হাসানের বিমূর্ত প্রশান্তি

শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর ২০১৪

সৈয়দ হাসান মাহ্মুদ। বিমূর্ত ধারার শিল্পী। বিমূর্ত ছবি আঁকতেই ভালোবাসেন। এ দেশের অনেক শিল্পী এ পথেই হাঁটছেন। তাদের পথচলা যেন শেষ হবার নয়, বরং প্রতিনিয়তই নব নব উদ্যমে চলছে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়শপথ। হাসান খুঁত খুঁতে স্বভাবের মানুষ। খুঁত খুঁতে মন নিয়েই তিনি ছবি আঁকেন। ক্যানভাস রাঙিয়ে তোলেন। নির্দিষ্ট কোনো ধারণাকে অবলম্বন কিংবা কোনো রূঢ় সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে তিনি প্রয়াসী হননি। তাঁর ছবিতে আবেগ ছাপিয়ে যায় যুক্তিকে। তিনি সামষ্টিক কোনো বক্তব্য ছড়িয়ে দেয়ার পরিবর্তে বরং ক্ষণিকের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভালো লাগায় ভেসে যেতে পছন্দ করেন। তাঁর শিল্পবোধ সত্যিই অসাধারণ। শিল্প রচনাশৈলীও চমকপ্রদ। যে কোনো শিল্পবোদ্ধা কিংবা শিল্পরসিক তাঁর শিল্পকর্ম দেখলেই অন্য ভুবনে চলে যান।

হাসান রঙকে ক্যানভাসের উপরিভাগ থেকে গড়িয়ে পড়তে দেন, যা একটি বুনট তৈরি করে। পরে এর ওপর বিশেষ ধরনের তুলি দিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে ক্রমাগত রঙ নিক্ষেপ করেন, যা স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে বিভিন্ন আকার ধারণ করে। এরপর ছুরি বা স্প্যাচুলা দিয়ে ক্যানভাসে দাগ কেটে যান। শিশুসুলভ উচ্ছলতায় হাসান রঙ নিয়ে খেলতে পছন্ন করেন, তবে রঙের উজ্জ্বলতায় মুখরিত নয় বরং এর ধূসরতায় বিষাদগ্রহস্ত হতে ভালোবাসেন তিনি। তাঁর অবচেতনে প্রকৃতি আছে নানা রঙ ও রূপ নিয়ে। ছবি আঁকতে গিয়ে তিনি ক্যানভাস থেকে শারীরিক দূরত্ব তৈরি করেন, অবচেতন জগতের অনিয়ন্ত্রিত আবেগ তাঁর ছবিকে পথ দেখায়।

বিশেষ করে হাসানের মেমোরিস ১৯৭১ সিরিজের ছবিগুলো এ দেশের স্বাধীনতার ক্ষত-বিক্ষত এবং দগ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগিয়ে তোলে। তিনি স্প্যাচুলা দিয়ে ক্যানভাসে দাগ কেটে ফুটে তুলেছেন ১৯৭১-কে। দগ্ধ-বিদগ্ধ ১৯৭১ স্মৃতি ভোলার নয়, তাঁর চিত্রগুলো এমনটাই আভাস দেয়। এছাড়া প্রকৃতিও মিশে রয়েছে তাঁর চিত্রপটে। এ দেশের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য তাঁর শিল্পকল্প কিভাবে মিশে আছে, চোখে না দেখলে কখনই তা উপলব্ধি হওয়ার নয়। আমাদের পারিপার্শ্বিক, সমাজ এবং বিশ্বব্যবস্থার নানা বেদনাদায়ক অনিয়ম আর নিরন্তর হতাশাকে সযতেœ পাশ কাটিয়ে যেতে চান তিনি, বরং তাঁর ক্যানভাসে তিনি স্বস্তি, আনন্দ আর প্রশান্তির বাতাবরণ তৈরিতে আগ্রহী।

সৈয়দ হাসান মাহ্মুদ প্রথাগত পদ্ধতিকে ভেঙে নতুন নতুন ফর্ম তৈরি করেন। যা শিল্পরসিকদের মন ছুঁয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনীতির রূপরেখাও রয়েছে তাঁর চিত্রপটে। শিল্পে কোথাও না কোথাও রহস্যে থাকতে হয়, এ প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া চিত্রকল্পের প্রতিটিতে রয়েছে রহস্যে, ভ্রম। প্রতিটি চিত্রকল্পেই রয়েছে রঙের পৌনঃপুনিক ব্যবহার। যা হাসানের সৃষ্টিকর্মগুলোকে করে তুলেছে বাঙ্ময়। তাঁর প্রতিটি শিল্পকর্মই গবেষণাধর্মী। তিনি নানাভাবে বিশ্লেষণের পর তাঁর চিত্রকল্প রচনা করেন। তাই হাসানের প্রতিটি চিত্রকল্পই মনোগ্রাহী। যা আকর্ষিত করে সাধারণকেও।

শিল্প সমালোচক আবুল মনসুর তার শিল্পকর্ম সম্পর্কে বলেছেন, হাসানের প্রদর্শিতব্য শিল্পকর্মসমূহ বিষয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি বলে মনে করি, এগুলোকে তাঁর শিল্প-অভিযাত্রা পথের একটি পদচ্ছাপ হিসেবে বিবেচনা করাই শ্রেয়তর হবে। ২০১০-২০১৪-এর চিত্রমালা একটিই নির্মাণশৈলীর বিবিধ বিদ্যাস। এগুলোতে পূর্বপরিকল্পনা ততটা আবশ্যিক ছিল বলে মনে হয় না, যদিও ঘননিবদ্ধ বুনটের মধ্যেও পূর্বে উল্লিখিত উল্লম্বতার বৈশিষ্ট্যটি নজরে পড়ে। রেখাঘন বুনটের এলাকার বাইরে গড়ানো রঙের ব্যবহার এ উল্লম্বতা নির্মাণ করেছে। তবে শিল্পী যে সুপরিকল্পিত নিরীক্ষার মাধ্যমে বিবিধ পর্যায় পার হয়ে তাঁর সা¤প্রতিকতম শৈলীতে পৌঁছেছেন তার পরিচয় পাওয়া যায় মধ্যবর্তী পর্যায়ের চিত্রকর্মগুলোতে। ধারাবাহিক ও নিয়মিত প্রদর্শনীর মাধ্যমে হাসান নিজেকে উপস্থাপন করেননি, ফলে তাঁর যাত্রাপথে উত্তরণের চিহ্নগুলো সব দর্শকের কাছে পরিচিত নয়। দীর্ঘ বিরতির পর শিল্পীর একক প্রদর্শনী তাই বিভিন্ন দর্শকের বোধে নানাবিধ ভাবনা উসকে দিতে পারে। হাসানের একক প্রদর্শনী যদি দর্শকচিত্তে বিবিধ চিন্তা ও প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায় তবে সেটিই হবে এ প্রদর্শনীর সার্থকতার একটি অন্যতম দিক।

আমাদের আস্থা আছে এই শিল্পীর প্রতি, বিমূর্ত চিত্ররচন চর্চাকে আরো গভীরতর অর্থময়তার ব্যঞ্জনায় তিনি ঋদ্ধ করবেন, রচনা করবেন এর সঙ্গে তাঁর ভাবনা ও বক্তব্যেও আন্তঃসম্পর্ক যাতে দৃশ্যমানতার উপরিতল ভেদ করে দর্শক পৌঁছতে পারেন সংবেদী অনুভূতির গূঢ়তর এক উপলব্ধির জগতে।

শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার হাসানের শিল্পকর্ম সম্পর্কে বলেছেন, জলরঙ চিত্র দেখে মনে হল কবিতার মত সুর লেগেছে তার ছবিতে। মাধ্যমের সঙ্গে শিল্পীর একটি নিবিড় সখ্য প্রয়োজন। রঙ, তুলি শিল্পীর আঁকার ভঙ্গি কেউ কাউকে শাসন করছে না। মিলিত রূপের সৃষ্টি করছে। এখানেই শিল্পী হাসানের কৃতিত্ব। বক্তব্যেও চমক নেই, ক্র্যাফটম্যানশিপের আধিক্য নেই, চলতি স্টাইলের বন্ধন নেই- তাই তার জলরঙ ছবি দেখে ভালো লাগলো। মন ভরা ছবি, আত্মিক সৃষ্টির খেলা।

বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আটস মনে করে, একনিষ্ঠ শিল্পী হাসান মাহ্মুদের ছবি যেমন আমাদের চেনা প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নতুন চিত্রভাষায় উপস্থাপিত করবে, তেমনি একজন রোমান্টিক এবং আবেগধর্মী শিল্পীর দীর্ঘ শিল্প-পথযাত্রার নীরব বিবর্তনের সঙ্গেও আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবে।

গত ২৪ অক্টোবর ২০১৪ থেকে শিল্পী সৈয়দ হাসান মাহ্মুদের ‘বিমূর্ত প্রশান্তি’ শীর্ষক একক চিত্রকলা প্রদর্শনী রাজধানীর বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে। আগামী ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ২৩ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বাংলাদেশে ইতালির রাষ্ট্রদূত ও শিল্প সমালোচক জর্জিও গুইলিয়েলমিনো, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম ও শিল্প সমালোচক অধ্যাপক আবুল মনসুর। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন শিল্পী সৈয়দ হাসান মাহমুদ এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। প্রদর্শনীতে মোট ৬৯টি শিল্পকর্ম রয়েছে। এ শিল্পী ১৯৫৮ সালের ১২ মার্চ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বিএফএ ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ঝাঁপি স্কুল অব আর্ট এ অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত। এ পর্যন্ত তাঁর ৩টি একক প্রদর্শনী হয়েছে এবং দেশে-বিদেশে বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি বিভিন্ন বই এবং ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছেন। প্রায় ১৮ বছর পর শিল্পী হাসান মাহমুদের একক প্রদর্শনী হচ্ছে।

:: আ বু ল কা লা ম আ জা দ

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj