বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লাঠিচার্জ, এক স্কুল ছাত্রের মাথার খুলি ফেটে গেল…

বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

’৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভাঙার মিছিলের দ্বিতীয় দলে ছিলেন শামসুল হুদা। উপস্থিত থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন ’৪৮-এর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে জিন্নাহর উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে- এ ঘোষণারও। ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ার কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ফলাফল বাতিল করে তাকে সিএসপি সার্ভিস থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার জন্য ২০১৪ সালে পেয়েছেন একুশে পদক।

শামসুল হুদা ১৯৩২ সালের ১ ডিসেম্বর ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এজন্য কারাবরণও করেছেন। ১৯৫৭ সালে জনসংযোগ অধিদপ্তরে যোগদানের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু। দীর্ঘদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে ১৯৮৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। বর্তমানে একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ‘এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে কর্মরত।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ১৯৪৮-এর ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রদত্ত সংবর্ধনা সভায় যখন জিন্নাহ বলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’, তখন উপস্থিত অনেকেই না, না বলে প্রতিবাদ করেন। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ সাহেব আবারো বলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়’। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদের না, না চিৎকারে জিন্নাহ সাহেব অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন এবং বক্তব্য তাড়াতাড়ি শেষ করে চলে যান। এই সভায় উপস্থিত থেকে আমিও জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিবাদ করি। এরপর ভাষা আন্দোলন ক্রমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন গতি লাভ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন চত্বরে (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগ) এসে জমায়েত হতে শুরু করে। বাইরে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পুলিশ বাহিনী ও ইপিআর বাহিনী অবস্থান নিয়েছিল সকাল ৭টা থেকেই। সকাল ১০টার দিকেই কলাভবন প্রাঙ্গণে আমতলায় জনাব গাজীউল হকের সভাপতিত্বে সভা শুরু হলো। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা শামসুল হক উপস্থিত, সঙ্গে খন্দকার মোশতাক আহমেদ। শামসুল হক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের পূর্ব দিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানালেন যে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে মতিন ভাই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে ছাত্র সমাজের যুক্তি দিলেন। সভা শেষে ছাত্ররা গ্রুপে বিভক্ত হয়ে দলে দলে রাজপথে নেমে এল। বাইরে সশস্ত্র বাহিনী ছাত্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায়। আমি দ্বিতীয় দলে থেকে লাহার গেট অতিক্রম করেছিলাম। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লাঠিচার্জ। লাঠির আঘাতে স্থানচ্যুত হতেই আমার পূর্বের স্থানে যে এক স্কুল ছাত্র এসে পড়ল তার মাথার খুলি লাঠির আঘাতে ফেটে গেল এবং সে ভূপাতিত হলো। আমাদের পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে নিল। পুলিশ ভ্যান থেকে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেলাম। পুলিশ ভ্যানে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল (ব্যাম্বো শেড)- বর্তমানে শহীদ মিনার পার হতেই প্রচণ্ড গোলাগুলি দেখে গেলাম। কী হলো বুঝলাম না। পুলিশ ভ্যানে আমাদের দলকে লালবাগ থানায় নেয়া হয়। তারপর সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। ঘটনার পরে অন্য যারা জেলে গেলেন এবং পরবর্তীতে জেলখানায় আমাকে যারা দেখতে গিয়েছিলেন তাদের থেকে শুনতে পাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, সালাউদ্দিন, রফিকউদ্দিন ও আবদুস সালাম এবং আরো অনেকে আহত হওয়ার সংবাদ। জেলখানায় দলে দলে অনেক ছাত্র পৌঁছে। প্রথম অবস্থায় জেলখানার হলরুমে একসঙ্গে রাখার কারণে অনেকের সঙ্গে দেখা। কিছুদিন এক রুমে জনাব হাবিবুর রহমান শেলী (উত্তরকালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা), কালিয়াকৈরের জনাব শামসুল হক, তৎকালীন এস এম হলের ভিপি (পরবর্তীকালে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত), জনাব এ আই এম তাহাসহ ছিলাম। পরে একটা সেলে আমাকে একাকী রাখা হয়।

২১ ফেব্রুয়ারি এই মহান দিনই আমাদের শহীদ দিবস। অমর একুশে। জগৎবাসীর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিনে আমাদের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় যারা অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন সেই বীর ভাষা শহীদদের এবং যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কঠোর সংগ্রাম করে নির্যাতিত হয়েছেন, দেশের স্বার্থে আত্মত্যাগ করেছেন, সেই নির্ভীক ভাষা সৈনিকদের গভীরভাবে স্মরণ করি। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। নতুন করে স্মরণ করি এ দেশের মানুষের মরণজয়ী ভাষা সংগ্রামের কথা, যে সংগ্রামের ফলে, যে আন্দোলনের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে ১৯৭১ সালে।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj