বিয়ের বয়স কমানোর সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী : বিশেষজ্ঞদের অভিমত

শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৪

সোহাগ মজুমদার : ছোটবেলা থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে নিজ গ্রামে এবং স্কুলে খ্যাতি ছিল জবার। স্যাররা খুবই প্রশংসা করতেন তার। জীবনে অনেক বড় হবে- এ দোয়া করতেন সবাই। কিন্তু হঠাৎ করেই পাশের গ্রামের সৌদি ফেরত এক ছেলের বাপ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে জবার বাবার কাছে। সপ্তম শ্রেণীতে পড়–য়া জবার বয়স তখন মাত্র ১৩ বছর। তার নিজেরও মত নেই বিয়েতে। অবশ্য তার মতামত জানতেইবা চায় কে? তবু স্কুলের শিক্ষকরা আসেন জবার বাবা-মাকে বোঝাতে। অল্প বয়সে বিয়ে দিলে এমন একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। তাছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কি কি ক্ষতি হতে পারে এসব বিষয়ে অনেক বোঝানোর পরও জবার বাবা-মা মানতে নারাজ। এতো ভালো ছেলে হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে তারা কারো কোনো কথাতেই কান দেন না। বিয়ে হয়ে যায় জবার।

শুরু থেকেই নাতির মুখ দেখা শাশুড়ির ইচ্ছেয় বছর না ঘুরতেই গর্ভবতী হয় জবা। কিন্তু মন থেকে সে প্রস্তুত ছিল না মা হওয়ার জন্য। হেসে-খেলে বেড়ানোর কিশোর বয়সে তার শরীরও প্রস্তুত হয়নি সন্তান জন্মদানের জন্য। কয়েকমাস পরই গর্ভপাত হয় জবার। ডাক্তার জানায় বয়স কমের সঙ্গে অপুষ্টি এর অন্যতম কারণ। প্রথম নাতির মুখ দেখতে না পারার ক্ষোভে এরপর শুরু হয় শাশুড়ির অত্যাচার। শুরু হয় উঠতে-বসতে কটাক্ষ। ধীরে ধীরে শুকাতে থাকে জবা। বাড়ে তার প্রতি স্বামীর অনীহা। অপুষ্টির সঙ্গে ধরা পড়ে তার সুতিকা রোগ। শাশুড়ি ছেলের জন্য আবার পাত্রী দেখা শুরু করে। রুগ্ন মৃতপ্রায় জবাকে ফেরত পাঠানো হয় বাবার বাড়ি।

এমন ঘটনা আমাদের গ্রামবাংলায় অতি চেনা। শহরের বস্তিতে, নিম্নবিত্ত এমনকি মাঝে মাঝে ধনী অনেক পবিরারেও এমন ঘটনা দেখা যায়। এর বাইরে সন্তান জন্মদিতে গিয়ে মা ও শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

দেশে বর্তমানে বাল্যবিয়ের হার ৩৯ শতাংশ। বাল্যবিয়ের হারে বাংলাদেশ বিশ্বে ৪র্থ। আমাদের দেশে জরায়ু ক্যান্সারে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। যদিও এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। দেশে বর্তমানে ৭২ হাজার ফিস্টুলা রোগী রয়েছে যাদের অপারেশন করে শেষ করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধান ড. রওশন আরা বলেন, আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা তেলাপোকা, ব্যাঙের জীবন চক্র পড়ে। ব্যবচ্ছেদ করে জানে তাদের যৌন জীবন সম্পর্কেও। অথচ নিজের শরীরকে জানার কোনো শিক্ষা আমাদের পাঠ্যবইয়ে নেই। নেই মাসিক ব্যবস্থাপনার কোনো সঠিক শিক্ষা। এখনো অনেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জানে না। আবার জানলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। পিল খেলে যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় তা অনেকেই জানে না। বাল্যবিয়ের পরদিনই সন্তান নিতে বলা হয়। শিশু বয়সে বাচ্চা নষ্ট করতে হলেও জীবনের ঝুঁকি প্রবল।

বাল্যবিয়ে ও অল্প বয়সে মা হওয়ার কুফলের মধ্যে সুতিকা রোগ, ফিস্টুলা, জরায়ু বেরিয়ে আসা এবং জরায়ু ক্যান্সারের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া অল্প বয়সী মায়েদের শরীরের পূর্ণ বিকাশ ঘটে না বলে প্রায়ই অপুষ্ট (প্রি ম্যাচিউর), শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম হয়। এভাবে ভবিষ্যৎ একটি প্রজন্মকে সম্পূর্ণ ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়। সামাজিক এ অসঙ্গতির দায়ও শিশু মায়ের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ অবস্থায় সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় ‘বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০১৪’র খসড়া নীতিগত অনুমোদন হয়। প্রস্তাবিত খসড়ায় মেয়ের বয়স ১৮-এর কম হলে এবং ছেলের বয়স ২১ বছরের কম হলে বাল্যবিয়ে বলা হবে যা বর্তমানে প্রচলিত আইনে বিদ্যমান রয়েছে। মন্ত্রিসভায় বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৪ অনুমোদিত হওয়ার পরেও মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ এবং ছেলেদের ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মন্ত্রিসভার মতামতের ভিত্তিতে পরিবেশ ও আবহাওয়া বিবেচনা করে প্রস্তাবিত আইনে বিয়ের বয়স কমানোর বিষয়ে পরামর্শক্রমে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আইনটি খতিয়ে দেখার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন যুক্তিও দাঁড় করোনো হচ্ছে। সরকারের একাধিক মন্ত্রী এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিয়ের বয়স কমানো হলে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা কমবে। আরেক মন্ত্রী, আবহাওয়া ও জলবায়ুর কারণে আমাদের দেশের মেয়েরা অল্প বয়সে পরিপক্ক হয়ে ওঠে বলে জানান। গত ২১-২৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডনে গার্ল সামিটে অংশ নেন। দেশে ফেরার পর সংবাদ সম্মেলনে খোদ প্রধানমন্ত্রী লন্ডনের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানেও ১৬ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়।

২০১৫ সালে পরবর্তী জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিকল্পনায় নারী-পুরুষের সমতা, নারীর মানবাধিকার ও নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার প্রত্যয় নিয়ে জাতিসংঘ ও সদস্য রাষ্ট্রসমূহ কাজ শুরু করেছে। যখন বাল্যবিবাহকে এ ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তখন মন্ত্রিসভায় এমন অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ, নারী ও মানবাধিকার কর্মীরা।

নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার হার, প্রজনন এবং সাধারণ স্বাস্থ্য নিয়ে এতো কাজ হচ্ছে। পেশাদারি দক্ষতা বাড়িয়ে নারীকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার সরকারের যে প্রয়াস এর মধ্যে বিয়ের বয়স কমানোর বিষয়টি বোধগম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম। এ ব্যাপারে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, নারীর মানবাধিকার বিষয়ে যেটুকু অর্জন তা নারী আন্দোলনের ৫০ বছরের ফসল। এতো চেষ্টার পরও দেশে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। ১২ থেকে ১৮ বছর মা হওয়ার বয়স নয়। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) ও নারীর প্রতি বৈষম্যবিলোপ সনদসহ (সিডও) নারী ও শিশু অধিকার সংক্রান্ত সব জাতীয় নীতির সঙ্গে শুধু সাংর্ঘষিক নয়, আত্মঘাতীও। এ সিদ্ধান্ত না নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বয়স কমানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শিশু বিয়ের প্রচলন করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত) ২০০৩ -এ ১৬ বছরের নিচে কোনো নারীর সম্মতিতে বা অসম্মতিতে যৌন সংগম করলে ধর্ষণের অপরাধ বলা হয়েছে। বিভিন্ন নারী ও মানবাধিকার সংগঠন অব্যাহতভাবে এটা সংশোধন করে সব ক্ষেত্রে শিশুর বয়স একই রাখা এবং নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকার কারণে ওই আইনে ১৬ বছর পরিবর্তন করে ১৮ বছর করার দাবি জানিয়ে আসছে। এছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ (সিআরসি) ও বাংলাদেশের প্রচলিত শিশু আইনে বয়স ১৮ বছরের কম হলে তাকে শিশু বলা হয়েছে। যেহেতু প্রচলিত আইন, বিধি-বিধান অনুযায়ী বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর বয়স ১৮ এবং পুরুষের বয়স ২১ নির্ধারণ করা হয়েছে সেক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে বিয়ের বয়স কমানো হলে প্রচলিত আইনের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হবে বলে মত দেন তারা।

এ বিষয়ে কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাসিমা আক্তার জলি বলেন, জাতীয় ও আন্তজার্তিক সব নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এ নীতি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, লন্ডন আর আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট এক নয়। আমাদের দেশে শতকরা কতোজন জন্মনিয়ন্ত্রণ করেন এমন প্রশ্ন ছুড়ে তিনি বলেন, কিভাবে বয়স বাড়িয়ে সনদপত্র নেয়া হয় তা আমরা জানি। এ অবস্থায় নারীবান্ধব সরকার কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঠিক বোধগম্য নয়। তবে ২০২১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে বন্ধ করার সরকারের যে টার্গেট তা কাগজে-কলমে বাস্তবাায়িত দেখাতে এমন সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ ব্যাপারে মহিলা ও শিশুপ্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি মানবাধিকার কর্মীদের এসব যুক্তির সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, আইনটি নিয়ে শুধু আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন আইন রয়েছে। আমরা সেসবই পর্যালোচনা করছি। এছাড়া আমাদের দেশে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে একটি শক্ত আইন থাকলেও তা সব ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। আইনের বিভিন্ন ফাঁক ও নানা কারণে বাল্যবিয়ে বন্ধ হচ্ছে না।

বিয়ের বয়স কমানো হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন কি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না তা নয়। তবে বিষয়টি উঠে আসাতে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে এতো বেশি সভা-সেমিনার, টকশো হচ্ছে। বিভিন্ন মহলে এ বিষয়ে এতো আলোচনা হচ্ছে যা আগে কখনো হয়নি। এটাকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এতে সর্বস্তরে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ছে। আলোচনা-পর্যালোচনার পর সরকার অবশ্যই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj