কানপাকা রোগের প্লাস্টিক সার্জারি

শুক্রবার, ১২ জুন ২০১৫

টিম্পানোপ্লাস্টির মূলত দুটি অংশ- এর একটি কানের পর্দা জোড়া লাগানো ও অপরটি অস্থি সংযোজন। আর এ কাজ দুটির সফল সমাধানের জন্য মধ্যকর্ণের যাবতীয় রোগজীবাণু নিখুঁতভাবে নির্মূল করা। কানের পর্দা জোড়া লাগাতে সাধারণত রোগীর নিজের শরীরের অর্থাৎ কানের পাশ থেকে এক ধরনের পাতলা টিস্যু বা কলা নেয়া হয় যাতে বলে টেম্পোরাল ফ্যাসা। এ ছাড়াও তরুনাস্থি বা তরুনাস্থির পাতলা আবরণ এ কাজে ব্যবহার করা হয়।

কানপাকা রোগের চিকিৎসায় বর্তমান বিশ্বে টিম্পানোপ্লাস্টি অতি পরিচিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। কানপাকা রোগীর কান থেকে পানি বা পুঁজ নির্গত হয়। কানের পর্দায় ছিদ্র থাকে এবং রোগীর শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়। ওষুধের দ্বারা অনেকের কান থেকে পুঁজ বা পানি নির্গত বন্ধ হয় বটে তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কানের পর্দার ছিদ্র স্থায়ীভাবে থেকে যায় এবং শ্রবণশক্তিও বেশ লোপ পায়। সংকটজনক কানপাকা রোগীর যদি সময়োপযোগী পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত চিকিৎসা করা হয় তবে এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বা এ রোগ আর দীর্ঘস্থায়ী কানপাকা রোগে রূপান্তরিত হতে পারে না। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী কানপাকা রোগ পুঁজ নির্গত একেবারে বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের কানের পর্দায় ছিদ্র থাকার কারণে মধ্যকর্ণ অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় থাকে এবং কোনো অবস্থায় পানি বা ঘাম কানের মধ্যে প্রবেশ করলে আবার পুঁজ পড়া আরম্ভ হয়। প্রতিবার প্রদাহে কানের সূ² সূ² কলা বা কোষসমূহ ক্ষয় হয়ে অপরিবর্তনশীল অবস্থায় চলে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে শ্রবণশক্তিও লোপ পেতে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা পথ খুঁজতে শুরু করলেন কিভাবে এ পথকে রুদ্ধ করা যায়। আর তাইতো টিম্পানোপ্লাস্টির আবির্ভাব। টিম্পানোপ্লাস্টি এমন একটি অপারেশন পদ্ধতি যা কিনা মধ্যকর্ণের সব রোগাক্রান্ত কলা বা কোষসমূহ নির্মূল করে যথাসম্ভব পুনরায় সেগুলো পুনঃস্থাপন করে কানের কার্যকারিতা সহনীয় এবং কার্যকরী পর্যায়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।

টিম্পানোপ্লাস্টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অতি পুরনো। তবে এর সূ² কার্যপদ্ধতি ও ফলাফল নির্ভর করে মধ্যকর্ণের অপরিবর্তনশীল রোগের চিকিৎসা ও নির্মূল করার ওপর। এ পদ্ধতির সংযোজনায় রোগ হয়েছে অপারেটিং মাইক্রোস্কোপ। অপারেটিং মাইক্রোস্কোপ এ কাজের সূ²তা বাড়িয়েছে এবং অতি নির্ভুলভাবে রোগীর হারানো কানের পর্দার সফল প্রতিস্থাপন এবং অস্থি সংযোজনের সুযোগ করে দিয়েছে। যার ফলে রোগীর আর কান থেকে পুঁজ বা পানি জাতীয় পদার্থ বের হয় না এবং শ্রবণশক্তি পূর্বের মতো কিংবা কার্যোপযোগী করা সম্ভব হয়। পুঁজ বা পানি জাতীয় পদার্থ নির্গত বন্ধ হলে কানের প্রদাহ থাকে না আর কানের প্রদাহ না থাকলে কানের ভয়াবহ জটিলতা বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও থাকে না।

টিম্পানোপ্লাস্টি বা পুনর্গঠন অপারেশন করতে কাঠামোগত দিক থেকে মূলত নিম্নের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ বা অঙ্গের প্রয়োজন হয়।

১. একটি স্বাভাবিক কানের পর্দা।

২. এ পর্দার সঙ্গে সচল বা গতিময় কানের অস্থির পূর্ণ, আংশিক কিংবা কোনো প্রস্থেটিক অস্থির চেইনের সঠিক সংযোগ।

৩. পর্দা এমনভাবে বসাতে হবে যাতে করে রাউন্ড উইন্ডোকে প্রত্যক্ষ শব্দ থেকে রক্ষা করতে পারে।

৪. পর্দা যেন স্বাভাবিকভাবে বাতাস ভর্তি মধ্যকর্ণকে পরিবেষ্টিত করে রাখে। এ বাতাস শ্রæতিনালীর বা ইস্টাশিয়ান টিউবের মধ্য দিয়ে এমনভাবে প্রতিস্থাপন হয় যাতে বায়ুমণ্ডলের বাতাসের চাপ এবং মধ্যকর্ণের বাতাসের চাপের সামঞ্জস্য বজায় থাকে।

টিম্পানোপ্লাস্টির মূলত দুটি অংশ- এর একটি কানের পর্দা জোড়া লাগানো ও অপরটি অস্থি সংযোজন। আর এ কাজ দুটির সফল সমাধানের জন্য মধ্যকর্ণের যাবতীয় রোগজীবাণু নিখুঁতভাবে নির্মূল করা। কানের পর্দা জোড়া লাগাতে সাধারণত রোগীর নিজের শরীরের অর্থাৎ কানের পাশ থেকে এক ধরনের পাতলা টিস্যু বা কলা নেয়া হয় যাতে বলে টেম্পোরাল ফ্যাসা। এ ছাড়াও তরুনাস্থি বা তরুনাস্থির পাতলা আবরণ এ কাজে ব্যবহার করা হয়। অস্থি সংযোজনের জন্য তরুনাস্থি শরীরের অন্যান্য অংশের অস্থি সুন্দর করে আবার কানের অস্থির মতো বানিয়ে পর্দা ও অন্যান্য ধ্বংসপ্রাপ্ত অস্থির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হয়। রোগীর শরীর থেকে এমতাবস্থায় অস্থি না পাওয়া গেলে অন্য মানুষের শরীর থেকেও নেয়া যেতে পারে। এ ছাড়াও অনেক ক্ষেত্রে একেবারে বানানো কানের অস্থির মডেল যা বাজারে সহজলভ্য সেটা লাগিয়ে দেয়া হয়। এগুলো সোনা বা প্লাটিনামের তৈরি জিনিস হয়ে থাকে।

কানের পর্দা লাগানো বা অস্থি সংযোজনের পূর্ব শর্ত :

১. কানের প্রদাহকে নিয়ন্ত্রণে আনা।

২. মধ্যকর্ণকে শুকনা করা।

এ অবস্থায় পুনর্গঠন অপারেশনের ফলাফল খুবই ভালো এবং উপরোক্ত বিষয় দীর্ঘমেয়াদি কানপাকা রোগের চিকিৎসায় বিষদ আলোচনা করা হয়েছে।

টিম্পানোপ্লাস্টি অপারেশনের সুবিধা :

১. কান থেকে পুঁজ পড়া বন্ধ করা।

২. শ্রবণশক্তি প্রায় পূর্বের অবস্থায় বা কার্যোপযোগী করা।

৩. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্রতিরোধ করা।

৪. সাঁতারুদের আগের মতো সাঁতার কাটানোর সুযোগ করে দেয়া।

৫. বিভিন্ন পেশাগত চাকরির সুযোগ করে দেয়া যেমন- সামরিক, নৌ, বিমান, পুলিশ, বিডিআর ইত্যাদি।

৬. সর্বোপরি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।

অতএব শ্রবণশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পাওয়ার আগে কিংবা কানপাকা রোগের জন্য একজন অভিজ্ঞ ইএনটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। অকালে বধিরতার হাত থেকে নিজেকে, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, সমাজ ও দেশের সব কানপাকা রোগীদের রক্ষা করুন।

অধ্যাপক মেজর (অব.) মোঃ আশরাফুল ইসলাম

এফসিপিএস এফআইসিএস

নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞ ও বিভাগীয় প্রধান

ইএনটি-হেড ও নেক সার্জারি বিভাগ,

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj