বিশেষ সংখ্যা : ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর ও বাংলাদশেরে প্রত্যাশা

রবিবার, ৭ জুন ২০১৫

গত ৫ জুন, শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফর ও বাংলাদেশের প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ভোরের কাগজ ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি যৌথ উদ্যোগে বৈঠকটির আয়োজন করে। ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তের সঞ্চালনায় বৈঠকের শুরুতেই মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহম্মেদ চৌধুরী কিরণ। গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেয়া আলোচকদের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অংশ দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের বিশেষ সংখ্যা।

শাহরিয়ার আলম

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিকে যারা গোলামি চুক্তি বলত তারাই এখন এ চুক্তি বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন বলে মায়াকান্না করেছে। দীর্ঘ ৪০ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সেটি বাস্তবায়নের পথে। আমরা যে কানেকটিভিটির কথা বলছি, সে ক্ষেত্রে ভিসা সহজ করা গুরুত্বপূর্ণ। মোদির এ সফর দ্বিপক্ষীয় রাষ্ট্রীয় সফর। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট এজেন্ডার কথা কেন বলা হচ্ছে? সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হবে। আর ভারত এখন বিগ ব্রাদার হিসেবে নয়, পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। তাই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে প্রতিবেশী দেশ দুটির সম্পর্ক নিয়ে সস্তা রাজনীতি করা উচিত নয়। ছিটমহল বিনিময়ের কারণে বাংলাদেশের নিট অর্জন হবে ৯ হাজার ৭৪৩ একর জমি। এই জমি ভারত পেলেই বলা হতো দেশ বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ শনিবার ঢাকায় আসছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও একই বার্তা নিয়ে তাকে ঢাকায় স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পে একটিও বিদেশি পয়সা নেই। বাংলাদেশের মানুষের শ্রমের টাকায় এই সেতু নির্মাণ হচ্ছে। তিনি উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থার যুগে বাণিজ্য ইস্যুতে চীনকে না টানার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বিশ্ব বাজারে চীন এগিয়ে আছে। তাই বলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় ইস্যুতে তা উদ্বেগের ইস্যু নয়। এই ৩৭ হাজার জনগোষ্ঠী এদেশের নাগরিক হওয়ার পর মুহূর্ত থেকে সব সুবিধা পাবে। আর ওই ২০০ কোটি টাকা জরুরি সহায়তা হিসেবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী

রাষ্ট্রদূত

দেশ ভাগের ৬৮ বছর আর ঐতিহাসিক মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির ৪১ বছর পর ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে মোদি বাংলাদেশে আসছেন। ভারতের পার্লামেন্টে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসকে অনেক বড় সাফল্য উল্লেখ করে। এর মাধ্যমে ছিটমহল আদান-প্রদান ছাড়াও অপদখলীয় জমি নিয়ে বিরোধের অবসান এবং ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার অচিহ্নিত সীমানা নির্ধারণ সম্ভব হতে যাচ্ছে। দিল্লির মসনদে বসার পর স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের সমস্যার সুরাহা করেই ঢাকায় আসবেন বলেছিলেন মোদি। সেটি করেই তিনি আসছেন, এ জন্য সাধুবাদ জানাই। মোদির সফরে তিস্তাসহ অমীমাংসিত ইস্যুতে কথা হবে জানিয়ে বলেন, ক‚টনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আলোচনার মাধ্যমেই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে। তবে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের জন্য সমন্বিত সংলাপ দরকার। প্রতিবেশীকে দুর্বল রেখে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। শেখ হাসিনার সরকার ভারতের উদ্বেগের ইস্যু সন্ত্রাস দমন করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে এনেছে। আলোচনার মাধ্যমে ঝুলন্ত ইস্যুগুলোর সমাধান করে দুদেশ একসঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা করি।

এম জে আকবর

বিজেপি সরকারের মুখপাত্র

৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সফর করছি। ৪০ বছর পর স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পথে। এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে এ বিষয়ে যে চুক্তি হবে সেটিও আমি ঐতিহাসিক মনে করি। একাত্তরে দুদেশের সম্পর্কে প্রথম ভিত্তি রচিত হয়েছিল। মোদির সফরকালে এই চুক্তি হবে দ্বিতীয় ভিত্তি।

বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মানুষের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। এ কারণেই ভারতের পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে এমন একটি বিল পাস হলো। এটি সে দেশের জনগণের ইচ্ছারই প্রতিফলন- যা এই শতকের একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। মোদির বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুণাবলির কথা তুলে ধরে বলেন, রাজ ও রাজনীতির দ্ব›েদ্বর কারণে গত ৪০ বছরে যা হয়নি তা এক বছরের মধ্যে করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সবার কথা শুনে ও বুঝে নিজের সিদ্ধান্ত নেন। আর যে সিদ্ধান্ত নেন সেটি বাস্তবায়নেও তিনি বদ্ধপরিকর। মোদি রাজনীতির আগে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জন্মদিনের উৎসব নয়, যে কেক খেয়ে চলে গেলাম। এটি টেকসই সম্পর্কে নিয়ে যেতে হয় সমমর্যাদার ভিত্তিতে। আর এ ব্যাপারে মোদির অবস্থান স্পষ্ট। তিনি কাজে বিশ্বাসী। আর এ কারণেই তার পররাষ্ট্র নীতিতে অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন থাকে।

মোদি দক্ষিণ এশিয়ার ট্র্যাজেডি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে অর্থনৈতিক রেনেসাঁ আনতে চান। আর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পাশে চান। বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো মুসলিম রাষ্ট্র নয়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। আর সন্ত্রাস দমনে বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি। মোদির সফরের মধ্য দিয়ে সেই শুভযাত্রা শুরু হবে।

ইনাম আহমেদ চৌধুরী

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা

মোদির সফরকে দলমত-নির্বিশেষে সকলের স্বাগত জানানোর বিষয়টিকে বড় রকমের ঘটনা। মোদির সফর বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময়। তাই আমাদের নির্ধারণ করতে হবে এ সফরকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করব। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ন্যায্য সুবিধা যেন পাই। দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্কের পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে হবে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক মর্যাদাপূর্ণও হতে হবে। নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে সীমান্তে আর কোনো হত্যা হবে কি হবে না। একই সঙ্গে বাণিজ্য নীতি নির্ধারণ করাটাও জরুরি। দেশের জনগণের মধ্যে যে আশার সৃষ্টি হয়েছে তা বাস্তবে রূপ নেবে। পানি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভারতের সঙ্গে আমাদের অভিন্ন ৫৪টি নদী রয়েছে। গত ৪৫ বছরে কেবল একটি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি হয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আশা করব, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে তিস্তা চুক্তি সই হবে। এছাড়া অন্য আরো ৫২ নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দুদেশের মধ্যে সমঝোতা হবে বলেও আশা রাখছি।

রাশেদ আহমেদ চৌধুরী

সাবেক রাষ্ট্রদূত

ইতিহাসে দেখা গেছে, দ্বিপক্ষীয় ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক পর্যায় থেকে এসেছে। এবার দুদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে আমরা শক্তিশালী রাজনৈতিক এজেন্ডা আশা করছি। নরেন্দ্র মোদির কাছে আমাদের প্রত্যাশা বেশি।

বলা যায়, এটি একটি ইউনিক টাইম। আমরা এশিয়ার শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে। এখন সরকারে সরকারে নয়, মানুষে মানুষে যোগাযোগের যুগ। আর এ কারণেই এদেশের জনগণ আশা করছে, মোদির সফরে তিস্তা চুক্তি সই না হলেও এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট সমঝোতার বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারলে প্রকৃত পক্ষে এই সফরকে আমরা কাজে লাগাতে পারব বলে আশা করি। তাহলেই জনগণ যে স্বপ্ন দেখেছে তা বাস্তবায়ন হবে।

হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

ভারতের পার্লামেন্টে সীমান্ত চুক্তি বিলটি সর্বসম্মতভাবে পাসের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও বিরোধীদলীয় নেত্রী সোনিয়া গান্ধী যেভাবে ঐকমত্য পোষণ করেন তা আমাদের দেশের রাজনীতির জন্য শিক্ষণীয়। যার ফলে এই সীমান্ত বিল পাসের মাধ্যমে আত্মপরিচয়হীন ছিটমহলবাসী আপন ঠিকানা খুঁজে পাবে। নাম পরিচয়ে যাদের মিথ্যা দিয়ে জন্ম ছিল এখন তাদের কষ্টের ও দীর্ঘশ্বাসের অবসান হবে। মানুষ হিসেবে ফিরে পাবে জাতীয় মর্যাদা। উন্নয়নের মূল স্রোত ধারায় ফিরে আসতে সক্ষম হবে তারা।

সীমান্ত ও পানি চুক্তির পাশাপাশি দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর মধ্যে একটা প্যাকেজ চুক্তি হওয়া দরকার। যাতে সামগ্রিকভাবে ট্রানজিট, সংযোগ, বিনিয়োগ, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, ভিসা ব্যবস্থা সহজীকরণ, বাস চলাচল চুক্তি ও বাণিজ্যিক সম্পর্কসহ সব কিছু স্থান পাবে। দুদেশের মধ্যে সব ইস্যুতে উইউ উইন অবস্থা যাতে বজায় থাকে সে জন্য সবাইকে সচেষ্ট হওয়া দরকার। একই সঙ্গে কোনো প্রকার রাজনৈতিক অস্থিরতা যাতে কারো অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। গঙ্গা চুক্তির মতো তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে স্থায়ী ব্যবস্থা থাকা দরকার। সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গিবাদের বিস্তার রোধে সুষ্ঠু স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমুন্নত রাখতে দুদেশকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় আনার প্রতিশ্রæতি কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।

শ্যামল দত্ত

সম্পাদক, ভোরের কাগজ

ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের পর মোদি সেটিকে বার্লিন ওয়াল পতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। একইভাবে যেন বিদ্যমান অনিষ্পন্ন ইস্যুগুলোর সমাধান করে দুদেশ সমান তালে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

আমরা আশা করব, নরেন্দ্র মোদির এ সফর গতানুগতিক কোনো সফর না হয়। এই সফরকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের জনগণের জন্য কল্যাণকর কিছু হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মোফাজ্জল করিম

সাবেক সচিব ও ক‚টনীতিক

মোদির সফরে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে। নরেন্দ্র মোদির লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার অবিসংবাদিত নেতৃত্ব। একই সঙ্গে বিশ্ব নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তিনি শক্ত অবস্থানে যেতে চান। আর এ কারণেই সুযোগ্য প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করতে চান।

ভারত দাদাগিরি নয়, ভাইয়ের সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়- ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সাম্প্রতিক এমন বক্তব্যকে স্বাগত জানান। আমরা ভারতের সত্যিকারের ভাই হতে চাই, সৎ ভাই নয়।

এই ভাইয়ের সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে গলার কাঁটা হয়ে থাকা তিস্তা নদীসহ সব অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসারে হওয়া এবং সীমান্ত হত্যা একেবারে বন্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এবার মমতাময়ী হয়ে এবারের সফরে আসবেন বলেও প্রত্যাশা। মমতার সম্মতি থাকলে মোদি হয় তো বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা চুক্তি সইয়ের ব্যাপারে চমক দেখাতে পারবেন।

এম শফিউল্লাহ

সাবেক রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিক। তাই মোদির সফরকে কেন্দ্র করে দেশের মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ভারতের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিস্তা বা ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি ভারত জানে না, সেটি আমাদের ব্যর্থতা। বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে নরেন্দ্র মোদিকে সরজমিন পরিদর্শন করাতে পারলে বোঝানো যেত তিস্তা এবং ফারাক্কা চুক্তির কারণে আমাদের কি প্রভাব পড়েছে। তাই আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে ভারত কখনো তাদের স্বার্থ ছাড়া কোনো চুক্তি করে না। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সফরে স্থলসীমান্ত চুক্তি হলে তা হবে নিঃসন্দেহে চমক। এটা দুদেশের সম্পর্ককে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে। তবে সম্পর্ক উন্নয়নে দুদেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের মধ্যেও পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ জরুরি। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এটি হলে দুদেশের মধ্যে ৬৮ বছর ধরে জিইয়ে থাকা বড় একটি সমস্যার সমাধান হবে।

দেবদ্বীপ পুরোহিত

সাংবাদিক, টেলিগ্রাফ

মোদির ঢাকা সফরে জন প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে এমনটাই আশা করি। একজন সাংবাদিক হিসেবে বলি, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ইন্ডিয়াকে যতটা কাভারেজ দেয়া হয়, ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে তার অর্ধেকও প্রাধান্য পায় না। ফলে বাঙালি যেভাবে ভারতকে চিনে বা জানে, ইন্ডিয়ানরা বাংলাদেশ সম্পর্কে তার কিছুই জানে না। আমি বাংলাদেশের মানুষের ভারতের প্রতি আগ্রহ দেখে অবাক হয়েছি। আমাদের দেশের নির্বাচন, আমার মতে, ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো বেশি লেখালেখি হওয়া উচিত। আর সে ক্ষেত্রে সত্যি চিত্রটা আসা উচিত। তাহলেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো ভালো হবে। আমি বাংলাদেশকে সাধারণ মানুষের চোখে দেখেছি।

মো. মঈনুল হক

সভাপতি, বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি (বাংলাদেশ ইউনিট)

৬৮ বছরের বন্দি জীবন থেকে যারা আমাদের মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছে, আমাদের কথা যারা ভেবেছ তাদের অবশ্যই ধন্যবাদ জানাই। দুদেশ একত্রে আমাদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছে বলেই আমরা আজ পরিত্রাণ পাচ্ছি। তবে এ বন্দি জীবন থেকে পরিত্রাণের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য ভারতের ছিটমহলে কমসংখ্যক লোকের জন্য ৩ হাজার ১০ কোটি টাকার প্যাকেজের বরাদ্দ হলেও বাংলাদেশের ছিটমহলের ৩৭ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম বরাদ্দ।

শুভজিৎ বাগচী

ব্যুরো চিফ, দি হিন্দু (কলকাতা)

স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হওয়াটা একটি বিরাট সাফল্য। এতে করে ছিটমহলগুলোর ৫২ হাজার মানুষের দুর্দশার অবসান ঘটবে। কারণ সেখানে জমি, জন্ম এবং মৃত্যু এর কিছুই রেজিস্ট্রি হয় না। এই চুক্তিটা হলে তাদের জন্য অনেক বড় একটি সফলতা হবে। আমি নিজে ছিটমহলের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। তাদের সঙ্গে থেকে দেখেছি কতটা দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। কোনো নারী যদি সন্তান প্রসবের জন্য সেখানের হাসপাতালে ভর্তি হয়, তবে সে নিজের স্বামীর নাম ব্যবহার করতে পারে না। তাকে ভারতের কোনো নাম ব্যবহার করতে হয়। যা খুবই দুঃখজনক। এরপর ভাসমান এসব মানুষ একবার এপারে আবার ওপারে জীবনাযাপন করে। এক লোককে দেখেছি তার স্ত্রী-সন্তানসহ কোনোভাবেই ভারতে প্রবেশ করতে পারছে না। এ দেশ-ওদেশ করে অবশেষে ৩ মাস জেল খেটে বাংলাদেশে ফিরে আসে। ছিটমহলবাসীদের অধিকাংশেরই এই অবস্থা আমি নিজে দেখেছি। আমার বিভিন্ন লেখায় এসব আমি প্রকাশ করেছি।

গোলাম মোস্তফা

ছিটমহল প্রতিনিধি

এতদিন আমরা ছিটমহলবাসীরা মানবেতর জীবনযাপন করেছি। আমরা দুদেশের ছিটমহলবাসী অনেক কষ্টে এক হয়ে এক এবং অভিন্ন স্লোগান দিয়েছি। আশা করি, ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে দুদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো দৃঢ় হবে।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj