আমাদের শোক ও শ্রদ্ধা

বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৪

একে একে নিভিছে দেউটি। ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন ও অধ্যাপক সালাহউদ্দীন আহমদের মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই চলে গেলেন আরো দুজন কৃতী মানুষ। জাতীয় স্মৃতিসৌধের নকশাকার স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন এবং শিক্ষাবিদ লেখক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। গত সোমবার দুপুরে মারা যান স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন। পরদিন মঙ্গলবার দিনগত রাতে মারা যান অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। যাঁরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দিয়ে নতুন একটি দেশের পরিচয়-প্রকৃতি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন, তাঁদের একে একে চলে যাওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টের এবং অপূরণীয় ক্ষতির।

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ১৯২৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি সরকারি বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ডে যান। দেশে ফিরে ঢাকা কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৫৫ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন। এর আগে ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ শিক্ষাবিদ শিক্ষকতা করেছেন বিশ্বভারতীতেও। ১৯৯০-৯১ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ২০০০ সাল থেকে তিন বছর বেসরকারি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক সিদ্দিকী। বাংলা একাডেমি ও এশিয়াটিক সোসাইটিতে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সমিতির এবং নাগরিক নাট্য চক্রের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপাচার্য, অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি এ দেশে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন। সাহিত্যচর্চা করেছেন। কবিতাগ্রন্থ ‘হৃদয়ে জনপদে’র জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ কর্মও করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি নানা বিষয়ে তাঁর চিন্তা-গবেষণা নিয়মিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কলামে। ইংরেজি ও বাংলায় অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর গ্রন্থ সংখ্যা ৪০টি। তাঁর মৃত্যুতে আমরা হারালাম দেশের একজন সুপণ্ডিতকে, একজন মানবতাবাদীকে, একজন বিবেকবান অভিভাবককে। যিনি ৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত আমাদের বনস্পতির ছায়া দিয়ে গেছেন।

আর স্থপতি সৈয়দ মইনুল হোসেন চলে গেলেন মাত্র ৬২ বছর বয়সে। ১৯৫২ সালের ৫ মে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ীর দামপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মইনুল হোসেন। ১৯৭০ সালে তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে। ১৯৭১ সালে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি নিজ গ্রামে চলে যান। খুব কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বরের পর তিনি ফিরে আসেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৬ সালে ইএএইচ কনসালট্যান্ট লিমিটেডে জুনিয়র স্থপতি হিসেবে যোগ দেন। কয়েক মাস পর চাকরি ছেড়ে যোগ দেন বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেডে। ১৯৭৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয় ও নকশা আহ্বান করা হয়। ২৬ বছরের তরুণ স্থপতি মইনুলের করা নকশাটি সে প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়। মইনুল হোসেনের নকশায় নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ এখন বাংলাদেশের একটি জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে সম্পৃক্ত স্থপতি মইনুলের নাম ও কীর্তি।

মানুষ মৃত্যুর অতীত নয়, কিন্তু কাজের মধ্যে বেঁচে থাকেন কৃতি মানুষরা। অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, স্থপতি মইনুল হোসেন আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁদের চিন্তা-চেতনা ও কীর্তি রয়ে গেছে আমাদের পাথেয় হয়ে। জাতির এই কৃতী সন্তানদের স্মৃতি ও অবদান যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ, সংরক্ষণ এবং ধারণ করার মাধ্যমেই তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবো আমরা।

সম্পাদকীয়'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj