নানা সংকটে সৈয়দপুর ফাইলেরিয়া হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবা ব্যাহত

শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০১৪

সৈয়দ জিকরুল হক, সৈয়দপুর (নীলফামারী) থেকে : সৈয়দপুরে বিশ্বের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতালটিতে শুরুতে চিকিৎসাসেবার মান চোখে পড়ার মতো হলেও বর্তমানে এটির নাজুক অবস্থা চলছে। দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে হাসপাতালটি রক্ষা পেলেও সংকট পিছু ছাড়ছে না। চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও আর্থিক সংকটে গরিবের একমাত্র ভরসাস্থল এই হাসপাতালটি নিভু নিভু অবস্থায় চলছে। গলগণ্ড (ঘ্যাগ) ও গোদ রোগের চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য এই হাসপাতালটি ২০০২ সালে গড়ে তোলা হয়। স্থানীয়দের দান করা জমির ওপর এই হাসপাতালটি গড়ে ওঠে। এখানে রয়েছে চিকিৎসাসেবার আধুনিক যন্ত্রপাতি। জটিল রোগীদের থাকার জন্য আছে ছয়টি বেড। ভিআইপি ক্যাবিনও রয়েছে চারটি। এমনকি জরুরি রোগীদের আনা-নেয়ার জন্য সার্বক্ষণিক সেবায় রয়েছে এম্বুলেন্স। অবকাঠামো, পরিবেশ ও যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও এর বর্তমান অবস্থা তথৈবচ।

এক সময় এই হাসপাতালের রোগীদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া হতো ওষুধ। চিকিৎসাসেবা দিতেন সরকারি চিকিৎসক ও নার্সরা। হাসপাতালে কর্মরত ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে সরকার থেকে দেয়া হতো আর্থিক অনুদানও। কিন্তু ২০১১ সালে হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের আর্থিক দুর্নীতি ধরা পড়ে সরকারি তদন্তে। এ নিয়ে হৈচৈ পড়ে যায়।

স্থানীয় অধিবাসীরা হাসপাতালটিকে দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন। হাসপাতাল পরিচালনার জন্য নতুন করে গঠন করা হয় পরিচালনা পরিষদ। এতে হাসপাতালে দুর্নীতির অবসান হলেও বন্ধ হয়ে যায় সরকারের পক্ষ থেকে আসা সব সুযোগ- সুবিধা। হাসপাতালের আয় বলতে এখন রোগী ভর্তি ফি, বেড ভাড়া ও এম্বুলেন্স ভাড়া অন্যতম। এসব খাত থেকে প্রতি মাসে গড়ে আয় হয় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ ১৮ জন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ওষুধ কেনা বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হয় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা।

পুরোদমে চিকিৎসাসেবা দিতে জনবল প্রয়োজন কমপক্ষে ছয়জন। এর মধ্যে দুজন চিকিৎসক ও চারজন সিনিয়র স্টাফ নার্স জরুরিভাবে প্রয়োজন রয়েছে এই হাসপাতালে। সারাদেশ থেকে গলগণ্ড ও গোদ রোগীরা এ হাসপাতালে আসেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু নানা সংকটে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ওই হাসপাতালে কথা হয় গোদ রোগী মোঃ মনু মিয়ার (১৯) সঙ্গে। তার বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বড়ভিউলা গ্রামে। গত ২২ অক্টোবর সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। প্রায় ১৫ বছর ধরে সে এ রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য অনেক জায়গায় ঘুরেছে। কোনো ফল মেলেনি। অবশেষে তার ঠিকানা হয় সৈয়দপুরের এ ফাইলেরিয়া হাসপাতালে। গত নয়দিনের চিকিৎসায় হাঁটাচলা করতে পারছে সে। আগে পায়ে পোকার কামড়ে সব সময় তাকে যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো। কয়েকদিনের চিকিৎসায় তার পায়ের বিভিন্ন অংশ থেকে দুই হাজার পোকা বের হয়েছে। এখন আর পোকার কামড়ের যন্ত্রণা নেই। চিকিৎসকদের কথা, দুই মাস একনাগাড়ে চিকিৎসা করলে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে।

এ দিনই হাসপাতালের বেডে কথা হয় কুষ্টিয়ার হরিনারায়ণপুর থেকে আসা ব্যবসায়ী বিকাশ সাহার (৪০) সঙ্গে। তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে গোদ রোগে ভুগছেন। চলাফেরা করতে পারতেন না। প্রায় এক মাস ধরে সৈয়দপুর ফাইলেরিয়া হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বর্তমানে ৭০ ভাগ সুস্থ হয়েছেন। আরো এক মাস তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে পূর্ণভাবে সুস্থ হতে চান। এসব রোগীর মতে, হাসপাতালের সেবার মান অনেক ভালো। তবে কর্তৃপক্ষ সময়মতো সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ করতে পারছেন না।

কথা হয় হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোঃ রায়হান তারিকের সঙ্গে। তিনি জানান, উইচেরিয়া ব্যাঙ্কক্রফটি জীবাণু থেকে গোদ আর আয়োডিনের অভাবে হয় গলগণ্ড। আক্রমণের ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত এসব রোগের জীবাণু শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পরে রোগ ধরা পড়লেও চিকিৎসা দেয়া জটিল হয়ে যায়। বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষরাই এসব রোগে আক্রান্ত হয় বেশি।

তার মতে, পাহাড়ি এলাকার মানুষদের গোদ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বর্তমানে সারাদেশ থেকেই এসব রোগের রোগীরা ফাইলেরিয়া হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। প্রতিদিন হাসপাতালের ইনডোরে গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী আসছেন। আউটডোরে রোগীর সংখ্যা এর থেকে তিন-চারগুণ বেশি। রয়েছে আর্থিক সংকটও।

কথা হয় হাসপাতালের রিশিপসনিস্ট (অভ্যর্থনাকারী) নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, তিন মাস ধরে বেতন পাই না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কষ্টে দিন নিবারণ করতে হচ্ছে। হাসপাতালের সংকট তাকে প্রচণ্ড পীড়া দেয়। এ সংকট মেটাতে তিনিও সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের সদয় দৃষ্টি কামনা করেন।

জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সুরুত আলী বাবু জানান, আর্থিক, জনবল ও ওষুধ সংকটের কারণে রোগীদের প্রয়োজনমাফিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর্থিক সংকটে হাসপাতালে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা তিন থেকে চার মাস বকেয়া থাকছে। এ জন্য তিনি সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেন।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj