জীবনানন্দ দাশের অন্তর্লীন রহস্যময়তা : সা ই ফু জ্জা মা ন

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৪

বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ দাশ উত্তর আধুনিক কবি। প্রকৃতি, নির্জনতা, প্রেম, মুগ্ধতা, একাকিত্ব, সমাজ-সমকাল তার কবিতার প্রধান উপজীব্য। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। স্বদেশ তার কবিতার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে। তার কবিতায় অন্তর্ভাগ জুড়ে আমাদের চেনা স্বদেশ রূপময় হয়ে ওঠে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি থেকে তিনি কবিতার উপরকরণ সংগ্রহ করেন। সমাজ লগ্নতা ও বিষয় বৈচিত্র্য তার কবিতাসমূহের বক্তব্যকে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় আকর্ষণীয় করে তুলেছে। যে বাংলায় তার জন্মগ্রহণ, বেড়ে ওঠা, দিন যাপন, সুখ-দুঃখ অবগাহন সে বাংলা তার প্রিয়। প্রকৃতি, প্রকৃতির সঙ্গী ফুল-পাখি, নদী, নারী, প্রিয় মানুষ আর অন্তর্গত বোধ জীবনানন্দ দাশকে আলোড়িত করেছে। এই অপরূপ সৌন্দর্যকে ভালোবেসে তিনি অনন্তকাল থেকে যেতে চেয়েছেন প্রিয় বাংলায়। জীবনানন্দ দাশ রচিত প্রথম কবিতা ‘বর্ষা আবাহন’ ১৯১৯ সালে ব্রহ্মবাদী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়।

জীবনানন্দ দাশ প্রকৃতি, সমাজ, বিষণœতা বিষয়ক কবিতা রচনায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। বঙ্গবাণী, প্রবাসী, প্রগতি, কল্লোল পত্রিকায় তার কবিতা প্রকাশিত হয়। ধীরে ধীরে জীবনানন্দ দাশ পরিচিত হয়ে ওঠেন। অশ্লীলতার দায়ে তাকে অভিযুক্ত হতে হয়েছে কখনো। আবার কখনোবা প্রশংসিত হয়েছেন কাব্য সমালোচকদের কাছে। চাকরিচ্যুত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে তার বেলায়। জীবতাবস্থায় তো বটে, মুত্যুর পরও আমরা জীবনানন্দ দাশকে পাই স্বতন্ত্র কবি, গদ্যকার, গন্ধকার হিসেবে। ১৩৩৮-এ ‘পরিচয় পত্রিকায় ক্যাম্পে’ কবিতা প্রকাশিত হলে জীবনানন্দ দাশ পাঠকদের স্পর্শ করেন :

এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি

সারারাত দখিনা বাতাসে

আকাশের চাঁদের আলোয়

এক ঘাই হরিণীর ডাক শুনি

কাহারে সে ডাকে।

কোথাও অনেক বনে- যেইখানে জ্যোৎস্না আর নাই

পুরুষ হরিণ সব শুনিতেছে শব্দ তার,

তাহার পেতেছে টের

আসিতেছে তার দিকে।

আজ এই বিস্ময়ের রাতে

তাহাদের প্রেমের সময় আসিয়াছে;

কাহাদের হৃদয়ের বোন

বনের আড়াল থেকে ডাকিতেছে জ্যোৎস্নায়

পিপাসার সান্ত¡নায়- অঘ্রাণে আস্বাদে;

কোথাও বাঘের পাড়া বনে আজ নাই আর যেন

মৃগদের বুকে আজ কোন স্পষ্ট ভয় নাই;

সন্দেহের আর ছায়া নাই কিছু;

কেবল পিপাসা আছে

রোম হর্ষ আছে।

২.

‘মহাপৃথিবী’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত জীবনানন্দ রচনা করেছেন। ‘বনলতা সেন’ অন্যান্য কবিতা ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থে সংযুক্ত। ‘আট বছর আগে একদিন’ কবিতায় আবেগ, বোধ ও আকর্ষণীয় শব্দ তরঙ্গ দোলায়িত। লাশ কাটা ঘরের বর্ণনা থেকে শুরু করে অদৃশ্য মোহময় জগতের রহস্যময়তা তার কবিতার অন্তর্দেশ রাঙিয়ে দিয়েছে। ‘মনোবীজ’ কোরাশ ‘সিন্দু সারস’-এ হেমন্তের কুয়াশা, মেঘের দুপুরের সোনালী চিল, প্রকৃতি, মানুষ অন্তরঙ্গ মুগ্ধতায় উপস্থাপিত। ‘আকাশ লীনা’ কবিতার সুরঞ্জনা কল্পনার জগৎ থেকে বেবিয়ে এসে জীবন্ত মানবী’র আদলে মূর্ত হয়ে উঠেছে। অভিমান, সর্তক বাতা, প্রণয়গীতি, প্রকৃতির কাছে তার আত্মসমর্পণ বিষ্ময়কর :

জীবনানান্দ দাশ নরনারীর প্রেম, রহস্য, দেহজ, দেহাতীত আকর্ষণকে বাক্সময় করেছেন তার ঐন্দ্রজালিক বর্ণনা, রূপক ও ভাব গাম্ভীর্যে :

সুরঞ্জনা অইখানে যেওনাতো ‘তুমি

বোলোনাকো’ কথা অই যুবকের সাথে;

ফিরে এসো সুরঞ্জনা;

নক্ষেত্রের রূপালী আগুন ভরা রাতে’

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে,

ফিরে এসো হৃদয়ে আমার।

জীবনানান্দ দাশ ‘ঝরা পালক’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে আবির্ভূত হয়ে বক্তব্যের বাক পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেকে বার বার অতিক্রম করতে চেয়েছেন। বেদনাবোধ, সংবেদী হৃদয় বৃত্তি, ফিরে দেখার আকুতি তার কবিতায় শক্তিময় হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। অতীত-বর্তমানের যোগসূত্র স্থাপন, ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্বেষণ, মৃত্যু ভাবনায় পতিত হওয়া তার কবি সত্তার মূল ভিত্তি।

সমাজ, সমকাল, প্রকুতি, বাংলা জীবনানান্দ দাশের কবিতার ভূভাগ জুড়ে দৃশ্যমান:

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ

খুঁজিতে যাই না আর; অন্ধকারে জেগে ওঠে ডুমুরের গাছে

চেয়ে দেখি ছাতার মতোর বড় পাতাটির নিচে বসে আছে

ভোরের দোয়েল পাখি-চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লাবের স্ত‚প

জাম-বট-কাঁঠালের হিজলের অশত্থের করে আছে চুপ ফণিমনসার ঝোপে

শটি বনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে

মধুকর ডিঙ্গা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে

এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ।

(বাংলার মুখ আমি)

৩.

জীবনানান্দ দাশের কবিতায় প্রকৃতির চিত্র রূপময়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠার কারণে তিনি প্রকৃতি প্রেমিক কবি হয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। মানুষের সূ² অনুভূতির বহুতল দিক তার কবিতায় প্রকাশিত। কিছু মানুষের রূঢ়তা কপটতা, সমাজ ও সমকালের অসঙ্গতি তাকে পীড়িত করেছে। তাইতো তার উচ্চারণ; পৃথিবীর রাত আর দিনের আঘাতে বেদনা পেতনা কেউ/ আর থাকিত না হৃদয়ের জরা সবাই যদি স্বপ্নের হাতে দিত যদি ধরা।/ জীবনানান্দ দাশ সবার থেকে আলাদা হয়ে বাংলার রূপ বৈচিত্র্য যেমন উপভোগ করেন তেমন অন্তলোকের সাথে একাত্ম হয়ে মগ্ন চৈতন্যে ডুব দেন। তাইতো তাকে বলতে শুনি ‘সকল লোকের মাঝে বসে। আমার নিজের মুদ্রা দোষে আমি একা হতেছি আলাদা। একজন সচেতন করি মানুষের আনন্দ-বেদনায় লীন হয়েছেন। ‘প্রেম মানুষের জীবনের রহস্য, অভিজ্ঞতা, জটিল এক মনস্তত্ত্বের প্রতীক হয়ে আছে। জীবনানান্দ দাশ সর্বগ্রাসী, স্বেচ্ছাচারী, আনন্দ-বেদনার নিযার্স প্রেমকে কবিতাবদ্ধ করেছেন। মানব-মানবীর সম্পর্ক অপর্থিব ভালোবাসার মোড়কে আবদ্ধ। এখানে যৌনতা, শারীরিক আকর্ষণ গৌণ দিক। ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থে জীবনানাদ দাস ‘প্রেম’ বন্দনায় নিজেকে যুক্ত করেছেন। কিছু অভিমান আছে : চলে গেছি বহু দূর, দেখোনিকো/ বোঝোনিকো/ করোনিকো মানা’।

জীবনানান্দ দাশের কবিতা আবেগে থরোথরো নয়। স্বল্প বাক কবি অন্তর্মুখীতা ও মৃদুভাষণকে বেছে নিয়েছেন। তার আত্মজৈবনিক কবিতায় খরস্রোত ও তীব্র অনুভূতির নির্যাস বেদনাময় হয়েছে। প্রেমিকার চলে যাওয়া প্রেমিকের কাছে হতাশা ও যন্ত্রণার। আর্তি, কাতরতা তার কবিতায় এসে অবিরাম ক্ষরণ দহন, বেদনাবোধকে ঘনীভূত করেছে। জীবনানান্দ দাশের মানস প্রতিমা আর দশজন নারীর মতো নয়, সে কেবলই অনন্যা তার আচরণ রহস্য ঘেরা। নিঃসঙ্গতা, নারী বন্দনা, আলো-আঁধারের লুকোচুরি জীবনানান্দ দাশ গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেন :

যে মুহ‚র্ত চলে গেছে- জীবনের যেই দিনগুলি

ফুরায়ে গিয়েছে সব, একবার আসে ফিরে;

তোমার পায়ের চাপে তাদের করেছে তুমি ধূলি।

তোমার আঘাত দিয়ে তাদের দিয়েছ তুমি ছিঁড়ে।

জীবনানান্দ দাশ বাংলার প্রকৃতি, জীবন তরঙ্গ, প্রণয়-বিরহ, কাতরতা, বিচ্ছেদ যন্ত্রণা চারপাশে আবর্তিত হতে দেখেছেন। তিনি শান্তি অন্বেষী ক্লেদাক্ত জীবনের মধ্যে তিনি সৌন্দর্য অবলোকন করেছেন। ‘মহা পৃথিবী’ থেকে ‘সাতটি তারার তিমিরে’ কাব্যগ্রন্থের পথপরিক্রমায় তিনি রোমান্টিক আবেগে সংরক্ত হয়েছেন। প্রেম মিলনে নয়, বিরহে সার্থক হয়ে ওঠে। যার জন্যে পৃথিবী অর্থময় হয়ে উঠতো, সেওতো হারিয়ে যায় এক সময়। তার সান্নিধ্য স্মৃতি মনের অন্দরে বন্দরে হানা দেয়। জীবনানান্দ দাশের কবিতায় ক্লান্তি, নিঃসঙ্গতা, রক্তঝরা যন্ত্রণার প্রকাশ বার বার ঘটেছে।

৪.

হতাশ কবি সঙ্গত কারণে অন্ধকারকে আলিঙ্গন করেন। উজ্জ্বল আলোর দিন নিভে যায় মানুষের আয়ু শেষ হয়। একি হতাশার কোনো অন্তরঙ্গ ধ্বনি, না স্বপ্ন ও বাস্তবের সমান্তরাল প্রস্থান চিত্র তা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। জৈব চেতনা নয়, মানব মানবীর সম্পর্কের রসায়ন স্পর্শ করে কৌত‚হলের কাছে ফিরে না গিয়ে গত্যন্তর নেই। জীবনের পথে চলতে গিয়ে যার সাথে তার দেখা হয়েছিল, চলে যাওয়ার পর মনের আঙিনায় তার নিত্য আসা যাওয়া। আমাদের সমাজে প্রতারক মানুষ আছে। আছে কিছু বিশ্বাসী মানুষও। স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা আমাদের রক্তাক্ত করে। দয়িতার অস্থিতি, সামাজিক অবক্ষয়, অন্তর্ধান- সব সত্য জেনে নিয়েও পরম আরাধ্য ‘প্রেম’ চৈতনালোকে আলো ছড়ায়।

আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস ও জীবনানন্দ দাশ দুজন ভিন্ন ধারার কবি। তাদের ভেতর ঐক্য ছিল ভাবনায়। একজন কবি দৈশিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ থাকেন না, তার দৃষ্টি আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রসারিত।

ইয়েটস উচ্চারণ করেন : ঙ ঈঁৎষব,ি পৎুহড়সড়ৎব রহ ঃযব ধরৎ …../ ড়ৎ ড়হষু ঃড় ধিঃবৎ রহ ঃযব বিংঃ; ইবপধঁংব ুড়ঁৎ পৎুরহম নৎরহমং ঃড় সু সরহফ. চধংংরড়হ ফরসসবফ বুবং ধহফ ষড়হম যবধাু যধরৎ/ জীবনানন্দ দাশ একইভাবে সোনালী ডানার চিলকে খুঁজে ফেরেন এই বাংলায়: হায় চিল সোনালী ডানার চিল/ এই ভিজে মেঘের দুপুরে। তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধান সিঁড়ি নদীটির পাশে/ তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ¤øান চোখ মনে আসে।

আসলে জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে থমকে যেতে হয়। নির্জনতার শব্দ আবিষ্কারে তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন। শব্দ নিয়ে মগ্নতায় পঙ্ক্তি রচনায় তিনি সিদ্ধহস্ত। উপমা উৎপ্রেক্ষা প্রয়োগে অভিনবত্ব দৃষ্টিগ্রাহ্য। অনেক দেশি শব্দ তিনি কবিতায় ব্যবহার করেছেন। শাদা, ঠাণ্ডা; ‘হিম’-এর মতো শব্দ যেমন আছে তেমন আছে, তার কবিতায় কথিত রূপ ও লিখিত ভাষার সংমিশ্রণ। তার কাছে তাদের হয়ে যায় তাহাদের। জীবনানন্দ দাশ জীবনবাদী কবি। মানুষের চারপাশের জগত সংসার থেকে বিষয় নির্বাচন করে তিনি কবিতার সাম্পান ভাসিয়েছেন সমুদ্রে। জলোচ্ছাস, কিংবা নিস্তরঙ্গতার ধারায় হারিয়ে যায় না তার গন্তব্য। বাংলার দক্ষ নাবিক কবি বহু জন পদ ঘুরেফিরে আসেন স্বদেশে মুগ্ধতায়। জীবনানন্দ দাশ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে, অভিজ্ঞতায়, অনুভবে, প্রেম, অভিমানে, নিঃসঙ্গতা ও বেদনায় জাগরুক আছেন। সময় ও সমকালের সারথী তিনি। হ

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj