মোস্তফা কামাল : জনপ্রিয় সাহিত্যের অন্যতম কাণ্ডারি

শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০১৫

কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামালের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। তিনি প্রায় আশিটি গ্রন্থের রচয়িতা। পেশাগতভাবে বাংলাদেশের অনেকগুলো সংবাদপত্রে নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যিক সাংবাদিকতা করেছেন এবং বর্তমানে অনেকেই কর্মরত আছেন। সাংবাদিকতা পেশার ব্যস্ততার মধ্যে যাঁরা সৃষ্টিশীল কাজের ধারা বজায় রাখতে পেরেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মোস্তফা কামাল। প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় তাঁর একাধিক বই প্রকাশিত হয়। তিনি দুই দশক ধরে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সায়েন্স ফিকশন, টিভি নাটক এবং শিশু-কিশোর উপযোগী রচনার নিয়মিত লেখক। কলামিস্ট হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তাও রয়েছে তাঁর। চলতি বছর (২০১৫) বইমেলায় প্রকাশিত তাঁর ‘চাঁদের আলোয় রাগিব আলী এবং সে’ একটি নতুন ধরনের উপন্যাস। অন্যদিকে ‘রুবীর কালো চশমা’ সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। চশমা হারিয়ে রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছিল রুবী। কোথাও খুঁজে পাচ্ছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তে নিয়াজ ওর রুমে ঢুকে দেখলো, চশমাটি তার পাশেই পড়ে আছে। নিয়াজ ওর দিকে চশমাটি এগিয়ে দিয়ে বললো, এই নাও তোমার চশমা। বিস্ময়ের সঙ্গে রুবী বললো, কে!/আমি, আমি নিয়াজ।/ও! নিয়াজ ভাইয়া? ধন্যবাদ। আপনি কবে এলেন?/এই তো! দুতিন দিন হলো। নিয়াজ সম্পর্কে রুবীর চাচাতো ভাই। দুজন দুজনকে পছন্দ করে। কিন্তু নিয়াজের মা যখন বিয়ের প্রস্তাব পাঠালো, তখন বেঁকে বসলো রুবী। সে বললো, ব্রোকেন ফ্যামিলিতে সে বিয়ে করবে না। কাহিনী মোড় নিল অন্যদিকে। নানা ধরনের কিশোর উপন্যাস লিখে মোস্তফা কামাল ইতোমধ্যে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছেন। এ ধরনের একটি গ্রন্থ ‘ডাকাতের কবলে ফটকুমামা’। বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা ফটকুমামা কিশোর ত্বকী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামলেন। দশ কিশোর গোয়েন্দা তাঁর সঙ্গী। তারা নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা এবং আখাউড়ার সীমান্ত এলাকা চষে বেড়িয়েছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তারা খুঁজে পেল দুই সন্দেহভাজনকে। তাদের নিয়ে রওয়ানা হলো ঢাকার উদ্দেশে। কিন্তু রাতের আঁধারে ঘটলো অঘটন! একদল ডাকাত তাদের গাড়িতে হামলা চালালো। এভাবেই এগিয়ে যায় কাহিনী। মোস্তফা কামালের রঙ্গব্যঙ্গ সিরিজ বেশ জনপ্রিয়। এ বছর প্রকাশিত হয়েছে ‘পাগলছাগল ও গাধাসমগ্র-৯’। আর সায়েন্স ফিকশন ‘বিমান রহস্য’ এবং ‘হাসির চার উপন্যাস’ সংকলন দুটিও দৃষ্টিনন্দন। এ ছাড়া কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ৬টি সায়েন্স ফিকশন ও ৫টি গোয়েন্দা উপন্যাসের সংকলন নিয়ে মোস্তফা কামালের আরো দুটি গ্রন্থ।

মোস্তফা কামালের ‘জননী’ উপন্যাসটি ইতোমধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ২০১১ সালের তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘জনক জননীর গল্প’ প্রকাশিত হয়। এসব গ্রন্থের আগেও তিনি ‘সিরিয়াস’ ধারার উপন্যাস রচনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘বারুদ পোড়া সন্ধ্যা’ (২০০৫), ‘হ্যালো কর্নেল’ (২০১০) তার মধ্যে পাঠকের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। এরপর তিনি লিখেছেন ‘জিনাত সুন্দরী ও মন্ত্রী কাহিনী’ (২০১২), ‘কবি ও একজন নর্তকী’ (২০১৩) প্রভৃতি উপন্যাসের বাস্তবধর্মী কাহিনী। অন্যদিকে তাঁর সংকলনগ্রন্থ ‘সায়েন্স ফিকশন সমগ্র’, ‘চার জয়িতা’, ‘চার অপরূপা’ এবং গবেষণাগ্রন্থ ‘আসাদ থেকে গণঅভ্যুত্থান’ (১৯৯৩) খ্যাতি অর্জন করেছে।

‘হ্যালো কর্নেল’ (২০১০) তাঁর একটি ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। বিশেষত এই উপন্যাসের কাহিনী বর্তমান পাকিস্তানের জঙ্গি তৎপরতা ও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তালেবানদের আক্রমণ সব মিলিয়ে সমকালীন ও প্রাসঙ্গিক। ২০০৪ সালে মোস্তফা কামাল পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য পাকিস্তানের বেলুচিস্তান ছাড়া অন্য সব অঞ্চল প্রায় এক মাস চষে বেড়িয়েছিলেন। এরপর আরো দু’দফায় তিনি সেখানে যাবার সুযোগ পান। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখতে পান সেখানকার সমাজে কীভাবে জঙ্গিবাদ শিকড় গেড়ে বসেছে। সরকার, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন, রাজনৈতিক দল জঙ্গিবাদকে সহযোগিতা করছে। তখন থেকেই আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত এলাকা ও ওয়াজিরিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গি ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র বিমান এবং কখনো কখনো ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের অনুমতি না নিয়ে এই হামলা পরিচালনা করলেও তৎকালীন মোশাররফ সরকার নিন্দা জানাতে পারেনি। কারণ তার সরকার জঙ্গিবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্য নিয়ে উল্টো তালেবান জঙ্গিদের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেছিল। উল্লেখ্য, এক সময় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তালেবান জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হয়। মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তালেবান সংগঠন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সর্বত্র ঢুকে গেছে। বাংলাদেশ তাদের টার্গেট ছিল তখন থেকেই। অর্থাৎ পাকিস্তান যেমন ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা পেয়েছে তেমনি বাংলাদেশকে ধর্মীয় উন্মাদনা দিয়ে অস্থির করে তোলার চেষ্টা হয়েছে অনেক আগে থেকেই। জঙ্গিবাদের এই বাস্তবতা নিয়ে মোস্তফা কামালের ‘হ্যালো কর্নেল’-এ যুদ্ধ ও প্রেম একীভূত। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা উপন্যাসের কাহিনীর ফ্রেমে ধারণ করেছেন তিনি। মোস্তফা কামাল দেখিয়েছেন এক জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে। তালেবান, আল-কায়েদার সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে জঙ্গি দমনে নাটক মঞ্চস্থ করা, তালেবান নেতাদের ভয়ে ভীত পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা, মানুষ অপহরণ করে অর্থ সংগ্রহের তালেবানি কৌশল, বাংলাদেশে জঙ্গি প্রেরণের জন্য ট্রেনিং প্রদান প্রভৃতি প্রসঙ্গ এবং সামাজিক-পারিবারিক জীবনের অনেক অজানা তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে এ উপন্যাসে। পাকিস্তানের সেনাকর্তা কর্নেল মইনুদ্দিন, বাংলাদেশি যুবক সাকিব, তার পাকিস্তানি প্রেমিকা মাহাভেস, যুবক আফ্রিদি ও তার মমতাময়ী মা উপন্যাসের মূল চরিত্র। সাকিবের জবানিতে উপন্যাসের কাহিনীর সূচনা এবং ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী ভূখণ্ডের চিত্রাবলি।

‘হ্যালো কর্নেল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত। এর কাহিনী নাটকীয় কৌশলে বিবৃত হয়েছে। দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে জঙ্গি অভিযান নাটকের সময় প্রথমে একজন সেনা কর্মকর্তা এবং আফ্রিদির বাড়ি থেকে একাকী বের হয়ে সাকিব তালেবানদের দ্বারা অপহৃত হয়। অপহৃত সাকিবকে উদ্ধারের জন্য মাহাভেসের প্রচেষ্টা, এই বাংলাদেশি যুবকের জন্য তার হৃদয়ের আকুতি কাহিনীকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যুদ্ধ, হত্যা, আতঙ্ক সব কিছুকে ছাপিয়ে এই দুই ভিনদেশি নর-নারীর প্রেমের পুনর্মিলনে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে। মূলত মোস্তফা কামাল সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে একাধিক উপন্যাস রচনা করেছেন। তার মধ্যে স্থান-কালের বিন্যাসে বৈচিত্র্যময় আখ্যানের শৈল্পিক উপস্থাপনা হচ্ছে ‘হ্যালো কর্নেল’। উপন্যাসটি দেশ এবং বিশ্বের বর্তমান জঙ্গিবিরোধী-পরিস্থিতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সৃষ্টিকর্ম।

২. মোস্তফা কামাল তাঁর কথাসাহিত্যে ম্যাজিক রিয়ালিটি সৃজনে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘চাঁদের আলোয় রাগিব আলী এবং সে’ উপন্যাসে ম্যাজিক রিয়ালিজম এসেছে বাস্তব থেকে স্বপ্ন এবং স্বপ্ন থেকে বাস্তবের আখ্যানের মধ্য দিয়ে। স্বপ্ন অনেক ক্ষেত্রে সত্য ঘটনা হয়ে উঠেছে। কারণ ম্যাজিক রিয়ালিজম আসলে বাস্তবকে দেখার এক বহুমাত্রিক এবং সামগ্রিক পদ্ধতি। সেই কাজটিই করেছেন মোস্তফা কামাল। তিনি রোজকার জীবনে চমক তৈরি করেছেন; রাগিব আলীর কাহিনীতে মানুষের বিস্ময়কে তুলে ধরেছেন। রাগিব আলী একজন সত্যবাদী মানুষ। আর এ কারণেই তাঁর পদে পদে বিপদ। একবার একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেখে ফেলায় মহাবিপদে পড়েন রাগিব আলী। খুনের ঘটনা ফাঁস হলে তাঁকেও খুন করা হবে বলে হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। আবার রাতে ঘুমের ঘোরে তাঁকে তাড়া করে সেই মৃত ব্যক্তির প্রেতাত্মা। রাগিব আলীর সংকট তৈরি হয়। তিনি সত্য প্রকাশ করবেন; নাকি অপরাধীদের হাতে জীবন দেবেন? এমনি এক পরিস্থিতিতে তাঁর পাশে দাঁড়ায় ডাক্তার শাওলী। শেষ পর্যন্ত একটি ইতিবাচক পরিণতি সম্পন্ন হয় আখ্যানে। মাঘ মাসের হাড়কাঁপানো শীতে এর কাহিনী উন্মোচিত হয়েছে। ৪৫ বছর বয়সের রাগিব আলী শিক্ষিত বেকার। পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। কিন্তু তার প্রকৃতিতে রয়েছে পরোপকারী প্রবৃত্তি। নাবিলার মতো অনাথ শিশুর প্রতি কাতর হওয়া থেকে শুরু করে পাড়ার কলেজ ছাত্রকে বিনা কারণে পুলিশ কর্তৃক শাস্তি পেতে দেখে ঝাঁপিয়ে পড়া তার স্বভাব। এমনি এক নিঃস্বার্থ ঘটনায় জনৈক মহিলার ব্যাগ ছিনতাই হওয়ার সময় সেটি রক্ষা করতে গিয়ে আহত হন ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে। তবে ঘটনাটি উপন্যাসের বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ডাক্তার শাওলীর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ ঘটে তার। শাওলী তার মানসিক অস্থিরতা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়, হত্যার ঘটনা প্রকাশে এবং অপরাধীকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানোতে সাহস জাগ্রত করে। তবে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে পিস্তল আসলাম ভারতে পালাতে গিয়ে সীমান্তরক্ষীদের দ্বারা ধৃত হয়; রাগিব আলী বিপদমুক্ত হন। মূলত মোস্তফা কামাল বাস্তবের ভেতর অলৌকিক সব ঘটনা অনুপ্রবিষ্ট করিয়ে ম্যাজিক রিয়ালিজমের অন্যতম চরিত্র হিসেবে রাগিব আলীকে নির্মাণ করেছেন। উপন্যাসটি পাঠককে রহস্যের জগতে নিয়ে যাবে।

৩. মোস্তফা কামালের অনেকগুলো গ্রন্থের মধ্যে ‘রুবীর কালো চশমা’ এবারের বইমেলার (২০১৫) গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। সত্য ঘটনা অবলম্বনে পারিবারিক ক্রাইসিসকে কেন্দ্র করে এর আখ্যান বিন্যস্ত হয়েছে। বর্তমান সময়ের একটি সামাজিক সংকট হলো সেপারেটেড ফ্যামিলি; মা-বাবার বিচ্ছিন্নতা। আর এই দাম্পত্য জীবনের সংকট সন্তান কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলে। সন্তান বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক বিপর্যয় সূচিত হয়। এমনকি এ ধরনের সংকট-দীর্ণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের অন্যরা এড়িয়ে চলে। নর-নারী সম্পর্কের ভেতর মহিমান্বিত সংযোগ হিসেবে প্রেম ও বিবাহের পথে কাঁটা বিছানো থাকে। ‘রুবীর কালো চশমা’ উপন্যাসে এসবই ব্যক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আছে প্রেম, আছে স্বামী-স্ত্রীর সাংসারিক দ্ব›দ্ব-সংঘাত। সব মিলিয়ে উপন্যাসটি নাগরিক সংকটের কাহিনী। প্রেমের উপন্যাস লেখার সময় প্রেমের সঙ্গে সমাজের দ্ব›দ্ব-সংঘাতগুলোও মোস্তফা কামাল তুলে আনেন। সাংসারিক জীবন, পারিবারিক জীবনে চলার সময় যা কিছু থাকে সব মিলিয়ে নিতে চান তিনি। তাঁর মতে, প্রেমতো সব জায়গাতেই আছে। সেই প্রেম কেবল নিরেট নর-নারীর প্রেম নয়। তাকে সমাজ-সংসার যুক্ত করে দেখা দরকার। অর্থাৎ এই ঔপন্যাসিক প্রেম কাহিনী লিখতে পছন্দ করেন তবে তা সমাজজিজ্ঞাসা বিচ্যুত প্রেমকাহিনী নয়।

মোস্তফা কামাল আলোচ্য উপন্যাসে রুবীর ব্যক্তিমানুষের অতল গহীনে ডুব দিয়ে একজন নারীর যন্ত্রণা, কষ্ট, ভয়, হতাশা, সংশয়, সাহসিকতাকে পরিস্ফুট করেছেন অসামান্য আলোকসম্পাতে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো- নিয়াজ, নিগার সুলতানা, জামিল আহমেদ, রওশন আরা, রুবাইয়াত হাসান একদিকে যেমন নাগরিক রুচি এবং আবেগকে লালন করে তেমনি অন্যদিকে নাগরিক সভ্যতার নেতিবাচক অবদান- সংশয়, বিচ্ছিন্নতাবোধ, কপটদাম্ভিকতা, নিঃসঙ্গতা, আত্মানুসন্ধানের আত্মদহন প্রভৃতি মনোজগতের অতল গহŸরের অন্ধকারের পুঞ্জীভূত উপাদানসমূহ তাদের মনের মধ্য থেকে উঠে আসে। ফলে নাগরিক পুঁজিতন্ত্রের অভিঘাতে যেখানে ব্যক্তির সূ² অনুভূতিগুলো অস্বীকৃত হয়েছে, অনিকেত সঞ্চারী করে তুলেছে তার দৈনন্দিন জীবন, সেখানে যন্ত্রণাদগ্ধ সেই ব্যক্তির মনস্তত্ত্বের বিবরণ ও বিশ্লেষণ হয়ে উঠেছে প্রধান। নাগরিক সভ্যতাও যে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার আবেষ্টন থেকে ব্যক্তির যন্ত্রণা ও অবচেতনার কামনাকে অগ্রাহ্য করতে চায় এবং এরই ফলে ব্যক্তি মানুষ কীভাবে প্রতিবাদী সত্তায় জাগরিত হয় তারই শিল্পরূপ ‘রুবীর কালো চশমা’ উপন্যাসের গতিচঞ্চল প্রান্ত।

মূলত মোস্তফা কামাল নাগরিক জীবনের পারিবারিক সংকটকে ব্যক্তির বহুমাত্রিক চেতনার সংস্পর্শে দৃশ্যমান করেছেন। ব্যক্তি তো শুধু গণ্ডিবদ্ধ পরিবারের সংকটের চূড়ান্ত সীমায় ক্ষয়ে গিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। সচেতন শিক্ষিত নাগরিক জীবনযন্ত্রণার মূলে থাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাস্রোত। মোস্তফা কামাল এসব প্রসঙ্গ সংবাদপত্রের কলামে উপস্থাপন করলেও এখানে সযতেœ তা থেকে দূরে থেকে মনস্তাত্তি¡ক উপন্যাসের অবয়ব নির্মাণ করেছেন। তবে তিনি সংহত বিবরণ ও একঘেয়েমি কাহিনীসূত্র উপন্যস্ত না করে নাগরিক বৃত্তের জীবনদগ্ধ উপন্যাস উপহার দিতে পেরেছেন, যার মূল সুর ইতিবাচক। এই ইতিবাচক জীবনদৃষ্টি ও সাবলীল গদ্যে শিল্পসম্মত কাহিনী বর্ণনার কারণে ‘রুবীর কালো চশমা’ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

৪. চলতি বছর মোস্তফা কামাল সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকারে নিজের সৃজনশীল কাজ নিয়ে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তার কিছু অংশ এরকম- দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিচরণ করছি সাহিত্যের শাখা-প্রশাখায়। গল্প, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন, নাটক, শিশুতোষ, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, কলামসহ নানা মাধ্যমে কাজ করেছি। অবশ্য সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও কথাসাহিত্য আমার বেশি পছন্দের। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে একাধিক গ্রন্থ। আমার ‘চাঁদের আলোয় রাগিব আলী এবং সে’ একটি নতুন ধরনের উপন্যাস। ‘অন্যপ্রকাশ’ প্রকাশিত ১০৪ পৃষ্ঠার এ উপন্যাসে আমি তুলে ধরেছি রোমাঞ্চকর কাহিনী। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রাগিব আলী সত্যবাদী মানুষ। তার জীবনে ঘটে নানা বিস্ময়কর ঘটনা, ঘটে পদে পদে বিপদ। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় এগিয়ে আসে ডাক্তার শাওলী। এরপর ঘটে নানা থ্রিলার। অতঃপর রাগিব আলী ও শাওলীর জীবনে ইতিবাচক পরিণতি দিয়ে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ‘রুবীর কালো চশমা’ সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। নানা ধরনের কিশোর উপন্যাস লিখে আমি ইতোমধ্যে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছি। এ ধরনের একটি গ্রন্থ ‘ডাকাতের কবলে ফটকুমামা’। বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা ফটকুমামা কিশোর ত্বকী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামলেন। দশ কিশোর গোয়েন্দা তাঁর সঙ্গী। তারা নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা এবং আখাউড়ার সীমান্ত এলাকা চষে বেড়িয়েছে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তারা খুঁজে পেল দুই সন্দেহভাজনকে। তাদের নিয়ে রওয়ানা হলো ঢাকার উদ্দেশে। কিন্তু রাতের আঁধারে ঘটলো অঘটন! একদল ডাকাত তাদের গাড়িতে হামলা চালালো। এভাবেই এগিয়ে যায় কাহিনী। আমার রঙ্গব্যঙ্গ সিরিজও বেশ জনপ্রিয়। এ বছর প্রকাশিত হয়েছে ‘পাগলছাগল ও গাধাসমগ্র-৯’। আর সায়েন্স ফিকশন ‘বিমান রহস্য’ এবং ‘হাসির চার উপন্যাস’ সংকলন দুটিও দৃষ্টিনন্দনভাবে ছাপানো হয়েছে। এ ছাড়া কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছে ৬টি সায়েন্স ফিকশন ও ৫টি গোয়েন্দা উপন্যাসের সংকলন নিয়ে আরো দুটি গ্রন্থ। বর্তমানে আমার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭৬।

আমি প্রতিদিন লিখি। যতটুকু পারি, লেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় থাকে। সকালে বা যেকোনো সময় অফিস টাইমের বাইরে লেখা শেষ করি। পাশাপাশি আমি প্রতিদিন পড়ি। পড়ার অভ্যাস আমার বহু পুরনো। প্রতিদিন পড়া আর লেখা নিয়ে আমি থাকি। তবে একজন লেখক পরিকল্পনা ছাড়া এগিয়ে যেতে পারেন না। ঈদ সংখ্যাকেন্দ্রিক একটা প্রস্তুতি থাকে, বাইমেলা কেন্দ্রিক কিংবা সিরিয়াস কাজ করার একটা প্রস্তুতি সারা বছরই থাকে। সিরিয়াস কাজ প্রতিবছর সম্ভব হয় না। যেমন আমার ‘জননী’ উপন্যাসটি লিখতে আমার দীর্ঘ সময় লেগেছে। দেশ-বিদেশের অনেক উপন্যাস ও প্রাসঙ্গিক লেখা তার জন্য পড়তে হয়েছে। বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের জননী বা ‘মা’ শিরোনামের উপন্যাসগুলো মাথায় রাখতে হয়েছিল। এ ছাড়া বর্তমান শতাব্দীর বইগুলো পড়ে আমার মধ্যে উপলব্ধি হয়েছিল এ বিষয়ে লেখা যেতে পারে। সিরিয়াস কাজ করার ক্ষেত্রে এভাবে আমাকে প্রস্তুতি নিতে হয়। পাশাপাশি আবার পপুলার কাজ করতে হয়। পপুলার কাজ বলতে আমি বিচিত্র ধরনের বিষয়ে লিখতে পছন্দ করি। গোয়েন্দা উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন বা ম্যাজিক রিয়ালিজম কিংবা হাসির উপন্যাস- নানা বিষয় ও নানা আঙ্গিকে আমার লেখা চলে। ইভেন আমি প্রেমকাহিনী লিখতে পছন্দ করি। তবে তা সমাজজিজ্ঞাসা বিচ্যুত প্রেমকাহিনী নয়। অর্থাৎ আমার লেখার মধ্যে দেখবেন ভ্যারিয়েশন আছে আর একই বই একই বছরে একাধিক প্রকাশ করা হয় না। অর্থাৎ সিঙ্গেল ও সমগ্র একই বই রাখি না। সায়েন্স ফিকশনের কথা বলতে গেলে বলতে হয়- এটা আমার সেফ কল্পনার বিষয়; বাস্তব সমাজ-সংসার এখানে মুখ্য নয়। বাল্যকাল থেকে আমি সায়েন্স ফিকশন পড়তাম; কল্পনার পাখায় ভর দিয়ে উড়াল দিতাম। তারপর ভাবলাম এটা যেমন আমাকে ভাবায় কল্পলোকে নিয়ে যায় তেমনি শিশুকে ভাবতে শেখায়। তার ভাবনার গভীরতাকে বৃদ্ধি করে। সায়েন্স ফিকশন শিশুর কল্পনাকে জাগ্রত করে। এ কারণে আমার সায়েন্স ফিকশন লেখা। একজন শিশু এটা পড়লে তার ভেতর কল্পনার উন্মেষ ঘটবে। সে ভাবতে শিখবে। চিন্তা ও কল্পনার প্রসারণ ঘটবে তার। গোয়েন্দা কাহিনীও একই ধরনের সত্য ঘটনা বা কাহিনী; তবে তা কাল্পনিক হয়ে থাকে। একটা ঘটনা বা কাহিনী, ধরেন এই যে সাংবাদিকতা; সাংবাদিকরা গোয়েন্দার মতোই ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে খবর নিয়ে আসে। এক একজন সাংবাদিক গোয়েন্দা হিসেবেই চিহ্নিত। দেখা ও রহস্য উদঘাটন করা এই গোয়েন্দা কাহিনী পাঠকের ভেতর আলোড়ন সৃষ্টি করে। থ্রিলিং তৈরিতে গোয়েন্দা কাহিনী ভূমিকা রাখে এটাতো জানেন। পড়তে পড়তে এমন একটা স্তরে পৌঁছাবে যখন মনে হবে সে নিজেই গোয়েন্দা। যেমন আমার ‘ফটকুমামা’ চরিত্রটি ইতোমধ্যে গোয়েন্দা কাহিনীতে একটি চরিত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। ফটকুমামা পাঠকের কাছে মনে হবে সে নিজেই ফটকুমামা। পাঠককে টেনে নিচ্ছে কাহিনী- মনে হচ্ছে তার সে নিজেই গোয়েন্দা। এটাই লেখকের সার্থকতা। পাঠক গোয়েন্দাকে নিয়ে ভাববে। লেখা যদি না ভাবায় মনের খোরাক না মেটায় তাহলে লেখা হয় না। লেখা আনন্দ দেবে একইভাবে। পাঠককে আনন্দ দেয়ার জন্য লেখককে সচেষ্ট থাকতে হবে।’

৫. বস্তুত মোস্তফা কামাল একজন নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যকর্মী। প্রতিদিন লেখাপড়ায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে সাহিত্য সৃষ্টির শ্রমসাধ্য ধারা অক্ষুণœ রাখা সত্যিই অভিনন্দনযোগ্য। তিনি নিরন্তর চেষ্টায় বাংলা সাহিত্যের সেবা করে যাচ্ছেন। জনপ্রিয় ধারার সফল কথাসাহিত্যিক হয়েও বৈচিত্র্যে তাঁর সৃজনকর্ম বহুমাত্রিক এবং জ্ঞানের সব দিগন্তকে স্পর্শ করেছে। তাঁর সৃজনকর্ম আমৃত্যু সক্রিয় থাকুক এই প্রত্যাশা আমাদের।

:: মিল্টন বিশ্বাস

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj