৫০তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা : সালাম সালেহ উদদীনের ছোটগল্প

শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০১৪

গল্পের পটভূমি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নাগরিক কিন্তু চরিত্ররা লেখকের ভাষায় দীর্ঘদিন নগরে বাস করেও মানসিকতায় প্রকৃত নাগরিক হতে পারেনি। আধুনিক জীবনের টানাপোড়েন এবং দৈনন্দিন সমস্যায় জড়িত মানুষের বিপন্নতা, একাকিত্ব ও কৃত্রিমতার প্রতি ইঙ্গিত দেয়াই গল্পগুলোর উদ্দেশ্য

পোস্ট-মডার্নের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যদি হয় জীবনের খণ্ডিত অংশের প্রতি আলোকপাত, তাহলে ছোটগল্প জন্ম-লগ্ন থেকেই পোস্ট-মডার্ন। সালাম সালেহ উদদীনের ছোটগল্পে খণ্ডিত জীবনের আলেখ্য শুধু নেই, এর বর্ণনায় রয়েছে এমন এক নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গি যা বেশ দূরত্ব থেকে ঘটনা অবলোকনের সুযোগ এনে দেয় পাঠকদের। এর ফলে আবেগ রহিতভাবে কাহিনীর উপলব্ধি সম্ভব হয়। এই দূরত্বরচনার জন্য লেখককে অবশ্য খুব কাছে থেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয় ঘটনা এবং ঘটনার চরিত্রকে। নিরীক্ষণের অন্তরঙ্গতার সঙ্গে আবেগরহিত উপস্থাপনার যেন শৈলী সালাম সালেহ উদদীন ব্যবহার করেন, কাহিনী নির্বিশেষে সেই বিষয়টিই কথা সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দেয়। নিরাসক্ত, নির্মোহ এমনকি আপাতদৃষ্টে উদাসীন একটি বর্ণনাভঙ্গির জন্য তাকে শনাক্ত করা যায় সহজেই। গদ্যোর, বিশেষ করে কথাসাহিত্যের চর্চায় সফলতার প্রধান যে শর্ত নিজস্ব শৈলীনির্মাণ, সেটি তিনি পূরণ করেন অনায়াসে এবং স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে।

সালাম সালেহ উদদীন তরুণ প্রজন্মের লেখক নন। আবার প্রবীণদের শ্রেণীতেও তাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। তিনি যে প্রজন্মের সদস্য তাদের মধ্যে গদ্য চর্চা প্রায় বিরলই বলা যায়। বেশ এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব দেখা দিয়েছে তার এবং সমকালীন লেখদের সৃজনশীলতায়। ব্যতিক্রমী মুষ্টিমেয় একজন হিসেবে শুধু নয়, বলিষ্ঠ প্রকাশভঙ্গি এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্যেও তিনি উলে¬খযোগ্য। এই আধুনিকতা অগ্রজদের কাছ থেকে ধার করা নয়, তার মেধা ও মননের ফসল। বিদেশী প্রভাবেও এমন হয়েছে তা বলা যাবে না। সংখ্যায় স্বল্প হবার জন্যই এবং দীর্ঘ বিরতি দিয়ে প্রকাশের কারণেই হয়তো তার লেখার বৈশিষ্ট্য নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। শহরে এখন সাদা কাক চোখে পড়ে না নামে যে ছোটগল্প সঙ্কলন সেখানে স্থান পেয়েছে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের কাহিনী। গল্পের পটভূমি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নাগরিক কিন্তু চরিত্রেরা লেখকের ভাষায় দীর্ঘদিন নগরে বাস করেও মানসিকতায় প্রকৃত নাগরিক হতে পারেনি। আধুনিক জীবনের টানাপোড়েন এবং দৈনন্দিন সমস্যায় জড়িত মানুষের বিপন্নতা, একাকিত্ব ও কৃত্রিমতার প্রতি ইঙ্গিত দেয়াই গল্পগুলোর উদ্দেশ্য। চরিত্রগুলো সব রকমের মানবিক দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার শিকদার, যার জন্য তাদের প্রতি বিরক্তি কিংবা ঘৃণা নয়, সহানভূতিই বড় হয়ে দেখা দেয়। ‘প্রকৃত নাগরিক’ হতে পারার ব্যর্থতার জন্য শেষ পর্যন্ত নগরায়ন পদ্ধতি এবং শ্রেণীবিভক্ত সমাজকেই দায়ী করতে হয়।

সঙ্কলনের প্রথম গল্প ‘প্রায়-নিমজ্জিত বাড়ির নায়িকারা’ নায়কের ফ্যানটাসি দিয়ে শেষ হয়েছে যেখানে ‘প্রায় নিমজ্জিত বাড়ির’ নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের প্রতি পৌনঃপুনিক আকর্ষণ থেকে তার মুক্তির ইচ্ছা ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু অন্ধ আবেগের কিংবা বলা যায় নিয়তির কাছে অসহায়তার জন্যই তার সঙ্গে নায়িকাদের অলীক যে সম্পর্ক তা যে চিন্ন হবার নয়, সেই উপলব্ধি নায়ককে জানিয়ে দেয় ‘পৃথিবীর রূপ রস-গন্ধ সৌন্দর্য তার পুষ্ট কাচের শক্তিশালী চশমা দিয়ে সে কখনই দেখতে পাবে না।’ বেশ নৈরাশ্যজনক এই পরিণতি কিন্তু তাকে এড়াবার উপায় জানা নেই নায়কের। প্রায় গল্পের প্রমাণ চরিত্রদেরই দেখানো হয়েছে আগ্যের ক্রীড়নক হিসেব যারা কেবল ঘটনা পরম্পরায় তাড়িত হয়েছে অসহায়ভাবে। তাদের জীবনে গতি আছে কিন্তু অগ্রগতি নেই। সালাম সালাউদদীন প্রায় গল্পেই বর্ণনাকারী একজন নয়, একটি গোষ্ঠী। বহুবচনে বর্ণনায় নাগরিক জীবনের. গ্রামীণ সামষ্টিকতার ইঙ্গিত রয়েছে যার মাধ্যমে লেখক চরিত্রের প্রকৃত নাগরিক হতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ‘ঢাকা হাউজিং-এর দম্পতি’ গল্পে বহুবাচনিক বর্ণনাকারীর ব্যবহার করে লেখক শ্রেণীভুক্ত মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশে¬ষণ করেছেন। বহুবচনের এই ব্যবহার তাঁর আরো কিছু গল্পে দেখা যায়। ‘ঢাকা হাউজিং-এর দম্পতি’ গল্পে নুর সাহেব এবং তার স্ত্রী শম্পার দাম্পত্য জীবন নিয়ে পাড়ার লোকের কৌত‚হল আর জল্পনা-কল্পনা শেষ হয় তাদের ভ্রান্ত ধারণার সমাপ্তি দিয়ে। পাড়ার লোকরা জানবার আগেই লেখক পাঠকদের গল্পের দম্পতি সম্পর্কে সত্য ঘটনা জানিয়ে দেন। বর্ণনা এখানে দুই পর্যায়ে ঘটে, পাড়ার লোকের মুখে এবং লেখকের ভাষায় যার জন্য গল্পটি সাধারণ বিষয়ে হলেও অসাধারণত্ব পায়। ‘একজন অতৃপ্ত মানুষের উপাখ্যান,’ গল্পটির বিষয় কেবল হাস্যকর নয়, উদ্ভটও বটে। একজন বিবাহিত পুরুষ কেবল প্রেমের জন্যে অন্য মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন কিন্তু এই আকর্ষণ একতরফা থেকে যাওয়ার জন্য তাকে পরিচিত জনের কাছে হাস্য-বিদ্রƒপের বিষয় করে তোলে। যে ঘটনায় এই ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণিত হতে গিয়েও হয় না, সেটি মেলোড্রামেটিক হলেও বিশ্বাসযোগ্য। গল্পটিতে লেখক নাগরিক জীবনে একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার ওপর জোর দিয়েছেন। মানসিক বিকৃতির ওপর নয়। ‘ঘুমহীন শহরে ঘুমকাতুরে একজন গল্পে প্রধান চরিত্র নাগরিক জীবনের উধর্বশ্বা দৌড় প্রতিযোগিতায় ব্যতিক্রমী একজন। কিন্তু প্রবাসী বন্ধুর কাছ থেকে হযাৎ লাখ টাকার চেক পাবার পর তার জীবনেও ‘ইঁদুর দৌড়’ শুরু হয় এবং অন্যদের মতো তারও প্রায় বিন্দ্রি জীবনযাপনের বাধ্যবাধকতা এসে যায়। নগর জীবনে কেউই বেশিদিন ব্যতিক্রমী থাকতে পারে না, সবাইকে একই ছাদের আদলে পড়ের উঠতে হয়, একলাই বলতে চেয়েছেন লেখক। ‘লোকটি’ গল্পের চরিত্র অন্যান্য গল্পের মতো মধ্যবিত্ত চরিত্রের নয়। অসুস্থতার জন্য শরীরে নানা আকারের কুৎসিত মাংস পিণ্ড নিয়ে নামহীন লোকটি রাস্তার পাশে বসে ভিক্ষা করে। একদিন ট্রাফিক জ্যামের সময় তার হঠাৎ মনে হয় যেন অনেক লোক ছুটে আসছে তার দিকে। গল্পটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা হতে পারে। এক নাগরিক জীবনে আকস্মিক ঘটনা ও দুর্ঘটনার ইঙ্গিত। দুই, লোকটির শরীর সমাজের অসুস্থতার প্রতিনিধিত্বকারী। তিন, লোকটি অসুস্থতার ভান করছে যা ধরা পড়ে যাবার জন্য মারমুখী হয়ে পথচারীরা ছুটে আসছে। ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে অদৃষ্টতা তার জন্যে গল্পটি খুব সাধারণ হয়েও চিন্তার খোরাক জোগায়। ‘রপ্তানি শিল্পের কথা’ গল্পটি অমুনা নতুন প্রজন্মের লেখকদের ব্যবহৃত বিষয় বর্ণনার সঙ্গে তুলনীয়। এইসব গল্পে একটা বড় পটভূমি ও ব্যপ্ত বিষয় থাকে যার ভেতর স্থাপিত হয় গল্পের প্রধান চরিত্র এবং বিন্যস্ত হয় পরিবর্তনশীল ঘটনা। বর্ণনাকারী ধারাভাষ্যকারের মতো নিস্পৃহ হয়ে ঘটনা ও চরিত্রের পরিপূরিক সম্পর্কের কথা বলতে থাকে। এই বর্ণনা মাঝপথে শেষ হতে পারে, কিন্তু পরিপূর্ণ সমাপ্তির দিকেও যেতে পারে। দুটোর মধ্যে যেটাই হোক, গল্পের লেখকের একটি বক্তব্য পাওয়া যায়। এই গল্পেও তাই দেখা যায়। বর্ণনার মেজাজ এখানে সংবাদ পরিবেশনের মতো তথ্যভিত্তিক এবং নৈর্ব্যক্তিক। ‘প্রেম এবং শরীরের মধ্য বিন্দু’, গল্পটি একজন উদ্ভট চরিত্রের বিকৃত মানসিকতার বিষয় নিয়ে। অস্থির নাগরিক জীবনে বিকৃতি ঘটে যায়, ঘটতে পারে, এই উপলব্ধি ছাড়া গল্পটির বিশেষ কোনো তাৎপর্য নেই। ‘শূন্যতা যখন প্রতিপক্ষ’ গল্পে একটি কর্মজীবী তরুণীর নিরাপত্তাবোধের অভাব তার নিঃসঙ্গতাকে তীক্ষè করে তোলে এবং প্রকৃত সঙ্গী তাকে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তাকে হারাতে হয়। মেয়ে চরিত্রটি নাগরিক জীবনে অনেক কর্মজীবী মেয়ের হতাশার এক চিত্র এবং সেই কারণে মর্মস্পর্শী। নাম গল্প ‘শহরে এখন নানা বক চোখে পড়ে না’ সত্যের মুখোমুখি এক কবি চরিত্রের কাহিনী। বর্ণনার ব্যাপ্তিতে এটি ছোটগল্পের পর্যায়ে পড়ে না। বিষয়ের দিক দিয়েও অন্য গল্পের তুলনায় এটা কিছুটা দুর্বল।

সালাম সালেহ উদ্দীনের প্রায়ই গল্পেই বর্ণনাকারী হিসেবে ‘আমি’র বহুবচন ‘আমরা’ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মাধ্যমে লেখক গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের যে প্রধান পার্থক্য, ‘কম্যুনিটি ফিলিং’ গোষ্ঠীগত অনুভব, তার দোলাচলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তার চরিত্ররা যে অনেকদিন নগরে বাস করেও মানসিকতায় নাগরিক হতে পারেনি, এই বিষয়টি তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন বহুবচনে বর্ণনাকারী ব্যবহার করে। তার গল্পের বিষয় অসাধারণ বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবনে যা ঘটে বা যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, সেই সব বিষয়কে কেন্দ্র করে তার কাহিনী বর্ণনা। লেখক নিজে অথবা বর্ণনাকারী চরিত্র ‘আমরা’ গল্পের সামান্য বিষয়কেও কৌত‚হল এবং ঔৎসুক্য নিয়ে পর্যবেক্ষণ করার ফলে গল্পগুলোতে এক ধরনের অন্তরঙ্গতা এসেছে যা নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি সত্ত্বেও পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। দৃষ্টিভঙ্গির এই বৈপরীত্য এবং অন্তিমে তাদের সাযুজ্য সালাম সালেহ উদ্দীনের গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে। গল্পের ভাষা সাহিত্যের হয়নি, অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদ পরিবেশনের মেজাজে লেখা। একেও একটি নতুন শৈলী বলে মেনে নেয়া যায়।

:: হা স না ত আ ব দু ল হা ই

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj