গণভোটের আগে গ্রিসের সঙ্গে সমঝোতার শেষ উদ্যোগ

শনিবার, ৪ জুলাই ২০১৫

কাগজ ডেস্ক : গত রোববার গ্রিসের মানুষ যদি ‘বেইল-আইটের’ বিরুদ্ধে ভোট দেন, সে ক্ষেত্রেও অন্তত ফ্রান্স গ্রিসকে ইউরোজোনে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। গত বুধবার ব্রাসেলসে ইউরো অর্থমন্ত্রীরাও তাই ভাবছেন কি না, বলা শক্ত।

দুদিনের মধ্যে দ্বিতীয়বার একত্রিত হচ্ছেন ইউরো এলাকার অর্থমন্ত্রীরা। বিশেষ করে যখন গত মঙ্গলবার মধ্যরাত্রে গ্রিস শিল্পোন্নত দুনিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে একটি ঋণের কিস্তি মেয়াদমতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়: দেড় বিলিয়ন ইউরোর একটি কিস্তি। ইতোপূর্বে আন্তর্জাতিক ‘পরিত্রাণ’ সাহায্যের মেয়াদও সরকারিভাবে শেষ হয় ওই মঙ্গলবারেই। অর্থাৎ বাস্তব বিচারে গ্রিস এখনই দেউলিয়া, কিন্তু গ্রিসের ‘ডিফল্ট’ নথিভুক্ত করার জন্য আইএমএফের হাতে ৩০ দিন সময় থাকছে। সেটাই গ্রিসের বাঁচোয়া।

নয়ত গ্রিসের উগ্র-বামপন্থী সরকার ও তার নেতা আলেক্সিস সিপ্রাস। গত পাঁচ মাস ধরে গ্রিসের পাওনাদারদের সঙ্গে একটি দুর্বোধ্য খেলা খেলে চলেছেন। গত বুধবারেও সিরিজা-নেতৃত্বাধীন সরকারের শেষ চাল : গ্রিস ইউরোপীয় স্থায়িত্ব প্রণালী বা ইএসএম তহবিল থেকে আগামী দুবছরের জন্য ২৯ দশমিক এক বিলিয়ন ইউরো প্রার্থনা করেছে। এই সময়কালের জন্য ‘আর্থিক প্রয়োজন পুরোপুরি মেটানো এবং যুগপৎ ঋণের পুনর্বিন্যাস। মনে রাখতে হবে: গ্রিসের তরফ থেকে এই ধরনের ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনার অনুরোধ এসেছে গত পাঁচ বছরে এ নিয়ে তিনবার।

জার্মানির অনমনীয় মনোভাবের ফলে আপস সমস্যাকর হয়ে দাঁড়িয়েছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে সাপ্যাঁ বলেন, সবচেয়ে অনমনীয় অবস্থান এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেসব ছোট দেশগুলোর তরফ থেকে, যারা নিজেরাই কঠিন সংস্কার প্রক্রিয়া কার্যকরি করেছে, অথচ যাদের জীবনযাত্রার মান গ্রিসের চেয়ে অনেক নিচে। ওদিকে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেছেন, গণভোটের আগে তিনি গ্রিসের নতুন প্রস্তাব সম্পর্কে আলোচনা করতে রাজি নন।

আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থারা গ্রহীতা হিসেবে গ্রিসের উপযোগিতা পুনরায় কমিয়েছে। এথেন্সে মঙ্গলবার ২০ হাজার মানুষ প্রবল বৃষ্টির মধ্যে বেইলআউটের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। গ্রিসের ব্যাংকগুলো সারা সপ্তাহ বন্ধ থাকছে, যদিও গত বুধবার হাজার খানেক শাখা সাময়িকভাবে খোলা হয় প্রবীণ পেনশনধারীরা যাতে তাদের পেনশন নগদ তুলে নিতে পারেন, তার সুযোগ দিতে। বাকি জনতা এটিএমগুলোয় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে দিনে সাকুল্যে ৬০ ইউরো তুলতে পারছেন। সংকট যে একটা ঘনাচ্ছে, তার চিহ্ন সর্বত্র। সব সত্ত্বেও সর্বাধুনিক জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, গ্রিকদের ৫৪ শতাংশ রোববারের গণভোটে বেইলআউটের বিরুদ্ধে, এবং ৩৩ শতাংশ তার স্বপক্ষে ভোট দিতে চলেছেন। যদিও দুতরফের মধ্যে ব্যবধান কিছুটা কমেছে।

গ্রিস সংকট সম্পর্কে জার্মানির অবস্থান : ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। ডাগমার এঙেল মনে করেন, জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল গ্রিস সংকটের ক্ষেত্রে এর বদলে আরো পুরনো একটি উক্তি ব্যবহার করছেন ‘ইউরো বিফল হলে ইউরোপও বিফল হয়ে পড়বে’।

এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সপ্তাহে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী নারী কোথায়? কমপক্ষে গ্রিসের সংবাদপত্রের শিরোনামে তো তাকে দেখা যাচ্ছে না। তবে তার ঘাড়ে দায় চাপানো বন্ধ করতে পেরেছেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল। কয়েক বছর আগেও মাথায় ছুঁচল হেলমেট বা নাৎসি ইউনিফর্মসহ তার ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হতো। জার্মান চ্যান্সেলর যেসব বার্তা পাঠাচ্ছেন, সেগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। আমরা, জার্মানরা বা আমি জার্মান সরকারের প্রধান হিসেবে ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি সদস্য দেশ এবং ইউরোজোনের ১৯টি সদস্য দেশের অন্যতম। ইউরোপীয় ইউনিয়নে কোনো দেশ একা সিদ্ধান্ত নেয় না, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

গুরুত্বপূর্ণ এই সপ্তাহের শুরুতে তিনি তার সিডিইউ দলের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছেন। এই উপলক্ষে তার ভাষণে চ্যান্সেলর বলেছেন, আপস-মীমাংসার ক্ষমতার ভিত্তিতেই ইউরোপ টিকে রয়েছে। সে সঙ্গে নিয়ম পালন করাও টিকে থাকার আরেকটি কারণ। যেমন সংহতি ও নিজস্ব দায়িত্ববোধের মতো নিয়ম। নিয়ম ভাঙলে নিজস্ব মূল্যবোধও ভাঙা হয়। এটা ম্যার্কেলের মৌলিক বিশ্বাসের মধ্যে পড়ে।

আঙ্গেলা ম্যার্কেল যে সতর্কতার সঙ্গে গ্রিস সংকটের সময়ে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছেন, তার জন্য তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে একজনের বাহবা কুড়িয়েছেন। সাবেক চ্যান্সেলর ও সামাজিক গণতন্ত্রী দলের হেলমুট স্মিট গত সপ্তাহে বলেছেন, তিনি তার এই উত্তরসূরির আচরণে যথেষ্ট ‘ইমপ্রেসড’।

হেলমুট স্মিটের বয়স এখন ৯৭। বৃদ্ধ এই মানুষটি তার বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতার জন্য শ্রদ্ধার পাত্র। তবে কিছু বিষয় বদলে গেছে। জার্মানির প্রতি প্রত্যাশা আজ আর আগের মতো নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ঘাঁটলে বারবার এই প্রশ্নটি উঠে আসছে। আঙ্গেলা ম্যার্কেল কোথায়? জার্মান প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত প্রায় দেড় বছর ধরে বলে চলেছেন যে, জার্মানিকে আরো দায়িত্ব নিতে হবে। এমন আহ্বান মোটেই জনপ্রিয় নয়। গোটা বিশ্বে জার্মানির ভূমিকার প্রশ্ন ও তার উত্তরের ক্ষেত্রে আঙ্গেলা ম্যার্কেলকে দেখা যাচ্ছে না।

গুরুত্বপূর্ণ এই সপ্তাহের শুরুতে আঙ্গেলা ম্যার্কেল আবার এমন একটি বাক্য বলেছেন, যেটি তিনি নিজেই বহুকাল শুনতে চাননি। ইউরো বিফল হলে ইউরোপও বিফল হবে। তবে তিনি এটা বলছেন না, কোন পর্যায়ে মুদ্রা হিসেবে ইউরোকে বিফল বলা যেতে পারে অথবা তার ওপর গ্রিসের আদৌ কোনো প্রভাব থাকবে কি না। তবে এই বাক্যের বিশাল গুরুত্ব রয়েছে। তাই আর রাখঢাক না করে প্রকাশ্যে আসা উচিত। বলা উচিত, এখানে অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি ও সবচেয়ে জনবহুল দেশের সরকারপ্রধান দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ইউরোপ যাতে বিফল না হয়, তা নিশ্চিত করতে তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন। সহযোগীদের সঙ্গে নিয়েই তিনি সেটা করবেন, তবে প্রয়োজনে নেতৃত্বের ভূমিকাও মেনে নেবেন, যদিও সেই ভূমিকা সব সময় জনপ্রিয় হবে না।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj