রাজনীতি কোনো মৃত্যুকেও নিরাপদ রাখছে না

রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

রবীন্দ্রনাথকে আমার সব সময় মনে পড়ে। বাঙালির জীবনে এমন কবি ও দার্শনিক দ্বিতীয় কেউ নেই। খণ্ডিতভাবে না দেখলে তুমিই শ্রেষ্ঠ বাঙালি হে কবিগুরু। জীবনের আনন্দে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে চলা রবি ঠাকুর পুত্রশোকে হতবিহŸল হওয়ার পরও লিখেছিলেন ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহে দহন লাগে/ তবু আনন্দ তবু শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে’। ভাগ্যিস আজ তিনি বেঁচে নেই। বাংলাদেশের বাঙালি যারা প্রাণ তুচ্ছ করে তাঁর গানকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিয়েছে তাদের শোক মাতম ও শান্তিহীনতায় তিনি নিশ্চয়ই বেদনার্ত হতেন। বলে রাখি কোনো মৃত্যুই শোকের বাইরে কিছু না। যে পরিবারের ডাকাত স্বামীটি মারা গেলে পাড়াময় উল্লাস ও শান্তি ফিরে আসে সে পরিবারের বিধবা স্ত্রীও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন। তার সন্তানরা শোকসন্তপ্ত হয়ে থাকে সারাজীবন। হিটলার মুসোলিনি ওসামা বিন লাদেন কারো মৃত্যুই সে অর্থে শোকহীন নয়। তবে শোকের প্রকারভেদ আর তার তাৎপর্য বুঝতে না পারলে শোক বেদনাবাহী হওয়ার পরিবর্তে মাতমের হয়ে ওঠে। তার সঙ্গে যদি কুবুদ্ধি ও রাজনীতি যোগ হয় তো আর কথা কোনো কথা থাকে না।

খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্রের মৃত্যু তাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের জন্য হৃদয়বিদারক, হওয়ারই কথা। এই ছেলেটি বড় ভাইয়ের মতো প্রগলভ বা বাকওয়াজ ছিল না। নিন্দুকেরা তার বিরুদ্ধে মাদক সেবনসহ নানা জাতীয় অপবাদের কথা বলে, আমি ভাবি আহা। যে দেশের মানুষ সারাদিন বিভিন্ন নেশায় বুঁদ, যে দেশের কেউ টাকার নেশায় ডাকাত, কেউ চুরির নেশায় মহাজন, কেউ সম্পদের নেশায় মাতাল, কেউ খ্যাতির নেশায় আদর্শভ্রষ্ট কেউবা ক্ষমতার নেশায় পাবলিকের ঘরে আগুন দেয়, মানুষ মারে, সে সমাজে এ জাতীয় মাদক-টাদক কি আসলেই কোনো নেশা? আর এগুলো যারা নেয় তারা তো এক ধরনের আত্মবিধ্বংসী। নিজেকেই নিঃশেষ করে দেয় তারা। যে মানুষ জ্ঞানত বা অজ্ঞানে নিজের ক্ষতি করে তার পেছনে করুণ ইতিহাস, বেদনা বা পরাজয়ের কারণ লুকিয়ে থাকে। এরা সমাজ বা রাষ্ট্রকে অস্ত্র বোমা গ্রেনেড হামলায় চ্যালেঞ্জ জানায় না। এরা খাম্বা বসিয়ে টাকা লুট করে না। সমাজের মাথা হওয়ার জন্য নারী লোলুপতায় ভোগে না। এদের বেশিরভাগই নীরবে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।

প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো এর কোন দলে পড়তেন বা আসলে এগুলো সত্য কিনা আমরা জানি না। এখন আর জানারও কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটা সত্য বড় ভাই তারেক রহমানের মতো রাজনীতি নিয়ে গলাবাজি বা উচ্চকিত ছিলেন না। তার বাবা-মা-বড় ভাই যখন রাজত্বে তখনো তাকে ঘিরে সেই লোভীদের তেমন ভিড় বা মৌচাক গড়ে উঠতে দেখিনি। তারপরও ভাগের ভাগ আর সম্পদের অন্যায্য বণ্টনে দোষী হয়ে শাস্তি পেয়েছিলেন। তারপর যে অজ্ঞাতবাস সে অজ্ঞাতবাসেই মারা গেলেন।

দুই.

মৃত্যু নিয়ে, লাশ নিয়ে রাজনীতি আমাদের উপমহাদেশে নতুন কিছু নয়। একেকটা মৃত্যু একেক ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব ও ছায়া বিস্তার করে। যেহেতু আমরা উন্নয়নশীল নামের গরিব দেশের মানুষ এখানে মৃত্যু ধর্ম রাজনীতি ও সমাজ একাকার। বলা হয় ফিরোজ গাঁধীর অকাল মৃত্যু ইন্দিরা গাঁধীর রাস্তা খুলে দিয়েছিল। ফের সঞ্জয় গাঁধীর দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুই নাকি কংগ্রেসের কলঙ্ক মোচনের পথে বড় ফুলশয্যা। ভুট্টোর ফাঁসি ছিল পাকিস্তানের টার্নিং পয়েন্ট। কথিত আছে বেনজিরের ভাইদের মৃত্যু ও হটিয়ে দেয়ার পেছনে ছিলেন আসিফ জারদারি। রাজতন্ত্রের নেপালে সর্বজনপ্রিয় রাজা বীরেন্দ্র সাহদেবের পুরো পরিবারকে মেরে আত্মহত্যা করা পুত্রটিও নাকি তাদের খুড়ো জ্ঞানেন্দ্র মহাশয়ের এক বিশাল ষড়যন্ত্র। কে জানে কোনটা সত্য আর কোনটা ভুল। কোনটা মিথ্যে আর কোনটা অপপ্রচার। তবে এটুকু জানি রাজনীতি ও রাজনৈতিক পরিবার যদি পৃথক করা না যায় এমন ধরনের মৃত্যু আর গুজব চলতে থাকবে। আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর পরও আমরা দেখলাম একেবারে নীরব ও অদৃশ্য এই ছেলেটিকে ঘিরে রাজনীতির নোংরা খেলা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনে মৃত্যুর অভিশাপ বড় বিকট। একদিনে একই সময়ে বাবা, মা, ভাই ও আত্মীয়-পরিজন হারানোর মর্মান্তিক রক্তাক্ত বেদনা খুব কম মানুষের জীবনে আছে। তিনি সে শোক সহ্য করেও আজ দৃঢ় এবং মনোবলে অটুট। বেদনার্ত প্রধানমন্ত্রী তড়িঘড়ি করে খালেদা জিয়াকে দেখতে যাওয়ার এই কারণটি বিএনপি মানেনি। তাদের চোখে-মুখে এখন সন্দেহ আর উদ্বেগের জলছাপ। অতঃপর যে নাটক, তালা কাহিনী, চাবি গল্প আর একের পর এক ঘটনার ঘনঘটা তাতে সত্য যে কখন কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ জানে না।

তিন.

কোকোর চাইতেও বড় হয়ে গিয়েছে দলীয় রাজনীতি। কেউ কোনো শিষ্টাচার বা নিয়ম মানেনি। কী তার প্রটোকল কী তার পদবি কী মর্যাদা সেটাও আর ব্যাপার থাকেনি। মনে হচ্ছে বিএনপির কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতা মারা গেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের হাবভাব আর দেশি-বিদেশি দূত-ভূতদের কাণ্ডকারখানায় এটা নিশ্চিত পাগলা গারদে সুস্থ মানুষও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। দলের অনেক সিনিয়র নেতা একদা সেক্রেটারি জেনারেল সালাম তালুকদার বা আবদুল মান্নান ভুঁইয়াকে আমরা নীরবে বিদায় নিতে দেখেছি। পদ-পদবিতে খ্যাতিমান হওয়ার পরও এরা ছিলেন অবহেলিত। অন্যদিকে সবকিছু ছাপিয়ে এতটা প্রকট ও আলোচনামুখর পুত্র বিদায় মিডিয়ারও কিঞ্চিৎ অবদানপুষ্ট বটে। তারা এমন ভাব করছেন যেন বিদেশ থেকে আমাদের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের মৃতদেহ ফিরে আসছে।

আবারো বলছি ব্যক্তি কোকোর প্রতি আমার বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ বা অমর্যাদা নেই। তার মৃত্যু তার মায়ের জন্য কত বেদনার তার আত্মীয়-পরিজনের জন্য কতটা মর্মান্তিক সেটুকু বোঝার ক্ষমতা ঈশ্বর আমায় দিয়েছেন। আমি এখানে কোকোর কোনো জয়-পরাজয় দেখছি না। যারা জীবদ্দশায় তাকে ঘিরে থাকেনি, তার প্রবাসজীবনে হয়ত একবারের জন্যও বেদনা বা শোকে আচ্ছন্ন হয়নি, ভয়ে যোগাযোগ রাখেনি তারাই আজ দরদের ফেনায় উথলে উঠছে। মনে হচ্ছে দূরদেশে বুঝি বিএনপি মারা গেছে। গণতন্ত্রের সংগ্রাম নামে অভিহিত মানুষ মারার অবরোধে বিশ্বাসীরা রাজতন্ত্রের চেয়েও ভয়াবহ পরিবারতন্ত্রের পূজারী। আবারো সেটাই দেখলাম আমরা।

কোনো মৃত্যুও এখন আর নিরাপদ নয়। যদি তা হয় রাজনৈতিক। এটাই কি মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ?

সিডনি থেকে

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মযহারুল ইসলাম বাবলা

ক্ষমতার রাজনীতি ও কাশ্মির সংকট

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

কর আদায় নয় আহরণ

আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার

বায়ুদূষণ রোধে করণীয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

রাষ্ট্রের স্বভাব ও চরিত্র

মাহফুজা অনন্যা

পেঁয়াজ সংকট কোন পথে?

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

দিল্লিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকা

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

একজন সৃজনশীল সুভাষ দত্ত

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

Bhorerkagoj