পার্কগুলো দখলমুক্ত করুন

রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৪

ঢাকা সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রিত ৪৭টি পার্কের মধ্যে এখন ৩৩টি পার্কের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাকিগুলো ঘিরে চলছে দখল-বেদখলের প্রতিযোগিতা। এসব পার্কে গড়ে উঠেছে মার্কেট, ক্লিনিক, আড়ত, রেন্ট-এ-কারের দোকান । অন্যদিকে রাজউক নিয়ন্ত্রিত ওসমানী, রমনা, সোহরাওয়ার্দী ও চন্দ্রিমা উদ্যানের অবস্থা আরো করুণ। এসব উদ্যানে আয়েশে ঘুরে বেড়ানো দূরের কথা, আশপাশে একটু দাঁড়ানোর উপায় নেই। মদ্যপায়ী মাতাল, মাস্তান, ছিনতাইকারী, দেহপসারিণী ও পুলিশের অত্যাচারে নানা হয়রানির শিকার হচ্ছে মানুষজন। এসব পার্ক তত্ত্বাবধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গ এতোটাই উদাসীন যে, মনেই হয় না তারা এর সঙ্গে কোনোকালে যুক্ত ছিলেন! কেউ কেউ রক্ষক হয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন ভক্ষকের ভূমিকায়ও। এমনই একটি উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকাল ভোরের কাগজের একটি প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায়ের মিনি পার্কগুলো কেউ কেউ গাড়ির গ্যারেজ, কেউ গরুর গোয়ালঘর, আবার কেউবা মালামাল রাখার খোলা গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। রাজউক নিয়ন্ত্রিত ওসমানী, রমনা, সোহরাওয়ার্দী ও চন্দ্রিমা উদ্যানের অবস্থাও খুব একটা ব্যতিক্রম নয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই পার্কগুলোতে শুরু হয় অসামাজিক কার্যকলাপ, হিজড়াদের অশালীন অত্যাচার, ছিনতাই, প্রতারণা, ব্লু্যাকমেইল ইত্যাদি। নগরবাসীর চিত্তবিনোদনের এসব জায়গায় অপরাধীদের আনাগোনা এতোই বেশি যে, দর্শনার্থীদের প্রায় সময়ই নিরাপত্তা সংকটের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিসিসি উত্তরের জোনাল অফিস-সংলগ্ন দক্ষিণ পাশে ২ নম্বর ডিসিসি মার্কেটের পশ্চিমে কাওরানবাজার শিশুপার্ক এখন পাইকারি কাঁচামালের আড়ত। ডিসিসির কাগজপত্রে আছে, অথচ বাস্তবে নেই রায়েরবাজার পার্কটি। অর্থাৎ কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই অবস্থা। ইংলিশ রোডের পার্কটি পূর্ণ বেদখলে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দখলে নিয়ে মাটি জমা করে পাহাড়সদৃশ করে রেখেছে। পশু হাসপাতালের সামনের পার্কটি সেখানে কোনোকালে ছিল কিনা, আজ আর কেউ বলতে পারবেন না। লালবাগের রসুলবাগের পার্কটি পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। নয়াবাজারে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পার্কের চারপাশ হয়ে আছে বেদখল। আজিমপুর শিশুপার্কে কাঁচামালের দোকান, টয়লেট ও কমিউনিটি সেন্টারের কারণে শিশুরা তো দূরে থাক, বয়স্করাও যেতে স্বস্তিবোধ করেন না। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষের চোখের সামনে পল্টন মোড় আর জিপিওর মাঝখানে মুক্তাঙ্গন নামের পার্কটি রয়েছে সম্পূর্ণ বেদখল অবস্থায়। রেন্ট-এ-কারের গাড়ি, মিনিবাস, মিনিট্রাক এবং পুলিশ বিনা কারণে সার্বক্ষণিক দখলে রেখেছে জায়গাটি। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশ্যে এভাবে পার্ক দখলই বলে দেয়- অন্যান্য পার্কের ভাগ্যে কী ঘটেছে বা ঘটছে! এর বাইরেও ছোট-বড় উল্লেখযোগ্য যেসব পার্ক আছে, সেগুলোতেও রয়েছে নানা বিড়ম্বনা ও বিব্রতকর পরিবেশ-পরিস্থিতি।

প্রায় আড়াই কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই নগরে নগরবাসী একটুকু অবসরে তাহলে কোথায় স্বস্তি বা আনন্দ খুঁজতে যাবেন? পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বল্প সময়ের বিনোদনের স্থান কোথায়? শিশুদের খেলাধুলা, বয়স্কদের বেড়ানো ক্রমশ স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে এখন। দুই সিটি করপোরেশন এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাউজক) পার্কগুলো দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত। এজন্য যাদের পোষা হয়, মাস শেষে বেতন নেয়া ছাড়া আর কোনো দায়িত্ব তারা পালন করে কিনা সন্দেহ! গাছগাছালিপূর্ণ পার্ক ক্রম ‘মৃত’ ও ‘অসুস্থ’ হলে ঢাকার আবহাওয়ায় যেমন বিরূপ প্রভাব পড়ে, তেমনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পড়ছে একই প্রভাব। ঢাকায় আর ৩০ থেকে ৯০ দশকের মতো কোনো মাঠ বা পার্কে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলার চর্চা কিংবা প্রশিক্ষণ তেমন চোখে পড়ে না। এতে আগামী প্রজন্ম হয়ে পড়ছে সংস্কৃতিবিহীন বা অপসংস্কৃতির আগ্রাসনের শিকার। এই বন্ধ্যত্ব অবস্থা থেকে নগরবাসী হিসেবে আমরা মুক্তি চাই। ঢাকার পার্কগুলো পুনরায় উদ্ধার করে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে নগরবাসীর বেড়ানো, আনন্দ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের আবহ সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু ডিসিসি নয়, সরকারকেও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে।

সম্পাদকীয়'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj