নদী রক্ষায় আদালতের নির্দেশ উপেক্ষিত কেন?

বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৪

দখল ও দূষণের কবলে পড়ে দেশের নদ-নদী মরে যাচ্ছে। নদ-নদী রক্ষায় সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগই কাজে লাগছে না। হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে উচ্চ আদালতকে। গভীর হতাশা ও উদ্বেগের বিষয় হলো উচ্চ আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করেও চলছে দখল-দূষণ। নদ-নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নও গতি পাচ্ছে না।

গতকালের ভোরের কাগজের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে, দেশের নদ-নদী রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বেহালদশার খবর। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু- ঢাকার চারপাশের চার নদ-নদী বাঁচাতে ২০০৯ সালের ২৫ জুন হাইকোর্ট নির্দেশ দেন। নদী তীরবর্তী অবৈধ স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদ, নদীর সীমানা নির্ধারণ করে সীমানায় পাকা খুঁটি বসানো, নদীর তীরে হাঁটার পথ নির্মাণ, নদীর তীরে বনায়ন করা, নদীগুলো খনন করা, নদীর তীরের জমি জরিপ করা, পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত খননকাজ পরিচালনা করাসহ ১২টি নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। কিন্তু গত পাঁচ বছরেও নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে তুরাগ ও বালু নদের সীমানা চিহ্নিত করা ও খুঁটি নির্মাণের কার্যক্রম ১৪ দিনের মধ্যে শুরু করতে চলতি বছরের ২৪ জুলাই আবারো নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। রাজধানীর বাইরের চিত্রও ভিন্ন নয়। ২০১০ সালে পটুয়াখালীর গলাচিপার রামনাবাদ নদী, ২০১২ সালে কপোতাক্ষ নদ, ২০১০ সালে কর্ণফুলী নদী, ২০১৩ সালে পাবনার ইছামতি নদী দখলমুক্ত করতে হাইকোর্ট নির্দেশ দেন। একাধিকবার নির্দেশদানের পরও এখনো নদী তীরবর্তী অবৈধ স্থাপনা সরানো যায়নি।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদ-নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা এমনই যে অনেক নদ-নদীর অস্তিত্ব মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে তা খুঁজে পাওয়া যাবে না। গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর গড়ে দশটি নদী তার অস্তিত্ব হারাচ্ছে। ইতোমধ্যে দখল ও দূষণের কারণে হারিয়ে গেছে ২৫টি নদী। বর্তমানে বিপন্ন নদীর সংখ্যা ১৭৪টি। এর মধ্যে ১১৭টি নদীর মরণদশা ঘনিয়ে এসেছে। এই চিত্র বদ্বীপটির কৃষি, যোগাযোগ, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবনযাত্রা সবকিছুর জন্যই ভয়াবহ হুমকিস্বরূপ। নদ-নদী-জলাশয় রক্ষার প্রয়োজনীয়তা এখানে নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। নদ-নদী জলাশয় রক্ষার তাগিদ প্রতিনিয়ত সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায় থেকে জানানো হচ্ছে। পরিবেশ সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের পদাধিকারীরা বলছেন। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এমনকি আদালতের নির্দেশ পর্যন্ত উপেক্ষিত হচ্ছে। সংকট কোথায়? দখল-দূষণকারীরা কি এতই শক্তিশালী যে রাষ্ট্রীয় সব উদ্যোগ তাদের কাছে অসহায়। নাকি সরকারের এ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের মধ্যে শিথিলতা রয়েছে। অভাব রয়েছে সংশ্লিষ্টদের দৃঢ়তায় ও সদিচ্ছায়। আমরা দেখছি, বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে নদ-নদী মুক্ত করতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে, কিন্তু বেশি দূর যাওয়ার আগেই তা আবার থেমেও যায়। আবার নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির অভাবে অবমুক্ত স্থানে আবার গড়ে ওঠে অবৈধ স্থাপনা। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টদের জন্য বাধ্যতামূলক। এখানে শৈথিল্যের কোনো সুযোগ নেই। আর এ ক্ষেত্রে শৈথিল্য আত্মঘাতী ফল দিতে বাধ্য। যারা নদ-নদী দখল-দূষণের সঙ্গে জড়িত তারা হয়তো নানাভাবে শক্তিশালী, ক্ষমতা-ঘনিষ্ঠও। তাদের আমল দিলে চলবে না। নদ-নদী রক্ষা করতে হবে জাতীয় স্বার্থকে সব ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বাথের্র ঊর্ধ্বে রেখে। দখলকারী দূষণকারীদের শাস্তি দিতে হবে, নতুন করে দখল-দূষণ রোধে টেকসই ব্যবস্থা নিতে হবে।

সম্পাদকীয়'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj