বাফুফের জমকালো অ্যাওয়ার্ড নাইট

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০১৫

দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছেন যে ক্রীড়াঙ্গনে খেলোয়াড় কর্মকর্তা কোচ পৃষ্ঠপোষক সবাইকে নিয়ে ক্ষণিকের আনন্দে মতোয়ারা হলেও বোধ হয় মন্দ হয় না। সেই উপলদ্ধি থেকেই পাঁচ বছর বেশ কৃতিত্বের সঙ্গে বাফুফে অ্যাওয়ার্ড নাইট উৎযাপন করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। ২০০৯ সালে প্রথম বাফুফে অ্যাওয়ার্ড রজনী পালিত হলেও মাঝে কেটে গেছে পাঁচটি বছর। এমনটি আর হবে না বলে জানিয়েছেন বাফুফের সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুস সালাম মুশের্দী। এখন থেকে প্রতি বছর বাফুফে অ্যাওয়ার্ড রজনী পালিত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ঘরোয়া ফুটবলে ২০১৪ সালে নান্দনিক নৈপূর্ন্য প্রদর্শনের কারণে শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাব লিমিটেডের মামুনুল ইসলাম সেরা খেলোয়াড় এবং উঠতি খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন মোহামেডানের হেমন্ত বিশ্বাস, মেয়েদের মধ্যে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন সাবিনা খাতুন এবং উঠতি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন সানজিদা আক্তার। এবারই মিডিয়াকর্মীদের ভোটে সেরা খেলোয়াড় এবং উঠতি খেলোয়াড়দের পুরস্কার দেয়ার নতুন নিয়মটি চালু করেছে বাফুফে।

অ্যাওয়ার্ড নাইট উপলক্ষ্যে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনের অডিটরিয়ামে বসেছিল বর্তমান এবং সাবেক ফুটবলারদের মিলনমেলা। অডিটরিয়ামে উপস্থিত সবার নজর ছিল ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত তারকাদের দিকে। চার ফুটবলার ছাড়াও এবার আরো একটি নতুন পুরস্কার প্রবর্তন করেছে বাফুফে। আর তা হচ্ছে সেরা ডিএফএ পুরস্কার। এবার এ পুরস্কার পেয়েছে সাতক্ষীরা জেলা। এএফসি সার্ভিস সিলভার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন আব্দুস সালাম মুর্শেদী। পাঁচ বছরে প্রায় ষাটটি পুরস্কার জমা পড়েছিল বাফুফের কাছে। আর এই ট্রফিগুলো তুলে দিতেই বাফুফে আয়োজন করেছে অ্যাওয়ার্ড রজনী। জমকালো আয়োজনে পুরস্কার প্রদানের ফাঁকে ফাঁকে ছিল নাচ গানের আয়োজন। পুরুষ ও নারী জাতীয় ফুটবল দলকে মঞ্চে তুলে অনুষ্ঠানের শুরু করা হয়। জাতীয় ফুটবল দল যেন বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে এবং প্রীতি ম্যাচে সিঙ্গাপুর এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে ভালো খেলতে পারে সেই জন্যে সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন আবব্দুস সালাম মুশের্দী। আঁখি আলমগীর, পারভেজ চৌধুরী, আরেফিন রুমি ও কর্নিয়ার সঙ্গীত পরিবেশন সবাইকে মুগ্ধ করেছে। গানের মাঝে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাফুফের বিভিন্ন কার্যকলাপের ওপর ভিত্তি করে অডিও ভিজ্যুয়াল প্রদর্শন করা হয়। গত ছয় বছরে বাফুফে আয়োজিত বিভিন্ন ঘরোয়া লিগের চ্যাম্পিয়ন, রানার্সআপ, সেরা গোলদাতা ও ফেয়ার প্লে ট্রফি দেয়া হয়। ২০০৯ সালে লিগে সেরা গোলদাতা হয়েছেন স্ট্রাইকার এনামুল হক। ঢাকা আবাহনীর জার্সি গায়ে এনামুল হক দুটি হ্যাটট্রিকসহ করেছিলেন ২১ গোল। ২০১০ সালের লিগে ১৬ গোল করে সেরা গোলদাতা হয়েছেন মিঠুন চৌধুরী। ২০১৩-১৪ মৌসুমে মোহামেডানের হয়ে ১৫ গোল করে সেরা গোলদাতা হয়েছেন ওয়াহেদ আহমেদ। পুরস্কার নিতে মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার ফ্লাসগুলো বারবার তার দিকেই পড়ে। জাতীয় দলের অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম বর্ষসেরা ফুটবলার নির্বাচিত হলে তার সাফল্যের সাক্ষী হতে ক্যাম্প থেকে আসেন জাতীয় দলের ফুটবলাররা। আসেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের ডাচ কোচ লোডভিক ডি ক্রুইফ। তবে ২০০৯ সালের পর অনুষ্ঠিত বাফুফে অ্যাওয়ার্ড রজনীতে উপস্থিত ছিলেন না বাফুফের সভাপতি কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠানে আসেননি তিনি।

এবার অ্যাওয়ার্ড নাইটে জুনিয়র ডিভিশন থেকে শুরু করে তৃতীয় বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, প্রথম বিভাগ এবং পেশাদার লিগের পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে নতুন পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। ঢাকার বাইরের তিন ভেন্যু সকার ক্লাব ফেনী, চট্টগ্রাম আবাহনী ও মুক্তিযোদ্ধাকে যথাক্রমে ২০১০-১১, ২০১১-১২, ২০১২-১৩ মৌসুমে বেস্ট ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট দল হিসেবে পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। ২০১৩-১৪ মৌসুমে বেস্ট ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট দল নির্বাচিত হয় ঢাকা মোহামেডান। গ্রামীণফোন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ২০১০-এর বেস্ট ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দল হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে চট্টগ্রাম আবাহনী। এ মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতার অ্যাওয়ার্ডটি পেয়েছেন মিঠুন চৌধুরী। সেবার তিনি করেছিলেন ১৬টি গোল। ২০১০-এর রানার্সআপ দল মুক্তিযোদ্ধা এবং চ্যাম্পিয়ন শেখ জামালকে দেয়া হয় অ্যাওয়ার্ড। ২০১১-১২ মৌসুমে গ্রামীণফোন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলে ফেয়ার প্লে ট্রফি জিতেছে আরামবাগ ক্রীড়া চক্র, বেস্ট ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দলের পুরস্কার লাভ করেছে ফেনী সকার, চ্যাম্পিয়ন ঢাকা আবাহনী এবং রানার্সআপ মুক্তিযোদ্ধার কর্মকর্তাদের হাতে অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। ২০১২-১৩ মৌসুমে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ফেয়ার প্লে ট্রফি জিতেছে বিজেএমসি। সেরা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের অ্যাওয়ার্ড পায় মুক্তিযোদ্ধা। আর চ্যাম্পিয়ন শেখ রাসেল ও রানার্সআপ শেখ জামালের কর্মকর্তাদের হাতে ট্রফি দেয়া হয়। সর্বশেষ ২০১৩-১৪ মৌসুমের ফেয়ার প্লে ট্রফি পেয়েছে ব্রাদার্স ইউনিয়ন। এবার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্রথম পর্বে গোপীবাদের ব্রাদার্স ইউনিয়ন শক্তিধর ঢাকা আবাহনী, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রকে টেক্কা দিয়ে পয়েন্ট টেবিলে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। গোল গড়ে পিছিয়ে না থাকলে দ্বিতীয় স্থানে থাকত দলটি। ২০১৩-১৪ মৌসুমে সেরা গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন ওয়াহেদ আহমেদ। মোহামেডানের জার্সি গায়ে গতবার তিনি গোল করেছিলেন ১৫টি। এবার ঢাকা আবাহনীতে খেলছেন ওয়াহেদ। গতবারের চ্যাম্পিয়ন শেখ জামাল ও রানার্সআপ আবাহনীর কর্মকর্তাদের হাতে ট্রফি দেয়া হয়। ২০১৩-১৪ মৌসুমে বেস্ট ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দলের পুরস্কার লাভ করেছে মোহামেডান। জমকালো বাফুফে অ্যাওয়ার্ড নাইট অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা, বাফুফের সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগ, বাফুফের সদস্য শেখ মোহাম্মদ মারুফ হাসান, সত্যজিৎ দাস রুপু, শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবের সভাপতি মনজুর কাদের, বাফুফের সহ-সভাপতি বাদল রায়, তাবিথ আউয়াল, নিটল নিলয় গ্রুপের উপদেষ্টা সত্য গোপাল পোদ্দার, ফেডারেশনের কর্মকর্তা ও স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। এবার প্রথমবারের মতো দুজন পুরুষ এবং দুজন নারী সেরা খেলোয়াড় মনোনয়নে প্রাথমিক নির্বাচনটা করেছে বাফুফের কোচেস প্যানেল। পরে সেখান থেকেই সাংবাদিকদের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন সেরা চার জন। নারী বিভাগে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত সাবিনা খাতুন মালদ্বীপে থাকায় তার পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন সতীর্থ সুইনু প্রæ।

ছেলেদের বিভাগে মামুনুল ইসলাম সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। সাদা শর্টস আর কালো প্যান্ট পরে বাফুফে অ্যাওয়ার্ড নাইটে স্ত্রীকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন মামুনুল ইসলাম। সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হওয়ায় উচ্ছ¡সিত জাতীয় দলের এ ফুটবলার পুরস্কার পেয়ে খুবই খুশি। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি জানান, দারুণ লাগছে। আরো ভালো খেলার প্রেরণা পেলাম।

উদিয়মান খেলোয়াড় নির্বাচিত হেমন্তর জন্য অ্যাওয়ার্ড নাইটটা ছিল বেশি উপভোগ্য। সবে মাত্রই শীর্ষ স্তরে খেলা শুরু করে জাতীয় দলের জার্সি গায়েও নজর কড়েছেন। মঞ্চে নাম ঘোষণার পর একটা দৌড়ে যান। জাতীয় দলের দশ নম্বর জার্সি গায়ে খেলা এ তরুণ খেলোয়াড় ইউরোপে গিয়েও ট্রায়াল দিয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার প্রদানের আগে অডিও ভিজি্যুয়ালে বাফুফের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। প্রথমে ২০০৯ সালের পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০০৭, ২০০৮ এবং ২০০৯ সালে টানা তিন বছর লিগ শিরোপা জেতায় ঢাকা আবাহনী লিমিটেডকে প্রদান করা হয় হ্যাটট্রিক ট্রফি। ২০০৯ সালের পুরস্কার প্রদান শেষে সংগীত পরিবেশন করতে আসেন আঁখি আলমগীর। ‘শ্যাম পীরিতি অন্তরে’ গানটি শেষ হওয়ার সঙ্গে অডিটরিয়াম থেকে ওয়ান মোর ওয়ান মোর আওয়াজ এলে তিনি ‘ডুম্পা ডুম্পা নাচের তালে’ গানটি পরিবেশন করেন। এরপর ২০১০-১১ মৌসুমের পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১০-১১ মৌসুমে বেস্ট ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দলের পুরস্কার লাভ করেছে চট্টগ্রাম আবাহনী। মুক্তিযোদ্ধার হয়ে মিঠুন চৌধুরী ১৬ গোল করায় সর্বোচ্চ গোলদাতা নির্বাচিত হন। ফেয়ার প্লে ট্রফি লাভ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র। ২০১০-১১ মৌসুমে লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাব লিমিটেড। রানার্সআপ হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র। পুরস্কার প্রদান শেষে মঞ্চে আসেন পারভেজ। শিল্পী পারভেজ তার জনপ্রিয় ‘যাবি যদি উড়ে যাবি’ গানটি পরিবেশ করেন। এরপর ২০১১-১২ মৌসুমের পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। ২০১১-১২ মৌসুমে পেয়ার প্লে ট্রফি লাভ করেছে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। বেস্ট ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দলের পুরস্কার লাভ করে সকার ক্লাব ফেনী। প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন হন ঢাকা আবাহনী রানার্সআপ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র। ২০১২-১৩ মৌসুমের পুরস্কার বিতরণের আগে ‘জ্বলে ওঠো বাংলাদেশ’ গানটি পরিবেশ করেন আরেফিন রুমি। সঙ্গীত পরিবেশন শেষে পাইনিয়ার, জুনিয়র ডিভিশন থেকে শুরু করে তৃতীয় বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ, প্রথম বিভাগ এবং পেশাদার লিগের পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১২-১৩ মৌসুমে ফেয়ার প্লে ট্রফি লাভ করেছে টিম বিজেএমসি। প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছে শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র। বলাবাহুল্য ওই বছর ঘরোয়া লিগে ট্রেবল জিতেছিল শেখ রাসেল। দলটির কোচ ছিলেন মারুফুল হক। ওই বছর লিগে রানার্সআপ হয়েছিল শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাব লিমিটেড। ২০১৩-১৪ মৌসুসের পুরস্কার প্রদানের আগে মঞ্চে ওঠেন তরুণ সঙ্গীত শিল্পী কার্নিয়া। ‘এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়ে’ গানটি পরিবেশ করেন তিনি। এভাবে পুরস্কার প্রদান নাচ এবং গানের মধ্য দিয়ে বাফুফে অ্যাওয়ার্ড নাইটের সমাপ্তি ঘটে।

:: গ্যালারি ডেস্ক

গ্যালারি'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj