অন্ধ কারার অন্তরালে

শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০১৪

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বাইশ.

প্যারিস ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের গ্র্যাজুয়েট মোক্তার ওউলদ দাদ্দাহর হাতে ১৯৬০ সালে ফ্রান্স সরকার মৌরিতানিয়ার প্রশাসনিক ক্ষমতা ছেড়ে দেবার কিছুকাল পর থেকেই চরমভাবে বদলে যেতে থাকে দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাস। এক দলকে সামরিক ক্ষমতা বলে সিংহাসন থেকে অপসারণ করে আরেক দলের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পুনরাবৃত্তির নিত্য মহড়ায়, এর আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে থাকে বিপুলভাবে। যার ফলে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট মোক্তার দাদ্দাহ, স্বদেশভূমিতে জনকল্যাণমূলক কর্মধারা প্রচলনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, শুরু থেকেই সেটা বাধাগ্রস্ত হতে থাকে বারবার। দাদ্দাহ চেয়েছিলেন পশ্চিমা বিশ্বের আদর্শ অনুসারে দ্বিধাবিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রিত করে সর্বসমন্বয় সাধনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে মাতৃভূমির উপযুক্ত উন্নয়ন সাধন। সেজন্য দেশের তিন প্রধান এথনিক গ্রুপ সাদা আরব, কালো আরব ও কালো আফ্রিকানদের বিবাদ মেটাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট দাদ্দাহ। যাতে স্বদেশে গণতন্ত্র প্রণয়নের অভিপ্রায় বাস্তবতা লাভ করে। যাতে কুশিক্ষায় জর্জরিত, সভ্যতার আলোকবঞ্চিত, তার দরিদ্রতম মাতৃভূমি শিক্ষা এবং আর্থিক সমৃদ্ধি লাভ করে বিশ্বের দরবারে ক্রমশ সভ্য দেশের স্বীকৃতি লাভের জন্য যোগ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য সফলায়নে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘মৌরিতানিয়ান রিগ্রুপমেন্ট পার্টি’ সৃষ্টি করেও স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেননি ওউলদ দাদ্দাহ। সামরিক অভ্যুত্থানের প্রবল ছোবলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা কয়েক বছর বাদেই বিধ্বস্ত হয়েছিল সমূলে উৎপাটিত হয়ে। মৌরিতানিয়ায় দাদ্দাহর যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে তিন দশকেরও আগে। কিন্তু এ দেশে সিরিজ অফ মিলিটারি ক্যুয়ের অবসান এখনো ঘটেনি। আর সেই সুযোগে টেরোরিজমের ভয়ঙ্কর অভিশাপ, মানবিক অধিকারের অসহ্য দুর্গতি, অসহনীয় দুর্নীতির পারঙ্গমতা দেশটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে জনমানসের নৈতিক অধঃপতন ঘটিয়ে। হিউম্যান রাইটস গ্রুপগুলো তাই আরম্ভ থেকেই বলে চলেছে- যেখানে সিরিজ অফ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা দখলের নিত্যপ্রতিযোগিতা চলে, সেখানে বারংবার পদক্ষেপ গ্রহণ সত্ত্বেও সর্বস্তরে দেশের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টি চরমভাবে অবহেলিত থেকেই যায়!

নাগরিক নিরাপত্তার এই অবহেলারই চরম মূল্য দিতে হয়েছে বছর চারেক আগে ফাদার আরভিনকে। রাজধানী নওয়াকশটে তখন ওয়েস্টার্ন টুরিস্টদের আগমনে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো সবে একটু আধটু জমে উঠতে শুরু করেছে। যদিও সহিংস গোষ্ঠীগুলোর নানা স্তরের ভায়োলেন্সের কারণে মৌরিতানিয়ায় টুরিজমের ক্ষেত্র তখন অতিমাত্রায় সীমিত হয়ে গেছে। তারপরেও নভেম্বরের শেষ প্রান্তে উত্তর আটলান্টিকের সাগর সৈকতে দু’চারজন সৌন্দর্যপিয়াসু কৌত‚হলী বিদেশীদের পদচারণা দেখা যাচ্ছিল গত কয়েকদিন ধরে। ফাদার আরভিনের কাজের সীমানা বহুদিন ধরে সংকীর্ণ হয়েছিল বয়সের ভারে। তার দায়িত্বভার সরাসরিই পুত্র এবং পুত্রবধূর কাঁধে ছেড়ে দিয়েছিলেন অধ্যক্ষ আরভিন। এ দেশে সন্ত্রাসের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে বয়সের ঝুঁকি তার নিয়ে বাইরে যাতায়াতও বন্ধ হয়েছিল এক প্রকার। বেশিরভাগ সময় ফাদারের দিন আজকাল তাই ঘরে বসেই অতিবাহিত হয়। বাইরের অশুভ উত্তেজনায় তিনি মর্মাহত হন। আর তাতে তার শারীরিক পরিস্থিতি পুত্র ও পুত্রবধূর উদ্বেগের কারণও হয়ে ওঠে মাঝেমধ্যে। সে কারণেই তিনি চাইছিলেন, সামনের বছর জন্মভূমি প্যারিসে ফিরে গিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন প্রভু জিসাসের চরণতলে। অবিন্না প্রথমদিকে সম্মত না হলেও শেষ অবধি রাজি হয়েছিল স্বামীর কথায়। জেসান বলেছিল- পাপ্পা ওখানে গিয়ে বসবাস করলে আমি অনেকটাই নিশ্চিন্ত হতে পারবো অবিন্না। সেখানে মেডিকেল চেকআপ রুটিন মেনে চলতে পারবে। এ ছাড়াও মাঝে মাঝেই অফিসের কাজে আমাকে শহরের বাইরে যেতে হয়। তুমিও তার ব্যতিক্রম নও। এই বয়সে একা একা তার ঘরে পড়ে থাকা…। এর ওপর অসামাজিক ক্রিমিনালরা এখানে যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে পাপ্পার এই সিদ্ধান্তকে আমার ভালোই মনে হচ্ছে।

জেসান কদাচিৎ আরভিনকে অন্যদের সামনে ফাদার বলে সম্বোধন করলেও সন্তান হবার অধিকারে অধ্যক্ষের সামনে বেশিরভাগ সময় ‘পাপ্পা’ বলেই আহ্বান করে। অবিন্না কিছু বলছে না দেখে আবার সে বলেছিল- আমরা রোজ ফোন করে পাপ্পার সঙ্গে কথা বলবো। আর বছরে তিনবার যাবো, ওকে দেখে আসতে। পাপ্পা ওখানে যতেœ থাকবেন। কারণ ওখানকার চার্চ এডমিনিস্ট্রেটিভ এসিসট্যান্টরা অধ্যক্ষ আরভিনকে ভালোবাসেন। শ্রদ্ধা করেন খুব। অবিন্না সম্মতিভরে তাকিয়েছিল স্বামীর মুখে- ফাদার তার সব শুভকর্মের যোগ্য মর্যাদা সেখানে পাবেন, সে বিশ্বাস আমার আছে জেসান। আমি ভাবছিলাম, তোমাকে ছেড়ে তিনি বেশিদিন সেখানে থাকতে পারবেন তো? সে কথা আমিও ভেবেছি অবিন্না। সেই সঙ্গে এটাও ভেবে রেখেছি, সে রকম হলে পাপ্পাকে আবার নিয়ে আসবো আমাদের কাছে। আপাতত তিনি যেটা ভাবছেন, সে রকমটাই হোক।

ফাদার প্যারিসে চলে যাবার কিছুদিন আগে হঠাৎ অফিসিয়াল কাজে রাজধানী শহর নওয়াকশটে দুদিনের প্রোগ্রামে যোগদানের দিন স্থির হলো অবিন্নার। তিন চারটে দিন বাইরে থাকলে শ্বশুরের দিনগুলো ভালো কাটবে ভেবেই পুত্রবধূ নিজের ইচ্ছের কথা জানালো তার স্বামীকে-জেসান, ফাদারকে নিয়ে তুমিও চলো আমার সঙ্গে। হোটেলে তো তিনদিন থাকতেই হচ্ছে, ডবল বেডের একটা রুম নিলে স্বচ্ছন্দে চলে যাবে আমাদের। ফাদার অনেকদিন ঘরে বন্দী হয়ে আছেন। ভালো লাগবে ঘুরে এলে। জেসান জবাবে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়েছিল আরভিনের মুখে -প্রস্তাবটা তোমার কেমন মনে হচ্ছে পাপ্পা? আমি কি তাহলে অফিস থেকে দুদিনের ছুটি নেবো? অফিস তোকে এখন ছুটি দেবে? এই তো পরশুই বলছিলি, তোর অফিসে কদিন খুব কাজের চাপ চলবে? পাপ্পা পুত্রের প্রশ্নে প্রতিপ্রশ্ন রেখেছিলেন সরাসরি উত্তর না দিয়ে। কিন্তু তার মুখের পরে পুত্রবধূর প্রস্তাবে যে প্রসন্নতার আবেশ মেখে সম্মতির আভাস ছড়িয়েছিল সেটা নজর এড়ায়নি তার সন্তানের। তুমি যেতে চাইলে দুদিনের ছুটি আমি নিতেই পারি। অবিন্না সারাদিন ওর প্রোজেক্টের কাজে ব্যস্ত থাকবে, আর আমি তোমাকে নিয়ে যতটুকু পারা যায় একটু ঘুরেটুরে চারদিকটা দেখে নেবো। জবাব দিয়েছিল জেসান। আরভিন হেসে বলেছিলেন -তাহলে চল, ফ্রান্সে ফিরে যাবার আগে ওদিকটা একবার একটু দেখেই যাই। আর হয়তো এ দেশে কোনোদিন ফিরে আসাও হবে না। ফাদারের গলায় বিচ্ছেদের ক্ষীণ সুর বেজেছিল।

ফাদার আরও একটা কারণে অবিন্নার প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিলেন। এতদূরে একা একা দেশের এ পরিস্থিতিতে পুত্রবধূকে ছেড়ে দিতে শঙ্কা হয়েছিল তাঁর। সে কারণেই মূলত পিতাপুত্রের সঙ্গে আসা। ইকরামা হোটেলটি আকারে ছোট নয়। এখানকার সার্ভিসও বেশ মানসম্মত। চেক ইন করে ৩০৭ নাম্বার রুমে স্বামী এবং শ্বশুরকে নিয়ে অবিন্না যখন প্রবেশ করলো, তখন গোধূলি মুহূর্ত পেরিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার ¤øান পর্দা নামতে শুরু করেছে চারপাশে। কিন্তু হোটেল ইকরামা তখনো ঝকঝকে, প্রচুর আলোর তীব্রতায়। আঁধারের ক্ষীণ স্পর্শও অপসারিত সেই আলোকধারায়। অবিন্না দ্রুত ¯œান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিতে নিতে বললো- ফাদার, নিচের ইনফরমেশন টেবিল থেকে আমি জেনে এসেছি, এখানে বাইরে থেকে রুমে খাবার নিয়ে আসার পারমিশন রয়েছে। জেসান রেডি হলেই ওকে নিয়ে আমি যাবো রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনতে। আপনি ততক্ষণে মুখ হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। এই অবেলায় আর ¯œান করবেন না। একটু হিমভাব আছে, ঠাণ্ডা লেগে যাবে। পুত্রবধূর এই উপদেশজনিত ¯েœহটুকু আরভিন সর্বদাই বড় উপভোগ করবেন। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী হলেও পুত্র জেসান ওকারোর জন্য যেমন তার পিতৃঅন্তর স্নেহরসে টইটম্বুর, তেমনি অবিন্নাকে পুত্রবধূ ভেবে তার কাছে ভালোবাসা লাভের আকাক্সক্ষাও ফাদারের হৃদয়ে অটুট। ফাদার প্রসন্নতা ছড়িয়ে হাসলেন- তাহলে আমিও বরং যাই তোমাদের সঙ্গে। না ফাদার। আজ সারাদিন আপনার জার্নি গেছে, এরপরে অতটা পথ যেতে গেলে সেটা আপনার জন্য অতিরিক্ত হয়ে যাবে। আমরা ত্রিশ চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসবো। আপনি বরং তত সময় শুয়ে শুয়ে একটু বিশ্রাম নিন।

ফাদার এরপরে পুত্রবধূর স্নেহদরিয়ায় ডুব দিয়ে নীরব হলেন একেবারে। মনে মনে ভাবলেন, কেন তিনি এদের ছেড়ে প্যারিসে ফিরে যেতে চাইছেন প্রভু জিসাসের চরণতলে সম্পূর্ণ আশ্রয় নেবেন বলে? জিসাস কি এদের ছাড়া? স্বর্গসুখের সাধনা করে যে প্রশান্তি লাভ হয়, পার্থিব ভালোবাসার এমন পরশ কি তার চেয়ে কিছু কম সুখ দেয় জীবনে? প্রভুর কাজে হৃদয় দিয়ে হৃদয় ছোঁয়ার উদ্দেশ্যই তো ছিল তার আজীবন। পুত্র, পুত্রবধূর হৃদয়পরশ সেই কারণেই কাম্যের হয়ে ওঠে থেকে থেকে। অন্তরের অমৃত বিলিয়ে স্বর্গের উৎস হয়ে ওঠাই ছিল তার যৌবনের সাধনা। তাই ফ্রেন্স সরকার এ দেশ থেকে অর্ধশতাব্দী আগে রাজকার্য ছেড়ে বেরিয়ে গেলেও হৃদয়ের সেই নির্দেশকে অমান্য করতে পারেননি আরভিন। বুকের অতুল মমতা ঢেলে চিরকুমার থেকে হতভাগ্য দেশকেই প্রেম বিলিয়েছেন বরাবর। তাই অবিন্নার ¯েœহের স্পর্শ এভাবে আকুল করেছে তাকে। সহসা জেসানের ভালোবাসা প্যারিসে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে বিচলিত করছে গভীর প্রশ্ন তুলে।

চল্লিশ মিনিটের আগেই অবিন্নাকে নিয়ে ফিরে এলো জেসান। পাপ্পা তখন শুয়ে শুয়ে টিভিতে গভীর মনোযোগে আন্তর্জাতিক বিষয়ের সংবাদ শুনছিলেন। যেখানে এক স্বনামধন্য মার্কিন ব্যক্তিত্ব তখন বলে যাচ্ছিলেন- একটি অবাস্তব অসম্ভব কামনার দাবিকে ম্যাসিভ হিংসার মাধ্যমে আদায় করার যে হৃদয়হীন নিষ্ঠুর কৌশল, আজকের জঙ্গিবাদ হচ্ছে তারই চরম দৃষ্টান্ত! ঠাণ্ডা মাথায়, ক্যালকুলেটেড ফ্যাশনে যা উদ্দেশ্যমূলক উপায়ে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে! জেসান সে কথা শুনতে পেয়েই চ্যানেল বদলাতে উতলা হলো- পাপ্পা, আবার তুমি এসব সংবাদ শুনছিলে? এসব নিউজ তোমার হার্টের ওপর কতটা চাপ বাড়ায়, সেটা তোমার থেকে ভালো আর কে জানে? কিন্তু জগৎ জুড়ে এটাই তো এখন বাস্তব চিত্র জেসান! হোক, তবুও তুমি শুনবে না! ডাক্তারের নির্দেশ তোমাকে মানতে হবে! আমার তো মাঝে মাঝেই ভয় হয়, তোমাকে আমার নাগালের বাইরে প্যারিসে থাকতে দেওয়া আদৌ উচিত হবে কিনা! ছেলের কথা শুনে হেসে ফেললেন ফাদার। শান্ত গলায় বললেন -বেশ তো, তোর সম্মতি না থাকলে যাবো না। অবিন্না কাছেই দাঁড়িয়ে শ্বশুরের জন্য একটি পেপার প্লেটে খাবার গুছিয়ে রাখছিল। হঠাৎ কাজ থামিয়ে বললো- ফাদার, ছেলের সম্মতি না থাকলে এখন যাবেন না বলছেন! অথচ আমি যখন বারবার আপনাকে যেতে বারণ করেছিলাম তখন কিন্তু নিজের সিদ্ধান্ত বদলের কথা একবারও উচ্চারণ করেননি! ফাদার আবার হাসলেন- আচ্ছা বেশ! তোমাদের দুজনের দাবিই মেনে নিচ্ছি। আপাতত প্যারিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমি রদ করলাম। বরং এরপরে সুযোগ মতো আমরা তিনজনেই সেখানে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসবো। রাত হয়ে যাচ্ছে অবিন্না, এবার আমাদের খাবার আয়োজন করো। বলে প্রসন্ন মুখে পুত্রবধূর দিকে আরও একবার প্রফুল্ল দৃষ্টি ছুড়ে দিলেন আরভিন।

হোটেল ইকরামার নিচের তলায় ব্রেকফাস্টের সুব্যবস্থা রয়েছে সেটা কাল সন্ধ্যায় চেকইনের সময়েই জেনে নিয়েছিল অবিন্না। সকাল সাড়ে ছ’টা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত তার সময়সীমা। সবকিছু গুছিয়ে নিতে আজ একটু বেশি সকালে বিছানা ছেড়েছিল সে। নতুন জায়গায় ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছুতে যাতে বিলম্ব না হয়, সে কারণেই এই বাড়তি সতর্কতা। ¯œান করে অফিসের পোশাক পরে একেবারে প্রস্তুত হয়ে অবিন্না লিফট ধরে নিচে এলো ব্রেকফাস্টের জন্য। খাওয়া শেষ করে সাতটার মধ্যেই পিতাপুত্রের জলখাবার নিয়ে আবার সে ফিরে এলো নিজের রুমে। অর্ধসুপ্ত জেসানের কানের কাছে মুখ নামিয়ে নিচু গলায় বললো- জেসান, তোমাদের দুজনের খাবারই টেবিলে সাজিয়ে রেখেছি। ফাদার উঠলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ো। ও হ্যাঁ আমার লাঞ্চের ব্যবস্থা তো ওই কনফারেন্স রুমেই রয়েছে, তাই দুপুরে আর আসা হবে না। অবিন্না এটুকু বলতে বলতেই ফাদার উঠে বসলেন বিছানায়। বললেন – নতুন জায়গা, সাবধানে যেয়ো অবিন্না। নাঃ থাক, একা গিয়ে কাজ নেই। আমরা বরং তোমায় সেখানে পৌঁছে দিয়ে আসি। নইলে বড় চিন্তা হবে। এখন কোত্থাও বেরুতে হবে না আপনাকে। জলখাবার শেষে ওষুধ খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপরে দুজনে মিলে বেরুবেন। আর কাল রাতে যে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার এনেছিলাম, সেখানে যাবেন দুজনে খেতে। রেস্তোরাঁটা খুব কাছেই, সে জন্যই বলছি। আমি আশা করছি পাঁচটার আগেই ফিরে আসতে পারবো। অবিন্না বেরিয়ে গিয়েছিল, দরজা থেকে ফের ফিরে এসে বললো- জেসান তোমরা বেশি দূরে কোথাও ঘুরতে বেড়িয়ো না। আজকাল এ দেশে কোনো জায়গাই নিরাপদ নয়। বরং এরপরে আমরা যখন প্যারিসে যাবো, তখন তিনজনে অনেক করে ঘুরে বেড়াবো।

জেসান বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে তন্দ্রাজড়িত অলস স্বরে উত্তর দিয়েছিল -ঠিক আছে, তাই হবে অবিন্না। আমি পাপ্পাকে নিয়ে কাছেপিঠেই একটু বেড়িয়ে আসবো।

সকালের খাওয়া শেষে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে অবিন্নার কথা অবহেলা করেনি জেসান। ফাদারও বলেছিলেন- এখানে আর বিশেষ কী দেখার আছে জেসান? কোস্টাল এরিয়ায় যেতে পারলে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখা যেতো। বহু বছর আগে দেখেছিলাম, সে এক এলাহি কারবার। বিশাল বিশাল মাছের ডালি সেখানে গাধার পিঠে চাপিয়ে তবে সেগুলো ওপরে এনে ট্রাকে তোলা হয়। সেই নিয়ে একজন কারবারির সঙ্গে আমার খুব কথা কাটাকাটিও হয়েছিল। ঝগড়া করেছিলে? কিন্তু কেন পাপ্পা? জেসান চলন্ত ট্যাক্সিতে পিতার পাশে বসে প্রশ্ন করে বেশ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছিল। পিতা তার স্বভাবসুলভ মৃদু হাসি ঠোঁটের ওপর টানতে টানতে বলেছিলেন- একটা বাচ্চা গাধার পিঠে লোকটা গাধাটার নিজের ওজনের দশ গুণ বেশি ভারী বোঝা চাপিয়েছিল বলে! সে বেচারা অতটা ভারবাহী হওয়ায় সামনে এগুতে পারছিল না একেবারেই! আর তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে বার বার আঘাত করছিল পাষণ্ড মানুষটা! সে এক অমানুষিক দৃশ্য! আর সেটা নিয়েই …! তাহলে তো ভালোই করেছিলে। তারপরে ওর পিঠ থেকে মাছের কারবারি বোঝা কমিয়েছিল? নাঃ! শেষে আমি নিজেই বেচারা বাচ্চা গাধাকে দাঁড় করিয়ে বার দশেক ওপরে উঠে মাছের ডালিগুলো ট্রাকে তুলেছিলাম। বাকিটা অবশ্য সেই-ই পরে টেনে নিয়েছিল ওপরে। এরপরে সেই মাছের কারবারি কী বলেছিল তোমাকে? কিছুই নয়। যে অনুভূতিতে ওর কিছু বলা উচিত ছিল, সেই অনুভব তো মানুষটার মধ্যে জন্মায়নি কখনো! কী করে বলবে!

কাছেপিঠে ঘণ্টা দুয়েক ঘোরাঘুরি শেষ করে অবিন্নার কথামতো মাহফা রেস্টুরেন্টে পাপ্পাকে নিয়ে প্রবেশ করলো জেসান। আধ ঘণ্টা পূর্বে ফোন করে অবিন্না তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল, দুপুর একটায় লাঞ্চের পরে হাই প্রেসারের ওষুধ খেতে যেন বিস্মৃত না হন ফাদার। তাহলে সেবারের মতো হার্টে চাপ বাড়লে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন আবার। কথাগুলো কানে যেতেই অধ্যক্ষ কৌতুকভরে বলেছিলেন- তোর বউকে ম্যানেজিং কমিটির ডিরেকটর করা হলে মানাতো বেশ! তা যা বলেছো পাপ্পা! বলেই সোৎসাহে হেসে উঠেছিল জেসান ওকারো। মাহ্ফা রেস্টুরেন্টে বাবাকে নিয়ে প্রবেশ করেই জেসান দেখতে পেল, সেখানে এরই মধ্যে টেবিলগুলো খরিদ্দারে ভরে গেছে। নানান ভাষাভাষীদের নিচু স্বরের টুকরো টুকরো কথাবার্তায়, গুঞ্জরণ তুলছে দুর্বোধ্য সব শব্দগুলো। ঘড়িতে তখন স্থানীয় সময় একটা বেজে পনেরো মিনিট। অবিন্নার বেঁধে দেওয়া লাঞ্চের সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে চল্লিশ মিনিট আগে থেকেই। কোণের দিকের একটি শূন্য টেবিল ছাড়া অন্য কোথাও বসার জায়গা ছিল না। পাপ্পাকে নিয়ে সেখানে বসেই খাবার মেনুর অর্ডার দিল জেসান। অন্য দুটি ডিসের সঙ্গে গারলিক এবং পিনাট সস্ দিয়ে তৈরি উটের মাংস আর টার্কি ট্যাকো সালাদ। হার্টের অসুস্থতার কারণে আরভিনের আহারে মাংসের মাত্রা অতি সীমিত। তার খাদ্য তালিকায় এলো গারলিক ব্রেডসহ বেশিরভাগই সবজিজাতীয় খাবার। খেতে বসে পিতাপুত্রের অজ¯্র কথা হলো আজ। যেগুলো সময়াভাবে ছেলের সঙ্গে পিতার সচরাচর বলা হয়ে ওঠে না। বেশিরভাগ কথাই আরভিন বললেন ব্যক্তিগত পর্যায়ের। খেতে খেতে, কথা বলতে বলতে একটায় ওষুধ গ্রহণের বদলে লাঞ্চ শেষে আজ আড়াইটে বেজে গেল অধ্যক্ষের ঘড়িতে। জেসান হঠাৎই সচেতন হয়ে বললো- তোমার কিন্তু আজ খুব অনিয়ম হলো পাপ্পা! আর এ কারণেই অবিন্না তার কাজের ফাঁকেও আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল, তোমার ওষুধ খাবার কথাটা! কিন্তু বহুকাল পরে তোর সঙ্গে আজ একটা চমৎকার দিন কাটলো আমার জেসান! আমারও। এবার তাহলে চলো, বিল মিটিয়ে আমরা উঠে পড়ি। হোটেলে ফিরে শুয়ে শুয়ে আরও অনেক গল্প শুনবো তোমার কাছে। ছেলেবেলায় যেমন মাঝে মাঝে তুমি শোনাতে। হ্যাঁ তাই চল। আজ আমার গল্প বলার নেশা পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

বিল মিটিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল জেসান। আরভিনের হঠাৎই মনে পড়লো, ওষুধের কৌটোটা ভুলে ফেলে এসেছেন রেস্তোরাঁর কোণের সেই টেবিলের ওপরে। এই মেডিসিন মৃতসঞ্জীবনীর মতো অব্যর্থ মহৌষধ ফাদারের জীবনে। অতএব পিতাকে রেস্তোরাঁর বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে ছেলে দ্রুত ছুটলো সেটা সংগ্রহ করে আনতে। জেসান কৌটো তুলে কয়েক পা অগ্রসর হয়ে দরজায় প্রায় এসেই পড়েছিল। আর তক্ষুনি ঘটে গেল অসহনীয় নাট্য পর্বের অসম্ভব ক্লাইমেক্সপূর্ণ সেই পালাটি। যা কোনো আকস্মিক বজ্রপাতের চেয়েও অনিবার্যভাবে অপ্রতিরোধ্য। উত্তাল আগ্নেয়গিরির চেয়েও যা ভয়ঙ্কররূপে লেলিহান। যা কারুর জীবন জ্বালিয়ে দিতে, সুখের প্রশান্তি নিঃশেষ করে নিতে অমোঘ নিয়তির মতোই স্বেচ্ছাচারী। সহসা চোখের পলকে একটি অমিততেজা বিস্ফোরণের উৎক্ষেপণে ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত হয়ে গেল একটু আগের কোলাহল মুখরিত রেস্তোরাঁ ‘মাহফা’। মুহূর্তেই সংক্ষুব্ধ নরক যন্ত্রনা তাকে সম্পূর্ণ করায়ত্ত করে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে ঊর্ধ্বগামিতায় ঠেলে দিতে লাগলো তাদের শত সহ¯্র উত্তপ্ত বাহু। অধ্যক্ষ আরভিন সে দৃশ্যপুঞ্জের দিকে তাকিয়ে জীবনছেঁড়া আর্তচিৎকারের যন্ত্রনায় কখন যে চেতনা হারালেন, জানা নেই তার।

পরের দিন সংবাদ চ্যানেলে যখন প্রচারিত হলো, এই নির্মমতা ছিল বেহেশত যাওয়ার সুখস্বপ্ন নিয়ে কাফের নিধনের নীরব প্রত্যাশায় এক জিহাদি নারীর আত্মদানের পরম প্রিয় উৎসব, তখন ফাদারের মতো অবিন্নার আপাদমস্তকও নিমজ্জিত হয়ে গেছে মন্থিত বেদনার নিমগ্ন অন্ধকারে। যে অন্ধকারের ছায়াপথেই জিহাদি নারী দেখেছিল তার বিপুল সুখের বিরাট খনি। ইহজীবনের স্তরে স্তরে যে সুখের অনুসন্ধান তাদের মতো মানুষদের কোনোকালেই মেলে না!

:: দীপিকা ঘোষ

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj