বেশি অত্যাচার হলে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে মোকাবেলা করবো : খালেদা

বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৪

কিশোরগঞ্জে ২০ দলীয় জোটের জনসভা

সাকাউদ্দিন আহাম্মদ রাজন, কিশোরগঞ্জ থেকে : বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ‘শুধু অবৈধ নয়, ব্যর্থও’। কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ মাঠে গতকাল বুধবার ২০ দলীয় জোট আয়োজিত জনসভায় এ মন্তব্য করেন তিনি। খালেদা জিয়া সরকারকে গুম ও খুনের দায়ে অভিযুক্ত করে বলেন, দেশের অবস্থা ভালো নয়। অত্যন্ত ক্ষমতাধর ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ পুলিশকেও মানে না। তিনি বলেন, ঈশা খাঁর কথা আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। বেশি অত্যাচার হলে ঢাল-তলোয়ার আছে; এটা নিয়েই মোকাবেলা করবো।

খালেদা জিয়া বলেন, দেশে জনগণের নির্বাচিত সরকার নেই। এ সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণকে ভোট দিতে দেয়া হয়নি। ভোটকেন্দ্রে কুকুর বসেছিল। সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। দশম সংসদ অবৈধ। তাহলে কী করে তারা নিজেদের নির্বাচিত সরকার দাবি করে। তারা কেবল অবৈধ নয়, ব্যর্থও। এই ব্যর্থতার কথা তাদের মন্ত্রীরাই স্বীকার করছেন। তাদের মন্ত্রীরাই বলছেন, অযোগ্য লোকদের বসানোর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নিঃশেষ হয়ে গেছে। অবৈধ ও ব্যর্থ সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ২০ দলীয় জোটের ধারাবাহিক জনসভার অংশ হিসেবে এ জনসভার আয়োজন করা হয়। জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোঃ শরিফুল আলমের সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এম ওসমান ফারুক, এলডিপির সভাপতি ড. অলি আহমেদ, জামাতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান,

ব্রিগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহ, ঢাকা মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মির্জা আব্বাস, খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যাপক ইসহাক, জেলা বিএনপির সভাপতি এড. ফজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ।

কিশোরগঞ্জবাসীকে উদ্দেশ্য করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনে আপনাদের আন্দোলনের ডাক দেবো। আপনারা বিগত দিনের মতো আন্দোলনে অংশ নেবেন। আওয়ামী লীগ জানে, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে দশটা ভোটও পাবে না। তাই ক্ষমতায় থাকতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে। তাদের বিদায় করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এ সময় তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সরকার গঠন করলে দেশের চেহারা পাল্টে দেবো। সব পুরাতন ছিঁড়ে ফেলে নতুনভাবে দেশ গড়া শুরু হবে। বেকারত্ব-দারিদ্র্য দূর করে দেশের পরিবর্তন আনবোই, আনবো।

খালেদা জিয়া বলেন, আমি ক্ষমতা চাই না, জনগণের সঙ্গে থাকতে চাই। ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন আমাকে অনেকবার বলেছে, দেশ থেকে চলে গেলে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু আমি যাইনি। সাহস করে এদেশের মানুষের সঙ্গে থেকেছি। আমি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থাকতে চাই।

বিএনপিকে জনগণের দল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সব সময় মানুষের সঙ্গে ছিলেন, এখনো মানুষের অন্তরে আছেন তিনি। তাকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হলেও মানুষ যে তাকে কতো ভালোবাসে তা তার জানাজাতেই প্রমাণ হয়।

খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশে যেমন সিরাজউদ্দৌলাহর রক্ত আছে, তেমনি আছে মীর জাফরেরও। মীর জাফররা জিয়াকে হত্যা করেছে। আমাদের শরীরে সিরাজের রক্ত আছে। সেই মীর জাফরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। ‘নব্য’ মীর জাফরদের বিদায় করে দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি

রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কড়া সমালোচনা করেন বিএনপি প্রধান। তিনি বলেন, এটা দুর্নীতি দমন কমিশন নয়, দুর্নীতির দায়মুক্তি কমিশন। দুর্নীতির আখড়া এটা। এরা দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি দিচ্ছে। কাউকে দায়মুক্তি দেয়ার অধিকার তাদের নেই। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সবকিছু ধ্বংস করতে চায়। তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করতে চায়। এ জন্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে ধ্বংস করেছে সরকার।

খালেদা জিয়া বলেন, এই কিশোরগঞ্জের মাটিতে জন্ম নিয়েছেন ৩ জন রাষ্ট্রপতি। এদের পুত্ররা বর্তমানে মন্ত্রী ও এমপি। কিন্তু এই আওয়ামী লীগের আমলে রাস্তাঘাটের বেহাল দশা দেখে মনে হয় কোনো উন্নয়নই হয়নি।

এদিকে খালেদা জিয়ার সফর উপলক্ষে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। কিশোরগঞ্জের প্রবেশপথ ভৈরব মেঘনা সেতু থেকে সার্কিট হাউজ পর্যন্ত ৫৭ কিলোমিটার পথের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয় জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ জেলা নেতাদের প্রতিকৃতি সংবলিত কয়েকশ তোরণ। নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে জেলা শহরের বিভিন্ন স্থানেও বড় বড় ব্যানার এবং বিলবোর্ড স্থাপন করেন স্থানীয় নেতারা, সেই সঙ্গে নিজেদেরও প্রচার চালিয়েছেন তারা।

জনসভায় অংশ নিতে সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে বিএনপি ও বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা জনসভার স্থান গুরুদয়াল কলেজ মাঠে আসতে শুরু করেন। বেলা সাড়ে ১২টায় জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শরীফুল আলমের সভাপতিত্বে জনসভার কার্যক্রম শুরু হয়।

২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া সর্বশেষ কিশোরগঞ্জ এসেছিলেন। ২০০৮ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে ভৈরবে এলেও সে সময় তিনি জেলা শহরে আসেননি। গত ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর ঢাকার বাইরে এটি খালেদা জিয়ার ষষ্ঠ জনসভা। সর্বশেষ গত ১ নভেম্বর নাটোরে জোটের এক জনসভায় বক্তব্য দেন তিনি। এছাড়া নীলফামারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জামালপুর, জয়পুরহাটের জনসভায় বক্তব্য রাখেন তিনি।

এর আগে বেলা পৌনে ১১টার দিকে গুলশানের বাসা থেকে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর রওনা হয়। তার গাড়িতে ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান। রাতেই ঢাকায় ফেরেন তিনি।

অভিনব অভ্যর্থনা : কিশোরগঞ্জে অভিনব কায়দায় খালেদা জিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। জোটের জনসভায় যোগ দিতে বেলা ৩টায় তিনি কিশোরগঞ্জ সার্কিট হাউজে পৌঁছান। এ সময় একটি হাতির পিঠে চড়ে রাজকীয় পোশাক পরিহিত একজন কাঠের তলোয়ার তুলে তাকে সালাম জানান। আর ময়মনসিংহ গীতিকার মহুয়া, মলুয়া ও সাখিনার বেশে তিন তরুণী খালেদা জিয়ার হাতে তুলে দেন শুভেচ্ছার ফুল।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj