ভারতে নাবালিকাদের গর্ভপাতের হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে

শনিবার, ৩০ মে ২০১৫

কাগজ ডেস্ক : নাবালিকা বা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের মধ্যে গর্ভপাতের হার ভারতে প্রতি বছর যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, জনসংখ্যা বা আর্থসামাজিক নিরিখে তার ভালো বা মন্দদিক নিয়ে সমাজের বিভিন্ন মহলে চলছে চিন্তা-ভাবনা।

নাবালিকাদের গর্ভপাত ভারতে প্রায় শোনাই যেত না। অবিবাহিতদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক আজো পরিবারে বা লোকসমাজে নিষিদ্ধ বলেই গণ্য করা হয়। তবু আমাদের দেশে সেটাই ঘটছে। সমাজের রক্তচক্ষুর পরোয়া না করেই অবাধে তা ঘটছে। কারণ সময় বদলাচ্ছে। কম বয়সী ছেলেমেয়েদের দৃষ্টি বদলাচ্ছে। ছেলেবন্ধুদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশার সুযোগ বাড়ছে। বয়ঃসন্ধিকালে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের মধ্যে যৌনতা নিয়ে দুর্নিবার কৌত‚হল জমে ওঠে শারীরবৃত্তীয় কারণেই।

আজকাল গর্ভসঞ্চারের ভয় অনেকটাই কেটে যাচ্ছে। শহুরে মেয়েরা একা একাই বিউটি পার্লারে যাওয়ার মতো সহজেই চলে যায় গর্ভনিরোধক সরঞ্জাম কিনতে কিংবা দরকার হলে ক্লিনিকে গর্ভপাত করাতে। এ ছাড়া যৌনমিলনের ঠিক পরে অথবা গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়ে গর্ভপাতের প্রয়োজন হলে বাজারে কিনতে পাওয়া যায় গর্ভপাতের পিল, তাই ইচ্ছামতো খেলেই হলো। অবশ্য ‘কেস’ জটিল হয়ে উঠলে তারা ছুটে যায় হাসপাতালে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং হাতুড়ে বা আনাড়ি ডাক্তার দিয়ে গর্ভপাত করাতে গিয়ে ভারতে প্রতি তিন ঘণ্টায় মারা যায় একটি মেয়ে।

একটা সমীক্ষাপত্রে পড়ছিলাম, গত বছর ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে গর্ভপাতের হার বেড়েছে ৬৭ শতাংশ। যে সাতটি রাজ্যে নাবালিকাদের মধ্যে গর্ভপাত উদ্বেগজনক, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গও আছে। এই অবাঞ্ছিত গর্ভপাতের পরিণাম কী? কতটা শুভ, কতটা অশুভ?

আমার তো মনে হয়, এর ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে। সন্তানের জন্মদান নাবালিকা মেয়েদের স্রেফ স্বাস্থ্য সমস্যাই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর আর্থসামাজিক ও ভারতের মতো জনবহুল দেশের ওপর তার গভীর অভিঘাত।

বলা হচ্ছে, ভারতের মতো দেশে মেয়েদের বিয়ের বয়স যদি ন্যূনতম ২০ বছর করা হয়, তাহলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। সম্ভবত সেই কারণে সরকার অবাঞ্ছিত গর্ভপাতের খুব একটা বিরোধী নয়। যদিও সরকার গর্ভবতী নারী বিশেষ করে নাবালিকা মেয়েদের যথেষ্ট গর্ভপাত রুখতে ২০০২ সালে সংশোধিত গর্ভপাতবিরোধী মেডিকেল টার্মিনেশন অব প্রেগনেন্সি আইন পাস করেছেন। একমাত্র জম্মু-কাশ্মির ছাড়া গোটা ভারতেই তা প্রযোজ্য। তাতে কিছু কিছু ক্ষেত্রকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। যেমন জীবন সংশয় দেখা দিলে যে কোনো মেয়েদের গর্ভপাত বৈধ, তবে তা করাতে হবে রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তার বা হাসপাতালে। মেয়েটি নাবালিকা হলে বাবা-মায়ের লিখিত অনুমতি লাগবে। ধর্ষণজনিত কারণে গর্ভপাতও বৈধ।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এই অবাঞ্ছিত গর্ভপাতের যুক্তিসঙ্গত সমাধান কী? আমি তো মনে করি, বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, অবিলম্বে স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে বিজ্ঞানভিত্তিক যৌনশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিয়ের ন্যূনতম বয়সসীমা বাড়ানো। যদিও জানি, এখানেও সমাজের বাধা। স্কুল- কলেজে যৌনশিক্ষা দিলে দেশটা নাকি গোল্লায় যাবে। এও জানি, অশিক্ষা ও দারিদ্র্যের কারণে আজো গ্রাম-গঞ্জে বাল্যবিবাহ এমনকি মেয়ে ঋতুমতী হওয়ার আগেই বিয়ে দেয়া বন্ধ করা যায়নি।

ফলে মা জন্ম দেয় হয় মৃত শিশুর, না হয় রুগ্ণ, বিকলাঙ্গ বা জড় বুদ্ধি শিশুর। ভেঙে পড়ে নাবালিকা মায়ের স্বাস্থ্য। দেখা গেছে, প্রায় ১৪ শতাংশ শিশুর জন্ম দেয় নাবালিকা মায়েরা। সেখানে মায়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ধর্তব্যের মধ্যেই নেয়া হয় না, সামাজিক রীতির নামে এটা সমাজের যথেচ্ছার ছাড়া আর কী? পশ্চিমা দেশগুলোতে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মেলামেশা অনেক বেশি অবাধ হওয়ায় কি সেখানে গর্ভপাতের হার এত বেশি?

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj