কমলা চাষে উত্তরবঙ্গের সীমান্তঞ্চলে ব্যাপক সফলতা

শনিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৪

সারা দেশ ডেস্ক : বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা পঞ্চগড় এবং ঠাকুরগাঁও জেলায় কৃষকরা ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছেন। ইতোমধ্যেই মাড়াই প্রক্রিয়া শুরু এবং কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়ায় কৃষকরা চলতি বছর কমলার বাম্পার ফলন আশা করছেন।

জেলা দুটিতে ২০০৬ সাল থেকে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কমলা চাষ শুরু হয়। অনেক কৃষক কমলা চাষ করে ব্যাপক লাভবান হওয়ার পাশাপাশি নিজের ভাগ্য পরিবর্তনে সক্ষম হয়েছেন। ফলে জেলা দুটির কৃষিনির্ভর সার্বিক অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে নতুন এক সম্ভাবনা।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, নভেম্বরের শুরু থেকে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে উৎপাদিত কমলা বাজারে আসতে শুরু করেছে।

পাকা কমলায় ভরে গেছে গাছের শাখা-প্রশাখায় দুটি জেলার প্রায় ৪৭৫টি ছোট-বড় ও মাঝারি কমলা বাগান। প্রাপ্তবয়স্ক এক একেকটি গাছে ২শ থেকে ১ হাজারটি পর্যন্ত কমলা ধরেছে। কমলার রঙে রঙিন হয়ে আছে বাগানগুলো। কমলার ফলনে চাষিরা খুশি হলেও কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ২০১১ সালে শেষ হওয়ায় চাষ স¤প্রসারণে তারা হচ্ছেন নানা সমস্যার সম্মুখীন।

কমলা চাষি ও কৃষি কর্মকর্তারা জানান, জেলা দুটিতে উৎপাদিত কমলা আকার, রঙ ও স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। অনেকেই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব কমলাকে ভারতের দার্জিলিংয়ের কমলার সঙ্গে তুলনা করছেন।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার বামনপাড়া গ্রামের হাবীব প্রধানের বাগানে এবার কমবেশি ৪শ কমলার গাছে কমলা ধরেছে। ২০১১ সাল থেকে তিনি কমলা বিক্রি করছেন। গত বছর ৫৪ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেছেন। এ বছর কমলা বিক্রি শুরু করেছেন। আশা করছেন এবার তিনি কমপক্ষে ১ লাখ টাকার কমলা বিক্রি করবেন।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী বড়বাড়ি গ্রামে সালাউদ্দিন প্রধান তার দুই একর জমিতে কমলার বাগান গড়ে তুলেছেন। প্রায় ১০ বছর আগে লাগানো এ বাগানের অনেক গাছেই গত চার বছর ধরে কমলা ফলছে। চার বছর ধরেই তিনি তা বিক্রি করছেন। গত বছর ৫০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করলেও এবার তিনির ১ লাখ টাকার বেশি আয় করবেন বলে আশা করছেন।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার কাহারপাড়া গ্রামের জিতেন চন্দ্র, খোলাপাড়ার আব্দুল জলিল, চছপাড়ার মহিরউদ্দিন, আমবাড়ির হামিদুল ইসলাম, বোয়ালমারীর আব্দুল মতিন, কমলাপুরের সাইফুল ইসলাম, বোদা উপজেলার সর্দারপাড়া গ্রামের অচিন্ত্য কুমার কারকুন, বানিয়াপাড়ার বাচ্চু মিয়া, আটোয়ারীর জুগিকাটার সাজেদুর রহমান এবং তেঁতুলিয়া উপজেলার ডাঙ্গাপাড়ার মখলেছার রহমান, সিপাইপাড়ার তৌহিদুল ইসলাম জানান, তারা ১০ বছর ধরে কমলা চাষাবাদ করছেন।

কমলা চাষিরা জানান, কমলা উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০১১ সালের জুন মাস থেকে তারা কোনো কারিগরি সহায়তা পাচ্ছেন না। কোনো ধরনের সমস্যায় পড়লে তাৎক্ষণিকভাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মঞ্জুর মোর্শেদ জানান, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে উৎপাদিত খাসিয়া জাতের কমলার রঙ, আকার,স্বাদ ভারতীয় কমলার মতো। আট-দশ বছর আগে কিছু মানুষ বাড়ির পাশের খালি জায়গায় কমলার চারা লাগান। ক’বছর পরেই সেসব গাছে কমলা ধরতে শুরু করে। তা দেখে উৎসাহিত হয় আশপাশের লোকজন। এভাবে বাড়তে থাকে কমলা চাষ।

কেবলমাত্র পঞ্চগড় জেলায় কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর ২০০৬-১১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের অধীনে ২২৩টি বাগানে ৩৪ হাজার ৮৮৮টি কমলার চারা রোপণ করে। এছাড়া বসতবাড়ির আশপাশে রোপণ করা হয় আরো ১ লাখ ৫৬ হাজার চারা। ১৫ হাজার কমলা চাষিকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের হরটিকালচার স্পেশালিস্ট খন্দকার মোঃ মেসবাহুল ইসলাম জানান, জেলা দুটিতে বর্তমানে প্রায় ছোট-মাঝারি-বড় ধরনের ৪৭৫টি কমলার বাগান ছাড়াও বসতবাড়ির আশপাশে ব্যাপকহারে কমলা চাষ হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ২৬০ হেক্টর জমিতে ৩ লাখ ২০ হাজারের বেশি কমলার চারা রোপিত হয়েছে।

তিনি জানান, ৫ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কমলার গাছে ফলন ধীরে ধীরে বাড়ে। ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকে এবং ২৫-৫০ বছর পর্যন্ত ফলন আস্তে আস্তে কমতে থাকে।

কর্মকর্তা ও কৃষকরা এবার জেলা দুটিতে দেড়শ টন কমলার উৎপাদন হবে বলে আশা করছেন। এছাড়া আগামী মৌসুমে ৬৫০ টন কমলা উৎপাদন হতে পারে। ২০১১ সালের জুনে কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। এতে কমলা চাষিদের কারিগরি নানা সুবিধা বাধাগ্রস্ত হয়। পঞ্চগড় কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ সহিরউদ্দিন জানান, কমলা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা বাগানগুলোতে কয়েক বছর ধরেই কমলার ভালো ফলন হচ্ছে। প্রতি বছর কমলার উৎপাদন বাড়ছে। এসব কমলা আকার, রঙ ও স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কমলা চাষিরা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেতে পারেন।

সারাদেশ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj