‘ক্যাম্পে’: একটি অভিনব ট্র্যাজিক ট্যাবলো : গৌ রা ঙ্গ মো হা ন্ত

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৪

যে গ্রন্থ পাঠ করে তরুণ শামসুর রাহমান জীবনানন্দকে আবিষ্কার করেছিলেন, একলব্যের মতো দূর থেকে গুরুরূপে কাব্যসাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন তা ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ (১৯৩৬), জীবনানন্দের দ্বিতীয় কাব্য। এ কাব্যের অন্তর্গত ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘পরিচয়’ পত্রিকার মাঘ ১৩৩৮ সংখ্যায় (প্রথম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা) প্রকাশিত হয়।

জীবনানন্দ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ উৎসর্গ করেন বুদ্ধদেব বসুকে। বুদ্ধদেব বসু ‘জীবনানন্দ দাস: ধূসর পাণ্ডুলিপি’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে জীবনানন্দ দাসকে আধুনিক কবিদের মধ্যে “বিশেষ অর্থে প্রকৃতির কবি” বলে আখ্যায়িত করেন। ‘ক্যাম্পে’ কবিতার নিবিড় পঠন পাঠককে জানিয়ে দেয় যে প্রকৃতির কল্যাণকর পটদৃশ্য উন্মোচিত হয় নি এ কবিতায়। রবার্ট ফ্রস্টের ‘ঞযব ঐরষষ ডরভব’ এবং ‘এযড়ংঃ ঐড়ঁংব’ কবিতায় প্রকৃতির যে ভীতিপ্রদ রূপ দৃষ্ট হয় তার সাদৃশ্য এ কবিতায় লক্ষণীয়। “এখানে বনের কাছে ক্যাম্প্ আমি ফেলিয়াছি;/ সারারাত দখিনা বাতাসে/ আকাশের চাঁদের আলোয়/ এক ঘাইহরিণীর ডাক শুনি।/ কাহারে সে ডাকে!” – এই প্রারম্ভিক স্তবক শিহরণধর্মী মনে হলেও এর কুহকী আবহের অন্তরালে রয়েছে শংকা ও অশুভ পরিকল্পনা। অরণ্যের চন্দ্রালোকিত বসন্তরাতে যে ঘাইহরিণী বিহŸল আহ্বানে পুরুষহরিণকে ডেকে নিচ্ছে, সে ফবপড়ু বা টোপ; প্রেমের প্রলোভন দেখিয়ে হরিণশিকারের উদ্দেশ্য সে চরিতার্থ করছে। বিপুল রোমহর্ষ নিয়ে একে একে হরিণেরা “গভীর বনের পথ ছেড়ে,/ সকল জলের শব্দ পিছে ফেলে অন্য এক আশ্বাসের খোঁজে” এগিয়ে আসছে “তাহাদের হৃদয়ের বোন” এর কাছে “সুন্দরী গাছের নীচে- জ্যোৎস্নায়”। অন্য এক আশ্বাসের ভেতর প্রচ্ছন্ন যৌনতার গন্ধ বিদ্যমান। যৌনতার এই ইঙ্গিতময়তা কবিতাটিকে রহস্যঘন করে এবং এর আবেদন বর্ধিত হয়। কিন্তু ‘পরিচয়’-এ প্রকাশিত হবার পর সজনীকান্ত দাস ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় কবিতাটিকে অশ্লীল বলে আখ্যায়িত করে তার অভিমত তুলে ধরেন- “বনের যাবতীয় ঘাই-হরিণকে তাহাদের হৃদয়ের বোন ঘাইহরিণী ‘আঘ্রাণ’ ও ‘আস্বাদের’ দ্বারা তাহার পিপাসার সান্ত¡নার জন্য ডাকিতেছে। পিস্তুতো মাস্তুতো ভাইবোনদের আমরা চিনি। হৃৎতুতো বোনের সাক্ষাৎ এই প্রথম পাইলাম।” সজনীকান্ত অজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে আরো লেখেন- “কবির তন্ময়তায় না-হয় গাছও সুন্দরী হইল।”

সজনীকান্তের বিরূপ মন্তব্যের একটি জবাব জীবনানন্দ রচনা করেছিলেন যা তাঁর জীবদ্দশায় মুদ্রণ নিষিদ্ধ ছিলো। ভূমেন্দ্র গুহের কল্যাণে রচনাটি ‘শতভিষা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘হৃদয়ের বোন’ প্রকাশটি জীবনানন্দ শেলির ‘ঝড়ঁষ’ং ংরংঃবৎ’ অনুসরণে প্রয়োগ করেছেন বলে অবহিত করেন। ক্ষুদ্ধ জীবনানন্দ শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে লেখেন, ‘বাংলাদেশে সজনে গাছ ছাড়া আরো ঢের গাছ আছে- সুন্দরী গাছ বাংলার বিশাল সুন্দরবন ছেয়ে রয়েছে সজনের কাছে তা অবিদিত থাকতে পারে।” জীবনানন্দ তার রচনায় একটি জরুরি প্রসঙ্গের অবতারণাও করেন। কবিতাটির মর্মার্থ তাঁর হাতেই হয়েছে অপাবৃত- “ক্যাম্পে অশ্লীল নয়। যদি কোনো একমাত্র স্থির নিষ্কম্প সুর এ কবিতাটিতে থেকে থাকে তবে তা জীবনের-মানুষের-কীট-ফড়িঙের সবার জীবনেরই নিঃসহায়তার সুর।”

‘ক্যাম্পে’ কবিতার পুরুষহরিণেরা শিকারির গুলিতে প্রাণ হারায়; তারা পরিবেশিত হয় খাবার ডিশে। প্রাণহীন হরিণেরা মৃত প্রেমিক বলে কবিতায় বর্ণিত থাকলেও তাদের মৃত্যু অস্বাভাবিক। মৃত্যুচেতনার চেয়ে ট্র্যাজেডিচেতনা এখানে গভীরতা লাভ করে। মৃগ-সংহারের আয়োজন কবিতাটির ট্র্যাজিক টোনালিটিকে গাঢ়তর করে। মৃগদের ট্র্যাজিক পরিণতির সঙ্গে কবি সংরাগী মানুষের সাযুজ্য অন্বেষণ করায় ট্র্যাজেডিচেতনা মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছে-

কেন এই মৃগদের কথা ভেবে ব্যথা পেতে হবে

তাদের মতন নই আমিও কি?

কোনো এক বসন্তের রাতে

জীবনের কোনো এক বিস্ময়ের রাতে

আমারেও ডাকেনি কি কেউ এসে জ্যোৎস্নায়- দখিনা বাতাসে

অই ঘাইহরিণীর মতো?

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’-র ‘প্রেম’ কবিতায় মানুষের হৃদয়ের সাথে হরিণ তুলিত হয়েছে। ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটিতেও কবি স্পষ্ট করেন- “আমার হৃদয়- এক পুরুষহরিণ-”। প্রেম মানুষকে সাহসী করে তুললেও অন্ধ করে, অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে রাখে। এই অন্ধত্ব বা অন্ধকারের বাইরে থাকে অশুভ, বিনাশী আরেক অন্ধকার যা মানুষকে টেনে নেয় চির অন্ধকারের অতলে। জীবনানন্দ উচ্চারণ করেন, “প্রেমের সাহস সাধ স্বপ্ন লয়ে বেঁচে থেকে ব্যথা পাই, ঘৃণা মৃত্যু পাই।”

‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি অন্ধকার-পরিকল্পনার এক অভিনব নাট্যায়ন। রবার্ট ফ্রস্টের ‘উবংরমহ’ কবিতার মাকড়সা, মথ ও ‘হিল-অল’- এর ট্রায়াডিক আলবিনো বিন্যাস যেমন অন্ধকার-পরিকল্পনাকে মঞ্চায়ন করে, ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় ঘাইহরিনী, পুরুষহরিণের দল ও শিকারি অন্ধকার-পরিকল্পনার নাট্যায়ন সম্পন্ন করে। তারা ‘উবংরমহ’ কবিতায় অভিব্যক্ত “অংংড়ৎঃবফ ঈযধৎধপঃবৎং ড়ভ ফবধঃয ধহফ নষরমযঃ”- এ রূপান্তরিত হয়। ফলত জীবনানন্দের এ কবিতা একটি বার্তা স্পষ্ট করে তোলে যে কসমিক জীবন অন্ধকার ও অশুভ শক্তির প্রভাব বিযুক্ত নয়। কবিতার শেষ স্তবকে সর্বগ্রাসী অন্ধকারচেতনা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে-

এই ব্যথা, এই প্রেম সব দিকে রয়ে গেছে-

কোথাও ফড়িঙে-কীটে, মানুষের বুকের ভিতরে,

আমাদের সবের জীবনে।

বসন্তের জ্যোৎস্নায় অই মৃত মৃগদের মতো

আমরা সবাই।

‘ক্যাম্পে’ কবিতায় একটি অদৃষ্টপূর্ব ট্র্যাজিক ট্যাবলো রূপায়িত হলেও কবিতাটি দুরূহ নয়। বিবৃতি কবিতাটিকে প্রাঞ্জল করে তুলেছে। কবিতাটির রূপকল্পে দুবোর্ধ্য কল্পনার আশ্রয় নেয়া হয়নি। কবি ইচ্ছে করেই কবিতাটিতে সংহত রূপ দান করেননি। এতে কবিতাটি লাভ করেছে অভিনব এক জীবনানন্দীয় কলেবর। হ

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj