন্দ্রিমা হ্রদের ঘটনাটুক এই ধারার মধ্যেই একটু উচ্ছলতা, নোরার বদৌলতে যে দুজন জানতে পেরেছে তাদের অভিমত। পুরুষের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। এবংতরুণী যখন একলা যাচ্ছে, কারুর সঙ্গে তখন যে কোনো মুহূর্তে এমন একটা পরিস্থিতিরতৈরি থাকবে, এটা ওর জন্যআরও সঙ্গত।

লিসেন! ইউ আর এইটিন নাও, স্টিল ইউ আর বিহেবিং লাইক এ স্মল গার্ল। বিউটি পার্লারে বব ছাঁটা চুল, ঠোঁটে গাঢ় লাল, সাবা বলছিল পুরুষযখন জোর খাটায় তখনই বেশি উপভোগ্য। আই এনজয়। বৈদগ্ধভে আমিও বুঝি এবংতার প্রাকটিস করি। কিন্তু ডিয়ার লোপা, এ ব্যাপারে পশুত্বটাই সর্বোত্তম।

নোরা ঘরে ফিরে এসেছে। আমাকে অনেক কাকুতি-মিনতি করে বাধ্য করেছে যেতে নোরা, এবং ওই ঘটনার পর, এটাই প্রথম ওদের বাড়ি। সামনে মিষ্টির প্লেট। আরও কি কি বলছিল সাবা, আমিও শুনছিলাম আনমনা। এক সময় উঠে গেল নোরা এবং কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এলো গোরাভাইটাকে নিয়ে। হঠাৎ চোখে পড়ল, আমি মুখ নিচু করলাম। নোরা বলল, বিশ্বাস করতাম না, দেখলাম, সত্যিই কাতর বেচারা। অনুতপ্ত, মনে হলো। এবংআমি যে আসি না, কথা বলিনা তাতে খুব দুঃখিত।

এখন বুঝতে কষ্ট হলো না নোরার মতলব। সে সাবাকে নিয়েএসেছে একটা মিটমাট করার জন্য।

ওয়েল গোরাভাই, ভালো আছেন তো?

হ্যাঁ ভালো। গোরা বলল, বিয়ের পর একদম ভ্যানিস হয়ে গেছ, এদিকে আস না।

সময়পাই না গোরাভাই। সাবা গরবিনীর মতো বলল, জানো তো উনি পাবলিক ফিগার। পার্টিফার্টি লেগেই আছে। তা আবার আমাকে না নিয়ে যেতে চায়না।

দ্যাটস কোয়াইট ন্যাচারাল!

সাবা হাত ভরা সোনার চুড়ি বাজিয়ে বলল, আমি ভাবছিলাম একবছর পড়াশোনাটা বাদ দিয়েই রাখি। কিন্তু উনি বলেন, কি প্রয়োজন। এমনিতেই গোলমাল ক্লাসটেলাস হচ্ছে না। নামটা রোলে থাক। কাজে লাগবে। আমি বুঝিনা। যাকগে এ সব। এখন তোমার খবর কি বলো। স্টেটস এ পাড়ি জমাবার সব প্ল্যান ঠিক আছে তো?

এমনিভাবে শুরু করে সাবা অবশেষে এমন একটা কাণ্ড করে বসবে তা অনুমান করতে পারিনি। প্লেট থেকে কাঁটায় বিঁধিয়ে একটা বসগোল্লা তোলে, এবংমিষ্টি বেঁধানো কাঁটাটি গোরার হাতে তুলে দিয়ে হেসে উঠে বলল, অ্যাকশন!’

‘হোয়াট ইজ দিস!’ ঘটনার এমন আকস্মিক পরিবর্তনে সত্যিই তাজ্জব হয়ে গেল গোরাভাই।

‘নো কুশসেন, অ্যাকশন প্লিজ’

আমার বাহু ধরলসাবা এবংপিঠে ঠেলা দিয়ে বলল, ‘এই লোপা, আর ন্যাকামি করিস না তো? হাঁ কর না?

যত সহজভাবেই করুক, আমি বিব্রত বোধকরছিলাম এবংবলা বাহুল্য, গোরাভাইও, হঠাৎ আমি উঠে পড়লাম।

আমার আম্মা একদিন বলেছিলেন জীবনটা একটা অনেক দীর্ঘপথ, একজন নারীর পক্ষে আরও বেশি, এখানে সেন্টিমেন্টাল হলে দুঃখই শুধু পাওয়া যায়, সুখ নয়।

এই কথাটাই কেন মনে পড়ছিল বুঝলাম না, কারণ আমার ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী সম্পর্কে তো কোনো চিন্তাই করিনি তখনো। আমার চলে আসার সময় দেখলাম, নোরার চেহারাটা ¤øান, সে বলল, গোরাভাই তেমন খারাপ ছেলে নয় লোপা, একটু ভেবে দেখিস।’

একথার ইঙ্গিতটা কি তাও আমার কাছে দুর্বোধ্য ছিল। প্রতিবেশী, ভালো ছাত্র এবং সর্বোপরি আমার সহপাঠিনী, বান্ধবীর ভাই : গোরাভাইকে আমি একজন অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবেই গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু সে জোর করে, অতিরিক্ত কিছু উপহার দিয়েছে। এর দায়িত্ব তার, যদিও হয়তো এটা তার চারিত্রিকবৈশিষ্ট্য নয়বরং সাময়িক দুর্বলতা। আমার মনে হয়েছে, এই ঘটনার পর আমার পক্ষে তার পক্ষে সম্পর্কচ্ছেদ করাই কর্তব্য।

এমনিভাবেই সময়ের স্রোত, কিছুকাল বয়ে যায়। তারপর হেমন্ত পেরিয়ে শীতকাল। শীতের সকাল আমার বড় প্রিয়, ছোটবেলায় আব্বার সঙ্গে বেরিয়ে পুরাতন যাদুঘরের কাছে বকুল কুড়াতাম। আর এখন? শিউলি জমাই। আমাদের গেটের দু’দিকে দুটো শিউলি গাছ, ভোরবেলায় স্তরে স্তরে ঝরে পড়ে থাকে অজস্র শিউলি ফুল। বাঁশের সাজিতে কুড়িয়ে এনে কিছু টেবিলে ছড়াই। আমার মনে হয় শিউলি, পবিত্রতার প্রতীক; আর তার গন্ধটা, স্বর্গীয়। এই মর্ত্যস্থলে আমি শিউলি ঝরা হতে চাই না। ভোরের শিউলিকে তাজা রাখি পানি ছিটিয়ে, পরিচর্যা করে। সেদিন সন্ধ্যায় টেবিলে বাঁদিকের সাজিতে শিউলির ¯ত‚প, বেশ ভালো লাগছিল।যুক্তিবিদ্যার বই খুলে বসেছিলাম, দরজায় খুটখাট আওয়াজ। একটা অসহায় ভঙ্গি করে নোরা ভিতরে হেঁটে এলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ¤øান হেসে বললাম, কিরে! এ সময়ে।’

‘ভাবছি, থাকব আজকে তোর সঙ্গে। আপত্তি নেই তো?

‘না না। আপত্তি কিসের। বরং ভালো লাগবে। একলা কি বোরিং!’

এইভাবে শুরু। আস্তে আস্তে, কথা বলতে বলতে, চেয়ারটা টেনে আমার আরও কাছে ঘন হয়েবসে নোরা, তারপর আঁচলের নিচ থেকে একটা খাতা বার করল। একটা পাতা খুলল।

লোপা রে, লক্ষী বোন আমার। সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। একটা অংশ আঙুল চেপে আমার দিকে মুখতুলে তাকাল নোরা, চেহারায় বিষণœতা।

কি ব্যাপাার। কি হয়েছে অজানা আশঙ্কায় আমি চমকে উঠলাম।

গোরা ভাই মারা যাচ্ছে।

বলিস কি, নোরা!

হ্যাঁ, এই দ্যাখা। খাতাটা বাঁ হাতের চাপে মেলে ধরে নিচু হয়ে বলল, এটা গোরা ভাইয়ের ডায়েরি। এই দ্যাখ, কি লিখেছে। পাতায়পাতায় শুধু কান্না ছড়ানো। তাও না হয় ভালো ছিল। কিন্তু দ্যাখ, পরবর্তী আত্মঘাতী স্বগতোক্তি। আমি সহ্য করতে পারছি না!

আলোর মধ্যেএকটু টেনে পড়তে লাগলাম, এই যে যন্ত্রণা, তার চেয়েমৃত্যু অনেক ভালো। মৃত্যুই আমার কাছে একমাত্র যুক্তির উপায়। আমি মরব। দিনের পর দিন চলেযাচ্ছে। আমি তিলে তিলে নিজেকে ক্ষয় করছি। এর পরেই আমি চির নিদ্রায় শায়িত হব, আহ, তখন কি শান্তি!

কি বুঝলি লোপা? আমি এইটুকু পড়া শেষ করে তাকাতেই ডু করে উঠল নোরা, বসল, গোরা ভাই বাঁচবে না। একমাত্র তোর জন্য-তোর জন্যে। আমার জন্য?

হ্যাঁ, একমাত্র তোর জন্যই এই অবস্থা। চাপা ঝাঁঝের সঙ্গে এইটুকু বলার পর সহসা আমার হাত চেপে ধরে বলতে লাগল, তুই আমার ভাইটিকে বাঁচা লোপা। গোরা ভাই তোকে ভালোবাসে।

ভালোবাসে?

হ্যাঁ, গভীরভাবে ভালোবাসে। নইলে কি এই দশা হয়? তুই কি ওকে ভালোবাসতে পারিস না?

ভালোবাসব?

কেন যাবে না।যায়, একশোবার যায়। হঠাৎ থেমে গেল নোরা, সোজা হয়ে বসল, তারপর আমাকে যেন পরিমাপ করতে করতে গদগদ স্বরে বলল, আর যদি না-ই পারিস ভালোবাসতে, সখী হিসেবে আমার অনুরোধ, কিছুকাল ভালোবাসার অভিনয় করে ওকে ফিরেয়েআন। বাঁচিয়ে তোল।

ভালোবাসার অভিনয়!

হ্যাঁ, ভালোবাসার অভিনয়। মেয়েরা অনেক জায়গায় ভালোবাসার অভিনয় করে।

এখানে তুইও না হয় করলি। শুধু আমার ভাই হিসেবে বলছি না, গোরা দেশের একটা এসেট।

সে রাতে আমার পাশে শুয়ে নোরা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেও আমি চোখ মেলে জেগে ছিলাম।

আমি মনের গহীনে ডুব দিলাম। শ্যাওয়াল, শ্মাম্মিলীতে। বুদবুদে আন্তঃস্রোতে।এক মুহূর্তে অভিনয়ের প্রয়োজন হবে না।

পরদিন, সন্ধ্যার একটু আগেই গিয়েছিলাম। আস্তে হেঁটে, করিডোর, পেরিয়ে। তার দরজায়। গোরা মুখ তুলে তাকাল আমার মুখের দিকে। আমি ভিতরে গেলাম।

কাছে একটা চেয়ার টেনে দেয়, আমি বসলাম, মুখোমুখি। কিছুক্ষণ কেটে গেল নীরবতা, পরে আমি বললাম তোমরাই দেশের আশা-ভরসা। এমন কেন করছ গোরাভাই?তুমি, কি সত্যিই আমাকে ভালোবেসেছ?

কেন, বিশ্বাস হয়না? কি করলে বিশ্বাস হবে তোমার? এই যে ছুরিটা একটা হাতের রগ কেটে দেখাব।

না না। ওসব করতে হবে না। ঝকঝকে ছুরিটা টেনে নিয়েছিল, আমি হাত ধরে থামিয়ে দিলাম, মনে হয় তুমি অসুস্থ। কিছুদিন রেস্ট নাও। আমি মাঝে মাঝে এসে দেখব।

গোরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েবলল, তাহলে আর দূরে থাকবে না?

ঠিক আছে, থাকব না। আমি একটু ভেবে বললাম, কিন্তু গোরাভাই-

কি বলে ফেল।

আমরা কাছাকাছি আসব ঠিকই। তার চোখে তাকিয়ে বললাম, কিন্তু আমাদের মধ্যে একটা দূরত্ব থাকবে কথা দাও।

বুঝেছি। গোরা থামল, কি ভাবল তারপর বলল, এটা তোমাদের সংস্কার। রক্তের ভিতরে, অস্থিমজ্জার ভিতরে আছে।

না গোরাভাই এটা ঠিক নয়।

তাহলে ঠিক জিনিসটা কি?

সে আমি জানি না। আমি আমার একটা হাত আলতো ভাবে তার বাহুতে রেখে বললাম, তোমার শরীরটা ভালো হয়ে গেলে আমি খুব খুশি হব।

তুমিও তাহলেসব জানতে পেরেছ লোপা। গোরা গাঢ়স্বরে বলল, ড্রাগ এডিক্ট একবার হয়ে গেলে তা ছাড়া সহজ হয়। তবু আমি ছাড়ব। যত কষ্টই হোক, ছেড়ে দেব। তোমাকে ফিরে পেয়েছি, তাই ছাড়তে চেষ্টা করব। লোপা, তুমি আমার জীবন।

ছিঃ অমন কথা বলে না। মানব জীবনটা অনেক বড়।

সে বড়ত্ব আমি চাই না, লোপা। আমি তোমাকে চাই।

তখনো আমার অতিশয্য, আমাকে তার বুকের মধ্যে দু’হাতে সবলে টেনে নিয়েছিল। ঠোঁট জোড়া আমার ঠোঁটের কাছাকাছি। কিন্তু ওখানেই থেমেছিল। এখন ঝর ঝর ঝম ঝম বর্ষণটা কিছু কমে এসেছে। ঘনঘন বিজলির নেভা-জ্বলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছি আমার শারীরিক রূপান্তর।

হ্যাঁ, কিঞ্চিৎ অন্যরকমবৈকি। কিছুটা আলাদা। ত্বকের সেই চিকন সোনালি বরণ একটা পেলব ছায়ার আচ্ছাদনে হারিয়ে যাচ্ছে। ওপরে, বোটার চারদিকে ঘিরে কালো চক্কর। সুঠাম, সুযোগ হয়ে ভরে উঠছে।

মনে-মনে শিউরে উঠি; তাড়াতাড়ি কাপড় পরে মশারির ভিতরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

জানালাটা খোলাই থাক। ওখানে এখনো বৃষ্টি, অন্ধকার, কিছু শীতলতা।মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমক। আমার প্রিয় কাঁচামিঠে আম গাছের পাতার ঝোপড়া, বারিপতনের চাপে নড়ে উঠছে, একটু একটু। এই জানালা আমারকৈশোর কালের, আমার এই প্রথম যৌবনের নীরব সাক্ষী। সুখ-দুঃখে কতদিন। কতদিন আমাকে যেন পরম স্নেহে আগলে ধরে রেখেছে, আধো জ্যোৎস্নায় আধো কৃষ্ণ রেখায়চাঁপাকলির মতো। আঙুলে দেখিয়েদিয়েছে অনন্তের ছায়াপথ।

কিন্তু একি। আমি যেন এখন সোজা হয়ে শুতে পারছি না, আমি ক্রমে কুঁকড়ে যাচ্ছি।

আমার ডর লাগে। আস্তে আস্তে ডান হাতের আঙুলে তলপেটটা টিপে টিপে দেখি, হ্যাঁ আগের মতো আর নেই। প্রায় তিন মাস থেকে আমার দেহের ভিতরে কি পরিবর্তন ঘটছিল, সাময়িক অসুস্থতা বলে উড়িয়ে দিয়েছি। কাউকে বুঝতে দিইনি। কিন্তু এখন? এখন কি করব?যদিও এমন স্বপ্নময় দুর্যোগ রাত, আজ সারারাত আমার ঘুম হবে না, মাথার ভিতরটা ঝিমঝিম করছে-সেখানে যেন তমসাচ্ছন্ন অতলপ্রবাহ।

তার মাঝখান থেকে ভেসে উঠছে দৃশ্য, এ বছরের আটই ফাল্গুন, মানে একুশে ফেব্রুয়ারির বিকেলটা তারপর সন্ধ্যা ও রাত।

এর আগের দিনও, আমার জগৎ নিয়েই আমি ছিলাম, তবুও সুখী।বালিশে হেলান দিয়ে পকেট বুকে একটা থ্রিলার পড়ছি নিচু করে ক্যাসেটে আমার প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত লাগিয়ে রেখেছিলাম। শান্ত অপরাহ্ন। মাঝে মাঝেবাইরে তাকাই।

সেদিন সাতই ফাল্গুন, বিশে ফেব্রুয়ারি।ঘাড়ের উপরে অজস্র চুল, নোরা মৃদু পায়ে ঘরে ঢুকল। গোরা ভাইয়ের সঙ্গে মিটমাট হয়ে যাওয়ার পর থেকে ও খুব সন্তুষ্ট; কিন্তু আজকাল বিশেষ আসে না। কোথায় যেন কি নিয়েব্যস্ত। কলেজে গেলে মাঝেমাঝে দেখা হয়, আর সপ্তাহে একবার ছায়নটের ক্লাস রুমে; এ জিনিসটা সে ছাড়েনি।

কি খবর নোরা? ডুমুরের ফুল হয়ে গেছিস, আজকাল দেখতেই পাওয়া যায় না। মৃদু হেসে আমি বললাম, বোস। কাছে বোস।

তুই তো বেশ সুখেই আছিস লোপা, পাশাপাশি বাড়ি। ঝগড়া-বিবাদ মিটে গেছে, তারপর এখন বসন্তকাল। নোরা কি ইঙ্গিত করল বুঝতে পারলাম; কিন্তু চুপ হয়ে থাকি। সে বলল, কিন্তু আমি? বলতে পারিস হতভাগী। দিন চলে যাচ্ছে দ্রুত, কিছুই মেলাতে পারছি নারে।

্একটা নিশ্বাস ছেড়ে নোরা আমার দিকে তাকালে বললাম, একটা কথা বলব নোরা? বলনা, তোর কথা শোনবার জন্যেই এসেছি। ও বলল, যদিও আমি জানি সে আমাকে নেহাৎ খুকি ছাড়া আর কিছুই মনে করে না। অথচ ওর মধ্যে পুরো পাকা রমণীর আদল।

আমি বললাম, তুই একটুতেই খুব বেশি ছটফট করিস!

হ্যাঁ সত্যই বলেছিস।আমার মধ্যেএকটা ভীষণ অস্থিরতা। কিন্তু একে আমি দমাতে পারি না। আমি ভেসে যাই। নোরা আমার একটি হাত আদর করে ধরে বলল, কোনো পুরুষ আমাকে অবহেলা করবে এটা আমার কাছে অসহ্য। ভাবলে, তখন আমি পিশাচী হয়েযাই। হ্যাঁ পিশাচী। সেই লোকের বুক চিরে রক্ত পান করতে ইচ্ছে হয়!

কি যে সব বলছিস নোরা; তুই মাঝে মাঝে সত্যি পাগলামী করিস। আমি একটু হেসে উত্তর দিলাম। কিন্তু ওর কথার তীব্রতায় কিঞ্চিৎ ভড়কে গেলাম।

ঠিক আছে থাক। বাদ দে এসব। হ্যারে শোন, কালকে একুশে ফেব্রুয়ারি আজ রাত বারোটা এক মিনিট থেকে শুরু। শহিদ মিনারে ফুল দিতে যাবি না? নোরার প্রসঙ্গ পরিবর্তন লক্ষণীয়, এক হাতে আমার চুল পাট করতে করতে বলল, খালু খালামা তো যাবেন?

হ্যাঁ অবশ্যই, এ বিষয়ে কোনো বছরই তাদের একরত্তি ভুল হয় না। কেমন একটা উইকনেস আছে। আব্বাকে পায়জামা-পাঞ্জাবি ঠিক করে রাখতে দেখেছি।

হোস্টেল থেকে মেয়েরা যাবে। আমাদের দুজনকে ঠিক সময়ে হাজির থাকতে বলেছে।

কিন্তু কখন?শুভ এসেহৈচৈ করছিল দুপুরে, তা মনে পড়তে আমি বললাম, পক্ষ প্রতিপক্ষতৈরি শহিদ মিনারে নাকি মারামারি কাটাকাটি হবে।

ওরা বারোটা এক মিনিটের কথা নিশ্চয় ভাবছে না।

ভাববে কি করে সব পুঁটিমাছের আত্মা। বেশিরভাগ মফস্বল থেকে এসেছে কিনা। আর সুপার আপা? একেবারে সন্ন্যাসিনী হঠাৎ নোরা উত্তপ্ত, আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ওরা যখন ইচ্ছে যাক। আমরা রাতেই যাব।

পাগল! আমি হেসে উঠলাম এবং উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, রাতে মেয়েদেরকে যেতে নিষেধ করেছে, জানিস না?

তাই নাকি? সে আবার কখন?

আজকেই, শুভ বলল। অবস্থা খারাপ, শহিদ মিনারে বোমা ফাটবার আশঙ্কা রয়েছে তো।

আরে থো ফেলে, বোমা ফাটাবে কে।এ সমস্তই পাতানো খেল, ঠুসঠাস, পটকাবাজি। রাজনীতি না থাকলে যা হয়- তখন কেঁচোরাই কিন্তু। হঠাৎ কি ভাবল নোরা, তারপর উঠতে উঠতে বলল, ঠিক আছে, তাহলে কালসকালেই যাওয়া যাক। আমি আসব, তুইতৈরি থাকিস।

এইসব শোভাযাত্রা আর কিছু নয় শোক মিছিল বত্রিশ বছর আগে ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে যারা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল, তাদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন। আমরা দুজন দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। তখন প্রায় দশটা বাজে; দলে দলেআসছে। খালি পায়ে। ছেলেমেয়ে, তরুণ-তরুণী। বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী, তারা নিঃশব্দে উঠছে ধাপ বেয়ে, ফুলের স্তবক স্থাপন করছে, দাঁড়াচ্ছে কিছুক্ষণ। নেমে আসছে কিন্তু অনেকেই যাচ্ছে না।নিচের চত্বরে দাঁড়িয়ে দেখছে। আমি নোরার সঙ্গেই ছিলাম, দুজনে দুটি তোড়া দিয়ে এসেছি।

আমার মনে ছায়ার মতো ভাসছে, ভাষা আন্দোলনের ঘটনাবলি; ইতিহাস পড়েছিলাম, এমনি দিনেই এখানে গুলি চালনা হয়েছিল।

আত্মত্যাগ, বীরত্বের গৌরব আমিও অনুভব করছি এবং যখন দেখলাম, বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা পরম শ্রদ্ধাভরে পুষ্পস্তবক দিচ্ছেন তখন একটি মানবিক মহত্ত্বের বিশ্বজনীন স্রোতোধারা আবিষ্কার করলাম। আমার মনের ভিতরটা, একটা অভূতপূর্ব পবিত্রতায় ছেয়ে গেল।

আমি তন্ময় হয়ে ছিলাম, পাশে নোরা আমার বাহুতে ঠেলা দিল। প্রশ্ন করল, ‘কিরে লোপা কি ভাবছিস?’

কিছু না, আমি ওর দিকে তাকিয়েবললাম, ‘ভালো লাগছে। আর কতক্ষণ থাকবি?

নোরা আমাকে পর্যবেক্ষণ করে বলল, ‘আমাদের আরও অনেক প্রোগ্রাম আছে তো, চল যাই।

‘এত জলদি?’

‘জলদি কোথায়? ঘড়িটা দ্যাখ তো, সাড়ে আটটায় এসেছি এখন এগোরোটা, পুরো আড়াই ঘণ্টা।’

কোথায়যাবি?

‘অত প্রশ্ন কেন, চল না।আজ ছুটির দিন, যতক্ষণ ইচ্ছা মজা করব।’ নোরা আমাকে আগলে ধরে বলতে শুরু করলে আমি পা বাড়ালাম। হাঁটতে হাঁটতে আমার দিকে ঘুরে তাকাল নোরা এবংবলল, ‘আজকে ওর সঙ্গে দেখা হবে আমার।

আমি আনমনা ছিলাম, প্রশ্ন করলাম; ‘কার সঙ্গে?’

বুঝতে পারছিস না? আমার উন্দাটার সঙ্গে। আজ শহিদ দিবস তো, গর্ত থেকে বেরিয়েছে।’

‘সত্যি?’ আমি ওর কথার অর্থবুঝলাম, খুশি হয়ে বললাম, ‘আমাকে একটু দেখাবি না? না ভয় আছে?

‘ভয় কিসের? ও নেহি তো আউর ছহি, আউর নেহি তো আউর ছহি।’ নিজের কথা রসেই খিল খিল করে হেসে উঠল নোরা এবংবলল, যেতে যদি চায়যাক। আমি আরেকটাকে ধরব। পুরুষ মানুষকে কাত করতে উরাৎ দেখাতে হয়না, একটু বাঁকা চাউনিই যথেষ্ট।

একটু খটকা লাগলেও ওর কথায় আমি অবাক হই না। নোরা বদলে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে জিগ্যেস করলাম, ‘উন্দার কাছেই যাচ্ছিস নাকি?’

্রও উত্তর দেওয়ার আগেই প্রফেসরস কোয়াটারস এর কোণে এসে পড়লাম এবং সামনে তাকাতেই দেখি, পরিচিত একটি গাড়ি।

‘ওইখানে প্রথম।’ ও নোরা আমার একটা হাত ধরল, আলতোভাবে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল, গোরাভাই অপেক্ষা করছে।’

গাড়ি বডিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গোরা আমাদেরকে দেখছিল। গলায় তেমনি সোনার চেইন। মটকার পাঞ্জাবি পরায় একটু অন্যরকম লাগছিল তবু সঙ্গে সঙ্গেই চিনতে পারলাম।

এও কি ছিল একটা ছককাটা কল্পনা, পরিকল্পনা?ওখানে জগন্নাথ হলময়দানের দেয়ালের কাছে পৌঁছলে, নোরা অনেক পীড়াপীড়ি করে আমাকে বসাল সামনের সিটে। গোরাভাইয়ের পাশে। সা করে আমার মনে ভেসে ওঠে সেই আশ্বিনের দুপুরটা আমার লজ্জা-লজ্জা করতে লাগল। আমি তাকাতে পারছিলাম না, মুখনিচু করে রইলাম।

কেবল নোরাই কথা বলছে, কি যেন সে বকর বকর করছিল। আস্তে করে টিএসসির দিকে যেতে যেতে গোরাভাই-ই প্রথম কথা বলল, কেমন আছ লোপা?

‘ভালোই।’ একটু থেমে জিগ্যেস করলাম, ‘তুমি কেমন?’

্আমার কথা কে আর ভাবে। একসিডেন্ট করে রাস্তায় পড়ে মরে থাকলেও আমার কেউ খোঁজ করবে না। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ও হ্যাঁ। আমি জানতাম তোমার সঙ্গে আজ দেখা হবে। দুটো ফুলের তোড়া নিয়েছিলাম, একটা তোমার জন্য। নোরা! দে তো ওকে-

‘ও হ্যাঁ। নোরা ফুলের তোড়াটা পাশ থেকে তুলে আমার ঘাড়ের উপর দিয়ে সামনে দিল।

‘বাহ, চমৎকার। তোড়াটা হাতে নিয়ে আমি বললাম, ‘তোমাকে ধন্যবাদ।’ আই অ্যাম অবলাবন্ড! গোরা বলল, শুঁকে দেখো, গন্ধ আছে।

নোরা বলল, আমার চাইনিজ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে, গোরাভাই।

চাইনিজ? বেশ তো। প্রস্তাবটা সহজেই মেনে নিয়ে বলল, মাত্র সাড়ে এগারোটা। কিছু সময় নষ্ট করা দরকার।

কোনদিকে যেতে চাও?

এয়ারপোর্টে একটু ঢুঁ মেরে আসব, তারপর ঢুকব-

কোথায়?

কিংস ইনে। অনুমোদনের অপেক্ষায় গোরা বলল, এয়ারপোর্ট রোডের উপরেই।খাওয়ায় ভালো।

কি বলিস লোপা?আপত্তি আছে? আমি শুধু মৃদু হাসলাম, নোরা বলল, আপত্তি আর কি হবে। আজ তুইই আমাদের গেস্ট অব অনার।

ও শিউর। গোরা বলল, ঝাল দেখে ভয় করলে চলবে না কিন্তু। ভয় পাবে কেন। নোরা বলল, ঝাল মেয়েদের প্রিয়।

এয়ারপোর্ট ও উত্তরা মোড়ের টাউন ঘুরে এসে চাইনিজ রেস্তোরাঁ এক কোণে টেবিলে আমরা যখন বসেছি, তখন বেশ ভুখ লেগেছে।

উত্তরার রবীন্দ্র সরণি দক্ষিণে নিয়ে গিয়েছিল, নোরাদের সিঙ্গল ইউনিট দোতলা বাড়ির নির্মাণ প্রায় শেষ। এখন ড্রয়িংরুমে উড প্যানেলিং হচ্ছে।

সৌকর্যমণ্ডিত কারুকাজ দেখতে বেশভালো লাগছিল, নোরা আমার হাতে একটা নাড়া দিয়েবলল, জানিনা?বাবা বলেছেন, এই বাড়িটা গোরা ভাইয়ের নামে লিখে দেবেন। সেজন্য গোরাভইকে জিগ্যেস করেছিলেন, ভিতরের সাজসজ্জায় তার পছন্দ কি?বৈঠকখানায় এই কাঠের কাজ গোরা ভাইয়েরই পছন্দ। ইস, কি সুন্দর হয়েছে দেখেছিস?

প্রলেপ দেওয়া দুই জানালার মাঝামাঝি একটা জায়গায় চৌকাঠের টুকরো সাজানো আমরা দেখছিলাম আমি সংক্ষিপ্ত উত্তর দেই, হ্যাঁ বেশ সুন্দর হয়েছে।

কিন্তু গোরাভাই। নোরা ওকে বলল, তুমি আমেরিকা চলে যাবে।

সারাক্ষণ প্রায় অন্যমনস্ক ছিল, যখন কথা বলেছে তার ফাঁকে ফাঁকেও গাম্ভীর্যের ছায়া। গোরাভাই বলল, ‘যাব তো হয়েছে কি?

জানো না? ওটা কামরূপ-কামখ্যার দেশ, একবার গেলে কেউ আর ফিরতে পারে না নোরা রসিকতা করে বলল ‘মনে হচ্ছে কি জানো?এই বাড়ির সিকেটা আমার ভাগ্যের ছিঁড়বে!’

বেশ তো তোর যদি বিয়ে হয় এখনই এই বাড়িতে এসে উঠতে পারিস! গোরাভাই বলল, আমাদের চারটে বাড়ি একটা তো তুই পাবিই।

এবার নোরা কিঞ্চিৎ দমে যায় ছল ছল দৃষ্টিতে তাকাল একটু আমার দিকে। আমি বললাম তুই যদি এখানে উঠিস, আমি এসে বেড়াব।

অবশ্যই, অবশ্যই। তোকে দেব দোতলার দক্ষিণের ঘরটা। ওপর থেকে এয়ারপোর্টের রানওয়ে বেশ দেখা যায়।

ও কেবল প্লেনের ওঠানামা দেখবে নাকি? ভালোই বলছিস। হঠাৎ গোরাভাই আমার ডানহাত টেনে নিল, পাতা উলটিয়ে ধরে বলল, ‘দেখি, দেখি। এই নোরা, লোপার বিদেশ গমনও আসন্ন। তাই নাকি? ও মা, তাহলে একলা আমি বাংলাদেশে পড়ে থাকব নাকি। ও হোরিবল। ঠিক আছে আমিও লেখালেখি করছি, অ্যাডমিশনটা পেলেই হলো নিজেই টিকেট কেটে উড়ে যাব। আমায় ঠেকাবে কে?

আছে একজন। মৃদু হেসে গোরা ভাই হাতঘড়ি দেখল, আমাদেরকে বলল, ওহ হো, একটা বেজে! চলো, চলো।

একটার পর একটা আইটেম চাইনিজ খাওয়া শেষ করে উঠতে তিনটা বেজে গেল। আমি গাড়ির কাছেএসে বললাম, নোরা আমাকে বাসায় পৌঁছে দে!

এখনই? পাগল হয়েছিস। আমাদের আসল প্রোগ্রামই বাকি। এবং তুই তুই-ই তার প্রধান আকর্ষণ। কথাটা শেষকরে নোরা হাসতে লাগল।

অনুষ্ঠান, সে কিসের অনুষ্ঠান আমি যখন আনমনা ভাবছিলাম, তখন রাস্তায় নামার পর গাড়িটা রেলওয়ে লেবেল ক্রসিং পার হয়ে বনানীর আবাসিক এলাকার একটি নির্জন স্থানে এসে থামল। একটি আধুনিক ডিজাইনের দোতলা বাড়ি। কাছেই বারান্দা।

আমায় কোথায় নিয়ে এলে নোরা? আমি বোকার মতো প্রশ্ন করলাম। আরে এটাও আমাদেরই বাড়ি। নোরা আবার হেসে উঠে বলল, নতুন ভাড়াটে আসতে তাদের মাসখানেক দেরি। বাড়িটা রিনোভেট করা হচ্ছে। গোরাভাই নিজের সিট থেকে নেমে এসে দরজা খুলে ধরল এবং বলল, এসো।

আসার সময়ই লক্ষ করেছিলাম, তার ঢুলঢুল চোখমুখ যাকে কেবল রাত্রি জাগরণের ফল মনে করতে পারিনি। এখন দেখছি কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক চাউনি।

প্রহরী বা চাকর-বাকর কাউকে কাছে পিঠে লেখলাম না, অথচ ড্রইংরুম খোলা এবং ভিতরে করিডোরের দিকে গেলে, কক্ষ কামরাগুলোও তাই। আমাকে নিয়ে নোরা একটি ঘরে ঢুকল।মাঝামাঝি অবস্থান, একদিকে শুধু জানালা।কিন্তু তাও ভেজানো। একটি ডাবল খাট, তাতে পরিুছন্ন বিছানা। দুটো বালিশও একটি কোলবালিশ সাজানো আছে। একদিকে চেয়ার টেবিল। জগ ভরতি পানি, তার উপরে পিরিচের ঢাকনা। একটি গøাস।

কেমন লাগছে? আসলে সবই কেমন হেয়ালি মনে হচ্ছিল, আমি তাকাতেই নোরা আমার হাত ধরল এবং খাট দেখিয়ে বলল, তুই একটু বোস। আমি এক্ষুনি আসছি। বয়মনে হয়স্ন্যাক আনতে গেছে, আমাদের গ্রুপের আর সবাই এক্ষুনি এসে পড়বে।লাঞ্চের পর একটু ন্যাপ নেওয়া তো আমার অভ্যাস। দেখেছিস কি পরিপাটি শয্যা? একটু রেস্ট নেনা রে।

এতক্ষণ অস্পষ্ট চিন্তাস্রোতে আমার মাথাটা সত্যিই ঝিমঝিম করতে শুরু করেছিল, আমার হাতব্যাগটা বালিশের কাছে রেখে কাত হলাম।

ক্লান্তি এসেছিল এবংঅনেকক্ষণ হয়তো তেমনিভাবে পড়েই থাকতাম কিন্তু একটু শব্দে চোখ খুলে গেল। আমার কক্ষে গোরা দরজার কপাট দুটো ভেজিয়ে দিল, লক্ষ করলাম এবং আমার কাছে, বিছানার পাশে এসে বসতেই ঝট করে উঠে পড়লাম। আমার কণ্ঠস্বরে কিঞ্চিৎ বিস্ময়, কি গোরাভাই।

কিছু না। এই তো তোমার কাছে একটু এলাম। ঠোঁট বেঁকিয়ে অদ্ভুত একটু হেসে গোরা বলতে লাগল, জানো লোপা, যুগটাই এমন পড়েছে যে আমাদের হাতে সময় বড় অল্প।

ঠিক বুঝতে পারছি না গোরাভাই।

ওয়েট এ বিট, বলছি। সেজন্য যা কিছু করার ঝটপট করে নেয়াই উত্তম। এই দ্যাখ এরো গ্রামটা, হার্ভাড থেকে তোমার দুলাভাই তোমার ফাদারকে লিখেছিলন। আমি খুলে দেখেছি উপায়ছিলনা।রাষ্ট্র রক্ষার্থেইনটেলিজেন্স অপরিহার্য, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য একটু গোয়েন্দাগিরির প্রয়োজন আছেবৈকি। ডক্টর মাশুক রহমান, তোমার ভগ্নিপতি লিখেছেন, ছেলেটা ছবি দেখেই তোমাকে পছন্দ করেছে। সেলফমেড, লাইফে তার গার্জিয়ান সে নিজেই। তোমার আব্বা প্রশাসনের বিরাট স্তম্ভ, তার নাম শুনেই রাজি। টেলিফোনে কবুল পড়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। টিকিটও পাঠাবে। তোমাকে শুধু প্লেনে উঠিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন। কিন্তু আমি দেখছি, ব্যাপারটা বিদঘুটে। তোমাকে আমার কাছ থেকে কেউ ছিনিয়ে নেবে, এটা অসম্ভব।

আমি এক্ষুনি তোমাকে-তোমাকে বিয়ে করব।

এরোগ্রামটা আমার হাতে দিয়েছিল এবংখুলেও ছিলাম, কিন্তু তার একটানা কথার শেষে আমি আঁৎকে উঠলাম।

পাগল, কি সব আবোল-তাবোল বকছো গোরাভাই।

বলতে পার। আবোল-তাবোল কিন্তু এটাই সত্যি। আমি জানতাম, তুমি বাধা দেবে। সুতারং আমি নিরূপায়।

আশ্চার্য, আমি দেখলাম নিমেষে ওর চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। একটা ফিল্ম দেখেছিলাম চৌকস বিজ্ঞানীরা চেহারার মধ্যে থেকে ফ্রাঙ্কেনটাইনের আর্বিভাব। এ কিসের লক্ষণ। নিশ্চয় ভয়ানক কিছু। আত্মরক্ষার জন্য বুদ্ধির প্রয়োজন।আমি বিনয় হাসির ভঙ্গি করে আলতো ভাবে তার বাজুতে হাত রেখে বললাম, কেন রাগ করছো গোরাভাই। আমি কি বলছি যে তোমাকে ভালোবাসি না তোমাকে চাই না? আমার বন্ধুত্ব পেয়েছ, তার উপরেও পাবে নিশ্চয়ই। তোমার জন্য আচ্ছন্ন ঘুমন্ত মুকুল থেকে বসন্তের অফুরন্ত পুস্পসম্ভার আমার হৃদয়টা জাগবে- সে মরা প্রেম।

স্টপ লোপা, ইউ স্টপ। একটা ক্ষুধার্ত হিংস্র পশুর মতো চেহারা, গোরা চাপাস্বরে চিৎকার করে বলল, আই ডোন্ট বিলিভ ইন উইমেনস লাভ।

আমি শিহরিত স্তম্ভিত হতভম্ব। কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে ক্ষিপ্রের মতো দুহাত বাড়িয়ে আমাকে জাবড়ে ধরল এবং অমিতবিক্রমে চিত করে টেনে নিয়ে গেল বিছানার উপর। আমি দু’হাতে বাধা দিচ্ছি এবং পাণপনে পা ছুঁড়ছিলাম। এমন সময় ভেজানো দরজার কপাট ঠেলে ঘরে ঢুকল আরও দুজন যুবক। একজন বলল, এনী হেলপ, গোরা? ইউ আর রেডি।

আমি কখন জ্ঞান হারিয়েছিলাম বলতে পারব না, কিন্তু জ্ঞান হারাবার আগে যেন যন্ত্রণাময় দুঃস্বপ্নের ভিতরে থেকে; পর পর সাতজনের মুখই দেখছিলাম।

এবার উপলব্ধি করলাম, এমতাবস্থায় বেঁচে থাকার জন্য আত্মাশক্তির প্রয়োজন চেষ্টা করে আত্মশক্তিকে জাগিয়ে রাখছিলাম। কিন্তু একসময় সবকিছু লুপ্ত হয়ে গেল।

আমি বলতে পারব না কতক্ষণ, কিন্তু যখন চেতনা ফিরে পেলাম তখন অন্য স্থান। দেখি একটা বেডে শুয়ে আছি কাছে বসে আমাকে ধরে আছেন, হ্যাঁ চিনতে পারলাম, ডক্টর ইসমত জাহান এবং একটু পরে এলেন ডক্টর মাসুদ করিম। গোরাদের দলের ছেলে সাজ্জাদ। ওরা তারই বড় ভাই ও ভাবি কিছুকাল আগেও ইংল্যান্ডে ছিলেন। দুজনেই প্র্যাকটিস করেন। একজন বেশ ভালো গাইনী অন্যজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। ওরা ঝুঁকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি ঝরঝর চোখের পানি ছেড়ে দিলাম। বুঝলাম ওরা আমাকে উদ্ধার করেছেন। আস্তে করে বললাম, ডোন্ট ডিসক্লোজ এনিথিং ভাবি, তাহলে আমি মরে যাব।

ইসমত জাহান ¤øান হেসে বললেন, কিচ্ছু ভেবো না লোপা। আমরা তো আছি। এবরিথিং ইউল বি অলরাইট। ডক্টর করিম আমার পালস দেখতে দেখতে বললেন, ডোন্ট ওরি। আমরা তোমার বাসায় দিয়ে আসব!

ভাবি বেশ যতেœর সঙ্গে আমাকে শুশ্রƒশা করেছিলেন। ওয়াশ দিলেন, বড়ি খাওয়ালেন। ঘণ্টা তিনেক পর যখন একটু সুস্থবোধ করলাম, ওরা গাড়িতে করে নিয়ে এলেন। আমি আস্তে হেঁটে উপর তলার নিজ কক্ষের দিকে যাচ্ছি। একুশের গ্রন্থমেলা দেখে আব্বা-আম্মা তখন ফিরছেন। ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দোতলার রেলিং ধরে আমি একটু থামলাম দুটো গাড়ি কাছাকাছি। ওরা জোরে কথা বলছেন ও হাসাহাসি করছেন। যাক, কিছু প্রকাশ করেননি, আশস্ত হলাম। অবসন্ন শরীরটা টেনে টেনে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে গিয়েশুয়ে পড়েছিলাম।

আটই ফাল্গুন ছিল সেদিন, আর আজবৈশাখের শেষদিন; কিন্তু যেন বিচ্ছিন্ন দুটি তারিখনয়। বরং একসূত্রে গাঁথা স্রোতধারা। এখন এই যে অবিরাম বারিপাত, তখনই তা শুরু, যদিও কারুর চোখে পড়েনি। ক্রমে শীত শীত করতে লাগল, গায়ে চাঁদর টেনে নিলাম। যেন স্বপ্নের মধ্যেই, একসময় কানে এক শেষরাতে আব্বা-আম্মার কথাবার্তা, তারা সেহরী খেয়ে ফিরছেন। কিন্তু ফজরের আযানের ধ্বনি কানে এলো না, তার আগেই অতল ঘুমে নিমজ্জিত হয়ে গেলাম।

অনেক রাতে ঘুম এসেছিল, সুতরাং ঘুম ভাঙতে দেরি হলো। আমি রোজা থাকতে পারি না; নাইটি চাপিয়েই নাশতা খেতে নিচে যাওয়ার সময়, আব্বা-আম্মা তাদের কক্ষেই আছেন। টুকটাক কি কাজ করছেন, কিন্তু বেশচুপচাপ। ক্রিং ক্রিং টেলিফোন বেজে উঠল, যেতে যেতে শুনলাম আব্বা কথা বলছেন।

শরীরটা আমার দুর্বল, এখনো বমি বমি ভাব। সাড়ে এগারোটার দিকেও শুয়ে ছিলাম, একটা বই পড়ছিলাম।

আব্বা টেলিফোনে আমার অসুস্থতার বিষয়টার কথা আলাপ করছিলেন কার সাথে জানি না : এমন প্রখ্যাত প্রবীণ ডাক্তার জামাল সাহেবকে নিয়েপ্রবেশ করলেন। তিনি তার বন্ধু কলেজ সহপাঠী ছিলেন। তিনি সারাটা জীবন বিলেতেই কাটিয়েছেন এবং শেষবয়সে দেশে ফিরেছেন। প্রচুর টাকা-পয়সা এখন তার চিকিৎসা, আসলে জনসেবা। সার্জন হিসেবে তার বেশনাম ছিল।

এদের দেখা মাত্র বুকের ভেতরটা ছাৎ করে উঠল, আমি ভিতরে ভিতরে নি®প্রাণ মমির মতো জমে গেলাম।

দেখি মা একটু, কি হয়েছে তোমার আদর ভঙ্গিতে বলতে বলতে ডক্টর জামান আমাকে পরীক্ষা করতে লাগলেন। মাথার সবটাই টাক, চকচক করছে। গোলগাল, নাদুস-নুদুস চেহারা। চোখে ভারী কাচের চশমা। মনে হলো, আত্মভোলা। কিছুক্ষণ টেপাটেপি করার পর আমার জিভ আর চোখের পাতা টান করে দেখে হো-হো করে হেসে উঠলেন। উঠে দাঁড়িয়ে স্টেথেসকোপটা গুটিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, এক্ষুণি মিষ্টির অর্ডার দাও হে এহসান, আমি বসছি, মিষ্টি না খেয়ে যাব না। হিউমার রাখো, কেমন দেখলে? সিরিয়াস কিছু হয়নি তো?আম্মা বিভ্রান্তের মতো তাকিয়ে আছেন, আব্বা জিজ্ঞেস করলেন।

আমি শুয়েই আছি, অত্যাধিক শীতের চাপে আরও শক্ত বরফের মতো জমে যাচ্ছিলাম, শুনলাম ডাক্তার চাচার সোল­াতে বললেন, এখনো কিছু বুঝলে না?এখনো একমদ আনাড়ি। নাতি হবে হে, আমাদের নাতি, হাহাহাহা।

আমি চোখ বুজেই রইলাম, মনে হলো আমার নিশ্বাস-প্রশ্বাস থেমে গেছে, আব্বা-আম্মার কি হলো তা অনুমান করবার সাধ্য রইল না।

তারপর দুপুর পেরিয়ে-বিকেল, বিকেল পেরিয়ে রাত। আমি শুয়েছিলাম বাতি নিভিয়ে, আব্বা-আম্মার ঘরে আলো ও উত্তেজিত কণ্ঠস্বর।

দরজায় একটু ফাঁক, আমি কোনোরকমে উঠে গিয়ে ওখানে দাঁড়াই। এক নজর দেখলাম, ডক্টর মাসুদ করিম ও তার স্ত্রী ডক্টর ইসমত জাহান। আটই ফাল্গুনে তারাই আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন, মনে হলো তাদেরকে ডেকে এনেছেন।

না, না। আমি বিশ্বাস করি না। চাপা, ক্ষুব্ধস্বরে আব্বা বললেন, আপনারা ঠিক কাজ করেননি। আশ্চার্য, এমন একটা সিরিয়াস ব্যাপার? আপনারা ডাক্তার হয়েও তা চেপে যেতে পারলেন?

আপনি একটু শুনুন আঙ্কল। পরিস্থিতি যেরকম তাতে আমার অবস্থায় পড়লে আপনি নিজেও হয়তো-

ঠিক আছে, সব খুলে বলুন। আব্বা বললেন, এখনো সময় আছে, আমি ওদের গুষ্টিশুদ্ধ জেলে পাঠিয়ে ছাড়ব।

ডক্টর করিম শান্ত, তিনি আস্তে আস্তে বললেন, আঙ্কল, আপনি শুনুন। আমার ছোটভাই সাজ্জাদ, ওর গ্রুপেরই ছেলে। ওর গতিবিধি আমি সন্দেহ করছিলাম। একটি জরুরি কলে আটকা পড়লে হয়তো ঘটনা এতটা গড়াতে পারত না। কিন্তু যখন গেলাম, লোপা সজ্ঞা হারিয়ে বিছানায় পড়ে ছিল। আপনারা জানেন না, তার পরেও কি মারাত্মক প্ল্যান ওরা করেছিল-

কি, কি? আব্বা-আম্মার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, আব্বা নিস্তেজভাবে বললেন, বলুন।

ওরা তখনো ওকে ঘিরে ছিল এবং দরজার কাছে যেতেই আমার কানে বাজল আলোচনা করছে সাভার নিয়েগিয়ে ওকে টুকরো টুকরো করে জঙ্গলে ছড়িয়ে দেবে।

ও আল্লাহ! আম্মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আব্বা অসহিষ্ণুভাবে পায়চারি করতে লাগলেন।

ওরা সংখ্যায় সাতজন, সুতরাং একটু কৌশল করলাম। কেউ আছেন? বলে দরজা ঠেলা দিতেই ওরা সটান দাঁড়িয়ে পড়ল এবং একসঙ্গে আমার দিকে তাকাল। দেখলাম, আমার ভাই সাজ্জাদও রয়েছে। আমি বললাম, ও তোমরা? কেমন আছ? ওরা কোনো উত্তর দিলনা। আমি বললাম, কে একটা জরুরি কলকরল, ঠিকানা দিয়ে। এ বাসায় একজন রোগী, অবস্থা খারাপ। আমি ছুটে এসেছি। দেখি, দেখি। ও বিয়্যালি সিরিয়াস। কেউ একটু ধরতো দুজন।আমার ক্লিনিকে নিয়েযাব। ওরা থ মেরে গিয়েছিল এবংআমাকে তিনজন সাহায্য করল। আমার বাসায়নিয়ে এলাম। কিন্তু একটু পরেই টেলিফোন বেজে উঠল। একজন বলল, সাবধান ডক্টর করিম, যদি কাউকে কিছু বলেন তাহলে আপনার ও এহসান সাহেবের দুই পরিবারই আমরা খতম করে দেব। তবু, ক্রিমিন্যালদের হুমকিতে দমে যেতাম না। কিন্তু লোপা, লোপা যে চায়নি-

কাছাকাছি বসে শুনছিলাম এবংশুনতে শুনতে আব্বা-আম্মা যেন পাথরে মূর্তি হয়ে গেলেন। তাদের চাউনিও সকরুণ, নির্নিমেষ।

অনেক কষ্টে আব্বা মুখ খুললেন, বিড়বিড় করে বললেন, হুঁ, নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড। কিন্তু না, তবু আমি সহ্য করব না। এতবড় আঘাত দিয়েছে, অপরাধীদের হাতের কাছে পেয়েও ছেড়ে দেব? অসম্ভব, অসম্ভব।

ওগো না-না। আম্মা আকুলভাবে এগিয়ে আব্বাকে ধললেন, চেপে যাও সব চেপে যাও। আমার বাছার মুখের পানে তাকিয়ে। বাপ হয়ে ওর জীবনটা তুমি নষ্ট করবে?

তখন আব্বার হাত-পা যেন শিথিল হয়ে এলো, তিনি হতাশাভাবে পিছনে দু’হাত ভর করে খাটের উপর বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ নীরব, তারপর মুখ তুলে বললেন, আই অ্যাম পাজলড। নাও হোয়াট ইজ টু বি ডান, প্লিজ অ্যাডভাইজ মি ডক্টর।

ডক্টর করিম যেন এ কথাটাই ভাবছিলেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, আই থিংক, এবোরশন ইজ অনলি সলিউশন।

এবোরশন! মেয়ের বিপদ হবে না তো?

না, না। সহজভাবে ডক্টর বললেন, অবশ্য সাত সপ্তাহ পর্যন্ত এম-আর করা যায়, কিন্তু ওর তো প্রায় তিন মাস। ডি এন সি করতে হবে।

আব্বা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন, আম্মা ডক্টর ইসমত জাহানের দিকে তাকিয়ে রইলেন, আমরা তো কিছু বুঝি না মা, তোমরাই দায়িত্ব নাও।

আই থিংক, ইউর ফ্রেন্ড ডক্টর জামাল ইজ দি বেস্ট এভেইলেবল ফিজিশিয়ান ফর দিস।

নো, আই ফ্রেপার ইউর ক্লিনিক। আব্বা যেন স্বপ্নের ভিতর থেকে জেগে উঠলেন, ইউ কনসাল্ট ডক্টর জামাল, ইফ নেসেসারি।

এক সময় শুনলাম, ওরা বিদায় নিচ্ছেন এবং ওদের পদশব্দ ক্রমে সিঁড়ির নিচে মিলিয়ে গেল।

আমি তখনো দরজার কাছে স্তব্ধ হয়েদাঁড়িয়েছিলাম। আব্বা-আম্মা ফিরে এলেন। হঠাৎ আম্মার ফোঁপানো কান্না, তিনি খাটের ধারে আব্বার বুকে লুটিয়ে পড়লেন এবং বলতে লাগলেন, আমরা কি অপরাধ করছি ওগো বল কি অপরাধ। ধন-সম্পত্তি। আভিজাত্যের অহঙ্কার তো কোনোদিন করিনি তবু কেন এই শাস্তি? আমাদের ছেলেমেয়েরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কি করব বল এখন কি করব।

অত উতলা হয়ো না তাহমিনা। আব্বা আস্তে আস্তে বললেন, আমরা হয়তো অবহেলা করেছি। আচ্ছা, তুমি না বড় মেয়েকে দেখতে যাবে বলেছিলে? চলোনা, আমেরিকা ঘুরে আসি?

আম্মা তক্ষুনি রাজি হলেন এবংমুখ তুলে বললেন, তাই চলো। টাকা-পয়সা জমিয়ে আর কি হবে। লোপা, শুভকে নিয়ে যাব। তুমি সব ব্যবস্থা করো। ঈদের পরেই যেন রওয়ানা দিতে পারি।

আব্বা-আম্মা উঠে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি, উভয়ে উভয়কে একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। আমি বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম।

অন্ধকার আবার অন্ধকার আমার জানালায়; সন্ধ্যার আগে থেকেই আদিগন্ত আকাশ জুড়ে স্তরে স্তরে কালোমেঘ জমছিল, এখন ঘোর হয়ে এসেছে। ঘন ঘন গুড়গুড় ধ্বনি ও বিজলি চমক। আমি চুপচাপ ওখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমড়া গাছের পত্রগুচ্ছ, ডালপালা, একটু একটু নড়ছে। ঝড় আসতে পারে। আমি মুখ তুলে তাকিয়ে আছি আসন্ন ঘন দুর্যোগের সেই বিপুল আয়োজনের দিকে। আমি কিছু ভাবছি না; কিন্তু এই কয়দিনের স্মৃতি প্রবাহ অন্তরে বয়ে চলেছে, স্রোতের ফুলের মতো। আরও এক সপ্তাহ কেটে গেছে, আজও শুক্রবার। আটই জ্যৈষ্ঠ, তেরো রমজান। ডক্টর দস্পতি যখন এসেছিলেন তার পরদিন সকালেই আব্বা-আম্মা গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেকদিন পর আব্বা নিজেই ড্রাইভ করলেন।

অপারেশন, যত ছোট হোক খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু ডক্টর ইসমত জাহান শুধু ডাক্তার হিসেবেই চমৎকার নন, তাদের যন্ত্রপাতিও সর্বাধুনিক। ক্লিনিকের ভিতরের দিকে সুন্দর ব্যবস্থা। এমনভাবে সমাধা করলেন, আমি টেরও পেলাম না! মনে হয়েছিল গভীর ঘুমের মধ্যে একটা স্বপ্ন দেখছি। থই থই নদী। চরাঞ্চল, রৌদ্র। টকটকে লাল কাটা তরমুজ।

আমার শরীরটা এখন পাখির পালকের মতো হালকা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সজীব নিবিড়।

একটা ভয়ঙ্কর কালোদৈত্য জানালা দিয়ে তার বিদঘুটে লোমশ হাতটা বাড়িয়েছিল, যেন গুটিয়ে নিয়েছে।

আমার এখন আর একটুও ভয় করছেনা। এই যে আসন্ন বিদ্যুতের দিকে তাকিয়ে আছি, আমি সম্পূর্ণ সাহসী। যেন প্রচণ্ড তুফানের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়েতে পারব। একদা দুঃস্বপ্নে, একটা কালো পিণ্ড যেন তীর বেগে আমার দেহে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু সেটাকে বার করে ফেলা হয়েছে। আমি মুক্ত এখন; আমি পবিত্র। একটা স্তিমিত স্বচ্ছ শান্ত অনুভবের স্রোতে হৃদয়টা ভরে আছে।

আমি যখন বিশ্রাম নিচ্ছিলাম বিকেলে, তিনদিন আগে এসেছিল নোরা আস্তে করে ঘরে ঢুকে আমার পাশে বসেছিল। আমি তড়িৎ পিষ্টের মতো সঙ্গে সঙ্গে উঠেবসতে পারতাম, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েচাপা চিৎকারে ওকে বেরিয়ে যেতে বলাও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আশ্চার্য, আমি নীরবে তাকালাম শুধু; কোনো অনুভূতিই আমার মনে জাগছে না।উস্কো-খুস্কো নোরার চুল, বাঁ হাতের কজ্বির নিচে একটা বান্ডেজ। এলোমেলো কাপড়-চোপড়। সে আমার ডান হাতটা আলতোভাবে টেনে নিল কোলের উপর এবংবলল, আমাকে তুই ক্ষমা করবি না জানি লোপা, চাইতেও আমি আসিনি। আমি কলঙ্কিনী।আমি ঘৃণিত পশুরও অধম। আমার শাস্তি আমি পাচ্ছি, আরও পাব। কিন্তু। কিন্তু লোপা একটা জিনিস আমি বুঝতে পারছি না।আমি যা করেছি, যা করছি-সে যেন আমার নয়। একটা বাতাস, বিষাক্ত বাতাস। আমাকে ঠেলছে প্রতিমূহূর্তে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।

ওকে না দেখিয়ে, আমি ¤øান হাসি। আমার মনে একটি কথা জাগল, নিজের পাপ ঢাকবার জন্য উত্তম সাফাই।

একটু চুপ থাকার পর নোরা বলল, তুইই বেশি গুরুত্ব দিস। খুব কাতর হয়ে পড়েছিস। আমার বন্ধু কত জানিস তো। সপ্তাহে দু’তিনবার। স্বেচ্ছায় যেতে হয়। আমার বেশ ভালাতো লাগে। আমাদের বেঁচে থাকার মতো কি আছে। একটা কিছু করা চাই তো। তবে বিপদও কম না। এই দ্যাখ, আমার ব্যান্ডেজ। বলেছি, একসিডেন্টে পড়েছিলাম। কিন্তু আমারই একজন এডমায়ারার রাগের মাথায় ছুরি মেরেছিল। তুই বিশ্বাস কর লোপা, ওরা আমাকে কথা দিয়েছিল তোকে এনে দিলে বদলায় ওই ছেলেটাকে ধরে এনে দেবে আমাকে। আসলে আমার খুব জিদ চেপেছিল। আমার জন্যই সবাই পাগল, অথচ সে কোন দেশের শাহজাদা যে আমার প্রতি নির্বিকার। আমি প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলাম। একে ওরা পায়নি, তবে শুনেছি প্রতিদ্ব›দ্বী দল ওকে শিগগিরই মেরে ফেলবে। যাক গে ওসব বাজে কথা। আমার বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে গেছে, জানিস? বরের পিতা অন্যতম ধনী ব্যক্তি। গুলশানে বাড়ি আছে; তারা ভাড়াই পায়পয়ষট্রি হাজার টাকা। আমি ভাবছি রাজি হয়েযাব; বিয়েছাড়া সারাক্ষণ শুধু টেনশন। বিয়ের পর হাসিমুখে প্রথম পূর্বদিকে যাব। সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্কক। তারপর ফিরে এসে পশ্চিমে বেড়াতে লন্ডন, প্যারিস, ওয়াশিংটন।যাওয়ার পথে তাজমহলটা দেখেযাব। এই দ্যাখ কত বাজে বকছি। আসলে কিচ্ছুই হবেনারে-আমার খোঁজখবর নেওয়ামাত্র প্রপ্রোজালটা ভেঙে যাবে। যাক, যাক। আমি ডোন্ড কেয়ার। শোন আমাকে যত ঘৃণা করবার তুই কর; কিন্তু একটা মিনতি জানাব, একটা অনুরোধ গোরাভাই মরে যাচ্ছে।তাকে তুই ক্ষমা করে দে। আসলে কি জানিস এই যেমন আমার কথা বললাম, গোরাভাইও জানত না সে কি করছে।

এরকম, একলা-একলা, আরও কিছুক্ষণ বকরবকর কথার পর নোরা উঠে পড়েছিল এবং যাওয়ার আগে বলেছিল, ঠিক আছে, কালকে আবার আসব। আমার শেষ কথাটা একটু ভেবে দেখিস লোপা, এখন আসি।

আমার আর ভেবে দেখবার কি আছে। আবোল-তাবোল কি সে বলে গেল তাও আমি বুঝতে পারলাম না। আব্বা-আম্মাকে রাজি করিয়েআজ আমিও রোজা রেখেছিলাম। অনেক কড়া রোদ উঠেছিল দুপুরে, আমগাছতলায় গিয়ে হাঁটছিলাম। কয়েকবার ছোট ঝড়ে কিছু কিছু ঝরেছে, কিন্তু তবু পাতার ঝোপড়ার ভিতরে অনেক আমও কিছু কিছু পেকেছে, হলদে রঙ। কয়েকটা পাড়তে ইচ্ছে হয়েছিল, কিন্তু পারলাম না।

প্রাঙ্গনে, গাছতলায় দুপুর রোদে হেঁটে এসে ক্লান্ত বোধ করছিলাম। নিজের ঘরে এসে জিরিয়ে নিলাম।

তারপর বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ গোসল করলাম। আমার রুমটা গোছানোর পর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।

একা ঘরে। পাশের বাড়ি আনারকলি, নোরাদের বাড়ির দিক থেকে একসঙ্গে কয়েকটি গাড়ির শব্দ, নানারকম কণ্ঠস্বর কানে এসে লাগল। একটু যেন অন্যরকম। আমি উঠলাম এবং যখন ওদিকের জানালায় গিয়ে দাঁড়ালাম, দেখি তিনটে গাড়ি পার্ক করানো আর করিডোরে ব্যস্ত লোকজন।

একটু পর, ভিতর থেকে নোরা বেরিয়ে এবং বাতাসে চুল উড়িয়ে সান্ডেল পায়ে আমাদের বাড়ির দিকে দ্রুত আসছে দেখলাম।

কিছুক্ষণে, সিঁড়ি মাড়িয়ে উপরে উঠে এলো। আমার কক্ষে প্রবেশ করতে করতে কতকটা বিচলিত স্বরে বলল, লোপা লক্ষীটি বল না, একটু। গোরাভাইয়ের অবস্থা খারাপ। ডাক্তার এসেছে।

আমি নিঃস্পৃহদৃষ্টিতে তাকালাম ওর মুখের দিকে এবং এই প্রথম আস্তে করে বললাম, চল।

আমি নিঃশব্দে নোরাকে অনুসরণ করছিলাম, গেট পেরিয়ে প্রাঙ্গন ছাড়িয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে যখন গোরার কক্ষে পৌঁছলাম, তার বেড়ের তিন পাশেই ভিড়। ওদিকে ছয়ইয়ার। কেউ কেউ মাথা নিচু করে আছে। আমাকে দেখে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। এদিকে ডাক্তার। কানে স্টেথেসকোপ লাগিয়েবুক দেখছেন।

একেবারে কাতরে কাতরে উঠছিল, চোখ বোজা অবস্থায়ই বিড়বিড় করতে লাগল।

আমার টিকিটটা দাও তো আম্মা-তোমার-তোমার আলমারি থেকে খুলে দাও। কাল ভোরে আমি ফ্লাই-ফ্লাই করব। ননস্টপ ফ্লাইট। ডাইরেক্ট টু লস এঞ্জেলস।

আঁচলে জলদি চোখ মুছে শিয়রে ছেলেকে ধরলেন আনোয়ারা মাহমুদ, একটু ঝুঁকে বললেন, যাবিই তো বাবা নিশ্চয় যাবি। দ্যাখ কে এসেছেন। তোর ডক্টর আঙ্কল। তোকে দেখছেন-

ও আচ্ছা।মনে হলো চেতন-অচেতন আসা-যাওয়া করছে, গোরা চোখ মেলল এবং বলল, আমার হেলথ সার্টিফিকেটটা এনেছেন তো ডাক্তার আঙ্কল?

হ্যাঁ বাবা। নো প্রোবলেম, তোমাকে এখন হাসপাতালে নিয়েযাব, আরেকটু চেক করে সার্টিফিকেট লিখতে হবে।

ঠিক আছে, আমাকে জলদি নিয়েযান ডক্টর আঙ্কল, আমার ফ্লাইট-আমার ফ্লাইট ক্যান্সেল করলেচলবে না।আই মাস্ট গো।

আমি দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিলাম। নোরা আমাকে, আসলে ধরে আছে ডাক্তারের পিছন দিকটায়। আমার দিকে একবার তাকিয়ে আনোয়ারা ছেলের মুখের কাছেঝুঁকলেন, এবংআদর করে বললেন, দ্যাখ বাবা, চেয়ে দ্যাখ কে এসেছে। লোপা এসেছে তোকে দেখতে। লোপা, চেয়ে দ্যাখ।

নোরা আমাকে ঠেলে নিয়ে গেল। আমরা পাশে, উবু হয়েবসে, তার মুখের কাছাকাছি।

ও লোপা! লোপা এসেছ! গোরা চোখ মেলে তাকিয়েআমাকে দেখতে লাগল। প্রথমে কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত, আস্তে আস্তে একটা করুণ আচ্ছন্নতায় ছেয়ে গেল। সে হাত বাড়াল না থেমে থেমে বলল, লোপা! আমি যাচ্ছি লোপা, আমি চলে যাচ্ছি। তোমার-সময় তোমার সময় তো এখনো আসেনি। তোমার সময়যখন আসবে-তখন এসো! এসো কিন্তু! বল, বল। আসবে তুমি?

একটু উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল, আস্তে আস্তে শান্ত হয়েঘুমিয়েপড়লে আমি উঠে এসেছিলাম। আমি কিছু বলতে পারিনি।

আমি ফিরে এসেছিলাম, ধীর পায়ে। ওদের প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে, আমাদের প্রাঙ্গণে। আমাদের প্রাঙ্গণের কোণে কাঠালিচাঁপার গাছ, সাদা সাদা অজস্র ফুল ফুটে আছে। আমাদের বাড়ির অপর দিকে রাস্তার ওধারে কৃষ্ণচূড়া গাছ, সেগুলোতে অজস্র রক্তিম পুষ্প সম্ভার। ওসব দেখতে দেখতে অনুভব করি, আমার ভিতরটা; শীতল পাষাণ প্রতিম : সেখানে নদী নেই, শস্য খেত নেই, কেবল একটি ধূসর পথরেখা। সেখানে বৃক্ষ আছে, অজস্র বৃক্ষ: কিন্তু নিষ্পত্র। জীর্ণ-শীর্ণ হাজারো প্রেতের আঙুলের মতো ডালপালাগুলো ঈষৎ হাওয়া কেঁপে কেঁপে উঠছে। মনে-মনে শিউরে উঠলাম এবং বিশ্বাস করতে ইচ্ছেছিল এই সমস্ত পুষ্পহীন, পত্রহীন, বৃক্ষেও ফাল্গুনের ছোঁয়া লাগবে : অফুরন্ত বসন্তের জোয়ারে ভরপুর সম্ভার নিয়ে এরা ভাসবে একদিন।

নিচে, ড্রয়িংরুম সংলগ্ন ডাইনিং স্পেসে বড় টেবিল : চেয়ারে বসে ইফতারির তদারক করছেন। আমি আব্বার কাছে এগিয়ে গেলাম, তাঁর কাঁধে হাত রাখি। উনি স্বস্নেহে তাকালেন আমার মুখে এবং প্রশ্ন করলেন, কিরে?

আমি প্লেট সাজানোতে রত আম্মার দিকে একবার চাইলাম, তারপর আব্বাকে বললাম, আব্বা আমি বিদেশে যাব না।

হ্যাঁ?কি বলিস, কেন? আব্বা যেন চমকে উঠলেন।

না এমনি। আমার যেতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। গানের কোর্সটা আমি শেষ করব তো।

আব্বা-আম্মা গভীরভাবে তাকিয়ে আমাকে দেখতে লাগলেন। আমি উঠে নীরবে নিজ কক্ষে চলে এসেছিলাম।

ওই যে এখন, একটা প্রচণ্ড আলোড়নে আকাশটা ভেঙ্গে গেল। দূরে সর সর শব্দ। বৃষ্টি আসছে, বৃষ্টি আসছে।

এরপর জোর বর্ষণ হবে, অবিচ্ছিন্ন একটানা। ঝর ঝর, ঝর ঝর। অন্ধকার, অন্ধকার। শব্দের তমশা।

বেশ ভালো লাগছে আমার। আমি হয়তো সারারাতই দাঁড়িয়ে থাকব আমার জানালার কাছে এইসব দৃশ্যমালা দেখতে দেখতে। আমি দাঁড়িয়ে থাকব আমার অনন্তের সিঁড়িতে। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj