ব্যাংকার্স সভায় সিদ্ধান্ত : ব্যাংক ডাকাতি ঠেকাতে লাগানো হচ্ছে অটো অ্যালার্ম

শুক্রবার, ১ মে ২০১৫

কাগজ প্রতিবেদক : ডাকাতি ঠেকাতে দেশে কার্যরত সব ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় লাগানো হবে অটো অ্যালার্ম। গত বুধবার রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশে ব্যাংকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া প্রতিটি ব্যাংক শাখায় নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তত একজন আনসার সদস্য নিয়োগের বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়। ব্যাংকগুলোতে উচ্চ পদে অধিকসংখ্যক নারী নিয়োগ এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বিনা কারণে অপসারণ ও ইস্তফা পরবর্তী সময়ে আর্থিক সুবিধা নিশ্চিতকরণ নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে।

সভায় গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় নেপালে সাহায্য পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। সভাশেষে ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকার্স সভার আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করেন। এ সময় এসোসিয়েশন ব্যাংকার্স অব বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান আলী রেজা ইফতেখার চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

ডেপুটি গভর্নর বলেন, কমার্স ব্যাংকের সা¤প্রতিক ঘটনার কারণে এবারের সভায় ব্যাংক শাখার নিরাপত্তা নিয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে, প্রচলিত এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে কি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় ব্যাংকারদের পক্ষ থেকে অটো অ্যালার্ম চালুর প্রস্তাব দেয়া হলে তাতে সকলেই সম্মতি জানায়। তিনি জানান, কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যেই এ সুবিধা চালু করেছে।

এবিবি চেয়ারম্যান আলী রেজা ইফতেখার চৌধুরী জানান, অটো অ্যালার্ম হলো এমন একটি ব্যবস্থা- যাতে পুলিশ, র‌্যাব ও ব্যাংকের হেডকোর্য়াটারসহ ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নম্বরে অটোকল দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

০এতে কোনো ব্যাংকে দুর্ঘটনা ঘটলে সুইচ চাপ দিলেই অনবরত কল যেতে থাকবে। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ডাকাতি হয় তো ঠেকানো যাবে না, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যাবে। তিনি আরো বলেন, ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সবাই একমত হয়েছেন। এছাড়া নেপালের জন্য ব্যাংকগুলো ইতিমধ্যে কম্বল জমা দেয়া শুরু করেছে। যা শিগগিরই পাঠানো হবে। এস কে সুর চৌধুরী আরো জানান, এবারের সভায় কমার্স ব্যাংকে ডাকাতির সময় নিহত ব্যক্তি এবং নেপালের ভূমিকম্পে মৃতদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। একই সঙ্গে নেপালে সাহায্য পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি শেষে ঋণের গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং মার্চ শেষে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ০৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে গভর্নর বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আমানতের সুদহার যে হারে কমেছে ঋণের সুদহার সে হারে কমেনি। ১৩টি ব্যাংকে এ হার এখনো ১৪ শতাংশের ওপরে রয়েছে।

এছাড়া, ৫টি ব্যাংকের ফেব্রুয়ারি ২০১৫ মাসে ঘোষিত কৃষি ঋণের সুদহার ১১ শতাংশের ওপর রয়েছে- যা মোটেই কাম্য নয়। তাই ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ এবং স্প্রেড ৪ এর কাছাকাছি নামিয়ে আনার ব্যাংকারদের আহ্বান জানান তিনি। শহিদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ব্যাংকের চাকরিতে প্রবেশকালে বয়সের উচ্চসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, সরকারি চাকরির নিয়োগবিধিমালা অনুসারে প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ একটি অভিন্ন বিধিমালা তৈরি করবে। যেখানে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে সুযোগ দেয়ার বিধান থাকতে হবে। এছাড়া তিনি ব্যাংকে অধিকসংখ্যক নারী কর্মী নিয়োগ, ডিএমডি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী কর্মীদের অগ্রাধিকার প্রদান ও নারীদের সহায়ক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

আতিউর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোরপূর্বক স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা, বরখাস্ত বা অপসারণ এবং এর পরবর্তীতে দায়দেনা প্রাপ্তিতে জটিলতা সৃষ্টি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতি স্থগিত করার নানা অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এসেছে। ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অন্যায় বা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে অনেক ভালো কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের ব্যাংকিং ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে- যা ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে অন্তরায়। এর ফলে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারেন। এছাড়া সন্ধ্যা ৬টায় কার্যদিবস শেষেও কর্মকর্তা-কর্মচারী, এমনকি নারী কর্মীদেরও কাজের নামে অহেতুক অফিসে আটকে রাখা হচ্ছে- যা মানবিক ব্যাংকিংয়ের পরিপন্থী।

আরো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, ব্যাংকগুলো সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর অযৌক্তিকভাবে আমানত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে তাদের মনোযোগ গ্রাহককে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের পরিবর্তে আমানতের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এ জন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রকৃত ব্যাংকিং সেবা থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ব্যাংকগুলো তাদের বার্ষিক বাজেট নির্ধারণের সময় ব্যবসায়ের যথাযথ উন্নতির দিকে নজর না রেখে সামর্থ্যরে চেয়ে অধিক মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরাও পর্ষদকে সন্তুষ্ট করতে এ ধরনের অযৌক্তিক মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা মেনে নেন। অযৌক্তিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানামুখী অনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেন। ফলে অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ব্যাংকের শাখার নিরাপত্তা জোরদার বিষয়ে বিদ্যমান নির্দেশনাগুলো পরিপালন এবং এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় ত্বরিৎ পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি শাখাকে নিকটস্থ থানার সঙ্গে একটি হটলাইনের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনের জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট থানায় আবেদন করার পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যাংক শাখায় অন্তত একজন আনসার সদস্য নিয়োগ করার কথা বলেন গভর্নর। সভায় এছাড়া আবাসন খাতের সঙ্কট নিরসনে এ খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানো, ডেবিট কার্ডের চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার ওপর জোর দেন গভর্নর। এছাড়া নেপালে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দিতে ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছে ব্যাংকার্স সভায়।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj