গোলটেবিল বৈঠক : পানি এবং টেকসই উন্নয়ন

সোমবার, ৩০ মার্চ ২০১৫

গত ২৪ মার্চ ভোরের কাগজের সম্মেলন কক্ষে ‘পানি এবং টেকসই উন্নয়ন’ -বিষয়ক এক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম বীরপ্রতীক। এ ছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, পরিবেশবিদ,

পানিসম্পদ বিষয়ক গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, প্রকৌশলী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, এনজিও ব্যক্তিত্ব, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টবিষয়ক সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ। গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

অনুষ্ঠানে বক্তারা দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে পানিসম্পদের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের বিষয়টি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নদী দখল, নদী দূষণ, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও পানিসম্পদের টেকসই উন্ন্য়নে কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত সে বিষয়েও আলোকপাত করেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা পানিসম্পদ উন্নয়নে বর্তমানে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার কথা জানান। মূলত ভোরের কাগজ আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকে নিরাপদ পানিসম্পদের টেকসই উন্নয়ন ও লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশেষজ্ঞরা। গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেয়া আলোচকদের বক্তব্যের চুম্বক অংশ দিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের বিশেষ ক্রোড়পত্র।

গোলটেবিল বৈঠকটি অয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করেছে ওয়াটার এইড বাংলাদেশ।

গোলটেবিল বৈঠকের আলোচকবৃন্দ

শ্যামল দত্ত : সম্পাদক, ভোরের কাগজ

বাংলাদেশে অনেক সমস্যা থাকলেও সম্ভাবনা রয়েছে তার চাইতে অনেক বেশি। এই সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু পানিকে ঘিরে আমাদের পরিকল্পনাগুলো আসলে টেকসই বা সঠিক হচ্ছে কি না, এটা একটা বড় প্রশ্ন। সম্প্রতি আমি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়েছিলাম সুন্দরবন রক্ষা-সংক্রান্ত একটি সেমিনারে অংশ নিতে। সেখানে আলোচনায় উঠে আসে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করার জন্য পানিই হচ্ছে এখন প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমরা দেখেছি, সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য ভারতের অনেক বেশি কর্মসূচি ও পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও তাদের অংশে সুন্দরবন আমাদের চাইতে অনেক ছোট। আমরা দেখেছি, সেখানে লবণাক্ততা ভয়াবহ পর্যায়ে বিস্তার লাভ করেছে। আমি গত বছর গোপালগঞ্জের টুঙ্গি পাড়ায় সাংবাদিকদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করেছিলাম।

সেখানে গিয়ে দেখেছি লবণাক্ততা সেখানেও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমি একবারও সেখানকার টিউবওয়েলের পানি পান করতে পারিনি। সেখানকার নদীর পানিও লবণাক্ত। শুধু টুঙ্গিপাড়া নয়, লবণাক্ততা এখন বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। তাই এটি নিয়ে আমাদের বিশেষভাবে ভাবতে হবে।

নজরুল ইসলাম : বীরপ্রতীক, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

এটা ঠিক যে, ভারত উজানে বাঁধ দেয়ার কারণে দেশের নদ-নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, আমরা পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছি না। আবার এটাও ঠিক যে আমরা যতোটুকু পানি পাচ্ছি তারও সঠিক ব্যবহার করতে পারছি না। তাই পানি ধরে রাখার জন্য আমাদের বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। যেমন ষাটের দশক থেকেই গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের চিন্তাভাবনা চলছিল। বর্তমান সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। গঙ্গা ব্যারেজ নির্মিত হলে বেশ কিছু সুফল পাওয়া যাবে। এটি করতে কোনো জমি অধিগ্রহণও করতে হবে না। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ৪ বিলিয়ন ডলার লাগবে এবং সময় লাগবে ৭ বছর।

আমি নিজেও প্রকৃতিবিরুদ্ধ কোনো কাজ করার পক্ষে নই। কিন্তু একান্ত প্রয়োজনে কখনো কখনো নদীতে বাঁধ দিতে হয়। গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি অনেকটা এ রকম। আমরা নদ-নদীর উন্নয়নে অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ১৬০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং করে পানি এনে বুড়িগঙ্গা নদীর নব্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করা সম্ভব হবে। অনেকের ধারণা নদীর দখল-দূষণ রোধ করার দায়িত্ব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু আসলে তা নয়। নদীর দূষণ রোধ করার দায়িত্ব পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের। আর দখলের বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় পড়ে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় মূলত নদীতীরে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্য দায়িত্ব পালন করে থাকে।

সেলিনা জাহান লিটা : সদস্য, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি

ছোট্ট এই দেশে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। প্রতিনিয়ত এ দেশের মানুষকে নানা দুর্যোগ মোকাবেলা করে বেঁচে থাকতে হয়। সরকার ইতোমধ্যে নদী রক্ষা, বাঁধ নির্মাণ করাসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নিয়েছে। যার মধ্যে কিছু কিছু কাজ শুরু হয়েছে এবং বাকিগুলোও স্বল্প সময়ের মধ্যে শুরু হবে। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও এসবের বাস্তবায়ন নিয়ে পিছিয়ে নেই সরকার। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাই দেশ বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে আসীন। পানির অপর নাম জীবন। এটা সবার জানা থাকলেও দেশের নদ-নদী রক্ষা করার জন্য উদ্যোগ নেই অনেকের। এই অমূল্য সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশে আইন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। সম্প্রতি এসব আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

ডা. মো. খায়রুল ইসলাম : কান্ট্রি ডিরেক্টর, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ

উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই উন্নয়ন কতটা টেকসই হয়েছে। বাংলাদেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ভাণ্ডার হলো বরেন্দ্র অঞ্চল। কিন্তু সেখানে নদীনালা সবচেয়ে কম। ওই অঞ্চলে ধান চাষের জন্য গভীর নলক‚পের মাধ্যমে পানি তোলা হয়। তখন আশপাশের গ্রামগুলোর টিউবওয়েলে পানি ওঠে না। এ অবস্থায় কৃষি মন্ত্রণালয় একটি আদেশ জারি করেছে যেন বোরো মৌসুমে কৃষকরা ধানের পরিবর্তে গম, ছোলা ইত্যাদি রোপণ করেন। কারণ ধান চাষ করতে প্রচুর পানি প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই আদেশ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর সামর্থ্য খুবই সীমিত। এই আদেশ বাস্তবায়ন করতে হলে আইনের পাশাপাশি কৃষকদের প্রণোদনা ও উৎসাহ দেয়া প্রয়োজন। দক্ষিণাঞ্চলে লবণ সহিষ্ণু ধানের প্রজাতি বাড়ানোর কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু চিংড়ি চাষ অক্ষুণœ রেখে এটা কীভাবে করা সম্ভব তা বোধগম্য নয়। স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছি।

এ কে এম এ হামিদ : সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ

অতীতে পানির কারণে কলেরা, ডায়েরিয়া হতো। এসব রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ত গ্রামের পর গ্রামে। হাজার হাজার মানুষ মারা যেত। এখন আর সেটা দেখা যায় না। তবে সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন নিরাপদ পানির অভাবে আবারো মানুষকে অসুস্থ হতে হবে। এখন আমাদের নদ-নদীর পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানিতেও দূষণ দেখা যাচ্ছে। তাই শুধু পানির সংকট নিয়ে ভাবলে চলবে না। ভাবতে হবে পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে। ১৯৬২ সাল থেকে বিশেষজ্ঞরা ওয়াসাকে তলদেশ থেকে পানি উত্তোলন করতে নিষেধ করলেও তা এখনো বন্ধ করা হয়নি। বরং আরো নতুন নতুন পাম্প বসাচ্ছে ওয়াসা। নদীর পানি পরিশোধন করে সুপেয় করার পরিকল্পনা রয়েছে ওয়াসার। কিন্তু নদীতে পানি না থাকলে তা কীভাবে করা হবে। তাই দেশের নদ-নদী রক্ষার জন্য ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি দেশের বিল, হাওর, জলাশয়গুলোর গভীরতা বৃদ্ধি করে সেখানে পানি সংরক্ষণ করতে হবে। পদ্মা ও যমুনায় ব্যারেজ নির্মাণ করে মিঠাপানির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া কল-কারখানার বর্জ্য পরিশোধন করে যেন নদীতে ফেলা হয়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রকৌশলী তাকসিম এ খান : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা ওয়াসা

মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ওয়াসা তিনটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পদ্মা, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা থেকে পানি এনে রাজধানীতে সরবরাহ করা হবে। আশা করছি, ২০১৯ সালের পর ওয়াসাকে আর ভূ-গর্ভের পানির ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে না। পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসা সবার সমঅধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এ জন্য ঢাকার সব বস্তিতে ওয়াসা বৈধ পানির সংযোগ ব্যবস্থা চালু করেছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় যে কোনো দেশের চেয়ে ঢাকা ওয়াসার পরিষেবার মান ভালো। তাই আমরা বলতে পারি আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

ড. মো. আতাউর রহমান : অধ্যাপক, পানিসম্পদকৌশল বিভাগ, বুয়েট

পানি জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআন শরিফে বলা আছে, পানি থেকে সব জীবন সৃষ্টি। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি বলেছেন, পানি নিয়ে যিনি কাজ করবেন তাকে দুটি নোবেল দেয়া দরকার। একটি বিজ্ঞানে, আরেকটি শান্তিতে। তাই পানির গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা পানি পেয়ে থাকি। এ দেশের নদ-নদীতে পানি রয়েছে। ভূ-গর্ভে পানি রয়েছে। বৃষ্টির পানিও আমাদের আরেকটি উৎস। পানিকে আমরা প্রতিদিনের প্রয়োজনে এবং উন্নয়নমূলক নানা কাজে ব্যবহার করি। তবে এই পানি আমাদের জন্য কখনো কখনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ক্রমাগত পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন এলাকা আর্সেনিক আক্রান্ত হচ্ছে। ভারত, চীন উজানের পানি আটকে দেয়ায় সময়মতো পানি পাচ্ছি না। কখনো কখনো বেশি পানি ছেড়ে দেয়ায় বন্যা আক্রান্ত হচ্ছি। প্রতিনিয়ত পানি দূষণের কবলে পড়ছে। ঢাকার আশপাশের নদ-নদী আজ বিপর্যস্ত। সুন্দরবন আজ পানিদূষণের কারণে হুমকিতে রয়েছে। তবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব।

সাইফুল ইসলাম : যুগ্ম পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ

বিআইডব্লিউটিএ মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের দেখাশোনা করে। তবে বর্তমানে বিআইডব্লিউটিএ নদীর দখল ও দূষণ রোধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মতো এ পর্যন্ত সংস্থাটি প্রায় ৫ হাজার অবৈধ দখলদারকে চিহ্নিত করে ৩ হাজার ২০০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে। দখলদারদের বিরুদ্ধে ১৭৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঢাকার চাপাশে ৫টি নদীর দূষণ রোধে ১৮৫টি নদীর বর্জ্যরে উৎসমুখ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ওয়াসার রয়েছে ৪৬টি। কিছু মুখ বন্ধও করেছে বিআইডব্লিউটিএ। নদী থেকে ক্ষতিকর বর্জ্য অপসারণের কাজ করে আসছে সংস্থাটি। সংস্থাটি দখল-দূষণ রোধে সরকারের কাছে নানা সুপারিশ করেছে। নদীতে বর্জ্য নিক্ষেপ না করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতেও কাজ করছে।

মুকিত মজুমদার বাবু : পরিচালক, চ্যানেল আই

পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় গণমাধ্যমের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। গণমাধ্যম বরাবরই পানি নিয়ে নানা সমস্যা জনগণের সামনে তুলে ধরে। তবে এ বিষয়ে আরো বেশি করে প্রচার করলে তা জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আমরা যদি বেশি করে এসব সমস্যা ও সমাধানের বিষয়ে আলোকপাত করি তাহলে পানি টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকার একা কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তাই জনগণকেও সচেতন হতে হবে। সরকারের দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। এত কম লোক দিয়ে কাজ হয় না। তাই শুধু সরকার নয়, আমাদেরও কাজ করতে হবে। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে ইতিবাচক কিছু পাওয়া যাবে।

আবুল কাশেম : প্রধান প্রকৌশলী, ঢাকা ওয়াসা

টেকসই উন্নয়নে যাতে পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে জন্য ওয়াসা কাজ করে যাচ্ছে। ওয়াসা তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে পানি সরবরাহের কাজ করছে। পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ওয়াসা পরিবেশের দিকে নজর রাখছে। মানুষ যাতে সেবা পায় সে খেয়াল রাখছে। বস্তির মানুষও যাতে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয় তাও দেখছে। বর্তমানে ওয়াসা রাজধানীর সবচেয়ে বড় বস্তি কড়াইল বস্তিতেও পানি সরবরাহ করছে। বর্তমানে ওয়াসা তার সরবরাহকৃত মোট পানির ৭৮ শতাংশ ভূ-গর্ভ থেকে উত্তোলন করে। ঢাকায় পানি সরবরাহের জন্য ৬৭০টি পাম্প ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি ২২ শতাংশ নদী থেকে সরবরাহ করে ওয়াসা। তবে আমরা যেসব মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি তা শেষ হলে ভবিষ্যতে ভূ-গর্ভ থেকে আর পানি উত্তোলন করতে হবে না।

শাহ মো. আনোয়ার কামাল : নির্বাহী পরিচালক, ইউএসটি

মানবসভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে পানি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে পানির চাহিদা আরো ব্যাপক। ছোটবেলায় দেখেছি নদীর পাড়ে, বিলের পাড়ে, পুকুরে পানি সহজলভ্য ছিল। কিন্তু এখন এই প্রাপ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই নেই। কোথাও বাঁধ দিয়ে পানিকে আটকে দেয়া হয়েছে। কোথাও নদীনালায় পানি নেই। অনেক এলাকায় লবণাক্ত পানি একটি বড় সমস্যা। এসব সমস্যা নিয়ে যে পরিমাণ গবেষণা হওয়া দরকার সরকারি পর্যায়ে সে অনুপাতে হচ্ছে না। দেশের কোথায় কোথায় সুপেয় পানি রয়েছে আর কোথায় নেই এর একটা জরিপ হওয়া উচিত।

শরীফ জামিল : যুগ্ম সম্পাদক, বাপা

আমরা পানি ও টেকসই উন্নয়নের কথা বলছি। কিন্তু প্রতিনিয়ত বন ধ্বংসের কারণে আমাদের দেশে বৃষ্টির পরিমাণ কমছে। ভূ-গর্ভের পানির যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে আজ রাজধানীসহ সারা দেশ বিপদের মুখে রয়েছে। দখলে দূষণে নদীনালা, খালবিল হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকার নিজেই নানাভাবে এসব নদ-নদী ধ্বংস করছে। তাই টেকসই উন্নয়ন আজ বাধাগ্রস্ত। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক সমস্যা রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সময় এই কর্মকাণ্ডকে টেকসই করার কথা অনেক সময় বিবেচনায় নেয়া হয় না। একটি অত্যন্ত মূল্যবান কিন্তু সীমিত সম্পদ হিসেবে পানিকে অবশ্যই টেকসই ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। যেমন ‘বিদ্যুৎ’ উৎপাদনের জন্য এখন সরকার ভাবছে কয়লার ব্যবহার বাড়াতে হবে। অথচ এতে নদী যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নিয়ে সরকার ভাবছে না।

এস এম এ রশীদ : নির্বাহী পরিচালক, এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ

টেকসই উন্নয়ন বলতে এমন উন্নয়নকে বোঝায় যা বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও উপযুক্ত থাকে।

এর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন এমনভাবে করা হয় যাতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে। বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের উন্নয়নের অর্জন অনেক বেশি।

তবে এসব উন্নয়ন টেকসই কি না, সে দিকে খুব একটা নজর দেয়া হয়নি। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্ব পানি দিবস পালন করা হচ্ছে। প্রতি বছরই এই দিবসের একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। তবে এবারের বিষয়টি অত্যন্ত মানবিক। কারণ পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না।

আমাদের ঠিক করতে হবে আমরা পানের জন্য পানির কোন উৎস ব্যবহার করব, কৃষির জন্য কোন উৎস কিংবা শক্তি-শিল্প উন্নয়নের জন্য কোন উৎসের পানি ব্যবহার করব ইত্যাদি। ন্যায্যতার সঙ্গে পানি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পানিসম্পদের সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোও প্রয়োজন।

ড. আনোয়ার জাহিদ : উপপরিচালক, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড

বাংলাদেশে পানি নিয়ে অনেক অর্জন হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত পানি নিয়ে যত কাজ হয়েছে তা রাজধানীকেন্দ্রিক। এখন সময় এসেছে তৃণমূল নিয়ে ভাবার। সময় এসেছে উপজেলা পর্যায়ে পানি নিয়ে বাজেট তৈরি করার। উপজেলা পর্যায়ে সরকারি বিভিন্ন অফিস রয়েছে। অনেক বেসরকারি সংস্থাও আছে যারা অনেক তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করে। এর মাধ্যমে একটি উপজেলায় কত পানির প্রয়োজন আমরা জানতে পারি। তথ্য ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায়ে পানি বাজেট করতে পারলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে। সুষ্ঠু ব্যবহার করা গেলে টেকসই উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।

এড.সৈয়দ মাহবুবুল আলম : সম্পাদক, পবা

দেশের নদী ও পরিবেশ রক্ষায় যথেষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু তার সঠিক প্রয়োগের অভাবে দেশের অধিকাংশ নদ-নদী হারিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশের নদী রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে নদীর কথা শুধু পাঠ্যবইতেই পাওয়া যাবে। টেকসই উন্নয়ন ও নদী রক্ষায় সবার আগে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। আমরা শিল্প-কারখানার উন্নয়নের কথা ভাবি। কিন্তু এর বর্জ্য আমাদের কী পরিমাণ ক্ষতি করে তা নিয়ে খুব বেশি ভাবি না।

'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj