সহবাস

শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

ঝিরঝির করে বৃষ্টি কুয়াশার মতো পড়ছে, রাস্তায় ল্যাম্প পোস্টের নিচে ইলেকট্রিসিটির আলোয় রুপালি ইলিশ স্বচ্ছ পলিথিন ব্যাগের ভেতর থেকেও জ্বল জ্বল করছিল। একটি নেড়ি কুকুর বেশ কিছু দূর রাস্তা মাজহার সাহেবের পেছন এসে রাস্তার পাশে থেমে গেল; মাথা আকাশ মুখ করে ঘেউ ঘেউ করে। গলির রাস্তাটা অন্ধকার, আলো নেই। বৃষ্টির পানিতে জামা, গেঞ্জি শরীরের সঙ্গে সেঁটে আছে। গলির রাস্তায় খানিক পানি জমেছে, মাজহার সাহেব লম্বা পা ফেলে মাড়িয়ে গেলেন। গ্রিলের বারান্দার ভেতর অনুভা হুইল চেয়ারে বসেছিল বাবার অপেক্ষায়

অন্যদিনের মতো আজকের আকাশটা এক রকম নয়, কেমন যেন হাহাকার ছড়িয়ে আছে। নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলে হৃদয়ের শূন্যতা দ্বিগুণ হয়, একটা অচেনা কষ্ট ধারাবাহিকভাবে ছেঁড়া ছেঁড়া বহুমুখী অশ্রæপাতের বর্ষণে অভিনব ঢেউ তোলে। গোলক ধাঁধায় তলিয়ে যেতে হয়, ভেঙেচুড়ে অনুভূতির দরজাটা হাট হয়ে খুলে থাকে অবিরত অজস্র কান্নাকাতর নগ্ন মুহ‚র্তগুলোতে। হঠাৎ করে এতটা অনুভূতির প্রবণ হওয়াটা ঠিক স্বাভাবিক ছিল না মাজহার সাহেবের। সে অতিসাধারণ মানুষ, সরকারি ছা-পোষা কেরানি। খোলা মাঠের পাশে শহুরে খেলার মাঠ, বৃষ্টির পানি ছোপ ছোপ হয়ে জমে গেছে। মাঠের পাশে সমান্তরাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর দেবদারুর গাছের সারি। অনেক সবুজ মাঠের ঘাস, অস্তরাগের স্বর্ণালি আজ মাঠের একপাশে অপার্থিব আলোয় রঙিন পটভূমি তৈরি করলে চেতনার সীমারেখা অতিক্রম করে এক অন্য রকম বেদনাবিধূর উন্মাদনা ভেতরটাতে এবড়ো-খেবড়োভাবে দাঁত বসায়। প্রকৃতি আজকে মাজহার সাহেব কে নিয়ে খেলছে। সে এলামেলো হাওয়ার মতো অনুভূতির দরজা খুলে সুনীল আকাশ দেখে অফিস ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে রাখে। সে নির্মমভাবে তাকিয়ে দেখে শহরের ছায়ামত বিকেলের ব্যস্ততা; বহুকাল ধরে এমন একটা মধ্যবিত্ত সুলভ আত্মচেতনা নিমজ্জিত ছিল জীবনের জটির বাস্তবতায়। নিজেকে অনেক দিন পর নির্লিপ্ত আর নির্ভার মনে হলো মাজহার সাহেবের। এই অন্তঃসার সংসারে বেঁচে থাকাটা আসলে একটা ভুতুড়ে ব্যাপার মাত্র, কোনো মূল্য নেই। অখণ্ড শূন্যতার অনাবিল আনন্দ নিয়ে বাড়ির রাস্তায় হাঁটা দেন তিনি, রাস্তার পাশে গাছগুলোর শিকড় বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গোড়াগুলো এবড়ো-খেবড়ো দেখায়। গাছেদের মতো মানুষের শিকড়ও কোথাও না কোথাও প্রোথিত থাকে, শেকড়ের টান, মহাকর্ষের বলের মতো কেন্দ্রভূমিতে জড়ো হয়। মাজহার সাহেবের নিস্তরঙ্গ জীবনে কোনো ওলোট পালোট নেই আছে শুধু উত্তাপবিহীন সহবাসের ইচ্ছা নিয়ে সংসার নামক রজ্জুর বন্ধনে নিজেকে জড়িয়ে রাখা। এটা কোনো বন্ধন নয় কিংবা মুক্তিও নয়, সে ইচ্ছে করলেই সংসারের রজ্জুগুলো আলগা করে নিয়ে ছাড়িয়ে নিতে পারবে নিজের নিঃসঙ্গ ছায়া কে। মানুষের পার্থিব জীবনের একমাত্র নিঃস্বার্র্থ সঙ্গী হলো তার ছায়া। ছায়াশরীর! যতদিন বেঁচে থাকবেন আপনার এই নাছোর বান্দা ছায়াশরীর কিছুতেই আপনার পিছু ছাড়বে না; অন্যদিকে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা পরিজন সবাই একটা মুহ‚র্তে মানুষকে ছেড়ে চলে যায়; কিন্তু ছায়া আপনার আমৃত্যু পর্যন্ত সঙ্গী হয়ে কবরে পর্যন্ত দেহের সঙ্গে লেপ্টে থাকবে। মাজহার সাহেব মনে মনে এসব কথাই ভাবছে, তাঁর ভাবনার জগৎ আজ হঠাৎ করে শৃঙ্খলা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে পূর্বাভাস ব্যতীত। একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খেলেন, সন্ধ্যাঘনায়মান। দেবদারুর ছায়ার মতো অন্ধকার ক্রমশ ঘনিয়ে আসলে মাজহার সাহেব কাঁচাবাজার আর সবজি বাজারের দিকে পা চালান। তাঁর ছায়া যথারীতি অনুসরণ করছে উৎসের রক্তে মাংসে গড়া মানুষটিকে। বাজারে ঢোকার মুখে হঠাৎ করে তার মনের পটপরিবর্তন হলো; খুব ইচ্ছে করছে বাজারের অনতিদূরে একটা নদীর উপরে ঝুলে থাকা সিমেন্টের ব্রিজের দিকে। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলে জোছনা উঠবে, ধবধবে স্নিগ্ধ কোমল হৃদয়ে সংক্রমণকারী দুর্বৃত্তায়ন জোছনা। জোছনা দুর্বৃত্তায়ন বটে! এই জোছনা রাতেই কত মানুষ মৃত্যুর আলিঙ্গনে নিজেকে উৎসর্গ করেছে। ব্রিজের একপাশে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, মাজহার সাহেব। আর কিছুক্ষণ পরেই অসীম গৌরবর্ণ নিয়ে হাস্যোজ্জ্বল চাঁদ তৎপর হবে আকাশের সামিয়ানার ওপর। ধীরে ধীরে বেমালুম ভুলে যান তিনি বাজারের কথা; সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফেরার কথা, স্ত্রীর কথা, একমাত্র কন্যা অনুভার কথা কিংবা অসুস্থ মা রাহেলা বেগমের ওষুধের কথা। এখন চোখের সামনে তার সীমাহীন জোছনা বিধৌত একটা ভরা নদীর যৌবনসিক্ত দেহ, কোমর বাকিয়ে উত্তর দিকে যেন শৈশবের খোঁজে ছুটে চলছে কুল কুল করে। কখন খলবলিয়ে উঠে নদীর স্রোত, অনেকটা শান্ত কিন্তু অদ্ভুত ছন্দ আছে ছুটে চলার মধ্যে কেউ যেন নদীর পায়ে অলৌকিক সঙ্গীতের নূপুর পরিয়ে দিয়েছে তার পায়ে। দূর-দূরান্ত থেকে গভীরভাবে কানপাতলে এই শব্দ আক্রান্ত করে, মন উদাস হয়, এক বারের জন্য হলেও সাধ জাগে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে বাউল হতে। প্রকৃতি তো পৃথিবীর সবচাইতে বড় বাউল। ব্রিজের নিচে নদীর পাড়ে বালুমাটি চিকচিক করছে রুপোর থালার মতো। চাঁদের মাদকতায় চূড়ান্ত বুঁদ হওয়ার আগে তাঁর মোবাইল বেজে উঠে; গভীরতার তাল কেটে যায়। মেয়ে মোবাইলে কল করেছে। অগত্যা মোবাইলে মেয়েকে একটা খুদে বার্তা পাঠিয়ে আবার আঁতেল করা জোছনা রোদে অবলীলায় ছায়ার সঙ্গী হলো মাজহার সাহেব। নিজের ছায়াটা পার্থিব দূরত্ব অতিক্রম করে ঠিক শরীরের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত গভীরতা নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেল, ঠিক যেন তিনি তাঁর ছায়ার মুখোমুখি। ঈষৎ শীতল বাতাস শরীরে নিখুতভাবে অনুভূতির হুল ফুটায়। কয়েকটা কবিতার লাইন আজ অনেক দিন পর করোটির গোপন অন্ধকারে অনুরণিত হলো; মনে মনে আবৃত্তি করলেন ‘‘জল থেকে উঠে আসে আমার নিরাকার ছায়া/এখন আমি বীজের ভেতর যীশু খ্রিস্টের মত/করাল গ্রাসে অভিন্ন শূন্যতা নিয়ে খেলি’’। বাতাস বইছে, শীতল বাতাস জন্মান্ধের মতো এদিক ওদিক অবলীলায় বায়বীয় জোছনা রাতে স্মৃতির কুয়াশায় ভর করে মাজহার সাহেব কে পরাভূত করে। লাগামহীন ভাবেই রুপালি মেঘের মতো উড়ে উড়ে স্মৃতি ডানা ঝাপটায়; অগত্যা ছায়াটা নাড়াচাড়া করলো শূন্য দেহে। মাজহার সাহেব এখন শূন্য নয়, লিপির স্মৃতিগুলো আগলে আছে তাকে, তাঁর চারপাশে লিপির শরীরের গন্ধ বিষণœতা ছড়াচ্ছিল। আজ থেকে এমন এক জোছনা ভেজারাতে লিপির শরীরের গন্ধ তার শরীরে উত্তাপের আগুন ডানা প্রসারিত করে ভয়ঙ্কর আকর্ষণ সৃষ্টি করেছিল। হায় লিপি! তার জন্য এক অপূর্ব মাদকতাপূর্ণ ব্যথা এখনো মনের মধ্যে জিইয়ে রেখেছে, বিরহে সে রহে। বিশ বছরের পুরাতন স্মৃতি, যে তাকে এতদিন পরেও এভাবে টেনেহিঁচড়ে খাঁচা থেকে বের করেছে, তা বোধহয় এমন জোছনাময়ী রাত না থাকলে সম্ভব হত না। হাওয়ায় ভাসতে থাকে লিপির মুখাবয়ব; গন্ধটার এখনো প্রবল টান আছে। আচ্ছন্নভরা গন্ধটা তীব্রতর হওয়ার আগেই আচানক ছায়াটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। জোছনা গাঢ় হয়, আশ্চর্যভাবে মায়া ছড়িয়ে পড়ছে প্রকৃতির শিরা-উপশিরায়। মাজহার সাহেব ও তার ছায়াশরীর পরস্পরকে হঠাৎ খুঁটিয়ে দেখছে। কানের কাছে বাতাসের ফিসফিস শব্দ জিরাফের গলার আওয়াজের মতো মনে হচ্ছিল, শরীরে পেঁচিয়ে আছে শরীরের ছায়াটা। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বাতাসে উড়ে উড়ে চারপাশে ডানা খসিয়ে নামতে থাকে। আজ অনেকদিন পর মাজহার সাহেব বৃষ্টিতে ভিজছে; তার ছায়াশরীরও বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে নির্মমভাবে। বৃষ্টির জল মাটিতে পড়লে ভেজামাটি থেকে এক ধরনের সোঁদাগন্ধ স্পর্শকাতরতা নিয়ে মুখরিত করে চারপাশ, গাছেরা উল্টেপাল্টে খুনসুটিতে মত্ত হয়। প্রায় ভিজতে ভিজতে মাজহার সাহেব হেঁটে যাচ্ছেন মাছ বাজারের দিকে। হঠাৎ বৃষ্টির পীড়াপীড়িতে যারা বৃষ্টিতে ভিজতে জানে না, তারাও দিগি¦দিক ছোটাছুটি করে আপাতত গন্তব্যে। বৃষ্টির ভারী ফোঁটা আলোয় ঝলমলিয়ে জটলা পাকায় বাতাসে; বাতাসে সোঁদাগন্ধের রেণু ভেসে থাকে অনেকক্ষণ। মাছ বাজারের নিরাপদ ছাউনির তলায় দাঁড়িয়ে ইলিশ মাছের আঁশটে গন্ধ তুমুলভাবে তাকে ব্যাপ্ত করলো। সে নিজের ছায়াশরীরের খোলস থেকে বেরিয়ে মৃত ইলিশের চোখে চোখ রাখে। পুরোপুরি পরাবাস্তবতার খোলস ছাড়িয়ে ইলিশ মাছের ভাজা সুঘ্রাণ তাঁর তড়পানো মনে অমৃতের স্বাদ জাগায়। আটপৌরে জীবন তার, টানাপড়েনের সংসার। আর্থিক অস্বচ্ছলতার ঘেরাটোপে বন্দি তাঁর সংসারের চাওয়া পাওয়ার সূত্রাবলি। তাঁর সংসারে কি পেয়েছে অনুভার মা সুলতানা; সুলতানা আদৌ কি তার স্বামীকে বুঝতে পারে। হয়তো সে বোঝাপড়া বিছানার সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ; হয়তো বা! সুলতানার কাছে মাজহার সাহেব নিরেট অতিসাধারণ একটা ছাপোষা কেরানি; এর বাইরে কিছু নয়। একটা নির্দিষ্ট সীমানার ভেতর তাঁর বসবাস, বিচরণ, যেখানে নেই কোনো অপার্থিব কিংবা অলৌকিক জোছনার আদিম মাদরতা, অমৃতের তৃষ্ণা। অনুভা তার বাবার মতো মন পেয়েছে, সে জোছনা ভালোবেসে, ভালোবেসে বৃষ্টি। বৃষ্টি হলে সে অনুভবের দরজা খুলে দুহাতে স্বপ্নমাখে। বাবার মতো তার অস্তিত্ব জুড়ে প্রকৃতির সঙ্গে মাখামাখি সংসার, জলের সংসার, দ্রোহের সংসার। মাজহার সাহেব বাসায় ফেরার সময় একটা বড় ইলিশ মাছ কেনে, অনুভা অনেক দিন ধরেই বৃষ্টির দিনে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে ভুনা খিচুড়ি খেতে চেয়েছিল। অনুভার মুখটা স্পষ্টভাবে কল্পনা করে সে, এই মুখের ভেতরে কত গভীর কান্না বরফ হয়ে আছে।

দুই.

ঝিরঝির করে বৃষ্টি কুয়াশার মতো পড়ছে, রাস্তায় ল্যাম্প পোস্টের নিচে ইলেকট্রিসিটির আলোয় রুপালি ইলিশ স্বচ্ছ পলিথিন ব্যাগের ভেতর থেকেও জ্বল জ্বল করছিল। একটি নেড়ি কুকুর বেশ কিছু দূর রাস্তা মাজহার সাহেবের পেছন এসে রাস্তার পাশে থেমে গেল; মাথা আকাশ মুখ করে ঘেউ ঘেউ করে। গলির রাস্তাটা অন্ধকার, আলো নেই। বৃষ্টির পানিতে জামা, গেঞ্জি শরীরের সঙ্গে সেঁটে আছে। গলির রাস্তায় খানিক পানি জমেছে, মাজহার সাহেব লম্বা পা ফেলে মাড়িয়ে গেলেন। গ্রিলের বারান্দার ভেতর অনুভা হুইল চেয়ারে বসেছিল বাবার অপেক্ষায়। মাছের ব্যাগটা স্ত্রীকে দিয়ে সোজা চলে গেলেন বাথরুমে। বালতি ভর্তি পানি; মগ ভর্তি পানি দিয়ে পায়ের কাদামাটি পরিষ্কার করেন। মনে হয় জিওল মাছের খলবলানি বাথরুমের ভেতর। মাজহার সাহেবের মা জড় মানুষের মতো বিছানায় পাশ শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আত্মকথনে মগ্ন। বাসার উঠোনটা জল কাদা অন্ধকারে মাখামাখি। সামান্য বৃষ্টিতে কাদা জমে ডালিম গাছের গোড়ায়। ভেতরের বারান্দার গ্রিলের ছায়া উঠনের উপর ঝাপসা হয়ে জলছায়ার অবিশ্রাম রহস্যজাল আঁকড়ে ধরেছে মাটির সঙ্গে। চায়ের কাপে চুমুক দেন মাজহার সাহেব, হিমহিম উত্তুরে বাতাস ভাঙা প্রাচীর টপকিয়ে বারান্দার চারপাশ জুড়ে হাতড়াতে থাকে। ইলিশের গন্ধ রান্নাঘর থেকে তেড়েফুঁড়ে এ দিকেই ছুটে আসছে; ফুসফুস ভোরে নিশ্বাস নেন তিনি। পেটে ক্ষুধাটা খচখচ করছে, তাকে তাড়া করে অনবরত রাতের খাবারের জন্য। অনুভা হুইল চেয়ারে বসে এঘর থেকে ওঘর যায়। মনে হয় মেয়েটার জন্মই হয়েছে হুইল চেয়ারে বসে থাকার জন্য। ঝুপঝুপে দুটি পাতাবাহারের গাছ বারান্দা লাগোয়া, বাতাসে কাঁপছে। মাজহার সাহেব মায়ের ঘরে যান; রাহেলা বেগম এখন বেওয়ারিশ লাশের মতো কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। রাহেলা বেগমের বিছানায় পেচ্ছাবের বিশ্রীগন্ধ চাউর হয়ে আছে। হঠাৎ মায়ের মুখের একপাশটা শিল্পীর অতিপ্রাকৃত ক্যানভাসের ভগ্নাংশের মতো ধূসর আর দীঘল মনে হয়। মানুষ এক সময় একা হয়ে যায়, এক প্রকার নিরুপায় নির্জীব হয়ে সরীসৃপের মতো অন্ধকারের ভেতর প্যাঁচ মেরে থাকে। রাহেলা বেগমের ঘরে পলেস্তার এক পাশে পোড়া ফুলে উঠা চামড়ার মতো লটকে থাকে; যে কোনো মুহ‚র্তে ঘরের মেঝেতে খসে পড়বে হুরমুড়িয়ে। ভাজা ইলিশের গন্ধে সমস্ত বাড়ি চাউর হয়ে গেলে; একটা মন খারাপের তাড়না মাজহার সাহেবকে সেলাই ফোঁড়াই করে। রাহেলা বেগম আজ এক মাস হলো ভাত খায় না, শুধু দুধ, ফলের রস আর সুজি খেয়ে থাকে। রাতে খাবার টেবিলে অনুভা বাবার পাশে বসে; ইলিশ মাছের তেল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে সে মুখ ফসকে বলেই ফেলল বহুদিন পর আজ ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাচ্ছি। মাজহার সাহেবের ভেতরটা মুহ‚র্তে ফাঁকা বিরাণ ভূমি হয়ে যায়। খুব সাধারণ আটপৌরে জীবন তার কিন্তু যেখানে মনের শান্তি নেই, অহর্নিশ পঙ্গু মেয়েকে নিয়ে একটা নীল বেদনা ছায়ার মতো প্রজাপতির ডানা উল্টে থাকে। এঁটো হাত দিয়ে শুধু প্লেটে ভাতের লোকমা চালাচালি করেন তিনি। এই উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে মাজাহার সাহেবের মতো ছাপোষা সরকারি চাকরিজীবী দের ইলিশের স্বাদ জিহ্বায় বিষাদ লাগে; তার এক ইলিশ কিনতেই সপ্তাহের বাজারের টাকা ফুরুৎ করে উড়ে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। তবুও সন্তানের মুখে একটু হাসি, কুয়াশা কুয়াশা ভরা ভালোলাগার চরম মূল্য দিতে নিম্নœমধ্যবিত্তদের এভাবেই সুখ কিনতে হয়। বৃষ্টি থেমে গেছে একটা ভাপসা গরম গহীন জলের মতো নিমজ্জিত করে রাখে এই শহরকে, এই রাতকে কিংবা মাজহার সাহেবকে। তাঁর শরীর চুইয়ে চুইয়ে নোনাঘাম বিশ্রামের সুখটুকু খসিয়ে রাখে, মেঘেদের ডানায় কোনো বাতাস নেই। হঠাৎ মাজহার সাহেব স্পষ্ট বুঝতে পারলো গলায় কাঁটাটা এখনো নামেনি। ইলিশের চিকন কাঁটা কোন ফাঁকে যেন গলার নিচে অন্ননালীতে পৌঁছে খচখচ করছে। কাউকে কিছু বলে না। তীব্র অস্বস্তি নিয়ে তিনি বারান্দার হাতল ভাঙা চেয়ারে বসে থাকেন। কিছুক্ষণ কাঁটাটাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করলেন; অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে মনের লাগামটা টেনে নোঙর ফেলতে চান। রাতের আকাশ জোছনার তীব্র আলোয় নিশাচর পাখির মতো জেগে আছে। আজ অনেক দিন পর এই জোছনা তার মধ্যে যে সুতীব্র হাহাকার তৈরি করছে; তা যেন সুচের আগার মতো হৃদয়েকে ক্ষতবিক্ষত করে, চরম শূন্যতায় দুলতে দুলতে জীবনের মূল উৎসকে অনুসন্ধান করতে চান তিনি। ইদানীং মৃত্যু চিন্তাটা তাঁর ভেতর একটা খোঁয়ারি বোধ উসকে দিয়ে অস্তিত্বের মায়াজালকে বিক্ষিপ্ত করে। বারান্দার বাইরে গাছেদের ঝুলে ঝুলে থাকা ছায়াগুলো ক্রমশ তৎপর হলে, মনের মধ্যে আবার ইলিশের কাঁটাটা ফিরে আসে। মনে হলো কোনো অলৌকিক বক এসে যদি তার লম্বা ঠোঁট দিয়ে গলার কাঁটাটা তুলে আনতো; কত আরাম আর স্বস্তি ফিরে আসতো মুহ‚র্তে। হঠাৎ একটা ভাবনা তাকে দুমড়ে মুচড়ে দিল; অনুভা তার একমাত্র সন্তান। পঙ্গু অনুভা কি তাঁর জীবনে একটা কাঁটার মতো! যার ভবিষ্যৎ চিন্তা সব সময় তাকে চিতার লেলিহান আগুনের মতো দগ্ধ করে, ওর স্বাভাবিক জীবন থাকলে এ বয়সেই বিয়ে-থা দিত কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে মেয়েটার কি হবে? কে তার মেয়েকে বিয়ে করে চিরজীবনের জন্য দায়িত্ব নিবে? অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস চারপাশের জেগে থাকা ধূসর অন্ধকারকে আরো গাঢ় করলো। আকণ্ঠ শূন্যতা নিয়ে বসে আছে মাজহার সাহেব। তিনি জীবনানন্দের জীবন-মৃত্যু নিয়ে ভাবনার কথা ভাবেন ‘আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝতে চাই আর? জানি না কি আহা! সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মত এসে জাগে ধূসর মৃত্যুর মুখ…’ । কাঁটাটা এখনো খচখচ করে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, ঠাওর হয় গলার নিচে। মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়েন তিনি। চেয়ারের পাশে তার শরীরের উৎস ছায়া প্রলম্বিত হয়ে লেপ্টে আছে সাদা নোনাধরা দেয়ালে। চোখে তন্দ্রা আসে ক্ষাণিকটা, রাত গাঢ়। শরীর নিংড়ানো ঘাম আর নেই, বাতাস খেলছে। আবছা আলোর বিছানায় প্রায় অর্ধ উলঙ্গ হয়ে শুয়ে আছে সুলতানা; তার অনেক গরম। সুলতানার পাশে নীরবে শুয়ে পড়েন তিনি কিন্তু আশ্চর্য ঘুম ঘুম ভাবটা আর নেই। ইদানীং ধু ধু সময়ে পার হয়ে যায় বিছানার সম্পর্ক। মাজহার সাহেবের ছায়াটা এখন কোথায়? নির্বাক বিছানায় পাশ ফেরেন তিনি, এখন বড্ড অস্বস্তি লাগছে ছায়াটার উপস্থিতি। মানুষের একান্ত মুহ‚র্তগুলোতে ছায়া সঙ্গী না হওয়াই শ্রেয়। তিনি ঘরের লাইট অফ করে দেন। বিছানায় মশারির ভেতর জলজ্ব্যান্ত এক অন্ধকার খোলস উল্টে দাঁত কেলিয়ে হাসছে, মাজহার সাহেব চূড়ান্ত বিস্ময় নিয়ে নিজের ছায়াটাকে খুঁজতে থাকেন। নিঃশব্দের মুখরতায় ঘাই বসাছিল সিলিং ফ্যানের কচকচ শব্দ; ভয় তার আব্রু খসিয়ে খলবল করছিল। রাতের রহস্য ডিঙিয়ে আবার ঝুলে থাকা জীবনটা একটু পেলবতা পেতে চায়, একটু জলের কাছে… ব্যর্থ টানে ব্যস্ততা ফিরে আসে। ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে তাই মাজহার সাহেবের অন্ধকারে দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়; তাঁর এই নিঃসঙ্গ সময়ে ছায়াটাকে খুব প্রয়োজন। শরীর গুলিয়ে আসে, বমি হবে। ক্ষুধার্ত অন্ধকারে মেঝেতে গলগল করে বমি হয়, বোধহয় কাঁটাটা বেরিয়ে গেছে। নির্ভার শরীর নিয়ে অন্ধকারে ঘরের মেঝেতে মাজহার সাহেব স্বস্তি ফিরে পান; ওপাশের মানুষটা এখনো গভীর ঘুমে থই থই হয়ে আছেন। কি এক বিস্ময়ে মাজহার সাহেবের ছায়াটা খিলখিল করে হেঁসে উঠলো। :: লিটন মহন্ত

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj