কবি ও কবিতা : আমীর খসরু স্বপন

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, সময়ের বিচারে প্রত্যেক দশকেরই কিছু কবি থাকে যারা গুরুত্ব অনুযায়ী আলোচিত বা সমালোচিত হয়ে থাকেন আর সমসাময়িক কালের সে সব কবিতার বিচার-বিশ্লেষণ ভবিষ্যতের লেখালেখির জন্য কাজে লাগে। তবে একজন মৌলিক কবির মৌল প্রবণতাগুলো চিহ্নিত করা বা তাকে বোঝা অনেক সময়ই সম্ভব হয়ে ওঠে না। অনেক ক্ষেত্রেই তার সুর, স্বরকে এবং প্রকরণ ও আঙ্গিকের নতুনত্বকে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। সে সব কবিতা, সময় যত এগিয়ে যায় ততই তার বিষয়বস্তু পরিচ্ছন্ন হয় অথবা তার ভাববস্তুর স্বচ্ছতা ফুটে ওঠে। সে জন্য একজন কবিকে আলোচনার পূর্বে তাঁর কবিতার পঠন-পাঠনের ব্যাপারে সতর্ক মনোনিবেশ করা উচিত। যেহেতু যিনি কবি তাঁর কাছে কবিতা লেখার অনেকগুলো কারণ নিহিত থাকে। আর সে সব কারণের ভেতর সদর্পে বিচরণ করা যায় বলেই তিনি কবি।

যিনি কবি, তিনি না-বুঝে, না-জেনে, কোনো বিষয়ের গভীরে তর্কহীনভাবে কোনো প্রশ্ন, কোনো ভাব, কোনো সমস্যা, কোনো মন্তব্য, কোনো ইঙ্গিত ছুড়ে দেন না… এ ক্ষেত্রে যুক্তির পরিশীলন যেমন কার্যকর থাকে, আবেগের নিয়ন্ত্রণটাও কবিকে সেভাবেই করতে হয়। সুতরাং বাক্য তৈরির সময় একজন কবিকে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হয় যেন ওই বাক্যটি ও ওই বাক্যের শব্দগুলোর অনিবার্যতা দু’একদিনের মধ্যেই হারিয়ে না যায়। কবিতার ভেতর দিয়ে কবি যে ভ্রমণ বা যাত্রা শুরু করেন, সেটা নিঃসন্দেহে একটা নতুন অভিজ্ঞতা বা এমন কিছু যা অন্যের ভেতর দিয়ে কবির মনে গড়িয়ে এলেও কবি তার ক্ষমতা দিয়ে সেটাকে তার সক্রিয়তার স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেন।

কবিতা লেখার শুরু বা প্রথম আরম্ভের দিন থেকেই একজন কবি সে চেষ্টার মধ্যে সব সময় বা নিয়ত তাকে আবিষ্ট রাখেন এবং ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজস্ব কাব্য ভাষা তৈরি করেন। কেননা স্বকীয় কাব্য ভাষার কোনো বিকল্প নেই। এখানে কবি খুবই যতœবান থাকেন। তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেন সেটাকে নিজের মতো প্রেজেন্টেশন করা খুবই সহজ কিছু নয়। এখানে তাকে নতুন হয়ে উঠতে হয়। অভিনব হয়ে উঠতে হয় এবং নতুন বা অভিনব হয়ে ওঠার জন্য তাকে ভাষার পরিশীলন বা চর্চা করলেই হয় না, তাকে নিজ ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিদের মৌল সুর সম্পর্কে সজাগ থাকতে হয়। যেহেতু কবিতার একটা স্যান্ডার্ড ভাষা বা প্রচলিত ভাষা সব সময়ের জন্য তৈরি থাকে যে স্ট্যান্ডার্ড ভাষার একটা ট্রেনড-এ দুই, তিন দশকের কবিরা প্রায় একই রকম লেখালেখি অব্যাহত রাখেন (সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) বস্তুত সেই ভাষার প্রতিষ্ঠিত বাক্যপ্রবাহ বা ট্রেনড-এর বাইরে তাকে নতুন ভাষার বাহন হিসেবে চিহ্নিত হতে হয়। এ যেন তার নতুন জন্ম! কেননা ভাষার বাহুল্যতাও তাকে গ্রাস করতে পারে। সেই বাহুল্যতাকে যেমন চেপে ধরতে হয়, পাশাপাশি পুনরাবৃত্তির দিকেও তাঁকে দৃষ্টি দিতে হয়। কেননা কেউ কেউ অল্প কথাতেই অনেক কিছু বলে ফেলেন আবার অনেকেই বহু বাক্য লিখেও তাৎপর্যহীন থাকেন। এক্ষেত্রে বলা যায়, কবির অনুভূতি যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন, তা স্মার্টলি বা উপযুক্ত কাব্যভাষায় প্রকাশ করা না হলে সেটাও একটা নিম্নমানের কথাই হয়ে যায়। সুতরাং ভাষার ওপর দখল রাখা প্রত্যেক কবিরই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, কবিমাত্রই তাঁর একটি অন্তঃশীলা ভাষা থাকে যা জন্মের স্থানিকতা সূত্র থেকেই নিজস্ব কথন ভঙ্গিমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। যে ভাষায় তিনি খুব সহজভাবেই মনের কথাগুলো কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু কবিতা যেহেতু ভাষার একটি গুরুতর আঙ্গিকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে সেহেতু তার সাথে অন্তঃশীলা ভাষার সু-সম্পর্ক কখনই টেকে না। যদিও কবিতার ক্ষেত্রে (তা যদি ঢাকার আঞ্চলিক কুট্টি ভাষায়ও রচিত হয়, তবু…) স্বতঃস্ফ‚র্তকেই ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু এটাও সত্য যে, শুধু ভাষা স্বতঃস্ফ‚র্ত হলেই চলে না, সেটার একটা ফর্ম না-দাঁড়ালে সেটাও অতি ন্যারেশনের ভেতর অর্থাৎ অতি বর্ণনাকাতর স্বভাব ধারণ করতে পারে। যেহেতু এর মধ্যে অতিরিক্ত বর্ণনার একটা সহজ সুযোগ তৈরি হয়। পঞ্চাশ থেকে সত্তর পর্যন্ত যে তিনটি দশকের কবিতা আমরা পড়েছি সেখানে এর সর্বোচ্চ স্খলন লক্ষ করা যায়। কিন্তু কবিতায় যে চিন্তাসূত্রগুলো একত্রিতভাবে প্রশ্রয় পায় বা যে চিন্তার জটগুলো একে একে তৈরি হতে থাকে তার অনিবার্যতা কোনো না কোনোভাবে বাধ্যবাধকতা থেকেই আসে আর সে চাপ কতটা, কিভাবে ও কতভাবে জীবনকে দেখার সুযোগ করে দেয় তারই সৎ উচ্চারণগুলো কবিতা বহন করে। আর এভাবেই একজন কবি নিজেকে ইতিহাসের সাথে সংযুক্ত করে নেন অথবা তার আবাস দিয়ে যান। বলাবাহুল্য, সে সব আভাস কোনো না কোনো চিন্তা কাঠামো থেকেই সৃষ্টি। কবিকে ওইসব চিন্তা কাঠামোগুলো নানা প্রশ্নের সাংঘর্ষিকতার মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর আদি ও বর্তমানের সাথে একটা সু-সম্পর্কের ভিত্তিতে এগিয়ে নেয়। ফলে কবিতাই একমাত্র শিল্প যার ভেতর ইতিহাস, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতিসহ নানা ঘটনা প্রবাহের একটা নান্দনিক সম্মিলন ঘটে। এটা যেন এক বিশাল সমুদ্র, যার পিঠে যুগের পর যুগ সবই ভেসে যায়। (অর্থাৎ হব সেই পাথর, সেই কালো পাথর, যাকে নদী বয়ে নিয়ে যায়… পাবলো নেরুদা) সুতরাং কবিতাশিল্প নির্ভর করে একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির ওপর আর এ দৃষ্টিভঙ্গিটি যত স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় কবিতার নান্দনিকবোধ ও সৌন্দর্যের দিকটাও ততই স্থায়িত্ব লাভ করে। তখন কবিতার অন্তর্নিহিত উপাদানগুলোর সাথে কবির নিবিড় সম্পর্ককে বুঝে নিতে কোনো অসুবিধে হয় না।

উল্লেখ্য, জীবনানন্দ দাশ তাঁর বনলতা সেন কবিতায় ইতিহাসের যে গতিকে টেনে ধরেন সে গতিকে শুধু ভাষিক দক্ষতার ওপর অবস্থিত কোনো নির্মাণ বলা সম্ভব নয়।

কেননা-

১. আমাকে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন

২. পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন

৩. থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন- প্রথম বনলতা সেন শান্তি দিয়েছে ঠিকই কিন্তু দ্বিতীয় বনলতা সেন চোখ তুলে তাকিয়ে কি যেন ভাবছিল এবং শেষ পঙ্ক্তির বনলতা সেন যেখানে অন্ধকারের মুখোমুখি বসেন সেখানে আর যাই থাক বিশ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতাটা এতটাই হতাশাজনক হয়ে দাঁড়ায় পাঠকের কাছে, যে অভিজ্ঞতার বিপরীতে কোনো চাঁদের ক্ষীণ আলো পড়ে না। সুতরাং সেই চাপকে সামাল দিতে হয়েছে একটা কোমল ভাষা দিয়ে। যেখানে রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাস সবই এসে মিলেমিশে একটা নান্দনিকবোধের জন্মকে অনিবার্য করে তোলে, সেইতো আসলে বনলতা সেন।

২.

কবিতার সাথে কবির যে সখ্য বা প্রেম যা প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে, সে প্রেম, সে সখ্য কখনই অভিনয়ের নয়। কেননা এই প্রেম, এই সখ্য তৈরি হয় তারই বিশ্বাস, ভালোলাগা ও জোরের জায়গা থেকে। কবিতার সাথে কবির সম্পর্ক তাই নিবিড়। অর্থাৎ এখানে কবি যা তাই সে করে দেখায় কল্পনা ও বাস্তবতার নিরিখে। কবি এভাবেই নিজের কাছে নিজেই হয়ে ওঠেন কাব্য বিশ্বাসের খাঁটি প্রেমিক। আর এ জন্যই বলা হয়, ‘কিছু কবির সমগ্র কবিতা পাঠযোগ্য, আর কিছু কবির সমগ্র রচনাবলী পড়ার দরকার হয় না।’

বলা বাহুল্য, সেই কবে টি এস এলিয়ট বলেছেন, ‘প্রসঙ্গ ও বক্তব্যে, বিন্যাসে ও প্রকরণে যে কবি বারবার নিজেকে অতিক্রম করে এসে নতুন দিগন্তের দরজা খুলে দিয়েছেন, নিরন্তন বিবর্তনে যিনি পূর্ণাঙ্গ তারই রচনা বা কবিকৃতী দাবি করে পাঠকের অভিনিবেশ।’ এক্ষেত্রে ইয়েটস বলেছেন, ‘এজরা পাউন্ড তাকে বিমূর্ততা থেকে মূর্ত প্রত্যক্ষতায় ফিরিয়ে এনেছেন।’ তবু বলতে হয়, কবির অনুভব ও তার সারাৎসার উপস্থাপনের প্রবণতাগুলো যদি কবিতাকে রহস্যজনক করে তোলে তার বিষয় ও বক্তব্যের ধূম্রজাল কবির ব্যক্তিকতাকে তখন কোথায় পৌঁছে দেয়- সমাজের ভেতরের ও বাহিরের সাথে তার যে আন্তঃযোগাযোগ বা ঘনিষ্ঠতা তাকে সে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে আসলে পলায়নপর, দাসত্ব ও অসত্যের ভূমিকায় তাকে নিয়োজিত রাখতে হয়। যা তাকে টেনে নিয়ে যায় প্রথার পুজো ও গতানুগতিক একরৈখিকতার মধ্যে আর সেখানে যা হবার তাই হয়। অর্থাৎ নিষ্ফলা মাঠ বা কবির ভানটাই তখন মুখোশ হয়ে দাঁড়ায়। আর মিডিয়া সাংবাদিক কবিরা, টক শো’র কবিরা, আমলা কবিরা, অধ্যাপক কবিরা ও সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদকরা সেই সব অকবিতাই সারা বছর লিখে যান সত্য প্রকাশের ভয়ে। আর এ কথা বলার কারণ হলো, কবি ও কবিতা শব্দ দু’টির ব্যবহার উপযোগিতা ক্রমশ হারিয়ে মুখোশধারী ও প্রতারক চক্রের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এর কারণ একটাই তা হলো, প্রভুত্ব কায়েম। আর সে সব অকবিদের কবিতাই বেনিয়া আলোচকের নামে ধন্য-ধন্য প্রশংসায় ছাপা হয়। ধূম্রজাল সৃষ্টির এই হলো নমুনা (হায়- কে, কত বড় কবি!) এক্ষেত্রে বলতে দ্বিধা নেই যে, সময় যেমন কিছু মূল্যবান পাথরের জন্ম দিয়ে থাকে সেই সাথে কিছু আকড়ও তৈরি হয়, আর এরা হলো কবিতার ক্ষেত্রে সেই আকড়। কিন্তু বিপজ্জনক হলেও সত্য যে, এই আকড়েই গিয়ে খেতে চায় সা¤প্রতিক কবিতার নির্যাস (হায়, ক্ষমতার এতই গুণ!)। কিন্তু এরা কি জানে না, বড় লোকের খানসামা আছে, বন্ধু নেই, আর কবিই কেবল জানে, (নতুন কাঠ যে কেটেছিল, সে তুমি, এখন খোদাই করার সময়- এজরা পাউন্ড)।

লেখালেখির বিষয়টা শুরুতে হয়তো যে কারো জন্য দশকের চৌহদ্দিতেই কোনো রকম কেটে যায়, কিন্তু শেষমেশ ভালো বা নতুন কিছু সৃষ্টির তাড়নায় প্রত্যেককেই সেই দশকের অজস্রতা! থেকে বা তকমা থেকে ঠিকই বেরিয়ে আসতে হয়। কেননা নতুন কিছু সৃষ্টির উন্মাদনা ও প্রান্তি মহাকালের মূল্যবান বিষয়- তা দশকের ভাবনায় কখনো সীমাবদ্ধ থাকে না এবং এটাই সত্য যে, দশক ফুরিয়ে যায় আর ভালো ও নতুন সৃষ্টিটাই কালের কাছে টিকে থাকে। আর সেই মৌল কবির সন্ধান আমরা সেখানেই পাই। হ

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj