অন্ধ কারার অন্তরালে : দীপিকা ঘোষ

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৪

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আগেই এসব কথা ভাবছো কেন? রবার্ট নিজেই হয়তো এদিকে কোনো কাজে এসেছিল। অসম্ভব! এসব অর্গানাইজেশনের কর্মীরা একা একা এমন মরুভূমিতে কাজ করতে বেরুবে, এটা ভাবাই অবাস্তব!

হিউম্যানিট্যারিয়ান অর্গানাইজেশনের কর্মীরা আজকাল হরহামেশাই কিডন্যাপড হচ্ছে! রবার্টও সেই দুর্ভাগাদের একজন! সেটা সর্বদাই ঠিক নয় অবিন্না। তুমিও তো সেই রকমই এক কর্মী। কিন্তু তুমি তো সেভাবে দলবদ্ধ হয়ে সচরাচর কাজে বেরোও না কখনো। তাহলে? আমার ব্যাপারটা আলাদা। আমি তো কোনো বিদেশী কর্মী নই। বাইরে থেকে যারা আসেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য সেটাই সাধারণ নিয়ম জেসান। আচ্ছা সে সব পরে জানা যাবে! আগে চলো, রবার্টকে নিয়ে কোনো শহর কিংবা লোকালয় খুঁজে পাবার চেষ্টা করি! এখানে বেশি বিলম্ব করে ফেললে রবার্টের অবস্থা আবারো অনেক খারাপ হতে পারে!

আশ্চর্যভাবেই উটের পিঠে তোলার আগেই রবার্টের জ্ঞান ফিরে এলো এবং ফিরে আসতে কাতরস্বরে প্রথমেই জল প্রার্থনা করলো সে। কিন্তু কোথা থেকে তাকে তৃষ্ণার জল জোগাবে অবিন্না? কাল গভীর রাতে যখন স্বামীকে নিয়ে চুপিচুপি পালিয়ে এসেছিল, জল সংগ্রহের সুযোগ কিংবা আগ্রহ কোনোটাই তার ছিল না। সে জেসানের মুখে বিপন্নভাবে তাকালো- ও যে জল খেতে চাইছে জেসান! কোথা থেকে দেবো? তোমার ঝোলাঝুলিতে খুঁজে দেখো না, যদি একটু পাওয়া যায়। ঝোলাঝুলি আর কোথায়? সালাফিস্টরা সবই তো সেই রাতে লুটে নিয়ে চলে গেলো! জউরাতের কুয়ো থেকে যে জলটা নিয়ে সঙ্গে রেখেছিলাম, তাও আর নেই! সে রাতে মারজাসের গ্রামে আসতে তোমাকেও জল দিতে পারিনি ঠিকমতো। কিন্তু এই মুহূর্তে মুখে জল দিতে না পারলে এই মানুষটাকে তো বাঁচানো যাবে না! আমাদের আগের বোতল দুটো কোথায়? সেগুলো উটের পিঠেই বাঁধা আছে। কিন্তু সেগুলোও তো শূন্য বোতল জেসান! আচ্ছা আমি দেখছি! বলেই জেসান ওকারো জলের অনুসন্ধান করতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখলো, যে পকেটের মধ্যে অবিন্না তাদের শূন্য বোতলগুলো রেখেছিল, সেখানেই ছোট্ট একটি অব্যবহৃত বোতল পড়ে আছে।

সম্ভবত তাদের আগে যারা এই উটটিকে ব্যবহার করেছিল, বোতলটা তাদেরই কেউ পান করার জন্য রেখেছিল সেখানে। ছোট্ট এক জলের বোতল। মাত্রই কয়েক আউন্স জল রয়েছে তাতে। কিন্তু তাতেই দুজনের মুখে অমৃত প্রাপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। অবিন্না হেসে বললো- দেখেছো, ঈশ্বরের কত কৃপা! আমি তো ভাবতেই পারিনি এ রকম জলের বোতল কেউ ওখানে রেখেছিল! কে জানে রবার্ট রোভার সুস্থ হয়ে আমাদের সাহায্য করবে বলেই হয়তো ঈশ্বর ওকে এই পরিস্থিতিতে আমাদের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিলেন! তোমার কী মনে হয় জেসান? এখনই কোনো কিছু নিয়ে হতাশ হবার কারণ নেই অবিন্না! রবার্ট আমাদের সাহায্য করতে না পারলেও বিচলিত হয়ো না! ফাদারের কথাগুলো ভাবো। তাঁর আশীর্বাদ রয়েছে আমাদের সঙ্গে। তিনি বলতেন- বিপদে ধৈর্য হারাতে নেই। তাতে বিপদের মাত্রাই শুধু বেড়ে চলে। অন্য লাভ বিশেষ কিছু হয় না।

রবার্টের তৃষ্ণা সম্পূর্ণ দূর না হলেও জীবনসঞ্জীবনী জলের স্পর্শে সে কিছুটা সজীব হয়ে উঠলো একটু পরেই। চোখের সামনে দুজন ভদ্র চেহারার তরুণ-তরুণীকে দেখতে পেয়ে আশান্বিত হয়ে প্রথমে সে কৃতজ্ঞতাভরে তাকালো। কিন্তু মুহূর্ত পরেই শঙ্কিত হবার চিহ্ন ফুটে উঠে অসহায় করে দিল তার মুখের চেহারা। নিঃশেষিত শক্তিতে নিজেকে মুক্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা চালালো সে। জেসান তার ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করে মৃদু আর নরম গলায় কথা বললো- ভয় নেই রবার্ট! আমরা তোমার শত্রু নই, বন্ধু! তোমার পরিচয় এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি কুড়িয়ে পাওয়া কাগজপত্র থেকে। এখন আর বেশি কথা বলো না। একটু সুস্থ হয়ে নাও আগে। তারপরে সব কথা হবে। রবার্ট দুস্থ স্বরে কোনোমতে শৃঙ্খলহীনভাবে উচ্চারণ করলো- অজ¯্র ধন্যবাদ তোমাদের! আমার জীবন ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অজস্র ধন্যবাদ!

রবার্টকে উটের পিঠে মাঝখানটায় বসিয়ে সামনে পেছনে বসে পড়লো অবিন্না আর জেসান। কিন্তু চলতে গিয়েই থমকে দাঁড়ালো আগের মতো। এবার কোন্দিকে যাত্রা করা উচিত তাদের? পথহীন বালিময় মরুপথে নির্দিষ্ট পথের রেখা কখনো থাকে না। কদাচিৎ মরুভূমি পথিকের আসা যাওয়ায় পথরেখা কখনো অঙ্কিত হলেও বি¯্রস্ত বালির ঝড়ে তা সহজেই নষ্ট হয়ে পড়ে আবার। অথচ সূর্যের প্রখর দহনের মাত্রা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে একটুখানি ছায়াঢাকা পথের অনুসন্ধান যথাশিগগির তাদের পাওয়া দরকার। তা নইলে জলতৃষ্ণায় দেহ সম্পূর্ণ জলহীন হলে মৃত্যু সুনিশ্চিত। সেই ভয়টাই এবার ফুটে বেরুলো অবিন্নার কথায়- কিন্তু জেসান, এবার কোনদিকে যাত্রা করবো আমরা? কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে অনিশ্চিতভাবে পথহীন পথের উদ্দেশ্যে ছুটে বেড়ালে আমরা মৃত্যুর আলিঙ্গন কি এড়াতে পারবো? এছাড়া অন্য উপায় নেই অবিন্না! মরুভূমির মাঝখানে স্থির হয়ে থেকে তো কোনোকিছু সুরাহা করা যাবে না! অতএব এই অভিযানে আমাদের যেদিকেই হোক এগুতে হবে! বলেই ভাগ্যের বিধান মেনে নিয়ে জেসান একটা দিক অবলম্বন করে তার উট পরিচালনায় উদ্যত হলো।

উটটা এরই মধ্যে কয়েকশ গজ পথহীন পথ অতিক্রম করেছিল। তারপরও শহর কিংবা গাঁয়ের অস্তিত্ব তখনো দৃশ্যমান হলো না তাদের চোখে। সম্ভবত প্রবল সূর্যের প্রচণ্ড স্পর্শ পেয়ে রবার্ট রোভার সচেতন হয়ে উঠছিল ক্রমশ। পূর্ব স্মৃতির সঞ্চারণ হচ্ছিলো তার মগজ থেকে মননে। সে এবার উট থামাতে বললো- প্লিজ! আমাকে একবার নিচে নামতে দাও! রবার্ট, তুমি কি অন্য কোথাও যেতে চাও? তরুণের দিকে পেছন ফিরে বসা জেসান মৃদুস্বরে জানতে চাইলো। না। আমার কাছে যে ম্যাগনেটিক কম্পাস আর ম্যাগনেটিক ম্যাপ রয়েছে, সেটা বার করে নিতে চাই। কারণ এভাবে চলতে থাকলে অপরিচিত মরুভূমিতে আমরা কখনোই গন্তব্য খুঁজে পাবো না। কিন্তু তোমার কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসগুলো তো আমাদের কাছে রয়েছে। সেখানে ম্যাগনেটিক কম্পাস কিংবা ম্যাপ তো আমরা পাইনি রবার্ট! এবার পেছন থেকে কথা বললো অবিন্না। সেগুলো আমি আক্রান্ত হবার আগে আণ্ডার গার্মেন্টের পকেটে লুকিয়ে রেখেছিলাম! আর ওদের গুলিতে আমার শরীরটা ঝাঁঝরা হবার আগেই সম্ভবত মাটিতে পড়ে যাওয়ায় মৃত ভেবে ওরা আমায় ফেলে গিয়েছিল! অথবা অন্য কোনো কারণে আমার মৃতদেহটা নিয়ে ওরা বিশেষ ঘাঁটঘাঁটি করতে চায়নি কিনা, আমার জানা নেই! জবাবে রবার্টের সঙ্গে জেসানও নিচে নামতে নামতে বললো- আমরা তিনজনেই বড় ভাগ্যবান রবার্ট, যে তুমি বেঁচে আছো! ঈশ্বর এই মুহূর্তে পরস্পরের পরম বন্ধুর মতো আমাদের সংযোগ করিয়েছেন শুধুমাত্র সেই কারণেই!

এরপরে সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে আয়ারল্যান্ডের তরুণ যে দুর্ধর্ষ লোমহর্ষক কাহিনীর কথা জানালো তাদের, তাতেই তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলো মৌরিতানিয়ার এমন একটি ভৌগোলিক স্থানে আপাতত তারা দাঁড়িয়ে, যেখানে মৃত্যুর নিষ্ঠুর বাহন হয়ে যে কোনো মুহূর্তেই উপস্থিত হতে পারে ‘এ্যাকুয়িম সংগঠনের’ ইসলামি জঙ্গিরা। এ্যাকুয়িম, আল-কায়েদার মতো আমেরিকা কিংবা ইউরোপের মাটিতে প্রত্যক্ষভাবে এখনো পর্যন্ত কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি সত্যি, তবে অপরাধ জগতে এ অর্গানাইজেশনটি আল-কায়েদার মতোই অত্যন্ত শক্তিশালী এবং অর্থবৈভবে বিত্তবান। নব্বই দশকের শুরুর দিকে আলজেরিয়ায় সেক্যুলার সরকারের পতন ঘটিয়ে যে ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট বিজয় লাভ করেছিল, তা এই জঙ্গি অর্গানাইজেশনেরই সমর্থনপুষ্ট হয়ে। এর জন্মলাভ আলজেরিয়ার মাটিতে। তবে সামরিক শক্তি এবং বিত্ত সঞ্চয় বৃদ্ধি করে দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে নিগার, মালি, মরক্কো থেকে মৌরিতানিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে লিবিয়ার মাটি পর্যন্ত। গেরিলা ইসলামিস্ট মুভমেন্টের জন্য সংগঠনটির আরো একটি উল্লেখযোগ্য শাখা সংগঠন রয়েছে ‘জি আই এ’ (আর্মড ইসলামিক গ্রুপ) নামে। গেরিলা স্টাইলে রেইড করা ছাড়াও এদের প্রধান টার্গেট হলো পশ্চিমা দেশগুলোর এইড ওয়ার্কার, টুরিস্ট, ডিপ্লোম্যাট কিংবা মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনের বিভিন্ন কর্মীদের কিডন্যাপ করে অর্থ আত্মস্যাৎ এবং তাদের হত্যা করা। কখনো কখনো অপহৃতদের এরা ব্যবহার করে দেশ-বিদেশের জেলখানা থেকে নিজেদের বন্দীমুক্তির মাধ্যম হিসেবেও। তবে এটি কেবল টেরোরিস্ট অর্গানাইজেশনের মিলিট্যান্ট কাজকর্মেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপসহ ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন মার্কেটগুলোতে নেশাদ্রব্য স্মাগলিং করে বিপুল অর্থ রোজগার করাও এদের কর্মধারার বিশিষ্ট অংশ।

রবার্ট তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা শেষে সামনের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললো- ওই যে বহুদূরে কালো লালচে ছায়ার মতো পর্দা দেখা যাচ্ছে, যাকে এখানে দাঁড়িয়ে অগ্নিদীপ্ত আকাশেরই ধূসর ছায়া বলে মনে হচ্ছে আমাদের, ওগুলো আসলে আকাশের কোনো ছায়া নয়। ওগুলো সারি সারি অনুচ্চ পাহড় আর তাদের গুহা। ওর পেছনের দিকে এক শ্রেণীর পার্বত্য উপজাতি বসবাস করে। স্বভাবে যারা বন্য সিংহের মতো হিংস্রতায় দুর্ধর্ষ! আর কুটিল কৌশলে হায়েনার মতো চতুর! ‘জি আই এ’-এর সন্ত্রাসীরা এদের সঙ্গে মিলেমিশেই নিজেদের অর্গানাইজেশনের জন্য কাজ করে! তাহলে তো ওদিকে আমাদের একেবারেই যাওয়া চলবে না! জেসান শঙ্কিত মুখে উচ্চারণ করলো কথাগুলো। অথচ আমরা তো ওদিকেই যাচ্ছিলাম জেসান! অবিন্না অস্ফুটস্বরে কথাগুলো বলে এমন এক কৃতজ্ঞ দৃষ্টিপাতে রবার্ট রোভারের দিকে তাকালো যেন সে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিঃশব্দ চিত্তের সুবিনয় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। রবার্ট তার ম্যাগনেটিক কম্পাস হাতে ধরে কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করতে করতে শিহরিত হয়ে জবাব দিলো- সর্বনাশ! না না, ওদিকে একেবারেই নয়! ওদিকটা উত্তর! কাল বিকেলবেলা পাহাড়ের ওই পাদদেশ থেকেই আমার চার সহকর্মীকে ওরা তুলে নিয়ে হত্যা করেছিল! আমাদের এবার দক্ষিণ-পশ্চিমের দিক ধরে এগুতে হবে। এখান থেকে পাঁচ-ছ মাইল রাস্তা সোজা চলে গেলেই খুব ছোটখাটো একটা শহরের মতো মিলবে। আশা করি কিছুটা বিশ্রাম সেখানে আমরা নিতে পারবো। জেসান উটের পিঠে ওঠার আগে এবার রবার্টকে একটি আলিঙ্গন দিয়ে বললো- হ্যাঁ। সেটাই আমাদের এখন সব থেকে বেশি দরকার। তোমাকে পেয়ে আমরা আবার উদ্যম ফিরে পেলাম রবার্ট! ওখানে পৌঁছে প্রথমেই আমাদের পানীয়জলের ব্যবস্থা নিতে হবে, তারপর অন্য কাজ। এরপরে উটের পিঠে চড়ে বসতে বসতে যেন হঠাৎই মনে পড়েছে জেসানের, এমনিভাবে সে বলে উঠলো- ওঃহো, আমাদের নামই তো তোমাকে এখনো জানানো হয়নি। আমি জেসান ওকারো। আর এ হলো আমার স্ত্রী অবিন্না। অবিন্না হিউম্যানিটেরিয়ান অর্গানাইজেশনের একটি ব্রাঞ্চের কর্মী। ওর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমিও এসব কাজে যোগদান করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ম্যাপ আর কম্পাস দুটোই জউরাত থেকে ছিনতাই করে নিয়েছে ‘সালাফিস্ট’ গ্রুপের জঙ্গিরা! সে কারণেই পথ হারিয়ে আমাদের এই চরম দুর্দশা! সালাফিস্ট? তাদের হাত থেকে তোমরা বেঁচে ফিরলে কী করে জেসান? ভয়ার্ত চোখে অবাক বিস্ময়ে জানতে চাইলো রবার্ট। পরে প্রশ্নের উত্তর না জেনেই বললো- আমাদের এইড ওয়ার্কারদের তিনজন কর্মী মাস দুই আগে নিহত হয়েছেন ওদের হাতে! শোনা যায়, ওরা কাউকে একবার টার্গেট করলে জীবন্ত নাকি ছেড়ে দেয় না! প্রভু যিশাস আমাদের রক্ষা করেছেন! যেমন কাল তুমি জিআইএ গেরিলা জঙ্গিদের কব্জা থেকে প্রাণ ফিরে পেয়েছো রবার্ট! বলেই নতুন প্রত্যাশা চোখে মুখে ছড়িয়ে উঠে বসলো জেসান। অবিন্না রবার্টকে উটের পিঠে উঠে বসতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে জানতে চাইলো- কিন্তু তুমি পাহাড়ের পাদদেশ থেকে এতদূরে এসে পড়লে কী করে?

রোভার সঙ্গে সঙ্গেই জিজ্ঞাসার জবাব না দিয়ে ভালোভাবে গুছিয়ে বসে নিলো প্রথমে। সে পূর্বের চেয়ে অনেকটা সুস্থ বোধ করলেও অনাহারে, জলতৃষ্ণায় শরীর বড় দুর্বল। অনেকখানি ঠাণ্ডা জল পান করতে পারলে ভালো লাগতো তার। গলার ভেতরটা শুকিয়ে যেন শক্ত একখানা কাঠের পাটাতন হয়ে আছে। জিভ নাড়িয়ে কথা বলতে গেলেই জড়ো হয়ে আসে শব্দগুলো। মনে হয় শুকিয়ে যাওয়া জিহ্বাটা যেন অনড় এক টুকরো অহল্যা পাথর। একটু সময় নিয়ে তাই মুখ খললো সে- আমরা পাঁচজন মিলে তিনটে উটের পিঠে চড়ে ওই জায়গাটা অতিক্রম করছিলাম কাল সকালে। আসাবাতে আমরা সর্বদাই গাড়ি ব্যবহার করেছি। কিন্তু এখানে বালির স্তর এতটাই পুরু যে উট ছাড়া চলাচল করা অসম্ভব। আমরা তাই…! পরে সব বিস্তারিত বলবো! বলেই থেমে পড়লো অনিন্দ্যসুন্দর বিদেশী তরুণ। জেসান ওকারো অবিলম্বে রবার্টের নির্দেশ মতো চলতে আরম্ভ করেছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে শান্তভাবে মন্তব্য করলো- রবার্ট এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ নয় অবিন্না। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ওর! তাছাড়া সহকর্মীদের হারিয়ে ও ভীষণভাবে শকড এই মুহূর্তে! আমরা শহরে পৌঁছে সুস্থ হয়ে সব কথা শুনবো ওর কাছ থেকে। ওঃ! হ্যাঁ! হ্যাঁ! নিশ্চয়ই! নিশ্চয়ই জেসান! অবিন্না লজ্জিত চেতনায় শব্দ কয়টি উচ্চারণ করলো অস্ফুট করে।

সে হঠাৎই যেন অন্যমনস্কভাবে ভুলে গিয়েছিল জেসান এবং রবার্ট দুজনেই যথেষ্ট অসুস্থ এখনো এবং এক বিশাল ভয়াবহ অনুভূতির সমুদ্র এখনো গর্জে ফিরছে তাদের হৃৎপিণ্ড তোলপাড় করে। দুর্বৃত্ত সালাফিস্টরা তিন-চার দিন আগে জেসানের কপালের ওপর মৃত্যুর অসহনীয় স্পর্শ দিয়ে, শরীরে প্রচণ্ড আঘাত করে তাকে মরণের অন্ধক‚পে ফেলে দিয়েছিল নৃশংসভাবে। কাল সেই একই বাস্তবতা কেড়ে নিয়েছে এই বিদেশী তরুণের চার সহকর্মীর প্রাণ। আর তাকেও মৃত্যুবাণে জর্জরিত করে মৃত ভেবে পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে গেছে বন্ধুর মরুভূমির অবান্ধব পরিবেশে। হৃদয়রাজ্যের এই বিধ্বস্ততা নিয়েই এখন বিরাট অগ্নিগোলকের মতো সূর্যের উত্তাপ সহ্য করে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে তাদের। অতএব এরপরে দীর্ঘ পথ চলতে গিয়ে তাদের বেশিরভাগ মুহূর্তই কেটে গেলো বাক্যহীন থেকে। পথের নিশানা পেয়ে, নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের অনুসন্ধান জেনে অবিন্নার দেহ ঘিরেও যেন ক্লান্তির ঢল নামলো এতোক্ষণে। যে ক্লান্তি কেবল দুঃখ নয়, এক তরল আনন্দও ছড়িয়ে দেয় দেহমনের অণুতে রেণুতে। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj