লালন স্মরণ উৎসব : অন্তরে তাঁর অনন্ত একতারা

শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০১৪

মানুষের ভেতরের মানুষটাকে জানার জন্য যাঁর গান আমাদের আন্দোলিত করে, ভাবতে শেখায়, মনের ভেতর নতুন বোধের জন্ম দেয়; তিনি অন্য কেউ নন আমাদের মনের মানুষ বাউল কবি লালন শাহ্। বর্তমান সময়ে লালন শাহ্র দর্শন এবং শিক্ষা খুবই প্রাসঙ্গিক, লালনের যে ভাব ও শিক্ষা তার মূলেই ছিল মানব ধর্ম, মানবতার ধর্ম। যতদিন যাবে লালন ততই আরও বেশি আমাদের সামনে প্রকট হয়ে উঠবে এমনটাই আভাস পাওয়া যায় শিক্ষিত ও উদার চিন্তাশীল মানব সমাজে। লালন ছিলেন আজন্ম অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ। ছেলেবেলায় তাঁর একটা বাণী শুনে আমি অত্যন্ত প্রাণিত হয়ে ছিলাম, “নানান বরন গাভীরে তার একই বরণ দুধ জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।” এই একটি কথার মধ্য দিয়ে সমগ্র মানব জাতিকে তিনি একসূত্রে গেঁথে ফেলেছেন। এই পৃথিবীর সমগ্র মানব জাতি (আমরা) একই মায়ের পুত্র, তবে ধর্মে ধর্মে এত হানাহানি, মারামারি, দ্ব›দ্ব কেন? তার সমাধান লালন আজীবন তাঁর গানের মধ্য দিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। লালনের ভাব এবং দর্শন সবসময় আমাকে টানতো সে জন্য ১৭ অক্টোবর একাই লালনের আখড়ায় যাওয়ার জন্য ছেঁউড়িয়ার উদ্দেশ্য রওনা হই, পথে মোঃ জাফুরুল ইসলাম (রতন) নামে এক লালন ভক্তের সাথে আমার দেখা হয়। তিনি পাবনা নিবাসী এবং দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে লালন মেলায় আসেন; তিনি আমাকে আখড়ার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখান এবং বিভিন্ন প্রসঙ্গে লালনকে নিয়ে বিস্তারিত বলেন। আমি রতন ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে হাজার লালন ভক্ত, অনুরাগী বিভিন্ন বাউল ভক্তরা এখানে এসেছে এবং তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক মিলনমেলা, যে ধরনের দৃশ্য সাধারণত আমরা সচরাচর দেখতে পাই না। আমি এখানে এসে সত্যি অভিভূত, কারণ এই ভক্তরা কম বেশি সবাই লালনকে হৃদয়ে ধারণ করেছে। আমরা সাধারণ মানুষ যারা, তারা লালনকে তাদের মতো করে হৃদয়ে ধারণ করতে পারিনি। লালন মেলা ঘুরে এবং বিভিন্ন লালন ভক্ত ও বাউল-ফকিরদের সঙ্গে কথা বলে যেটা জানতে পারলাম; সেটা হলো লালন কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না, তাঁর মূল ধর্ম ছিল মানব ধর্ম, মানবের কল্যাণ এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, প্রেম ও ভক্তি, যা মানুষের হৃদয়কে শুদ্ধ করে। তাঁর এই ভাবের কথা বা দর্শন বোঝা যায় তাঁর অমূল্য সব গানের মধ্য দিয়ে। “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।” এই গানটির মধ্য দিয়ে তার সমগ্র মূল্যায়ন আমরা করতে পারি, অর্থাৎ তিনি মানুষকে কোন পর্যায়ে দেখতে চেয়েছেন এবং মর্যাদা প্রদান করেছেন। লালন দর্শনের সঙ্গে আমরা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ভারত সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মিল খুঁজে পাই, এমনি রবীন্দ্রনাথ প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রথম শিক্ষিত এবং সুশীল সমাজেন কাছে লালনের দর্শন তুলে ধরেন; শুধু ভারত বর্ষেই নয় তিনিই প্রথম লালন দর্শনের সঙ্গে পাশ্চাত্যের ভাববাদীদের পরিচয় করিয়ে দেন। লালনের বয়স যখন শতবর্ষের কাছাকাছি তখন রবীন্দ্রনাথ যুবক এবং তিনি লালন যে সোনার মানুষ তা বুঝতে পেরেছিলেন; তাদের মধ্যে এক ধরনের বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আমরা রবীন্দ্রনাথের অনেক গানে এবং কবিতায় লালনের দর্শন খুঁজে পাই; বাউল সঙ্গীতের ধারা অনেকটা স্পষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে। লালন ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অনেকটা অনুপ্রেরণার উৎস, যেখান থেকে তিনি নিজেকে জানার প্রয়াস করেছেন এবং নিরাকার সর্বশক্তিমানের সাথে সাকার মানব হৃদয়ের অপার তাত্তি¡ক শূন্যতার অন্তঃমিল খুঁজে পান, যে জ্ঞান অর্জন করছে মানুষ পরমানন্দ লাভ করতে পারে, জীবনের মুখ্য আনন্দ তখন বিরহ বাসনায় রূপান্তরিত হয়। লালন দ্বারা যে রবীন্দ্রনাথ প্রভাবিত তা তিনি নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন। “আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানের অন্যরূপ রাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে।” (হারামণি, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৪২ পৃ: ৭)। এমনকি লালনকে নিয়ে যে কবিতা রচনা করেছেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ কতটা বুঝতে পেরেছিলেন লালনকে।

“কতদিন দেখেছি ওদের সাধককে

একলা প্রভাতে রৌদ্রে সেই পদ্মা নদীর ধারে,

যে নদীর নেই কোন দ্বিধা

পাকা দেউলের পুরাতন ভীত ভেঙ্গে ফেলতে।

দেখেছি একতারা হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে

মনের মানুষকে সন্ধান করবার

গভীর নির্জন পাথে। ”

(বাউল কবি লালন শাহ্, অধ্যাপক আনোয়ারুল কবির, নওরোজ কিতাবিস্তান, ৪৬, বাংলাবাজার ঢাকা, ১৯৬৬)

এবার ছিল বাউল স¤্রাট লালন ফকিরের ১২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী, প্রতি বছরের মতো হাজার হাজার ভক্ত সমাগম হয়েছিল ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়ায়। ৫ দিন ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং মেলার আয়োজন করেছিল লালন একাডেমি, এ এক অভূতপূর্ব মিলনমেলা যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এবারের লালন মেলায় দুজন প্রবীণ লালন ভক্তের সাথে আমার কথা হয়, তাঁরা হলেন- রওশন ফকির ও ফকির পিয়ার শাহ, যাঁর গুরুর নাম কেয়ামত শাহ। ফকির পিয়ার শাহ এসেছেন দৌলতপুর থানার প্রাগপুর থেকে, তিনি ৪০ বছর ধরে লালন ফকিরের ভক্ত। প্রাণের টানে তিনি প্রতি বছর ছুটে আসেন ছেঁউড়িয়ায়। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায় যে, লালনের শিক্ষা এই সমাজে খুব বেশি প্রয়োজন, কারণ লালন ভক্ত হলে তখন হৃদয়ে আর কোনো জাতি বা ধর্মের ভেদাভেদ থাকে না। আল্লাহ্র আশেকান বা আলোকিত মানুষ হওয়ার জন্য মানুষের বাউল দর্শন আত্তস্ত করা প্রয়োজন, আর তা না হলে নিজেকে এবং সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায় না। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন লালন ফকিরের কোনো সন্তান ছিল না, তিনি কোনো সৃষ্টি করেনি, তিনি ছিলেন অখণ্ড।

অন্যদিকে রওশন ফকিরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি বাউলদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন এবং এ প্রজন্মের কিছু ছেলেদের লালন দর্শন বোঝাচ্ছেন। আশার কথা হলো দিন দিন লালন মেলায় মানুষের ভিড় বাড়ছে এবং মানুষ বাউল দর্শনকে বোঝার চেষ্টা করছে। সারাদিন লালন মেলায় ঘুরে সন্ধ্যার সময় নাটোরের উদ্দেশ্যে রওনা হই, অনেক ভক্ত বলেছিলেন রাতে থেকে যাওয়ার জন্য, কারণ রাতেই মেলার আসল রূপ দর্শন করা যায়। রাত্রিযাপনের প্রস্তুতি ছিল না বিধায় আমাকে চলে আসতে হয়েছিল কিন্তু মন টানছিল থেকে যাওয়ার জন্য। মনে হলো মনের মানুষকে ফেলে রেখে আমি চলে যাচ্ছি, মনের মধ্যে বিরহের একতারা বাজছিল। ভাবতে অবাক লাগে লালন ফকির তিন ধর্মের সংমিশ্রণে নিজেকে জানার চেষ্টা করেছেন। তিনি যেমন চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন, তেমনি অনুপ্রাণিত ছিলেন ইসলাম ধর্মের সুফিবাদ এবং বুদ্ধ দেবের দর্শন দ্বারা। লালন ফকিরের এক অন্তরেই বেজেছিল অনন্ত একতারা, যে একতারার ধ্বনি যুগ যুগ ধরে তার ভক্তদের অনুপ্রাণিত করবে এবং মিলন ঘটাবে জীব আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার।

“আমি একদিনও না দেখলাম তারে/বাড়ির কাছে আরশী নগর/সেথায় এক পড়শী বসত করে।”

লালন ফকির তাঁর গানে এক পড়শীর কথা বলেছেন, যে কিনা আরশী নগরে থাকে। গানের কথাগুলো মনকে অন্যরকম করে দেয়, আন্দোলিত করে, কি জাদু সে গানের ভেতর! কারণ আমাদের মনের ভেতর এই পড়শীকে জানার আগ্রহ তীব্র, লালন মাত্রই সেটা বুঝতে পেরেছিল। মনে মনে আমরা সবাই বাউল, লালনের গান সেই ভাবটিকে উসকে দেয়। মনের মানুষকে জানার জন্য লালন চর্চার কোনো বিকল্প নেই।

:: লি ট ন ম হ ন্ত

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj