খোকন রাজাকারের ফাঁসি

শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৪

এস এম মিজান : মুক্তিযুদ্ধকালীন ফরিদপুরের নগরকান্দায় হত্যা, গণহত্যা ও ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধের দায়ে ওই এলাকার রাজাকার কমান্ডার পলাতক জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের ফাঁসির রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ১১টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, চারটিতে বিভিন্ন মেয়াদে ৪০ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। একটি অভিযোগে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে।

অভিযোগ গঠন করা ১১টি চার্জের মধ্যে ১০৯ পৃষ্ঠার রায়ে ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে অপহরণ, আটক, নির্যাতন, হত্যা, গণহত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের দায়ে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২, ৩, ৪ ও ১১ নম্বর অভিযোগে আটক, ধর্ষণ, ধর্মান্তর, দেশান্তরে বাধ্য করা, মানসিক নির্যাতন, নিপীড়ন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনে পরামর্শ ও সহযোগিতার দায়ে বিভিন্ন মেয়াদে এই আসামিকে মোট ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া এক নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি মর্মে তাকে খালাস দেয়া হয়।

জাহিদ হোসেন খোকনকে গ্রেপ্তার বা তার আত্মসমর্পণের পর এই সাজা কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মোঃ আনোয়ারুল হক এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর এটি দ্বাদশ রায়।

ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত আসা ১২টি রায়ের মধ্যে তিনটি মামলায় মোট চারজন পলাতক আসামির সর্বোচ্চ সাজা হলো। ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে জামাতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার এবং নবম রায়ে একাত্তরের দুই বদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীনের ফাঁসির রায় হয়। পলাতক থাকায় তারা কেউ আপিলের সুযোগ পাননি। রায়ে বলা হয়, জাহিদ হোসেন খোকন এই রায়ের বিরুদ্ধে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। তবে সেই সুযোগ নিতে হলে খোকন রাজাকারকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

রায় ঘোষণার পর প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, জাহিদ হোসেন খোকনের বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছিলাম। আদালত সেটা আমলে নিয়ে এ রায় প্রদানের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন। অন্যদিকে খোকনের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমার মক্কেলের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার পায়নি। এ সময় রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, জাহিদ হোসেন খোকন পলাতক আছেন। নিয়ম অনুযায়ী তাকে নিজে হাজির হয়ে আপিল করতে হবে।

এদিকে ফাঁসির রায় ঘোষণা করা এই আসামি ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে জামাতের হয়ে কাজ করেন। স্বাধীনতার পর বিএনপির রাজনীতিতে জড়ান। তিন বছর আগে ২০১১ সালে নির্বাচনে জিতে নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন ৬৬ বছর বয়সী এই যুদ্ধাপরাধী। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তদন্ত শুরুর পর থেকেই পলাতক খোকন এখন কোথায় আছেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। তবে সুইডেনপ্রবাসী বাংলাদেশীদের তথ্য অনুযায়ী, সেখানেই বড় ছেলে ও মেয়ের সঙ্গে বহাল তবিয়তে রয়েছেন খোকন।

মামলার ইতিহাস : ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে গত বছরের ২৮ মে পর্যন্ত জাহিদ হোসেন খোকনের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করেন প্রসিকিউশনের তদন্ত কর্মকর্তা সত্যরঞ্জন রায়। এরপর ২৯ মে তার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়। গত বছর ১৮ জুলাই অভিযোগ আমলে নিয়ে বিএনপির এ নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হলে আদালতের নির্দেশে খোকনকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এরপরও তিনি হাজির না হওয়ায় তার অনুপস্থিতিতেই আদালত মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে বলেন। পলাতক খোকনের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় খরচে আব্দুস শুকুর খানকে আইনজীবী নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল।

গত বছর ৯ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে খোকন রাজাকারের বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। ২১ নভেম্বর থেকে গত ২ এপ্রিল পর্যন্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সত্যরঞ্জন দাসসহ ২৪ জন সাক্ষ্য দেন। আসামি পলাতক থাকায় তার পক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষী ছিল না। এরপর দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৭ এপ্রিল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj