লিভার সিরোসিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০১৫

লিভার সিরোসিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ব্যবহারিক প্রয়োগ সংকেত নিয়ে আজকের নিবন্ধ।

এই রোগে লিভারের কোষগুলোর ক্রমশ অপকর্ষতা (প্রোগ্রেসিভ ডি-জেনারেশন) হতে আরম্ভ হয় এবং কোষগুলোর চতুঃপার্শ্বস্থ শ্বেততন্তু সমূহের বিবৃদ্ধি ঘটে। ইহার ফলস্বরূপ “পোর্ট্যাল ভেন” নামক সুবৃহৎ লিভার শিরার মধ্যে রক্ত চলাচলে বাধা জন্মে, লিভারটি শুকিয়ে ছোট হয়ে লিভার সেল নষ্ট হয়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতার সৃষ্টি করে। এটি অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

লিভার সিরোসিরের কারণ :

সাধারণত : ৩৫ বৎসর হতে ৫০ বৎসরের মধ্যে লিভারের সিরোসিস খুব বেশী দেখা যায়। ২৫ বৎসরের নিম্নে এই রোগ প্রায় দেখা যায় না। স্ত্রীলোক অপেক্ষা পুরুষগণ এই রোগে সমধিক আক্রান্ত হন। খালিপেটে অপরিমিত মদ্যপান, তাড়ি খাওয়া, অতিরিক্ত গরমমশলাযুক্ত গুরুপাক কোনও দ্রব্য আহার, রিকেট, গেঁটেবাত, উপদংশ, ম্যালেরিয়া স্থানে বাস, পুনঃ পুনঃ ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়া, স্কার্লেট ফিভার, টাইফয়েড-ফিভার, উপদংশ (পূর্ব পুরুষাগত বা নিজে অর্জিত), টিউবারকুলোসিস প্রভৃতি হতে লিভার সিরোসিস হয়।

লিভার সিরোসিসের লক্ষণ :

সিরোসিসের লক্ষণ নানা রকম হয় এবং নিচের বর্ণনার যেকোনো সংমিশ্রণে হতে পারে।

১. হেপাটোমেগালি : সিরোসিসের প্রথম দিকে লিভার বড় হয়, কিন্তু যতই দিন যেতে থাকে ততই লিভারের কোষগুলো ধ্বংস হয়ে ফাইব্রোস টিস্যু দ্বারা পূরণ হওয়ায় লিভারের সাইজ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে।

২. জন্ডিস : জন্ডিস সিরোসিসের জন্য অপরিহার্য নয়। এটি নির্ভর করে লিভার কতটা কর্মক্ষম আছে তার ওপর। তাই জন্ডিস থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে।

৩. এসাইটিস : লিভারের কোষের স্থলে ফাইব্রোস টিস্যু হলে পোর্টাল প্রেসার বেড়ে যায়, ফলে পেটে পানি জমে। জন্ডিস ও পেটের পানি লিভারের গুরুতর অবস্থা নির্দেশ করে এবং সিরোসিসের শেষ দিকে দেখা যায়।

৪. স্পাইডার টেলানজিসিটাসিয়া : বুকের উপর রক্তনালীর জাল দেখা যায়।

৫. যৌন ইচ্ছা কমে যায়, বুকের লোম পড়ে যায়, পুরুষের স্তন বৃদ্ধি, অন্ডকোষ শুকিয়ে যায়, যৌন অক্ষমতা ইত্যাদি হতে পারে।

৬. মেয়েদের স্তন ছোট হয়ে যায়, মাসিক অনিয়মিত কিংবা মাসিক বন্ধ হতে পারে।

৭. রক্তক্ষরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়

৮. পোর্টাল হাইপারটেনশন : প্লীহা বৃদ্ধি পায়, পেটের ত্বকের ওপর শিরাগুলো প্রকট হয়, ফ্যাক্টর হেপাটাইটিস লিভার রোগের গন্ধ শ্বাস পাওয়া যায়।

৯. হেপাটিক এনকেফ্যালোপ্যাথি : লিভারের কার্যের বিঘ্নজনিত কারণে মস্তিস্কের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া (হেপাটিক এনকেফ্যালোপ্যাথি) যার জন্য মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় যেখানে ভ্রান্তি থেকে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে।

১০. অন্যান্য : অল্প অল্প জ্বর, ত্বকে দাগ, ক্লাবিং ইত্যাদি থাকতে পারে।

প্রকারভেদ :

লিভার সিরোসিস সাধারণত ৪ প্রকার।

১. এট্রিফিক সিরোসিস : ইহাতে লিভারের আকার অতিশয় ক্ষুদ্র ও ওজনও তদানুপাতে হ্রাস হয়। লিভারের নিম্নপ্রান্তে হাত দিয়ে পরীক্ষা করলে লিভার এবড়ো থেবড়ো বুঝা যায়। অন্যান্য লক্ষণ মদ্যপান করে পীড়া হলে প্রথমে মদ্যপানজনিত পাকাশয় প্রদাহের লক্ষণ দেখা যায়। লিভারে স্বল্প বিস্তর রক্তাধিক্য হয়। ক্রমশ রোগীর চোঁঙা, ঢেকুর, অজীর্ণ ঢেকুর, অর্জীণ ভুক্তদ্রব্য বমন, ¤েøষ্মা রক্তবমন প্রভৃতি উপসর্গ সমূহ প্রকাশিত হয়। কোন কোন রোগীর এত অধিক পরিমাণে রক্ত বমি হয় যে তা মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে থাকে।

২. হাইপারট্রফিক সিরোসিস : এই পীড়ায় লিভার খুব বড় হয়। এত বড় হয় যে নিম্নাংশের নাভীর নিকট পর্যন্ত নেমে আসে। লিভারের মধ্যে অধিক পরিমানে রক্ত জমাই ইহার প্রধান কারণ।

৩. ফ্যাটি সিরোসিস : ইহাতে লিভারে খুব বেশী পরিমাণে চর্বি জমে, লিভার সংকুচিত ও ক্ষুদ্র হয়। (এট্রাফিক সিরোসিসে-লিভারে চর্বিতে কিছু অংশ থাকে)। এই জাতীয়ের পীড়ায় লিভার ক্ষুদ্র হয় না। লিভার বড় হয় পরীক্ষায় লিভার এবড়ো থেবড়ো দেখায় না, সমৃণ হয়। লিভারে অল্প রক্ত থাকে। যারা অতিরিক্ত বিয়ার মদ্যপান করে তাদের মধ্যে এই পীড়া অধিক হয়। অন্যান্য লক্ষণ-অধিকাংশই এট্রফিক সিরোসিসের মত।

৪. গøাইসোনিয়ান সিরোসিস : যারা স্ট্রং-এলকোহল পান করে ইহা প্রায় তাদেরই হয়। ইহাতেও লিভারের আকার ক্ষুদ্র ও লিভার বিকৃত হয়। কানেকটিভ টিস্যুসমূহ অতিশয় স্থুল ও তাদের বিবৃদ্ধি হয়। এই পীড়াতে ও এট্রফিক সিরোসিসের লক্ষণসমূহ থাকে।

৫. পথ্য : দুগ্ধই এই পীড়ার প্রধান পথ্য। যাদের দুগ্ধসহ্য হয় না, তারা এরারুট, কোয়েকার্স-ওট, সাগু বার্লী, শরীর পালো প্রভৃতি দুগ্ধে মিশিয়ে পান করবে। কোনও প্রকার মাদকদ্রব্য সেবন, গুরুপাক দ্রব্য পান ভোজন ইহাতে একেবারে নিষিদ্ধ।

৬. হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : লিভার সিরোসিস অত্যন্ত জঠিল রোগ। হোমিওপ্যাথি মতে অসুখ হল শরীরের স্বাভাবিক প্রাণশক্তিতে বাধাদান বা অসুস্থকারী এক অপশক্তি। এই রোগ প্রতিকারে হোমিওপ্যাথিতে যুগান্তকারী ওষুধ থাকলে তা সফল প্রয়োগের উপর আরোগ সাফল্য নির্ভর করবে। লক্ষণভেদে এ রোগে ব্যবহৃত ওষধের নাম নিম্নে প্রদত্ত হল। যথা ১) ম্যাগনেসিয়া মিউর ২) ব্রায়োনিয়া ৩) চেলিডোনিয়াম ৪) হাইড্রাসটিস ৫) কার্ডুয়াস মেরি ৬) এসিড নাইট্রোমিউর ৭) মার্কুরিয়াস ৮) পটোফাইলাম ৯) ক্যালিআয়োড ১০) হিপার সালফ ১১) এসিড নাইট্রিক ১২) এপিস ১৩) এপোসাইনাম ১৪) আর্সেনিক ১৫) ইলাটিরিয়াম ১৬) কুরারি ১৭) এসিড ফ্লোর ১৮) হাইড্রোকোটাইল ১৯) আয়োডিয়াম ২০) লাইকোপোডিয়াম ২১) ফসফরাস ২২) প্লম্বম ২৩) নাক্সভমিকা উল্লেখযোগ্য। তারপরেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে ওষুধ সেবন করা উচিত।

হ ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

পরিচালক : সিএইচসিআর (সেন্টার ফর হোমিও কনসালটেশন এন্ড রিসার্চ)

১ বংশাল রোড, ফিরিঙ্গীবাজার, চট্টগ্রাম।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj