জি-৭ সম্মেলনে গুরুত্ব পেল ইউক্রেন-রাশিয়া প্রসঙ্গ

শনিবার, ১৩ জুন ২০১৫

কাগজ ডেস্ক : অনেক বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তবে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে প্রত্যাশিতভাবেই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ইউক্রেন ও রাশিয়া প্রসঙ্গ। বাভারিয়ায় শেষ হওয়া সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়েও কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এবারের জি-সেভেন সম্মেলনও পড়েছিল বিক্ষোভের মুখে। সাতটি শিল্পোন্নত দেশ বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিনিময় করে বড় বড় সমস্যা সমাধান করার অঙ্গীকার করলেও বিপুল অঙ্কের অর্থের অপচয় ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয় না। এমন ক্ষোভ থেকেই জি-সেভেনবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিলেন বিক্ষোভকারীরা। বাভারিয়ান শ্লস এলমাউয়ের সামনে সম্মেলনের প্রথম দিনে অনেকেই এসেছিলেন ‘জি-৭ নরকে যাও’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে। কিন্তু গত সোমবার সম্মেলনের শেষদিনে খুব একটা বিক্ষোভ দেখা যায়নি। কালো পোশাক পরা স্থানীয় এক বিক্ষোভকারী জানালেন, তার ধারণা, অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় ঘরে ফিরে গেছেন।

ইউক্রেন সংকটে ভূমিকার জন্য রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যে আলোচনা হবে এমন ইঙ্গিত আগেই পাওয়া গিয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার বলেছিলেন, ভøাদিমির পুতিন থাকতে রাশিয়া আর জি-৭-এ ফেরার যোগ্যতা রাখে বলে আমি মনে করি না। পুতিন ওখানে (জি-৭) এসে বসতে চাইলে কানাডা কঠোরভাবে বিরোধিতা করবে। রাশিয়াকে এখনই জি-সেভেনে ফেরানোর প্রস্তাব একেবারেই ওঠেনি বরং সম্মেলন শেষে সংবাদ সম্মেলনে আঙ্গেলা ম্যার্কেল জানিয়েছেন, ক্রাইমিয়া ‘দখল’ করে নেয়ায় রাশিয়ার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তা-ও বলবৎ থাকবে।

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইটালি, ফ্রান্স, জাপান এবং কানাডা। অর্থাৎ স্বাগতিক জার্মানি ছাড়া সম্মেলনের বাকি ছয় দেশের প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে অভিন্নমত ছিলেন।

চলতি শতক শেষ হওয়ার আগে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানোর মাধ্যমে বিশ্ব উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রির নিচে রাখার লক্ষ্যমাত্রাও স্থির করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে তেল, গ্যাস এবং কয়লার পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার বাড়াতে ১০০ বিলিয়ন ডলার (৯০ বিলিয়ন ইউরো) বরাদ্দের অঙ্গীকার আগেই করেছিল জি-৭। এ সম্মেলনেও সেই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অপুষ্টি আর ক্ষুধায় আক্রান্ত অন্তত ৫০ কোটি মানুষকে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত করার অঙ্গীকারের কথাও শোনা গেছে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে। ওবামা-ম্যার্কেলরা অবশ্য এই লক্ষ্য পূরণের জন্য অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দেননি।

জি-সেভেন সম্মেলনে ইউরোপীয় আধিপত্য : জার্মানিতে আয়োজিত জি-সেভেন শীর্ষ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার ক্ষেত্রে জোরালো সদিচ্ছা দেখিয়েছে বিশ্বের সাতটি শিল্পোন্নত দেশ। ইউরোপের অন্য সংকটও এবার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে ধারণা ক্রিস্টিয়ান ট্রিপের।

জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলার ক্ষেত্রে শিল্পোন্নত দেশগুলোর গোষ্ঠী জি-সেভেন এক যৌথ অবস্থান নিয়েছে। অতীতে এ ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তার প্রতি জোরালো সমর্থন দেখিয়েছে এই দেশগুলো। তবে চলতি শতাব্দীতেই পুরোপুরি কার্বন-বর্জিত জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা সত্যি উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের শেষে প্যারিসে যখন বিশ্ব জলবায়ু চুক্তি চূড়ান্ত হবে, তখন এই সাতটি গণতান্ত্রিক শিল্পোন্নত দেশের সদিচ্ছার জোর দেখতে পাওয়া যাবে। এগুলো সবই প্রতিশ্রæতি, যা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক স্তরে এই পরিবর্তন সত্যি কার্যকর হবে কি না, তা আমরা শিগগিরই জানতে পারব। কিন্তু তা সত্ত্বেও বলতে হয়, ফলাফল দেখা যাচ্ছে। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও এই সাতটি দেশ রাশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি সে দেশের আগ্রাসী নীতির বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়ন নয়, অন্য দেশগুলোর ওপরেও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ জুন মাসের পরেও বাড়ানোর জন্য চাপ বাড়বে।

অন্য কোনো জি-সেভেন সম্মেলনে ইউরোপের এমন আধিপত্য দেখা গেছে বলে মনে পড়ে না। অংশগ্রহণকারীদের তালিকার দিকে তাকালেই ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গির জোরালো প্রতিফলন বোঝা যায়। ৯ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৬ জনই ছিলেন হয় কোনো ইইউ রাষ্ট্র অথবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। এ ক্ষেত্রে জি-সেভেন গোষ্ঠীর সংস্কারের প্রশ্নও উঠতে পারে। অনেক বিষয়েরই শক্তিশালী ইউরোপীয় প্রেক্ষাপট ছিল। যেমন ইউরো এলাকার অমীমাংসিত ঋণ সংকট, গ্রিসকে ঘিরে সংকটের চূড়ান্ত ফয়সালা, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের সংকট, মধ্যপ্রাচ্যে রাষ্ট্রের ভাঙন ও আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধের ফলে ভূমধ্যসাগরে শরণার্থীর ঢল ইত্যাদি। শরণার্থী সংকটের বিষয়টি সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জাপানেরও বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। তবে ইউরোপের শরণার্থী ও অভিবাসন নীতির সঙ্গে তাদের নিজস্ব নীতির তেমন মিল নেই।

অর্থাৎ ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এবারের জি-সেভেন শীর্ষ সম্মেলন বেশ সফল বলা চলে। তবে এমন সম্মেলনকে ঘিরে এত বিশাল আয়োজন ও আধিক্য কমিয়ে ব্যয় সংকোচ করা যায়, সেই বার্তা অংশগ্রহণকারীদের কাছে পৌঁছেছে।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj