ডিসিসির বর্জ্য শোধনাগার : সাভারে দুর্গন্ধে গ্রাম ছাড়ছে মানুষ

শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০১৪

সাভার প্রতিনিধি : সাভার উপজেলার বনগাঁও ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম নগর কোণ্ডা। এখানে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসবাস। এখানকার বেশিরভাগ লোকই মৎস্যজীবী ও কৃষি কাজে নিয়োজিত। আছেন ব্যবসায়ীও। ছোট এই গ্রামের অদূরে স্থাপন করা হয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য শোধনাগার। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সব জঞ্জাল, ময়লা-আবর্জনা পড়ছে এই ভাগাড়ে। স্থানটি সাভার উপজেলার অন্তর্গত হলেও সাভারের কোনো ময়লা সেখানে পড়ছে না। অথচ ডাম্পিং স্থান সংকটে ভুগছে সাভার পৌরসভা। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলায় দূষিত হচ্ছে পৌর এলাকার পরিবেশ।

নগর কোণ্ডা এলাকার একাধিক প্রবীণ ব্যক্তি বলেছেন, স্বভাবিকভাবে চোর-ডাকাতের ভয়ে মানুষ রাতে দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখে। কিন্তু ওই এলাকায় ময়লার দুর্গন্ধের কারণে সারাদিনই বন্ধ রাখতে হয় বাড়ির দরজা-জানালা। এ অবস্থায় নিরুপায় পরিস্থিতিতে ঘরবাড়ি ছাড়ছেন অনেক মানুষ। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। বর্জ্যরে দুর্গন্ধে বিষিয়ে উঠছে পরিবেশ। প্রতিনিয়ত অসুস্থ হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। তাদের শরীরে দেখা দিচ্ছে নানা রকম চর্ম রোগ। এদিকে সামান্য বৃষ্টি হতেই এই ময়লার পানি মিশে যাচ্ছে নদী এবং কৃষি জমিতে। স্থানীয় বাসিন্দা মোমিন উল্লাহ পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, তাদের কয়েক বিঘা কৃষি জমি জোর করে নিয়ে নেয়া হয়েছে ওই ভাগাড় নির্মাণের জন্য। তাদের জমি থেকে বছরে প্রায় ১০০ মণ ধান পাওয়া যেতো। কিন্তু তারা এখন কোনো কিছুই পাচ্ছেন না। তাদের বাড়িটি ভাগাড়ের কাছাকাছি হওয়ায় সবসময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়।

মনোয়ার হোসেন সৈকত ও ইসরাত জাহান ইভা এই গ্রামের বাসিন্দা। তারা মিরপুর বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, ময়লা আবর্জনার পচা গন্ধে আশপাশের গ্রামগুলোতে বসবাস করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ভাগাড়ের ওপরে আশপাশে সারাক্ষণ কাক ও শুকুন উড়ে। বিষিয়ে উঠা পরিবেশে টিকতে না পেরে সামর্থ্যবান অনেকেই পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে সাভার ও ঢাকায় ভাড়া বাসায় থাকছেন। আর যারা আছেন তারা নিরুপায়!

মোঃ মাসুম পেশায় একজন কৃষক। তিনি বলেছেন ময়লা-অবর্জনার কারণে জমির উর্বরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। জমিতে চাষ করতে লাঙল চালাতেই ওঠে আসে পলিথিন। শীত মৌসুম সামনে রেখে কৃষক জমি তৈরি করতে চাইলেও মাটি অনুর্বর হয়ে যাওয়ায় তারা কোনো সবজি চাষ করতে পারছেন না। এছাড়া দূষিত বাতাসের কারণে নষ্ট হচ্ছে গাছপালা ও ফুল-ফল। মোঃ সংজব পেশায় একজন মৎস্যজীবী। তিনি বলেছেন বর্জ্যরে কারণে পানি দূষিত হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে কেবলমাত্র বর্ষা মৌসুম ছাড়া এমনিতে অন্য কোনো সময় ওই এলাকার নদী-ডোবায় কোনো মাছ পাওয়া যায় না। তিনি আরো বলেন, কোণ্ডা বিলে অনেক সুস্বাদু মাছ পাওয়া যেতো এক সময়। এখন আর তা পাওয়া যায়না। সাভারের বলিয়ারপুর এলাকার এক গৃহবধূ জানান, মশা-মাছির উপদ্রবে ঘরে টেকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এছাড়া গরু-ছাগল পালনের জন্য তারা কোনো ঘাস পাচ্ছেন না।

জনগণের দুর্ভোগ প্রসঙ্গে বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইবনে হাসিব সোহেল বলেন, বারবার এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেও কোনো কাজ হয়নি। আমরা সিটি করপোরেশন বরাবর আবেদন করেছিলাম এই ভাগাড় অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য। কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এছাড়া যাদের জমি নিয়েছে সিটি করপোরেশন তার দামও দেয়নি। তিনি আরো বলেন, এভাবে চলতে থাকলে নগর কোণ্ডা গ্রাম এক সময় বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। তিনি এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সুশীল সমাজ ও পরিবেশবাদীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj