ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের বিকল্প নেই

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

কোনো জাতির জীবনই একটানা একভাবে চলে না। চলতে চলতে কোনো এক সময় সর্বগ্রাসী বিপদ আসতেই পারে। জঙ্গল থেকে লোকালয়ে হিংস্র বাঘ, বন্যহাতি নেমে আসতেই পারে। তখন কি ভয়ে বিবরে লুকালে বন্যহাতি রেহাই দেবে? হিংস্র জন্তুকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে না দাঁড়ানো পর্যন্ত মানুষের জনপদ নিরাপদ হয় না। আজ ইতিহাসের জঙ্গল থেকে হিংস্র শ্বাপদ জন্তু বাঙালি জাতির লোকালয়ে নেমে এসেছে, যেমন নেমে এসেছিল ১৯৭১ সালে, ১৯৭৫ সালে, ২০০১ সালে। প্রতিটি বিপদসঙ্কুল স্তরে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকবেলা করে এগিয়ে এসেছে। বাঙালির চেতনাকে হত্যা করা কিছুতেই সম্ভব হয়নি। আজ শাহবাগের তরুণরা গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছে, ‘আমাদের ধমনীতে শহীদের রক্ত, এই রক্ত পরাজয় মানে না’; ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে ভয় করি না মরণে’ ‘এসো ভাই, এসো বোন, গড়ে তুলি আন্দোলন।’

বাঙালি জাতিকে যদি এই বোমার আগুন থেকে, পেট্রলবোমার হাত থেকে, সন্ত্রাসের হাত থেকে, জঙ্গি মৌলবাদীদের হাত থেকে বাঁচাতে হয় তাহলে সবাইকে শাহবাগের তরুণদের কণ্ঠে উচ্চারিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মহামতি লেনিন বলেছেন, ‘বিল্পব যখন আসে তখন কাউকে বাদ দিয়ে আসে না।’ আর মধ্যযুগের শেষ পর্বের কবি ভারত চন্দ্র বলেছেন, ‘মহল পুড়িলে দেবালয় এ্যাড়ায় না।’ তাই বিল্পবী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য।’ কেউ তামাশা দেখে দিন কাটাতে পারবেন না, মৌলবাদ জঙ্গিবাদের আগুন আপনাকে রেহাই দেবে না। এর চেয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হোন। না হলে আগুন নিভবে না। এ আগুন মৌলবাদের, জঙ্গিবাদের, এ আগুন জামায়াত-শিবির-তালেবানের। এ আগুন আপনার সন্তানের, আপনার ভাই-বোনের, আপনার পিতা-মাতার জীবন কেড়ে নিচ্ছে। আপনি সাধারণ মানুষ, আপনি কোনো জঙ্গিবাদ সমর্থন করেন না, এ জন্য আপনাকে পুড়িয়ে মারছে সপরিবারে। আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, এ জন্য আপনাকে পুড়িয়ে মারছে।

শাহবাগ থেকে তরুণরা স্লোগান দিয়ে বলছে, ‘জামায়াত নিয়ে গণতন্ত্র হয় না, হবে না।’ তরুণরাই দেশ স্বাধীন করেছে, গণঅভ্যুত্থান করেছে। এই ভাষা আন্দোলনের মাসেই তরুণরা শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। তাই তরুণদের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাতে হবে, তরুণদের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রতিরোধ গড়ে তুলুন, নিরীহ, অসহায়ভাবে আগুনে আত্মাহুতি দেবেন না।

ঐক্যই আমাদের মাতৃভাষা রক্ষা করেছে, ঐক্যই স্বৈরাচার প্রতিরোধ করেছে, পাকিস্তানিদের বিদায় করেছে, আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আমাদের বিপদ ত্বরান্বিত হয় ঐক্যের গাঁথুনিতে ফাটল ধরলে। ঐক্য না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিপন্ন হয়।

একটি জাতীয় পত্রিকায় দেখেছি, শতাধিক বিদেশীয় এই হট্টগোলের মধ্যে ঢাকায় নেমেছে। তারা অধিকাংশই পাকিস্তানি নাগরিক। তারা আইএসআই-এর মিশন নিয়ে, জামায়াত-শিবির নিয়ে নাশকতার কাজে নেমেছে। তারা বাংলাদেশে অবস্থানরত মায়ানমারের জঙ্গি রহিঙ্গাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। নাশকতা চালিয়ে বাংলাদেশকে ধ্বংসের অতলে পাঠাতে চায়। তারা অবস্থান নিচ্ছে মাদ্রাসাগুলোতে, সার্বভৌমত্ব বিরোধী জঙ্গিদের তারা ২৪ ঘণ্টা উসকানি দিয়ে যাচ্ছে, টাকা ছড়াচ্ছে। বোমার সরঞ্জাম কিনে দিচ্ছে, বাংলাদেশের মানচিত্র পুড়িয়ে দেয়ার ইন্ধন দিচ্ছে। এদের রুখতে হবে। পাকিস্তানিরা আমাদের পিছু ছাড়েনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে পাকিস্তানিদের হাত ছিল, জেলহত্যার পেছনে এমনকি ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পেছনেও পাকিস্তানিদের আইএসআই-এর হাত ছিল। সাম্রাজ্যবাদও আমাদের বন্ধু নয়, ১৯৭১ সালে এবং ১৯৭৫ সালেও সাম্রাজ্যবাদ আমাদের বন্ধু ছিল না। ধর্মান্ধ অপশক্তি কখনো আমাদের ছাড় দেবে না। দরকার হলে, সুযোগ পেলে এরা দেশের ১৬ কোটি মানুষ হত্যা করবে ১৯৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে। শাহবাগের তরুণরা স্লোগান দিয়েছে, ‘আমার মাটি, আমার মা, পাকিস্তান হবে না।’ দেশকে বাঁচাতে হলে, বোমাবাজ রুখতে হলে তরুণদের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাতে হবে। তরুণদের শক্তির জোগান দিতে হবে। বাংলাদেশে আজ দুই পক্ষের লড়াই চলছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং বিপক্ষের। শাহবাগের তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের মশাল হাতে নিয়ে নামছে। লাখো শহীদের আত্মদান যাতে আবর্জনার স্ত‚পে চাপা না পড়ে সে জন্য ১৯৭১-এর চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামতে হবে। জঙ্গি-জামায়াত-শিবির অনেক মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, অনেক মানুষ আগুনে পুড়িয়েছে, অনেক মানুষকে পঙ্গু করেছে, দগ্ধ করেছে, কয়লা করেছে, অনেক সংসার ভস্ব করেছে, বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছে। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার মন্ত্র ব্যতীত, মুক্তিযুদ্ধের দ্রোহের আগুন ব্যতীত এই জন্তু, এই হায়েনা, এই ডাইনোসর, এই ইবলিস, ফেরাউন, নমরুদ রোখা যাবে না। তাই ঐক্য চাই, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। অথচ বেদনার সঙ্গে লক্ষ করেছি, আরামপ্রিয় একটি মহল দুই নেত্রীকে এক পাল্লায় দাঁড় করিয়ে, দুজনের সমান দোষ ধরে নানা নসিহত শোনাচ্ছেন জাতিকে। এসব হচ্ছে জামায়াত-শিবির-জেএমবি-জঙ্গিদের অপশন দেয়ার কৌশল। বিএনপি-জামায়াত গত জানুয়ারি থেকে বোমাবাজি শুরু করেনি। হাওয়া ভবনের গণহত্যার নাশকতা অনুসারে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে। যারা পাণ্ডিত্যের বহর দেখিয়ে বলেন আওয়ামী লীগের কোনো লোকজন মারা যায় না, তাদের চোখ-কান বন্ধ না খোলা তা বুঝতে পারি না। ২০০১ সালের তাণ্ডব ২৬ হাজার নৌকার ভোটার হত্যা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা কিবরিয়া সাহেব, আহসান উল্লাহ মাস্টার, মমতাজউদ্দিন, আইভি রহমান, মনুছুরুল আলমকে হত্যা করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাংলাভাই ধরে ধরে মুক্তিযুদ্ধের লোকদের হত্যা করে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখত।

যে কোনো সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল-অবরোধ হতেই পারে। এটা রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু অধিকার ভোগ করার সঙ্গে কি কর্তব্যবোধ জড়িত নেই? মানুষ পোড়ানো কোন ধরনের রাজনৈতিক অধিকার? জনতাকে প্রতিপক্ষ করা কোন ধরনের আন্দোলন? ব্যর্থ আন্দোলনের দায় জনগণ বহন করবে কেন? বিএনপির পক্ষ থেকে হরতাল ডাকা হলেই জামায়াত-শিবিরের বোমাবাজির উৎসব শুরু হয়। সার্বভৌমত্ব বিধ্বংসী বোমাবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প যারা ভাবেন তারা সুবিধাবাদেরই চাষাবাদ করছেন।

মাহমুদুল বাসার : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

বায়ুদূষণ নীরবে কেড়ে নেয় প্রাণ

মোস্তাফা জব্বার

ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

সমৃদ্ধির চতুর্দশ বর্ষপূর্তি

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

ছাত্ররাজনীতির সেকাল একাল

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ছাত্ররাজনীতি

মাহমুদুর রহমান মানিক

সঠিক পথে চলুক ছাত্ররাজনীতি

মাহমুদুল হক আনসারী

বুয়েটে শিক্ষার পরিবেশ ফিরুক

Bhorerkagoj