রাজনীতিতে বিরক্ত ব্যারিস্টার মওদুদ

শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৪

খোন্দকার কাওছার হোসেন : রাজনীতির ওপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে আছেন ডাকসাইটে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। এ কারণে এ অঙ্গনের কারো সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন না তিনি। কথা বলছেন না মিডিয়া কিংবা নিজ দলীয় নেতাদের সঙ্গেও। বাসভবন-অফিস আর আদালত পাড়ায়ই সময় কাটে তার। ঘরে-বাইরে পিষ্ট হয়ে এমনটা করছেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠ সূত্র এমনটাই জানালো।

সূত্র আরো জানায়, এক সময়ে যাদের পাত্তা দেননি রাজনীতিতে তেমন লোকদের প্রভাব প্রতিপত্তি ও আচার-আচরণে অনেকটাই ক্ষুব্ধ নানা ঘাটের পানি খাওয়া এ রাজনীতিক। নিজ দল বা সরকারি দল কারো সঙ্গেই আপাতত খাপ খাওয়াতে পারছেন না রাজনীতির মাঠের এ পাকা খেলোয়াড়। অনেকটা যেন বেখাপ্পা পরিস্থিতিতেই হাবুডুবু খাচ্ছেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার কৌশল হিসেবেই চুপসে আছেন আদালত পাড়ার বাঘা এ ব্যারিস্টার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিজ ঘর বিএনপিতে তার অবস্থান অনেকটাই নড়েবড়ে। স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য হওয়ার পরও দলের নেতাকর্মীরা বরাবরই তাকে সন্দেহের চোখে দেখেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে সে সন্দেহ আরো প্রকট হয়। কেউই বিশ্বাস করতে পারেন না তাকে। কোনো একটি পক্ষের দালাল হিসেবে গালাগাল দেন প্রতিনিয়ত। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন তিনি। রয়েছেন ঘরকুনো মওদুদ হয়ে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি- সব দলের কাছেই এক সময়ের অতি আদরের মওদুদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন জিয়া মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী। এরশাদ সরকারে মন্ত্রী, উপ-প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও উপ-রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন সুযোগ সন্ধানী এ রাজনীতিক। সর্বশেষ খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় ছিলেন আইনমন্ত্রী। ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ২০০১ ও ২০০৯ সালে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ৬ বার সংসদ সদস্য হন এ অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। এরপরও তিক্ততা ছাড়ছে না তাকে। বিতর্ক তার নিত্যসঙ্গী।

ডেমোক্রেসি এন্ড দি আফটার ম্যাথ এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র (১৯৯৩-২০১৩) বই দুটিতে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় নিজ ঘর বিএনপির মধ্যে তুমুল সমালোচনায় পড়েছেন তিনি। দলের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা রিজভী আহমেদ সংবাদ সম্মেলন করে তার বইয়ের ও তার সমালোচনা করেছেন।

দালাল সম্বোধন করে নেতাকর্মীরা তার ছায়াও মাড়াতে চান না। নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয় কিংবা গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের পথ ধরেন না তিনি হেনস্তা হওয়ার ভয়ে। খোদ খালেদা জিয়া পর্যন্ত চটে আছেন তার ওপর এমন প্রচারণা রয়েছে দলীয় পরিমণ্ডলে।

খালেদা জিয়ার নীলফামারী, নাটোর কিংবা গত বুধবারের কিশোরগঞ্জ সফরেও সঙ্গী হননি মওদুদ। দলের যুগ্ম মহাসচিব ও মওদুদের সহযোগী ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন ভোরের কাগজকে জানান, ওই সফরের সময়ে তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। অবশ্য তখন তিনি দেশে ছিলেন বলে ভোরের কাগজের কাছে তথ্য রয়েছে।

ঘরের বাইরে সরকারি কাজে বাধা দেয়াসহ তার বিরুদ্ধে রয়েছে ১৮টি মামলা। এছাড়া ৩০০ কোটি টাকা মূল্যের গুলশানের বাড়ি নিয়েই হাঁপিয়ে উঠেছেন খালেদা জিয়া সরকারের সাবেক এই আইনমন্ত্রী। এছাড়া বার্ধক্যজনিত নানা রোগেও আক্রান্ত বলে জানা গেছে। হাঁটু ও পায়ের ব্যথায় আক্রান্ত ৭৪ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ। নিয়মিত থেরাপি নিতে হয় তাকে। প্রতিদিন হাসপাতালে যাওয়া নিরাপদ না হওয়ায় বাসায়ই থেরাপি মেশিন এনেছেন বলে জানান তার পরিচারক ইব্রাহিম। অবশ্য মওদুদ জানিয়েছেন, আপাতত তাকে থেরাপি নিতে হচ্ছে না।

মওদুদ সহসা মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে চান না। তবে তার ঘনিষ্ঠরা জানান, বর্তমান রাজনীতি নিয়ে চরম হতাশ তিনি। বিভিন্ন কারণে তাকে দোষারোপ করা হয়, সরকারের বা বিভিন্ন সংস্থার দালাল বলে গালি দেয়া হয়, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে অনেকেই বক্তব্য দেন। এটা তার ইগোতে লাগে। আবার দলের ভেতরেও চলছে দোষারোপের রাজনীতি। এসব আর ভালো লাগে না তার। এছাড়া রাজনীতিতে কোনো ভদ্রতা, শিষ্টাচার বা সম্মানবোধ না থাকায় চুপচাপ থাকাকেই সমীচীন বলে মনে করেন সময়ের আলোচিত-সমালোচিত এ প্রবীণ রাজনীতিক।

পাশাপাশি বাড়ির মামলা নিয়ে অতিরিক্ত টেনশনে থাকায় তার শরীর-মন কোনোটাই ভালো নেই। গুলশান এভিনিউয়ের ১৫৯নং বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ভোগ দখল করে আসছেন মওদুদ। বাড়িটির মূল মালিক ছিলেন অস্ট্রেলীয় নারী অ্যাঞ্জেল ফলস। অ্যাঞ্জেল ফলসের মৃত্যুর পর তার পাকিস্তানি স্বামী ওই বাড়িতে বসবাস করতেন। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেলে বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে সরকারের তালিকাভুক্ত হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক বলছে, মওদুদ ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে লন্ডন প্রবাসী ভাই মঞ্জুর আহমদের নামে ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কাগজ তৈরি করে বাড়িটি সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নেন।

ভোরের কাগজের পক্ষ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে ফোন করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কথা বলতেই রাজি হচ্ছিলেন না মওদুদ। পরে অনেকটা বিরক্ত হয়েই বললেন, দেশে রাজনীতি নেই তো। রাজনীতিতে দেখবেন কিভাবে। তার ভাষায় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ এখন আর রাজনীতিকদের হাতে নেই। এটা এখন চলে গেছে অন্যত্র। রাজনীতি থেকে সহনশীলতা, সহমর্মিতা বিদায় নিয়েছে। ভিন্নমতকে কেউ শ্রদ্ধা তো করেই না বরং শত্রু জ্ঞান করে। ভিন্ন মতাবলম্বীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্ল করে, অপমান অপদস্থ করে। এর চেয়ে নিরাপদ থাকতে চুপচাপ থাকাকেই শ্রেয় মনে করেন আলোচিত-সমালোচিত এ রাজনীতিক। বলেন পরে কথা হবে।

তবে তার ঘনিষ্টজনরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অনুক‚লে এলে ফের রাজনীতির মাঠে সরব হবেন আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিক ও আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj