নারীর ক্ষমতায়ন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০১৫

বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক আলোচিত বিষয়ের মধ্যে একটি হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষমতায়ন শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় ১৮৬০-এর সমসাময়িক সময়ে। অত্যন্ত সংকীর্ণ অর্থে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন বোঝাতে। আশির দশকে তা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বেসরকারি উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে নারীর সামগ্রিক অধিকার অর্জনের দাবি বোঝাতে। ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ উইথ উইমেন ফর নিউ ইরা নারীর ক্ষমতায়নের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করেছে এভাবে- এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জেন্টার বৈষম্যবিহীন এক পৃথিবী গড়ে তোলা। যেখানে পৃথিবীতে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারী তার নিজের জীবনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। সমন্বিত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধি। সমন্বিত উন্নয়ন তত্ত্বের মূল দর্শন হচ্ছে- পরিবার ও সামাজিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হলো নারী উন্নয়ন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো যে বিষয়গুলো নারীর অধস্তনতা সৃষ্টি করে সে বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষমতার উৎস ও কাঠামোর পরিবর্তন, নারীর সুপ্ত প্রতিভা এবং সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশের সুযোগ, তার ওপর প্রভাব বিস্তারকারী সিদ্ধান্তসমূহে অংশ নিয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ইত্যাদি।

এবার আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল- ‘নারীর ক্ষমতায়ন, উন্নয়ন ক্ষমতায়ন কোনো মানবিক দর্শন নয়।’ ক্ষমতায়নকে মানবিক অভিধায় ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা। শিক্ষা, মূল্যবোধ, সততা, নৈতিকতা, সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ঐতিহ্যকে বিবেচনায় না এনে কোনো প্রক্রিয়াতেই নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। আধিপত্যশীল সংস্কৃতির বিদ্যমান অবস্থার সঙ্গে সংঘর্ষ না বাধিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন লাভের জন্য আগে নিজেকে সচেতন হতে হবে। ক্ষমতায়ন লাভের যে পূর্বশর্তগুলো সেগুলো অর্জন করতে হবে। যারা ক্ষমতায়ন লাভ করবে তাদের সচেতনতার পাশাপাশি সমাজে যারা চিন্তাশীল মানুষ আছেন, যারা এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন তাদেরও সচেতন হতে হবে। সর্বস্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। নারী সমাজের জীবনের বাস্তব দিকগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে তার অবস্থান কোথায় তা তাকে উপলব্ধি করতে হবে। বিশ্বায়নের যুগে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। তথাপি বাংলাদেশের নারীরা থেকে থাকেনি। হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে তারা এগিয়েছে অনেকদূর। নারীর প্রতি সহিংস আচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে যা মোটেই কাম্য নয়। নানা বাধা বিপত্তি উতরিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ক্ষমতায়ন লাভের যুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বর্তমান বাংলাদেশে সামাজিক উন্নয়ন, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা, ক্ষুদ্র্ঋণ ব্যবহার তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতায়ন, ভোটের হিসাবে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ, পোশাক রপ্তানিতে প্রথম সারিতে স্থানলাভ ইত্যাদির সবকটির পেছনেই নারীর অবদান উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে বলা যায় স্বাধীনতার পর থেকে নারীরা এ ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে সফলতা লাভ করেছে। ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে মাত্র ৫ জন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে সংসদে সর্বমোট ৬৯ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে নারী সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী ও সংসদ উপনেতা/স্পিকার প্রত্যেকেই নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৯৭ জন। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৭৬ লাখ প্রবাসীর মধ্যে ৮২ হাজার ৫৫৮ জন নারী। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধানতম ক্ষেত্র গার্মেন্টস খাতের ৮০ ভাগ কর্মীই নারী। দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবহারকারীও নারী। নানা প্রতিক‚লতা, বাধা ডিঙিয়ে তার এখন কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে নারীর ব্যাপক হারে অংশগ্রহণ পৃথিবীর মধ্যে নজির রয়েছে। বর্তমান নারীর ক্ষমতায়ন সামাজিক উন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয় বিধায় এটি এখন আর নারীর মুক্তি বা নারী উন্নয়নের জন্য নয়। যে কোনো রাষ্ট্র তথা বিশ্বে মুখোমুখি এমন সব সমস্যার সমাধানের অন্যতম প্রধান ধাপ হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কেবল আন্তর্জাতিক পরিসরে নয় বাংলাদেশ ও স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে যে কোনো নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বা সমস্যা সমাধানে নারীর ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী আজ নারীরা সর্বক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার মাধ্যমে চিন্তা-চেতনায়, কর্মদক্ষতায় পরিবার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রেখে চলেছে। তারপরও নারীর প্রতি সামাজিক ও কাঠামোগত বৈষম্য, বৈরিতার অবসান হচ্ছে না। নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এসব বৈরী পরিবেশের অবসান হতে হবে। এ অবসান সহসা হবেনা ধীরে ধীরে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে থেকেই নারীকে এগিয়ে যেতে হবে। আজ এ জন্য প্রয়োজন নারীর উন্নয়ন তথা ক্ষমতায়ন, যে দেশের নারীর ক্ষমতায়ন নেই সে দেশে নারীর মানবতা খুব নিম্নমানের থাকে। আমাদের দেশের নারীর উন্নয়ন বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে অনেক এগিয়েছে। অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন তার গবেষণায় তুলে ধরেছেন এভাবে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের নারীরা অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, নারীর উন্নয়ন তখনই হবে যখন কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ থাকবে। সেটা ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ পর্যায়ে হতে পারে। একজন কর্মক্ষম নারী তার শ্রমের বিনিময়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলে পরিবার, সমাজ তার সিদ্ধান্তের গুরুত্ব দেবে। সামাজিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। তাহলেই প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়ন হবে- হবে মানবতার উন্নয়ন। পরিবার থেকে শুরু করে জাতি, বর্ণ, প্রথা ও সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন এবং ধর্মীয়, শিক্ষা ব্যবস্থা, উদ্বুদ্ধমূলক প্রচারের মাধ্যমে সচেতনতা গড়ে তোলা, এ সংক্রান্ত আইনের সংশোধন এবং নারীর ক্ষমতায়ন সহায়ক আইন সংযোজন করা।

:: নিলুফার নাজনীন

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj