প্রকৃতির গহীনে

রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৪

অপার সৌন্দর্যের পার্বত্য জেলার ঢেউ খেলানো সারি সারি পাহাড়ের গহীনে এখনো লোক চক্ষুর অন্তরালে রয়েছে প্রাকৃতিক বিস্ময়কর বহু সৌন্দর্য। ভ্রমণ পাগলদের অনুসন্ধানে যেগুলোর খোঁজ মিলেছে তা দেখার জন্যই ছুটে ভ্রমণ পিপাসুরা। আমাদের অ্যাডভাঞ্চার প্রিয় দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের এবারের ভ্রমণ ছিল বান্দরবানের উঁচু উঁচু পাহাড় খর স্রোতা খাল আর আদিবাসি পাড়া পেরিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার গহীনে সৌন্দর্যের আধার রাইক্ষং ঝরণার প্রান্তরে। দলে ছিলাম ছয়জন, লাইটার কচি ভাই ছাড়া সবাই ছিলাম সবল তবে মানসিক ভাবে উনার ছিল অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল। বাশের লাঠি সম্বল করে দু-পায়ের উপর ভর করে হাঁটতে শুরু করি। ঢেউ খেলানো সারি সারি পাহাড়, ছড়া-ঝিড়ি মাড়িয়ে শুধু এগিয়ে যাচ্ছি। কখনো দু-হাজার ফিট উপরে কখনো বা আবার দেড় হাজার ফিট নিচে এই ভাবেই চলছে ঘন্টার পর ঘন্টা চড়াই উৎড়াই। কোথাও যে একটু নিশ্চিন্ত মনে জিড়িয়ে নিব, শিকারি জোকের কারণে সে সুযোগটুকুও নেই।

বেশ কয়েক ঘন্টা হাটার পর নাখজং পাড়ার দেখা পেলাম, আদিবাসি মুরংদের বসতি। বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রামের পাশাপাশি সঙ্গে নেয়া মুড়ি চানাচুর তেল দিয়ে মেখে বেশ মজা করে খাই। খাওয়া শেষে আবারও হাটা। আজকের গন্তব্য পুকুর পাড়া। পাহাড়ের সৌন্দর্য যথাযথ ভাবে তুলে ধরতে পার না। শুধু চোখ বাধা গরুর মত হাটিয়ে নিয়ে যাও। পাহাড় অরণ্যে হাটতে হয় গুটি গুটি পায়ে, চার পাশে তাকিয়ে, কখনো বা আবার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে থমকে যেতে হবে, তবেই না পাওয়া যাবে পাহাড়ে ঘুরার চমকানো সৌন্দর্যের আনন্দ। আমার কথা শুনে গাইড সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।

দুপুর দুটা বিশ মিনিটে রুমা খালের দেখা পাই। খালের পানিতে ছড়ানো ছিটানো প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট ছোট বড় অসংখ্য পাথরের চাই, স্বচ্ছ শিতল পানি হাতে মুখে দিয়ে, দুপুরের আহার সঙ্গে থাকা চিড়া গুড় দিয়ে সেরে নেই। এবার পাথর আর পানি ডিঙ্গিয়ে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা। এনোং পাড়া আসতেই প্রায় সন্ধ্যা, ডানে তাকিয়ে দেখি বিশাল বিশাল গাছ আর জঙ্গলে ঘেরা ইয়া উচু এক পাহাড়। পুকুর পাড়া যেতে হলে এই পাহাড়টি ডিঙ্গাতে হবে। এবার হয়তো ঢাকা থেকে বয়ে আনা রশির বস্তা কাজে আসবে, আমাদের রাত করে পাহাড় জঙ্গলে হাটার দারুন মজার মজার সব অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু গাইড কেন যেন বেকে বসল, তার জোরালো আবদার রাতে এনোং পাড়াতেই থেকে যান। জানি না তার কোন সার্থ ছিল কি না। তবে তার ভদ্রতার জন্য বিষয়টা নেতিবাচক চিন্তা না করে ইতি বাচক হিসেবেই ধরে নেই।

রুমা খালে সাফসুতর হয়ে এনোং পাড়াতেই থেকে যাই, রাতের খাবারে অর্ডার দেয়া হল বাশ কোড়লের ভাজি, ডাল আর পাহাড়ি মুরগির ভূনা, সঙ্গে ঢেঁকি ছাটা ঝুম চালের বৈঠা ভাত তো থাকছেই। খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাই কিন্তু ঘুম আসে না, বাহিরে ভরা জো¯œার আলো খোলা জানালার ফাঁক গলে চোখে পড়ে। সুনসান নিরবতা খান খান করে কানে ভেসে আসে অবিরাম ধারায় বয়ে যাওয়া খালের পানির কলকল শব্দ। একরাশ হিমেল হাওয়ায় শরীর জুড়িয়ে যায়। মনের মাঝে প্রচন্ড বাসনা জাগে, ঘরের বাহিরে বের হয়ে পূর্ণিমা উপভোগ করার কিন্তু হায় ততক্ষনে সবাই বেঘোর ঘুমে। আমিও এক সময় ঘুুমের রাজ্যে হারিয়ে যাই।

মোরগ ডাকা ভোরে বিছানা ছাড়ি, জাগিয়ে তুলি সবাইকে, সামান্য দানাপানি পেটে পুরে ছুটি এবার মূল গন্তব্যে। গত সন্ধ্যায় দেখা উচু পাহাড়টাই ট্র্যাকিং করতে হবে প্রায় আড়াই ঘন্টা, পাড়া থেকে নেমে সামান্য দূরে গিয়েই শুর হয় ট্রাকিং। আকাশ ছোঁয়া বৃক্ষ, শরীরে জড়িয়ে যাওয়া সব লতা গুল্ম আর ভয়ানক সব শিকারি জোঁকের অভয়ারন্য। এ যেন পাহাড় নয় মনে হবে কোন মৃত্যুপুরির ভেতর দিয়ে হেটে যাচ্ছি। আসলে তা নয়, প্রথমে দেখতে যে কারোরই এমটি মনে হতে পারে। দিনের আলো যে পাহাড়ে হার মেনেছে সেখান দিয়েই আমরা হেটে বেড়াই, প্রায় ঘন্টা দেড়েক হাটার পর পেয়ে যাই সু-মিষ্ট সছ্ছ পানি ধারা। দুই পাহাড়ের বুক চিরে অবিরাম গড়িয়ে পড়ে পানি।

কিভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবানের এসি/নন এসি বাস আছে, ভাড়া ৬২০ হতে ১ হাজার টাকা, বান্দরবান রুমা বাস ষ্ট্যান্ড হতে রুমা বাজার পর্যন্ত লোকাল বাস সার্ভিসে জন প্রতি ১০০ টাকা অথবা জিপে ৩ হাজার ৫০০ টাকা রির্জাভ ভাড়া। রুমা আর্মি ক্যাম্পে নাম এন্ট্রি করে দৈনিক ৮০০ টাকা হতে ১ হাজার ২০০ টাকার চুক্তিতে গাইড নিতে হবে। নির্ভরশীল গাইড সম্পর্কে আর্মি ক্যাম্প অথবা আরণ্যক রির্সোটের পরিচালক জসিমের নিকট সহযোগিতা নিতে পারেন। থাকা-খাওয়া রুমা বাজার হতে প্রয়োজনীয় বাজার সদাই করে নিতে হবে। যতটা সম্ভব শুকনো খাবার খাওয়ার চেষ্টা করবেন। মাছ মুরগি চাউল এসব আদিবাসি পাড়াতেই পাবেন। রাতে সঙ্গে যাওয়া গাইডের নিদেশর্র্না অনুযায়ী আদিবাসি পাড়ায় থাকবেন। মাথা পিছু ৮০ থেকে ১০০ টাকা নিবে।

টিপস:

:: ভ্রমণে সদস্য চার থেকে ছয়জনের অধিক যেন না হয়। অধিক সদস্য হলে মত পার্থক্যের সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। ।

:: প্রয়োজনীয় স্যালাইন, মশা ও জোঁক প্রতিরোধক ক্রিম ও অন্য আন্য ওষুধ সঙ্গে নিবেন।

:: শক্ত লাঠি, টর্চ ও ব্যাগে হালকা কাপড় রাখুন।

:: গাইড ও স্থানীয়দের সঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা পরিহার করে তাদের সাথে ভদ্র ব্যবহারের পরিচয় দিন।

:: ভ্রমণের পূর্বে অবশ্যই সঙ্গিদের যথা সম্ভব ট্রাকিং সম্পর্কে ধারনা দিন।

:: অবশ্যই চলার পথে চারপাশের মায়াবী সৌন্দর্য সময় নিয়ে উপভোগ করুন।

:: র্ঝণার ভৌগলিক অবস্থান রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে হলেও বান্দরবান দিয়ে যাওয়া সহজ।

মো:জাভেদ-বিন-এ-হাকিম

ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

ফ্যাশন (ট্যাবলয়েড)'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj