ভারতের উন্নয়ন মডেল কতটা গ্রহণযোগ্য?

শনিবার, ২৩ মে ২০১৫

কাগজ ডেস্ক : উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত না থাকলেও উন্নয়নের মডেল এবং তা বাস্তবায়নের সদিচ্ছা ও ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যায়। ভারতের বর্তমান উন্নয়নের মডেল কতটা টেকসই এবং সাধারণ মানুষের জন্য কতটা উপযোগী, সেই প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি।

বিশ্ব অর্থনীতি তথা ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে যে তাল মিলিয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশে-বিদেশে ভারতের সেই ক্যানভাসটাই নিপুণ মার্কেটিং দক্ষতায় তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির দোস্তিকে ইতোমধ্যে দুহাত বাড়িয়ে স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্বের তাবড় তাবড় নেতারা।

প্রশ্ন হচ্ছে, সেই ছবিটার বাস্তবায়ন কি হচ্ছে? হলে কতটা? আমার তো মনে হয়, ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের ১২৪ কোটি জনসংখ্যার দেশে যতটা বলা হচ্ছে, ততটা করে দেখানো সহজ নয়। বিশেষ করে, ভারতের মতো বহু জাতি বহুমতের গণতন্ত্রে যেখানে তিন পা এগোলে দুপা পিছিয়ে আসাটাই দস্তুর। দ্বিতীয়ত, গোটা বিশ্বের উন্নয়নের সঙ্গে এখন গভীরভাবে সম্পৃক্ত পরিবেশ, কার্বন নির্গমন। উন্নত দেশগুলোর মতে, দরকার হলে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে উন্নতিকামী দেশগুলোকে উন্নয়নে কাটছাঁট করতে হবে। এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত ভারতের মতো উন্নয়নমুখী দেশগুলোর ওপর কতটা, এই মুহূর্তে সেটা বহু-চর্চিত একটা ইস্যু। অবশ্যই একটা বিতর্কিত ইস্যু। পরিবেশের রক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করেও আমার মতো কেউ কেউ মনে করে, উন্নত দেশগুলো কিন্তু তাদের শিল্পায়নে রাশ টানেনি। কিয়োটো প্রটোকল নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। কাজেই সেদিক থেকে মোদি কি উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সমান তালে পা মিলিয়ে চলতে পারবেন?

প্রধানমন্ত্রী মোদির বিজেপি দল ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এ নিয়ে নানা মহলে নানা মত। প্রশ্ন উঠেছে, মোদির ‘আচ্ছা দিন’-এর প্রতিশ্রæতি কি নেহাতই স্লোগান সর্বস্ব? তা ছাড়া যে স্লোগান দিয়ে মোদি জমানা শুরু হয়েছে, তা বাস্তবায়িত করতে মোদি কতটা তৎপর? আমার তো মনে হয়, মূল প্রশ্নটা ঠিক তা নয়। মোদি সরকার অনেক ভালো ভালো অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতে নিয়েছে, অর্থনৈতিক সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছে, জোর গলায় কেন্দ্র-রাজ্য সহযোগিতা তথা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর জোর দিয়েছেন, বৈদেশিক নীতিতেও ভুবনায়নের অনেক খোলা বইছে। অনেক খোলা মন নিয়ে বৈশ্বিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ভারতকে মেলাতে চেয়েছেন।

তা সত্ত্বেও বাস্তব প্রতিফলনের নিরিখে বিচার করলে তার নিট ফল আশানুরূপ হয়েছে বলে অন্তত আমার মনে হয় না, অন্তত এখনো পর্যন্ত। কেন হয়নি তার আপাত কারণ সরকারের ‘আচ্ছা দিন’-এর সদিচ্ছার অনেকটাই আমলাতান্ত্রিক স্তরে গিয়ে খেই পাচ্ছে না। কিংবা বলা যায়, প্রশাসনিক জঙ্গলে হারিয়ে যাচ্ছে। সেটাকে মুঠোয় আনতে মোদির এখনো সময় লাগবে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা নয়, অন্তত রাজনৈতিক স্তরে। সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে মোদি সরকারের। প্রতি পদে অন্য দলের সমর্থনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় না। যে কারণে সাবেক মনমোহন সিং-এর কংগ্রেস জোট সরকারকে নীতি রূপায়ণে পদে পদে টক্কর খেতে হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, মোদি সরকারের আগ্রাসী সাংস্কৃতিক নীতিও এ জন্য আংশিক দায়ী। এই নীতি দেশকে বিভাজনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

তবে হ্যাঁ, দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যে কিছুটা হলেও অক্সিজেন জোগাতে পেরেছেন মোদি সন্দেহ নেই। আর্থিক প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে হয়েছে সাত শতাংশের ওপরে। দ্বিতীয় বড় ইতিবাচক ইঙ্গিত মুদ্রাস্ফীতির হার নেমে এসেছে পাঁচ শতাংশে। এখানেও পুরো কৃতিত্ব আমি দিতে পারছি না মোদি সরকারকে। এটা অনেকটাই হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায়। মোটা বিদেশি লগ্নি এখনো মোদি টানতে পারেননি। কর সংস্কারে হাত দিতে গিয়ে হাত পুড়িয়েছেন। শেয়ারবাজারে লেনদেনকারী বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলোর পুরনো মুনাফার ওপর কর চাপাতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়েছে। বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলো শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। অন্যদিকে পরিকাঠামো উন্নয়ন তথা শিল্পায়নে ‘মেক-ইন-ইন্ডিয়া’ নীতির রোডম্যাপ কার্যকর করতে গিয়ে সংসদে জমি অধিগ্রহণ বিল এবং পণ্য ও পরিষেবা কর বিল পাশ করাতে হিমশিম খাচ্ছে মোদি সরকার, যেহেতু সংসদের উচ্চকক্ষে সরকার পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। খুচরো ব্যবসায় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নীতিও ফাইলবন্দি।

উপসংহারে বলা যায়, এসব সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বে ভারতের বিশাল বাজারকে কোনো দেশই অস্বীকার করতে পারে না। আর্থিক সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে মোদি আগামী চার বছরে সেটাকে কাজে লাগাতে পারবেন বলে আশা করা যায়। যদি পারেন, তাহলে মোদি উচ্ছ¡াস আবার ফিরে আসবে। সফল হবে ভারতের বিশ্বায়নের ধারাবাহিকতা।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj