দুই মহিলা মন্ত্রী নিয়ে ইমেজ সংকটে মোদি

শনিবার, ২০ জুন ২০১৫

কাগজ ডেস্ক : বর্ষপূর্তির এক মাস না ঘুরতেই দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ মহিলা মন্ত্রীকে নিয়ে চরম অস্বস্তিতে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার। সুষমা স্বরাজের পর বসুন্ধরা রাজে। প্রথম ধাক্কাটা সামলে ওঠার আগেই ললিত মোদি বিতর্ক নয়া মোড় নিল গত মঙ্গলবার।

সরকার ও দলে ইমেজ সংকটে পড়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ললিত মোদির পক্ষ থেকে প্রকাশ করা কিছু নথিতে দাবি করা হলো, ২০১১ সালেই ললিতকে ব্রিটেনের অভিবাসনসংক্রান্ত আবেদনের বিষয়ে সাহায্য করতে রাজি ছিলেন সে সময় রাজস্থান বিধানসভার বিরোধী দলনেতার পদে থাকা বসুন্ধরা। শর্ত ছিল একটাই।

তার সমর্থনের কথা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো চলবে না। ললিত মোদির তরফে প্রকাশ করা নথিগুলোর মধ্যে রয়েছে তার সেই উইটনেস স্টেটমেন্টও। যদিও বসুন্ধরার দাবি, এমন কোনো বিবৃতির অস্তিত্ব তিনি জানেন না। কিন্তু গত মঙ্গলবার রাতে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ চ্যানেলকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ললিত মোদি দাবি করেন, বসুন্ধরা তার হয়ে সাক্ষ্যপত্রে সই করেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে লন্ডনের কোর্টে হাজির না হওয়ায় তা রেকর্ড হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি।

গত সোমবার ললিত মোদি টুইটারে দাবি করেছিলেন, বিস্ফোরক কিছু তথ্য প্রকাশ করতে চলেছেন তিনি। কিন্তু তার আইনজীবী মেহমুদ আবদির সংবাদ সম্মেলনে বিস্ফোরক কোনো তথ্য সামনে আসেনি। তবে তার পর তার আইনজীবী ও জনসংযোগ সংস্থা সংবাদমাধ্যমকে ২৫০ পাতার যে নথি পাঠায়, সেটাই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ওই নথির মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা রাজের একটি বিবৃতি। ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট ওই বিবৃতিতে বসুন্ধরা প্রথমেই বলেছেন, ললিত মোদির করা অভিবাসনসংক্রান্ত যেকোনো আবেদনের সমর্থনে আমি এই বিবৃতি দিচ্ছি। কিন্তু এই কঠোর শর্তসাপেক্ষে যে, আমার সাহায্যের কথা কোনোভাবেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষের গোচরে আনা হবে না। যে সময় এই বিবৃতি, সেটা আইপিএল কেলেঙ্কারি সামনে আসার বছর খানেক পর। ২০১০ সালে ইন্ডিয়ার জেরায় একবার মাত্র হাজিরা দিয়েই দেশ ছেড়েছেন বিদেশি অর্থ লেনদেন আইন লঙ্ঘন করায় অভিযুক্ত ললিত মোদি। ২০১১ সালের মার্চে তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করেছে ক্ষমতায় থাকা ইউপিএ সরকার। সেই অবস্থায় ললিত মোদিকে সমর্থন করা এবং তা নিয়ে এই লুকোচুরির শর্ত স্বাভাবিকভাবেই বিরাট বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইনের চোখে অভিযুক্ত এক নাগরিককে কী যুক্তিতে সাহায্য করতে রাজি হলেন বসুন্ধরা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বসুন্ধরা নিজে অবশ্য বলেন, আমি ওদের পরিবারকে অনেক দিন ধরে চিনি। কিন্তু আপনারা কোন নথির কথা বলছেন, আমি জানি না। আর বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছে, ওই বিবৃতি ভুয়ো। বসুন্ধরাকে বাঁচাতে তার দল দুটি যুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে। এক, ওই বিবৃতিতে বসুন্ধরার স্বাক্ষর নেই। আর দুই, সেটি অসম্পূর্ণ। বস্তুত, তিন পাতার ওই বিবৃতি আচমকাই শেষ হয়ে গেছে।

প্রথমে ললিত মোদিকে সমর্থনের শর্তের কথা জানানোর পর নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক কেরিয়ার নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন বসুন্ধরা। কিন্তু তার মাঝখানেই বিবৃতিটি শেষ হয়ে যায়। পরবর্তী পাতায় রয়েছে সম্পূর্ণ অন্য বিষয়। যার সঙ্গে বসুন্ধরার বক্তব্যের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে অন্য একটি সূত্রের পক্ষে সওয়াল করা হয়েছে, নথির যে প্রতিলিপি প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি ফাইল কপি। অর্থাৎ আইনজীবীরা নিজের কাছে যে কপিটি রেখে দেন। সেখানে সই না থাকলেও মূল যে কপিটি ব্রিটেনের কর্তৃপক্ষকে জমা দেয়া হয়েছে, সেটি স্বাক্ষরিত হওয়া সম্ভব। তা ছাড়া হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবেই সম্পূর্ণ বিবৃতিটি এখানে প্রকাশ করা হয়নি বলে মনে করছেন কেউ কেউ। বসুন্ধরার ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এমনও দাবি করেছে, রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী নাকি অভিযোগ করেছেন, অনুমতি না নিয়েই তাকে ব্যবহার করা হয়েছে। বিতর্কের অবশ্য এখানেই শেষ নয়। উইটনেস স্টেটমেন্ট নিয়ে চাপান-উতোরের মধ্যেই সামনে চলে আসে বসুন্ধরার একটি ই-মেইলও। সেটি ওই বিবৃতির প্রায় দুবছর পরের। ব্রিটেনে ললিত মোদির হয়ে কাজ করা আইন সংস্থাকে ২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ওই ই-মেলে বসুন্ধরা জানান, তিনি সাক্ষী দিতে ব্রিটেনে যেতে পারবেন না। গোপনীয়তার স্বার্থে ভিডিয়ো স্টেটমেন্টও দেবেন না। তার কথায়, আমার দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গত ২ ফেব্রুয়ারি রাজস্থানের রাজ্য সভাপতি হিসেবে আমাকে মনোনীত করেছেন। ভোটের প্রচারের বিষয়ে পরামর্শ নেয়ার জন্য দলীয় কর্মীদের আমাকে প্রয়োজন হবে। এই জরুরি সময়ে আমি রাজস্থানের বাইরে যেতে পারব না…বিষয়টির গোপনীয়তা এবং স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে আমাকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, ভিডিও লিঙ্কে আত্মপ্রকাশ করার ঝুঁকিও আমার এড়িয়ে চলা উচিত।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রবল রাজনৈতিক আক্রমণের মুখোমুখি বসুন্ধরা রাজে ও তার দল। কংগ্রেস তার বিরুদ্ধে প্রায় দেশদ্রোহের অভিযোগ এনেছে। দলের নেতা দ্বিগি¦জয় সিং মন্তব্য করেন, বসুন্ধরা রাজে এমন নির্বুদ্ধিতার কাজ করবেন, এটা আমরা আশা করিনি। একজন মুখ্যমন্ত্রী দেশের সরকারের কাছ থেকে তথ্য গোপন করতে চান। এই কি তার জাতীয়তাবাদ? সংযুক্ত জনতা দল নেতা কে সি ত্যাগী অভিযোগ করেছেন, বসুন্ধরার সঙ্গে ললিত মোদির সম্পর্ক সুবিদিত। এর আগে তিনি যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন রামবাগ প্যালেসে ললিত মোদি নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন ও জমির ডিল করতেন।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj