স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসুন

শুক্রবার, ৮ মে ২০১৫

অস্ত্রোপচার, দুর্ঘটনায় রক্তক্ষরণ, প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, রক্তের ক্যান্সার, রক্তশূন্যতা, হিমোফিলিয়া, থ্যালাসেমিয়া, ডেঙ্গুসহ রক্তের স্বল্পতাজনিত অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় রোগীর দেহে রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন পড়ে। রক্ত কারখানায় তৈরি হয় না এবং রক্তের কোনো বিকল্পও এখনো তৈরি হয়নি। একজন মানুষের দেহের একই গ্রুপের রক্তই সঞ্চালন করা হয় আরেকজনের দেহে। সাধারণত আত্মীয়-স্বজনের মাঝ থেকেই রোগীর জন্য রক্তদানকে উৎসাহিত করা হয়। আত্মীয়-স্বজনের মাঝে না পাওয়া গেলে কোনো সুস্থ, নিরোগ মানুষের দেহের একই গ্রুপের রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়।

১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী যে কোনো সুস্থ, নীরোগ মানুষ (পুরুষের ক্ষেত্রে ওজন কমপক্ষে ৪৮ কেজি, মেয়েদের ক্ষেত্রে ৪৫ কেজি) প্রতি চার মাস পর পর ১ ব্যাগ রক্ত (৩৫০-৪৫০ মিলিলিটার) দিতে পারেন, এতে তেমন শারীরিক ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই। যারা হেপাটাইটিস, এইডস, ম্যালেরিয়া বা অন্য কোনো রক্তবাহিত রোগে ভুগছেন, তাদের রক্তদান করা উচিত না, কারণ আপনি হয়তো রোগীর উপকারই করতে চাচ্ছেন কিন্তু সেই রক্ত রোগীকে নতুন রোগে আক্রান্ত করতে পারে। কোনো রোগের কারণে এন্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ খাচ্ছেন, এরকম অবস্থায়ও রক্ত দেয়া উচিত নয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিক চলাকালীন, গর্ভবতী অবস্থায় ও সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার ১ বছর পর পর্যন্ত রক্তদান করা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। মাস ছয়েকের ভেতর বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন বা অপারেশন হয়েছে- এমন ব্যক্তিদেরও রক্তদান করা উচিত নয়। এছাড়া সুস্থ মানুষ রক্তদান করলে তার ও স্ক্রিনিংয়ের পর ওই রক্ত দিলে রোগীর সাধারণত কোন সমস্যা হয় না।

রক্তদান করা এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। রক্তদানের জন্য বিশেষ কোনো প্রস্তুতিরও দরকার পড়ে না। স্বাভাবিক খাওয়াদাওয়াই যথেষ্ট। তবে রক্তদানের আগে-পরে একটু বেশি পরিমাণে পানি পান করা উচিত। হাতে সুচ ঢোকানোর পর সাধারণত ৬ থেকে ১০ মিনিট সময়ের মধ্যেই এক ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হয়ে যায়। রক্তদানের পর কিছুটা সময় বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্রামের সময়টাতে দু-এক গøাস পানি বা জুস পান করা এবং হালকা কোনো খাবার খাওয়া যেতে পারে। প্রাথমিক ওই বিশ্রামের পর দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজ করতে কোনো নিষেধ নেই। তবে যেদিন রক্ত দেবেন সেদিন ভারী কোনো কাজ না করাই উচিত। কারো কারো ধারণা, রক্তদানের সময় খুবই ব্যথা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে, দক্ষ হাতে রক্ত সংগ্রহ করা হলে শিরায় সুচ ঢোকানোর সময় সুচ ফোটার একটুখানি ব্যথা ছাড়া বাকি সময় কোনো ব্যথা হয় না। রক্তদানের সময় মাথা ও শরীর এক সমান্তরালে থাকতে হবে। হাতে সুচ ঢোকানোর পর সাধারণত ৬ থেকে ১০ মিনিট সময়ের মধ্যেই এক ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হয়ে যায়। একজন মানুষের শরীরে থাকে ৫.৫ থেকে ৬ লিটার রক্ত। এক ব্যাগ রক্তদান করা মানে ৩৫০ থেকে ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত দান করা। রক্তের উপাদানগুলোর ভেতর পানির অভাব পূরণ হয়ে যায় বেশি পরিমাণ পানি পানের মাধ্যমেই। রক্তের অন্যতম উপাদান লোহিত কণিকা (রেড ব্লুাড সেল) ১২০ দিন পর পর প্রতিস্থাপিত হয়। অর্থাৎ এক একটি লোহিত কণিকা ১২০ দিন বাঁচে। আপনি রক্ত দিন বা না দিন ১২০ দিন পর সেটি মরে যায় এবং নতুন লোহিত কণিকা জন্ম নেয়। রক্তের অন্যান্য কণিকার আয়ুষ্কাল আরো কম।

পেশাদার রক্তদাতারা টাকার বিনিময়ে রক্ত দেয়। আমাদের দেশে পেশাদার রক্তদাতাদের বেশিরভাগই মাদকাসক্ত বা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত। মূলত নেশার টাকা জোগাড়ের জন্যই এরা রক্ত বিক্রি করে। এরা ভোগে রক্তবাহিত নানান রোগে। আর পেশাদারদের রক্ত বিক্রির মাধ্যম হিসেবে অলিতে-গলিতে গড়ে ওঠা ব্লুাড ব্যাংকগুলোও যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের সরবরাহ করছে এদের রক্ত। এই রক্ত গ্রহণ করায় রোগী সাময়িকভাবে সুস্থ হলেও দীর্ঘমেয়াদে রক্তবাহিত জটিল কোনো রোগ যেমন- এইডস, হেপাটাইটিস-বি ও সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ফাইলেরিয়া ইত্যাদিতে আক্রান্ত হতে পারেন। দেখা গেছে, পেশাদার রক্তদাতাদের বেশিরভাগই পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং রক্তের অন্যতম উপাদান হিমোগ্লোবিন এদের দেহে কম থাকে। ফলে এক ব্যাগ রক্তে যতটুকু হিমোগ্লোবিন রোগীর পাওয়ার কথা, তা সে পায় না।

বিশুদ্ধ রক্ত পাওয়ার আশায় আমাদের দেশে মানুষজন সন্ধানী, রেডক্রিসেন্ট, অরকা, বাঁধন. কোয়ান্টাম প্রভৃতি সংগঠনের দ্বারস্থ হয়। এসব সংগঠন কিন্তু রক্ত তৈরি করে না। স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের দান করা রক্ত লোকজনের কাছে সরবরাহ করার মাধ্যম হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। যত বেশি মানুষ রক্ত দেবেন, এসব সংগঠন তত বেশি বিশুদ্ধ রক্ত সরবরাহ করতে পারবে। তাই স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসুন। আপনার রক্তে বেঁচে থাকুক একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ।

হ ডা. মুনতাসীর মারুফ

কনসালটেন্ট সাইকেট্রিস্ট

মনোমিতা মানসিক হাসপাতাল

৫০/ক, পিসি কালচার হাউজ সোসাইটি

রোড-৮, শ্যামলী, ঢাকা।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj