তরুতলে শান্তিনিকেতন : দু লা ল স র কা র

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৪

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আমার দিকে চোখ পড়তে স্মিত হাসলইবা কেন? শম্পাকেও দেখছিনা যে জিজ্ঞেস করব। এক মুহ‚র্ত, মাত্র এক পলক। কিন্তু শুনলাম যে কে যেন বলছে, নাচবা আমার লগে?”

তবে দুষ্টামি! বিস্ময়ের ঘোর ভেঙ্গে এতক্ষণে মন স্থির হল, শম্পা? আমার শান্তিনিকেতন প্রবাসে ফরিদপুরী বাঙালিটানের কথা বলে আমাকে যে ক্ষ্যাপাতে পারে সেতো শম্পা। বুঝলাম আমাকে চমকে দিবে, অবাক করতে তাই ওর ঐ ছদ্মবেশ, তাই ওর ঐ নৃত্যবেশ।

সাল ১৩৩৫ এর ৩০শে আষাঢ়ের সেই দিনটি। তারপর প্রতি বছর ঘুরে ঘুরে আসে এই দিনটি, এই বৃক্ষরোপণ দিবসটি। সেই শুরুর দিনে তিনি যে বলেছিলেন,-

“সৃষ্টির প্রথম পর্বে পৃথিবী ছিল পাষাণী, বন্ধ্যা। জীবের প্রতি তার করুণার কোনো লক্ষণ সে দিন প্রকাশ পায়নি। চারিদিকে অগ্নি-উদগীরণ চলছিল, পৃথিবী ছিল ভূমিকম্পে বিচলিত। এমন সময়ে কোন সুযোগে বনলক্ষী তার দূতীগুলকে প্রেরণ করলেন পৃথিবীর এই অঙ্গনে। চারিদিকে তার তৃণশম্পের অঞ্চল বিস্তৃন হল, নগ্ন পৃথিবীর লজ্জা রক্ষা হল। ক্রমে ক্রমে এল তরুলতা প্রাণের আতিথ্য গ্রহণ করে। তখনো জীবের আগমন হয়নি; তরুলতা জীবের আতিথ্যের আয়োজনে প্রবৃত্ত হয়ে তার ক্ষুধার জন্য এনেছিল অন্ন, বাসের জন্য দিয়েছিল ছায়া ।”

একজন বিজ্ঞান মনস্ক কবির এই গভীর অন্তর্দৃষ্টি লক্ষনীয়। জীবের আগমনেরও পূর্বে এসেছিল উদ্ভিদ। তারপর জীবজগতের আগমনে বৃক্ষ মাটির বুক চিড়ে খাদ্য সংগ্রহ করল। আসন সরূপ তৃণ শম্পের আয়োজন হল। দিল প্রয়োজনীয় অক্সিজেন। মাথায় ধরল ছায়া। এভাবে বৃক্ষ আতিথেয়তার কোনই ত্রুটি করল না”।

রবীন্দ্র চিত্ত প্রথম থেকে, সেই কাব্য জীবনের ভোর বেলা থেকেই বৃক্ষ তাঁর অনুভূতির জগতকে দখল করে ছিল। প্রথম প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থের নামকরণই তার প্রমান। সেই ‘বনফুল’ কিংবা তারও পূর্বে কবিতা ‘প্রকৃতির খেদ’ থেকে জীবনের বাঁকে বাঁকে কবিতার আঁকা বাঁকা পথে যত পথ চলছেন কোথায় নেই বৃক্ষ? আর তাইতো শান্তিনিকেতনে পিতা যে বৃক্ষের ভিত ভূমি তৈরি করেছিলেন তার উপরই তিনি নির্মাণ করলেন বৃক্ষের মেলা। এই বৃক্ষ রাজ্য তৈরি করেছিলেন তার উপরই তিনি নির্মাণ করলেন বৃক্ষের মেলা। এই বৃক্ষ রাজ্য তৈরির পশ্চাতে দেবেন্দ্রনাথের পরে বৃক্ষপ্রীতিতে যারা এ স্থানটুকুকে মাহাত্ম্য দান করেছেন তাঁদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ, দ্বিপেন্দ্রেনাথ, বলেন্দ্রনাথ, দীনেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, প্রতিমা দেবী, মীরা দেবী অবশ্য স্মরণীয়। আর এঁদের সকলকে ছাড়িয়ে সম্পূর্ণতা দান করেছেন একা রবীন্দ্রনাথ। যেন তাঁর আবেগের প্রতিটি অনুরণন বৃক্ষকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে।

সংগীতের দোলায় শান্তিনিকেতনের আকাশ সে দিন দুলছে। আমি দেখেছি, শিশু বকুলটিকে মাথায় ধারণ করে বালিকাটি একটি নির্দিষ্ট স্থানে সেটিকে রাখল এবং তাকে ঘিরে শম্পাসহ আর সকলের নৃত্য গীত। আহা, বকুল শিশুটি যদি কথা বলতে পারত তবে জানি না কী বলে ওর মনের ভাব প্রকাশ করত। তবু মনে হয় বকুলের পাতাগুলো হাসছে। তবে কি ভালোবাসায় সবাই জাগে?

এই উৎসবের বর্ণনা করতে গিয়ে কবি তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে বলছেন-

“তোমার টবের বকুল গাছটাকে নিয়ে বৃক্ষরোপণ উৎসব হলো। পৃথিবীতে কোন গাছের এমন সৌভাগ্য কল্পনা করতে পারনা। সুন্দরী বালিকারা সুপরিচ্ছন্ন হয়ে শাঁখ বাজাতে বাজাতে গান গাইতে গাইতে গাছের সঙ্গে সঙ্গে যজ্ঞ ক্ষেত্রে এল।- মালা দিয়ে চন্দন দিয়ে ধূপ ধুনো জ্বালিয়ে তার অভ্যর্থনা হলো। এখন সে বেশ আছে । তোমার টব থেকে তাকে ধরায় অবতীর্ণ করানো হলো বলে তার ক্ষেদের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’

এ অনুষ্ঠানে কবি পঞ্চ ভূতকে উদ্দেশ্য করে পাঁচটি খণ্ড কবিতা রচনা করেন। উদ্দেশ্য ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, থেকে বৃক্ষ যে খাদ্যসুধা গ্রহণ করে নিজেকে সতেজ ও চির সবুজ করে তোলে তারই সকৃতজ্ঞ আবাহন।

১৯২৮ এ আনুষ্ঠানিকভাবে বৃক্ষ রোপণ উৎসব প্রবর্তিত হবার আরো পূর্বে ১৯২৫ এ শান্তিনিকেতনের পূর্বাঞ্চলে ‘পঞ্চবটীতে’ কবির জন্মোৎসব উপলক্ষে প্রথম বৃক্ষরোপন হয়েছিল। এরও পূর্বে ১৯১৬ সালে জাপানে ও কাকুরার বাড়িতে ও পরে আমেরিকার ক্লীভল্যান্ডে শেক্সপীয়ার উদ্যানে তিনি বৃক্ষ রোপণ করে বৃক্ষের গুরুত্ব প্রমান করে ছিলেন। এর পর ১৯২৬ সালের ১৮ ই নভেম্বর ব্যালটন ফুব্রেরেড’ নামক হ্রদের তীরে স্বাস্থ্য নিবাস সংলগ্ন উদ্যানে রোপণ করেছিলেন’ লিনতেন বৃক্ষের একটি চারা। চারাটি রোপণ করতে তিনি স্বাস্থ্য নিবাসের অতিথি বইএ লিখেছেন-

“হে তরু এ ধরাতলে রহিবেনা যবে

সেদিন বসন্তে নব পলবে পলবে

তোমার মর্মর ধ্বনি পথিকেরে কবে

ভালবেসেছিল কবি বেঁধেছিল যবে।”

ইতিমধ্যে ১৩২৫ সারের ৮ই পৌষ মহাসমারোহে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি দেখেছিলেন তাঁর শান্তিনিকতনে অনেক গুজরাটি, নেপালি, মারাঠি রাজস্থানি ছাত্র এসে জড়ো হয়েছে। ভারতের সর্ব প্রান্তে ছাত্র সমাবেশ দেখে কবি উৎসাহিত হয়ে নুতন ভাবনায় উদ্দীপ্ত হলেন। সে ভাবনার রূপরেখা কেমন হবে ১৯১৬ সালে আমেরিকা থেকে জানালেন-

“শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়কে বিশ্বের সঙ্গে ভারতের যোগের সূত্র ধরে তুলতে হবে। ঐখানে সর্বজাতিক মনুষ্যত্ব চর্চার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে- স্ব:জাতিক সংকীর্নতার যুগ শেষ হয়ে আসছে- ভবিষ্যতের জন্য যে বিশ্বজাতিক মহামিলন যজ্ঞের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে , তার প্রথম আয়োজন ঐ বোলপুরের প্রান্তরেই হবে।”

বিশ্ব ভারতীর পরিকল্পনা গ্রহণ করে কবি তাঁর কৃষিবিদ পুত্র রথীন্দ্রনাথকে কলকাতা থেকে আনিয়ে নিলেন। সঙ্গে পুত্রবধু প্রতিমা দেবী। পুত্র রথীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতী ও শ্রীনিকেতন গড়ার পিছনে যে কত অবদান রেখেছেন। কবির এ বিশ্ব জাতিকতা যেমন বিশ্বভারতীর মূল সুর, মানুষে মানুষে, জাতিতে-জাতিতে ঐক্যের গ্রন্থন তেমনি মাতৃজঠরের মতো অসংখ্য বৃক্ষময় শান্তিনিকেতন একে ঘিরে আছে। আজ বিশ্বভারতীই যেন শান্তিনিকেতন, আর শান্তিনিকেতনই যেন বিশ্বভারতী। আমি, অতনু, শম্পা এর ছাত্র।

এখানে অধ্যয়নরত সব ছাত্র-ছাত্রীই লেখে, গায়, নাচে, আঁকে। অতনু, শম্পাও তার ব্যতিক্রম নয়। শম্পা কবিতা, অতনু দু’টোই অর্থাৎ গদ্য ও পদ্য সব। শম্পা লিখে সব দেখাত। কোথাও প্রকাশের জন্য পাঠালে দেখিয়ে নিত। তাই দেখতে গিয়ে অজান্তে আমার কবিতার ছাপ পড়ে থাকবে। একবার একটা কবিতা দেখে সহপাঠীরা বললে, এ কবিতায় আর শম্পা নেই। একদিন ওর মামা কবি মনুজেশ মিত্রের সাথে এক নাটকের ফাঁকে পরিচয় করিয়ে দিলে। উনি অবিবাহিত, বোলপুর কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক। উনি অবিবাহিত ছিলেন। জানতে ইচ্ছে হয় কেন? কারো কি আঘাতে এমন বৈরাগ্য? একই বাসায় থাকতেন। কবিতা ও বিশ্ব ইতিহাস বিষয়ক কত কথা যে ইনি বলতেন। আমি নীরবে শুনতাম। শম্পা অনেক সময় বিরক্ত হয়ে মামাকে কৃত্রিম ধমক দিয়ে বলতেন, ‘এমনি নাচুনী বুড়ি-।” বুঝাত আমাকে, আমিও ক্লাস ছেড়ে কবিতা, কবিতা করেই কাটাতাম। আরেক বিদগ্ধ পণ্ডিত ও কবি শিবনারায়ণ রায়। কত সন্ধ্যা রাতে এসে লয়প্রাপ্ত হয়েছে। উনি আমি রতন পলীর উনার বৃক্ষঘেরা একটি নিভৃত বাসায়। বরিশালের মানুষ। স্মৃতিতে বেদনা ঝরত। আমি দেখতাম। আর শুনতাম কবিতার বাক পরিবর্তনের ইতিহাস। আমি জানতে চাইতাম দ্রাবীড় সভ্যতার কথা। তাঁদের বর্ণ ও লিপি ব্যবহারের ইতিহাস। পাঠোদ্ধার আজো হয়নি বলে এই রবীন্দ্র ভবনের অধ্যক্ষ কত কথায় আমাকে কত ভাবে ঋৃদ্ধ করেছেন- প্রায় প্রতি বিকেল ও সন্ধ্যায় এমনি করে আমার কাটাত শান্তিনিকেতনের কোন না কোন বিদগ্ধ গুণী মানুষের সান্নিধ্যে। পূর্ণ হয়েছি আমি। ভাবি, আমার পরবর্তী প্রজন্ম, আমার আত্মজের মধ্যে কি সঞ্চারিত হবে এ বৃত্তি? জানি না।

সে দিনও এমনি সন্ধ্যা- পূর্ব পলীর এক প্রান্তে শম্পাদের বাসা। চাঁদ উঠেছে পূর্ণাবয়বে। আমি শম্পা ও মামা হাঁটছি বাসার সামনে। ওর বাবা, মা কিছুক্ষণ থেকে হেঁটে হুটে বাসায় ফিরেছেন। ওর বাবার সাথে কথা বলে বুঝেছি তাঁরও অন্তর লোক রবীন্দ্র মনস্ক। কিছুক্ষণ কথা বলে মামাও ফিরে গেলেন ঘরে। তখন আমি ও শম্পা। একটু দূরে ট্রেন লাইন। আমার পথের পাশে কতগুলো ইউকিলিপট্যাসের দীর্ঘ সারি। মন্থর বাতাস। বৃক্ষগুলো আমাদের দেখছে। এই ছোট্ট পথটুকু আমরা বহুবার ঘুরে ঘুরে অতিক্রম করলাম। সেই চম্পক সন্ধ্যা, সেই গন্ধময় নৈশব্দের মধ্যে ইউকিলিপট্যাসের হস্ত সঞ্চালন।

এ রকম সন্ধ্যা অতনুও আমাকে উপহার দিত। কিন্তু কোথায় যেন, কিসের যেন অভাব ছিল। শম্পা তা ভরিয়ে দিত। অতনু বুঝত। ও আমাদের বন্ধু হলেও আমাকে শম্পা সম্পর্কে মাঝে মাঝে ছলনাময়ী বলে ওরই সম্মুখে সাবধান করত। শম্পা শুনেও কোনদিন কিছু বলেনি। হয়ত ভাবত এ শব্দটি নারীর জন্য কতটুকু প্রযোজ্য? নারীর অন্য সব গুণের মধ্যে, সেবার মধ্যে ছলনাও যে একটি । তাই বলেইতো ওরা দোলায়, বাজায়। আমি অতনুকে বিরত করি।

একদিন। অতনু আমাকে নিয়ে ঘোষদা’র কেন্টিনে ঢুকেই দূরে এক টেবিলের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে বলছে, আরে গুরু, এখানে?

পাশে শম্পা। যার উদ্দেশ্যে বলছে সে অতনুর আরেক বন্ধু। বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে, বোটানীতে এমএসসি- নাম ওর শোভন।

কেন এখানে নিয়ে এল অতনু? শম্পাকে দেখাতে? শোভনের পাশে? অতনু কেন করছে এসব? তবে কি অতনু চায় আমিই শুধু ওকে ঘিরে থাকি? শম্পা দূরে, আরো দূরে সরে থাক? এবং জানতে চায় শম্পা একই সাথে অন্যকে সঙ্গ দেয়? কী জানি? মনটা তিতা হয়ে যায়।

আমি অতনুর দিকে মুখ ঘুরাই। অতনুর ঔষধে কাজ হয়েছে তবে। তখন ওর চোখে মুখে প্রাপ্তির উজ্জ্বলতা। এইতো অতনু। কত পূর্ণ, কত সুন্দর। চেয়ে দেখি আমাকে পড়া ওর শেষ হয়েছে। ও তবে জয়ী। চল দুলাল, বাইরে যাই। সময় বিকেল। কেন্টিন পেড়িয়ে নেপাল রোড ধরে বায়ে ঘুরি। ঢুকে যাই একেবারে ভিতরে। নিচু বাংলার জঙ্গলে। ঘনো বনচ্ছাদিত পথ। পীচ ঢালা সোজা, বাঁকা বহু শিরা উপশিরারমত বহু পথ। একদিন হয়ত এরকম ছিলনা। ছিল শুধু কাঁকড় বিছানো। আর একটি বাড়ি। বাড়িটির নাম‘ নিচু বাংলা’। শান্তিনিকেতন পলির দক্ষিণ প্রান্তে এর অবস্থান। এখানে থাকেন রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই, মহর্ষির প্রথম পুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ। অবশ্য অল্পায়ু তাঁর প্রথম সন্তান কন্যা। নামাকরণের পূর্বে তার মৃত্যু হয়। দ্বিজেন্দ্রনাথ কাব্য, দর্শন, গণিত ও সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। বিষয়বুদ্ধি বর্জিত এই মানুষটির মাথায় এ ভাবনা আসেনি যে দেয়াল দিয়ে শীত ঠেকানো সম্ভব নয়।

অতনু বলছিল, বাড়িটি যখন নির্মাণ করা হয় তখন তা ছিল মাটির তৈরি, একতলা। দেবেন্দ্রনাথের জীবিত অবস্থাতেই এটি তৈরি হয়।

শন্তিনিকেতন বাড়িটি তখনো তৈরি হয়নি। পরে একে সংস্কার করে দ্বিজেন্দ্রনাথের বসবাসের উপযোগী করা হয়। এখানেই, এ বাড়িতে তিনি বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চায় তন্ময় হয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই অসামান্য প্রতিভার মানুষটির জীবন ছিল আত্মভোলা ধরণের, গোছানো নয়। তাই তাঁর কাছ থেকে যা পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, বাঙালি জাতি তা পায়নি। এই শুদ্ধ চরিত্র, শিশু সুলভ সারল্যের স্পর্শ আকর্ষণে এসেছেন ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, গান্ধীজী প্রমুখ।

আজো এ অরণ্য প্রকৃতির ঘোর লাগা নিচু বাংলার সান্নিধ্যে এসে আমি অতনু কিছুক্ষণ নীরব হয়ে দূর অতীতের পদধ্বনি শুনি। সেই বিস্মৃত, লুপ্ত- প্রায় প্রকৃতির জীবনের মধ্যে গন্ধ পাই সেই মানুষটির। জ্যেষ্ঠর, কাছে আসা কনিষ্ঠের হাসি কান্না, কথা না কথার ভ্রাতৃত্বের মধুর মিলন মুহ‚র্তগুলোর- আমি ও অতনু গেয়ে উঠি সেই গান-

আমি কান পেতে রই, ও আমার আপন হৃদয় গহন -দ্বারে বারে বারে

কোন গোপন বাসীর কান্না হাসির গোপন কথা শুনিবারে- বারে বারে \

ভ্রমর সেথা হয় বিবাগী নিভৃত নীল পদ্ম লাগিরে,

কোন রাতের পাখি গায় একাকী সঙ্গী বিহীন অন্ধকারে বারে বারে \

.. .. .. .. .. .. .. .. .. .. . .. ..

ওসে আমায় জানি পাঠায় বাণী গানের তানে

লুকিয়ে তারে বারে বারে \

এই বাড়িটির চারিদিক ঘিরে প্রাচীন কিছু আমলকী, মহুয়া, শাল ও আম। নিচু বাংলার এ অরণ্য স্বাদ, এ প্রকৃতি গন্ধে মনে পড়ে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের প্রথম যুগের ছাত্র সুলখক প্রমথ নাথ বিশীর কথা ও তাঁর বর্ণিত ভাষা-

“মুচুকুন্দ চাপা নাগ কেশর এবং আরো অনেক দেশী ও বিলাতী ফুলের গাছ, বিভিন্ন ঋতুতে এখানকার বাতাস সুরভিত করিয়া রাখিত। এই নির্জন নিস্তব্ধ স্নিগ্ধ আশ্রমে বর্ষীয়ান দার্শনিক লেখাপড়া লইয়া কাল কাটাইতেন। মানুষ এখানে অল্পই যাতায়াত করিত। কিন্তু দার্শনিকের সঙ্গীর অভাব ছিলনা।

গাছ হইতে কাঠ বিড়ালিরা , নামিয়া আসিয়া তাঁহার পায়ের কাছে সমবেত হইত, খাদ্যকনা খুঁটিয়া খাইত, পাখির দল তাঁহার চারিদেকে জটলা করিত , শালিখ আসিয়া তাঁহার চেয়ারের হাতলের উপর বসিত– ইহাদের জন্য নিয়মিত খাদ্যের বরাদ্দ ছিল। শিক্ষকদের মধ্যে যাঁহারা প্রবীন তাহাদের মধ্যে অনেকে তাঁহার কাছে যাতায়াত করিতেন ; আর তাঁহার সঙ্গী ছিল প্রিয় ভৃত্য মুনীশ্বর, প্রাচীন ভারতের ঋষিদের তপোবন দেখি নাই, তবে সে তপোবন যে অনেকটা এই রূপ ছিল তাহাতে সন্দেহ নাই ”।

অতনু বলছিল , জানো দুলাল , বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ ও তাঁর জীবন চর্চা শান্তিনিকেতনের তপোবনিক ভাবনাটি যেন আরো অর্থবহ করে তুলছিল। আমারও তাই মনে হয়। তাই বার বার করে শান্তিনিকেতনের এ নিঝুম অংশটুকু আমাকে টানে । মনে মনে ভাবি অতনু জানে না যে শম্পাও কতদিন আমাকে এখানে নির্জনতা দেখাতে নিয়ে এসেছিল।

ঐ যে দেখছ , ওটা রাধাচূড়া, কৃষ্ণ চূড়ার পাশে অতনু বলছিল। রাধার পাশে কৃষ্ণ । নামের সঙ্গে গাছ দু’টোর কী সঙ্গতি আছে জানি না। তবু বেশ দেখতে। রাধা চূড়ার ফুলগুলো হলুদ হলুদ, কোনটায় লাল যুক্ত । কিন্তু কৃষ্ণচূড়াতো লালে লাল— টগবগে লাল। ঐ যে পাশে দেখ কতগুলো শ্বেত করবী–

হেমন্ত কোন্ বসন্তেরই বাণী পূর্ণশশী ওই যে দিল আনি \

বকুল ডালের আগায় জ্যোৎস্না যেন ফুলের স্বপন লাগায়।

কোন্ গোপন কানাকানি পূর্ণশশী ওই -যে দিল আনি \

আবেশ লাগে বনে শ্বেতকরবীর অকাল জাগরণে ।

ডাকছে থাকি থাকি ঘুমহারা কোন্ নাম না জানা পাখি।

কার মধুর স্মরণখানি পূর্ণশশী ওই যে দিল আনি \

রবীন্দ্র অনুভবের কী প্রগাঢ় প্রকাশ ভঙ্গীমা ! বকুলের ডালের আগায় জোছনাতে যে ফুলের স্বপন লাগায় তার পাশে কোন আবেশে শ্বেত করবী অকালে জেগে ওঠে তা কবির মনে আবেগের উদবোধন ঘটিয়েছে। শ্বেত করবীর ফুটে ওঠার মধ্যে কবি দেখেছেন তার আবেশ মুগ্ধ প্রস্ফুটন।

আমরা এগিয়ে চলেছি সম্মুখে যেখানে রাধাচূড়া ও কৃষ্ণচূড়ার যুগল মিলন। বৃক্ষের নাম রাধাচূড়া — এ আমি পূর্বে শুনিনি। এখানে এসে শুনলাম ও দেখলাম বৃক্ষরূপে কৃষ্ণের পাশে রাধাও কত জীবন্ত। মানুষী সত্তার রাধা কৃষ্ণ যুগলকে বৃক্ষেও যুগল বন্দী করে রাখা হয়েছে। এটা এখানের ধর্ম। কত নাম না জানা বৃক্ষকে এখানে নামদানে ধন্য করা হয়েছে।

নিচু বাংলার সর্বত্র বৃক্ষ। বিভিন্ন লতা গুল্মে নিবড়ি ছায়াবৃত। বাইরে থেকে বোঝাই যায় না ঐ লতাগুল্মের মধ্যেও ছোট ছোট একতলা দালান বাড়িতে কোন গুণী মানুষ পাখির বাসার মত নীড় বেঁধেছে । দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথ আজন্ম বৃক্ষপ্রেমী। তিনিও উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন বৃক্ষপ্রীতি। তাঁর হাতের যতেœ এখানের আম , লিচুর বাগান। মহর্ষি যখন শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিচালনার জন্য ট্রাস্টগঠন করেছিলেন দ্বিপেন্দ্রনাথ ছিলেন অন্যতম ট্রাসটি।

এ প্রসঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী প্রমথনাথ বিশী সাহায্য করতে পারেন। মহাকাল নির্বিঘ্নে তাঁর কাঁধে সেই জীবিত সময়গুলোকে বহনের দায়িত্ব দিয়েছেন। আজ এখন যতদূরেই তাকাই দেখব বর্তমান ছাড়া আর কিছু নেই — কী করে দেখব? দূর পশ্চাতে কী করে আমাদের দৃষ্টি পৌঁছবে? আমরাও এগিয়ে চলেছি– এমন কোন বৃহৎ সূ² শক্তি নেই যাকে ইচ্ছে মত নিয়ন্ত্রন করে পিছনের সব দৃশ্যকে দেখা যাবে। একে একে পাপড়ির মত একেকটি যুগ ছড়িয়ে দৃশ্যত উপভোগ করা যাবে।

প্রমথ নাথ বলেছেন , “ একবার গ্রীষ্মের ছুটিতে আমরা কয়েকজন ওখানেই ছিলাম । তখন আমাদের কিছু বয়স হইয়াছে। আমি দু’জন সঙ্গীকে প্রস্তাব করিলাম, চলো বাগান হইতে কচি তাল পাড়িয়া তালশাঁস খাওয়া যাক। তাদের মুখ হইতে সমস্বরে বাহির হইল , দ্বিপু বাবুর বাগান।”

আর কিছু তারা বলিতে পারিলনা । দ্বিপু বাবু তো নিজে ধরিতে আসিবে না , আসিবে তাহার বয়, সে কিছুতে আমাদের গায়ে হাত তুলবে না। যদি সত্যি বিপদ হয় , আমি তার প্রতিকার করিব। কিন্তু লোকজন ছুটিয়া আসিলে যেন পালাইয়ো না, সব মাটি হইবে।

আমরা তিনজনে গিয়া তাল গাছের তলে সমবেত হইলাম । একটি তাল পড়িয়াছে কি অমনি দ্বিপু বাবুর ঊদাত্ত কন্ঠ ধ্বনিত হইয়া উঠিল “ বয়, বয়! সঙ্গীরাতো পালাইবার মুখে । আমি বলিলাম, “ না পালানো চলিবে না ।”

বয় আসিয়া বলিল , “ বাবু আপনাদের ডাকছেন”। আমি বলিলাম “ চলো ” । দ্বিপেন্দ্র নাথের কাছে নীত হইলে তিনি বলিলেন “ তোমরা কেন আমার বাগানে ফল পাড়তে এসেছিলে? ”

আমি ভালো মানুষের— মত বলিলাম , আজ্ঞে কাছা-কাছি আর কারো বাগান নেই এই জন্যে ।”

তিনি বলিলেন “ আচ্ছা তোমরা বস । ” আর বয়কে বলিলেন, লিচু ও তালশাঁস পাড়িয়া আনিতে।

আমরা যাইবার কালে বলিলেন , যে দিন তোমাদের ফল খাইতে ইচ্ছা করিবে , গাছের তলায় না গিয়ে একেবারে আমার কাছে এসো।”

আর আমাকে বলিলেন “ দেখ বাপু , তুমি একটা কাজ করো , তোমার এই উত্তরটি আর কোন ছেলেকে শিখিয়ে দিও না।”

এতক্ষণে অতনু ও আমি নিচু বাংলা থেকে বেড়িয়ে এসেছি। বাইরে বাতাস ও জোছনার খেলা। পৃথিবীর বায়বীয় আবরণ উপর ঢেউয়ের লতা। বাতাসে শাল ও মহুয়ার মোহময় গন্ধ ।

কোথায় যাওয়া যায় বল? অতনু আমার হাত ধরে বলেছে। আর বুঝি মনে মনে ভাবছে , এ ভাবেই শম্পার জায়গাটি ওর ভরিয়ে তুলতে হবে।

চল, এবার ‘দু:খ হরণীতে’ যাই। অতনু বললে । হাঁটছি দু’জনে। নিচু বাংলার‘ দ্বিজবিরাম ’ থেকে বেড়িয়ে নেপাল রোডে উঠে , হিন্দি ভবন ও চীনা ভবন এর পাশ দিয়ে হাঁটছি। রাস্তার দু’পাশে বেশ বয়স্ক জাম গাছের সার। গাছগুলো বেশ মোটা সোটা কিন্তু জামগুলো আকারে ছোট। বড় জাম বলতে বাড়িতে যা দেখতাম তা কি এখানে নেই?

একটু একটু আবছা আলো আঁধারি পথ। ঝোপের ভিতরে জোনাকিরা মিট মিট করে জ্বলছে, ডাকছে ঝিঁ ঝিঁ । অলস বাতাস। ভাবতে অবাক লাগে , এরই মধ্যে শিল্প সাহিত্য ও মননের এক শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান। আমরা দু’জনে রাতের আলো আঁধারিতে —

জান জানি আদিকাল হতে

ভাসালে আমারে জীবনের স্রোতে

সহসা হে প্রিয় কত গৃহ পথে

রেখে গেছ প্রাণে কত হরিষন \

ভালো লাগছে , অনেকটাই আমার ভালো লাগছে। এক উদাস আনন্দে মন অনেকটাই এখন হালকা । মনে হচ্ছে , এই যে চারিদিকে গাছ পালা, জোনাক, ঝিঁ ঝিঁ , রাতের নৈশব্দ, নক্ষত্র নিলয় এরা সব মানুষের অস্তিত্বেরই অংশ। এতে আর মানুষে কোন পার্থক্য নেই। মনে হচ্ছে এ মুহুর্তগুলো যদি আর শেষ না হত। মহাকাল তার সোনার রথ থেকে দু’একটি দিন বা কিছু নিভৃত মুহুর্ত যদি মানুষের জন্য নামিয়ে রেখে যেত। রবীন্দ্রনাথের অনুভব সেখানে আরো কত প্রগাঢ়—

সোনার খাঁচায় দিনগুলো মোর

রইল না আর রইল না

সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলো।

আমি অতনু হাঁটছি পথ । কারণ আজ যে আমাদের রাত ও পথের নেশায় পেয়েছে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট ’ স্খলিত পা। এ রাস্তার শেষ শান্তিনিকেতন খেলার মাঠ। ডানে আমাদের বিদ্যাভবন। ঐতো বিদ্যাভবনের দেয়াল ঘেঁষে ঘনো নীলমনির ঝার। জোছনার মিষ্টি রোদেও দেখা যায় অজস্র নীলমনি ফুটে একটি চমৎকার নীলাভ আবহ গড়েছে। নীলমনির নীলাভ রঙটি কবির যে কত প্রিয় ছিল– বলতেই অতনু গেয়ে উঠল–

ফাল্গুন মাধুরী তার চরণের মঞ্জীরে মঞ্জরী

নীলমনির মঞ্জরীর গুঞ্জন বাজায়ে দিল কি রে

আকাশ যে মৌনভার বহিতে পারে না আর

নীলিমা বন্যায় শূন্যে উচ্ছলে অনন্ত ব্যাকুলতা

তারি ধারা পুষ্প পাত্রে ভরি নিল নীলমনিলতা।

কবিতাটির ভূমিকায় কবি বলছেন“ শান্তিনিকেতন – উত্তরায়ণের একটি কোনের বাড়িতে আমার বাসা ছিল। এই বাসার অঙ্গনে আমার পরলোকগত বন্ধু পিয়র্সন একটি বিদেশী গাছের চারা রোপণ করেছিলেন। অনেক কাল অপেক্ষার পরে নীল ফুলের স্তবকে স্তবকে একদিনে সে আপনার অজস্র পরিচয় অবারিত করলে। নীল রঙে আমার গভীর আনন্দ, তাই এই ফুলের বাণী আমার যাতায়াতের পথে প্রতিদিন আমাকে ডাক দিয়ে বারে বারে স্তব্ধ করেছে। আমার দিক থেকে কবিরও কিছু বলবার ইচ্ছে হত, কিন্তু নাম না পেলে সম্ভাষন করা চলে না। তাই লতাটির নাম দিয়েছি নীলমনিলতা । উপযুক্ত অনুষ্ঠানের দ্বারা সেই নাম করণটি পাকা করবার জন্যে এ কবিতা। নীলমনি ফুল যেখানে চোখের সামনে ফোটে সেখানে নামের দরকার হয়নি —

কিন্তু একদা অবসান প্রায় বসন্তের দিনে দূরে ছিলুম, সে দিন রূপের স্মৃতি নামের দাবি করলে। ভক্ত ১০৮ নামে দেবতাকে ডাকে সে শুধু বিরহের আকাশকে পরিপূর্ণ করার জন্যে।”

কবির রচিত ‘ নীলমনিলতা’ কবিতাটির কথা আমার মনে পড়ে যায় —

আমি আজ কোথা আছি প্রবাসে অতিথিশালা – মাঝে ,

তব নীল লাবন্যের বংশীধ্বনি দূর শূণ্যে বাজে !

আসে বৎসরের শেষ , চৈত্র ধরে ¤ান বেশ,

হয়তোবা রিক্ত তুমি ফুল- ফোটাবার অবসানে—

তবু, হে অপূর্বরূপ , দেখা দিলে কেন যে কে জানে \

সত্যিই অপূর্ব রূপ এই নীলমনির । কী গাঢ় নীলমঞ্জরী । যেন হৃদয়কে টেনে নিতে চায় ব্যগ্র দু’হাতে। প্রকৃতি পূজারী রবীন্দ্রমানসে নীলমনির ছাপ তাই এত প্রগাঢ় , এত অতল নি:শব্দ ।

এর পাশে একটু দূরে “ দিনান্তিকা ” । পাঠ ভবন দপ্তর ছাড়িয়ে একটু এগুলেই ‘ চৈত্য ’— চারিটি রাস্তার সংযোগ স্থলে । গাঁয়ের খড়ের চালা ঘরের মতো। পরিকল্পক ছিলেন নন্দলাল ও সুরেন্দ্র নাথ কর। স¤প্রতি আঁকা কোন ছবির প্রদর্শনীর ঘর। কাঁচের আবরণে একটি তাক । তাতে এখানের শিল্পীদের আঁকা ছবি বা ভাস্কর্য সকলের দেখার জন্য রেখে দেওয়া হয়। এর অদূরে ‘ দিনান্তিকা ’ । কবিগুরুর গানের ভান্ডার ভ্রাতুষ্পুত্র দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামকরণে এর নাম। পূর্বের শ্রীচেহারার পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু এ দোতালা বাড়িটি একটিু অদ্ভুত ধরনের। এর অনেকগুলি কোণ। দোতালায় ওঠার সিঁড়িটি সামনে । গঠন শৈলীর বৈচিত্র্য মন টানে। এটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৩৯ সালে। এখানেই দিন শেষে সে দিনের শিক্ষক কর্মীরা এসে একত্রে বসে চা খেতেন। আসতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এ বাড়িটির সাথে দিনেন্দ্রনাথ ও তাঁর সহধর্মিনী কমলা দেবীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

আমি ও অতনু সন্ধ্যার আলো অন্ধকারে এর পাশ দিয়ে হাঁটছি । পাশে বিরাট এক তমাল। তমালের গাত্রাবরণ শ্যামল ; কালো। বিরহিনী রাধা কৃষ্ণের বর্ণ ভেবে এ বৃক্ষকে খুব ভালো বেসেছিলেন বলে বৈষ্ণব কবিরা লিখলেন“ আমি তমাল বড় ভালোবাসি।” সেই তমালের পাশ দিয়ে যেতে যেতে যেন আমিও কেঁপে উঠি। কেন জানি না। আমার গাইতে ইচ্ছে হল —

আমি শ্রাবণ আকাশে , ওই দিয়েছি পাতি

মম জল-ছলো-ছলো আঁখি মেঘে মেঘে ।

বিরহ দিগন্ত পারায়ে সারা রাতি অনিমেষ আছে জেগে \

যে গিয়েছে দেখার বাহিরে আছে তারি উদ্দেশে চাহিরে

স্বপ্নে উড়িছে তারি কেশরাশি পূরব পবন বেগে \

শ্যামল তমাল বনে

যে পথে সে চলে গিয়েছিল বিদায় গোধুলি ক্ষণে

বেদনা জড়ায়ে আছে তারি ঘাসে , কাঁপে নি:শ্বাসে —

সেই বারে বারে ফিরে ফিরে চাওয়া ছায়ায় রয়েছে লেগে \

কবি নিশ্চয়ই এখানে কারো চলে যাবার বহমান বেদনাকে ইঙ্গিত করেছেন। বুকে বোঝা হয়ে আছে সে ভার। বৈষ্ণব পদ কর্তার রাধা বিরহকে বুকে লালন করে কবি বিরহী দিগন্তকে স্মরণ করেছেন। শ্যামল , তমাল বনকে প্রত্যক্ষ করে। বাস্তবের কোন এক উপলক্ষকে কেন্দ্র করে বিরহীমন জেগে ওঠে —

ঝড়ে চঞ্চল তমাল বনের প্রাণে

তোমাতে আমাতে মিলিয়াছে একখানে।

আমরা ডানে বাক্ নেই । যাব আমরা “দু:খ হরিনী”। এটি এখানে ছাত্রীনিবাস হোষ্টেলের সম্মুখের রাস্তা। ছেলেরা এ নামেই ডাকে। এখানে এখন ঘরে ফেরার পাখির ডাক। তাই কাকলি মুখর। একটু বাদে পাখির কাকলি থেমে যাবে তার পর শুরু হবে নারী কন্ঠের কলকলানি।

অতনু যেতে যেতে বলছিল, দিনান্তিকার বাড়ির বাঁ পাশে একটি খড়ের আটচালা বাড়ি ছিল। বায়ে ছিল বাঁশ ঝার। এই বাঁশ ঝারের পাশেই ছিল ‘ বেণুকুঞ্জ ’ । এখানে এক সময় দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর , পন্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী এবং প্রথম দিকে কবিপুর রথীন্দ্রনাথ ও তাঁর নি:সন্তান পুত্রবধু প্রতিমাদেবী থাকতেন।

বারো

আমার মনে আনাগোনা করছে অনেক কথা। ক’দিন আগেঐ নিম বৃক্ষটির তলে বসে এক মনে এক কিশোরীকে ছবি আঁকতে দেখছিলাম। হয়ত হবে শরতের আকাশের ছবি। কে কতটা প্রকৃতির প্রতিকৃতি আঁকতে পারল নাকি তাতে কতটা নিজের মনের রঙ থাকল তবেই একটা ছবি হয়ে উঠে? ভাবি নিসর্গ প্রকৃতির এই যে এতটা বিভূতি এর কি আলাদা কোন স্রষ্টা আছেন? যিনি এত কিছু নির্মাণ করেছেন যেমন এ শান্তিনিকেতন? না থাকলে আমার কোন বড় ধরনের লাভ ক্ষতি নেই কারণ আমার সঙ্গে তাঁর অস্তিত্ব ঘটিত কোন সাংসারিক সম্পর্ক নেই — আর যদি নির্বিকল্প তিনি থেকেও থাকেন তবে তা হবে অসহ্য সুন্দর। যা আমি সইতে পারব না। তবে রবীন্দ্রনাথ যে কার জন্য এত জন্ম বাউল হয়ে ভিতরে ভিতরে এতটা উদাস ছিলেন কে জানে —

আজি শরৎ তপনে প্রভাত স্বপনে কী জানি পরাণ কী যে চায় ।

ঔ শেফালির শাখে কী বলিয়া ডাকে, বিহগ বিহগী কী যে গায় \

আজি মধুর বাতাসে হৃদয় উদাসে , রহেনা আবাসে মন হায় –

কোন কুসুমের আশ্ েকোন্ ফুল বাসে সুনীল আকাশে মন ধায় \

এরপর আমাদের সন্ধ্যার গন্তব্য “ দু:খ হরিনী।” নামটি কোন তাপিত পুরুষ হৃদয় প্রদান করেছে সন্দেহ নেই। পথটি কাঁকড়ের কন কনিতে ঢাকা । এরকম এখানে সব পথেই — প্রাকৃতিক। বিড়ালা , গোয়েঙ্কা এ দু’জন শিল্প পতির অবদানে মেয়েদের এ দু’টি বড় ছাত্রীনিবাস । উভয় ছাত্রী নিবাসের সামনের অঙ্গনে প্রচুর ফুল, নানা রঙের , নানা জাতের। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে বুঝে ‘ রজনী গন্ধা ’ ও ‘ কামিনী’ নিজেদের মেলে ধরবার প্রয়াসে ব্যস্ত। ফুটে আছে কত করবী, রঙ্গন — আর এরা সবাই রবীন্দ্র অনুভূতিতে কী গভীর প্রভাবই না ফেলেছিল —

আন্ করবী, রঙ্গন, কাঞ্চন রজনীগন্ধা প্রফুল মলিকা

আয় তোরা আয়

মালা পর গো মালা পর সুন্দরী —

ত্বরা র্ক গো ত্বরা কর।

আজি পূর্ণিমা রাতে জাগিছে চন্দ্রমা,

বকুল কুঞ্জ দক্ষিণ বাতাসে দুলিছে কাঁপিছে

থরো থরো মৃদু মর্মরি ।

আহা , যে রাতে চন্দ্রিমা জেগেছে সে রাতে কবি করবী, রঙ্গন , কাঞ্চন , রজনীগন্ধা ও বকুলকে আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও কবির আহ্বান না পেলেও প্রকৃতি তার আপন রসে পলবিত হবে। তবু কবির অনুভূতি জেগেছে আর জেগে উঠে তা যে ফুলের সাথে চন্দ্রিমার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গান হয়ে উঠেছে।

গোলাপ দেখছি সর্বত্র । বড় খোপার মত গোলাপ। গোলাপ যখন ফোটে , ফুটেই থাকে। তাঁর মধ্যে কোন ফাঁক নেই যেন। কতগুলো নম্র সুমিষ্ট পাতলা পাপড়ি পালকে কী রকম ফুটে থাকে। কবি তাই গোলাপের দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠেছেন –

ফাগুন হাওয়ায় রঙে রঙে পাগল ঝোরা লুকিয়ে ঝরে

গোলাপ জবা পারুল পলাশ পারিজাতের বুকের পরে \

সেই খানে মোর পরাণ খানি যখন পারি বহে আনি,

নিলাজ রাঙা পাগল রঙে রাঙিয়ে নিতে থরে থরে।

যত ফুল, যত বৃক্ষ তিনি এখানে রোপণ করেছেন সবাই কবির কাব্যের কিংবা গানের উপজীব্য হয়েছে। হয় কবি এদের জন্য করেছেন অথবা এরা ( ফুলেরা) কবিকে ধন্য করেছে, ঋদ্ধ করেছে।

টগর এখানে যত্রতত্র — সর্বত্র। প্রায় প্রতিটি বাড়ি ঘিরে টগরের বেড়া । রাস্তার দু’পাশে ঘনো সবুজ পাতার নীরব টগর সর্বত্র , সবখানে। কেন রবীন্দ্রনাথের এই টগরের প্রতি এত পক্ষপাত ছিল কে জানে। সুন্দর ভাবে ছেটে রাখলে সম সাদৃশ্যে সুন্দর পাতার কিংবা ফুলে সে অপরূপ। বার মাসেই ফোটে — ছোট ছোট সাদা ফুল । বেশ সুচি স্নিগ্ধ । গন্ধ নেই টগরের। কিন্তু এরা যখন ফোটে এত বেশি করে ফেটে যে দেখতে আকাশের ছায়াপথের মত মনে হয়।

শম্পাদের বাসার সামনেও এমনি টগরের বেড়া। গাছগুলো বর্ষায় আরো ডাগর হয়ে ওঠে। পাতাগুলো কেমন সবুজ আর তেল চকচকে । এর মাঝে উঁকি দেয় তার সাদা ফুলগুলো। কত দিন , কত সন্ধ্যায় ও আমি সিড়িতে বসে এই টগর দেখেছি। বলেছি, এ রকমই আমার বাংলাদেশ। হঠাৎ অতনু আমাকে টান মারে। বলে , কী ভাবছ এত?

অতনু দেখে ফেলেছে, আমি কী ভাবছি । হায় অতনু ! শম্পার কাছ থেকে আমাকে ফিরিয়ে আনার কী প্রানান্ত চেষ্টা। আমরা সম্মুখে তাকাই । দেখি, দেবযানী ও রুমকি। আমাদের দু’জনকে দেখে হাসছে। কাছে গেলে বলছে , বল কী দু:খ হরণ করতে হবে তোমাদের? শম্পা কোথায়? সেই-ইতো তোমাদের চলমান “দু:খ হরণী।”

আমি ভাবি, আবার সেই শম্পা? কেউ খোচা দিয়ে জাগায় , কেউ ভালোবেসে জাগায়? এরা কোন দলে?

ততক্ষণে রুমকি ও দেবযানী গান ধরেছে —

সহসা ডাল পালা তোর উতলা যে ও চাঁপা, ও করবী।

কারে তুই দেখতে পেলি আকাশ-মাঝে জানি না যে \

কোন সুরের মাতন হাওয়ায় এসে বেড়ায় ভেসে ও চাঁপা , ও করবী।

কার নাচনের নূপুর বাজে জানিনা যে \

জাগতে চাইলেও কি সব সময় জাগা যায়? এত পাওয়ার মধ্যেও মন আমার নিশ্চেষ্ট । চারিদিকে ফুল, লতা , পাতা সার সার বৃক্ষ ও জোছনা ধোওয়া বাতাসে যৌবন রস সিক্ত তরুণ তরুণীর মেলা। আবেগে মোহাবিষ্ট পরিবেশ। আমার এ সময় মনে হল, নর-নারীর প্রেমজ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুষ্পের একটি ভূমিকা আছে। ফুলের রঙ , তার গন্ধ, তার নির্ব্বাক চারুতার সঙ্গে প্রেমজ অনুভূতিগুলোর যেন এক নিবিড় সম্পর্ক আছে। তাই দেখি এত ফুল ও ফলের পাশে সুন্দর সুন্দর তরুণ তরুণীগুলো বেশ মানিয়ে যায়। তাদের প্রেমজ আকুতি যেন ফুল হয়ে ঝরে—

পাখিরা বলে, চাপা , আমারে কও

কেন তুমি হেন নীরবে রও।

প্রাণ ভরে আমি গাহি যে গান

সারা প্রভাতেরই সুরের দান ,

সেকি তুমি তব হৃদয়ে লহ ।

কেন তমি তবে নীরবে রও।

চাঁপা শুনে বলে ” হায় গো হায়

যে আমারই গাওয়া শুনিতে পায়

নহ, নহ পাখি সে তুমি নও । ”

তা হলে কে শুনবে চাঁপাকলির গান? আমরা জানি কবির গান একই সঙ্গে বাণী ও সুর প্রধান । বাণী এবং সুরের এত সুন্দর সেতু তৈরি একমাত্র রবীন্দ্রনাথেই সম্ভব। আমার বিশ্বাস এই বাঙালী জাতির হৃদয়ে কোথাও একটি মরমী সুরের আবেস লুকিয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ তাকে তাঁর অতি সচেতন শব্দ তরঙ্গ দিযে জাগিয়ে তুলেছেন। এ সত্যটি উপলব্ধি করেই তাঁর বিশ্বাস জন্মে ছিল যে, বাঙালী তাঁর আর সব কিছু ভুলে গেলেও তাঁর সঙ্গীত ভুলবে না।

তাঁর গানে তত্ত্ব আছে— যেমন উপরে বর্ণিত চাঁপা ও পাখির কথোপকথনে একটি সুন্দর তত্ত্বেরই পরিস্ফুটন দেখি। কিন্তু কী আশ্চর্য , এ কঠিন তত্ত্বের প্রকাশে তিনি যে কথা ও সুরকে ধরেছেন তা কত হৃদয় মথিত।

তেরো

দেবযানীদের ছাত্রীনিবাসের নান্দনিক দালান গৃহটি ধরে মধুমঞ্জরি লতা।

কবি বলেছেন ,— “ নাম দিয়ে আমি নিলাম আপন করে মধুমঞ্জরি ”

এ ফুলটি নাকি বিদেশী। কারো কারো মতে বাংলায় যাকে হরগৌরী , মধুমালতী বলা হয় রবীন্দ্রনাথ তাকেই বলেছেন মধুমঞ্জরি। এর পাপড়ির কিছুটা লাল কিছুটা সাদা— তাই এর নাম হরগৌরী। বসন্তে এর লতা ফুঁড়ে অজস্র ফুল আসে। কবি আশা করেন–

তব প্রাণে মোর ছিল যে প্রাণের প্রীতি

ওর কিশলয় রূপ নেবে সেই স্মৃতি ,

মধুর গন্ধে আভাসিবে নিতি নিতি

সে মোর গোপন কথা ।

অনেক কাহিনী যাবে যে সেদিন ভুলে ,

স্মরণ চিত্ত যাবে উন্মূলে ;

মোর দেওয়া নাম লেখা থাক ওর ফুলে

মধুমঞ্জরী লতা।

রবীন্দ্রনাথ দেশ ভ্রমন কালেও এই পুষ্পলতিকাটির জন্য ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছেন। ১৯২৬ সালে রোম থেকে ফ্লোরেন্স যাবার পথে শান্তিনিকেতনে ফেরার কথা ভেবে লিখেছিলেন —

“ কিন্তু পৌঁছব যখন তখন শিউলি ফুলের পালা–মালতীর পরিশিষ্ট দেখতে পাবো। ইতিমধ্যে আমার মধুমঞ্জরীর হয়তো বর্ষাধারায় শ্রীবৃদ্ধি হবে।”

পরের বছর পিনাঙ থেকে লিখেছেন —

“ আমার কোনার্কের গাছগুলোর অবস্থা কী রকম? তাদের জন্য মনটাতে টান পড়ে। ”

কুরচি কবির প্রিয় ফুলগুলির অন্যতম। উত্তরায়ণ বাদেও এখানে এর কিছু আবাদ হয়েছে। দেবযানী হাতে করে কয়েকটি কুরচি এনে আমার সামনে মেলে ধরে। ছোট খাটো পুতুল পুতুল গড়ন এই দেবযানীর। সিলঙ থেকে এসেছে। শিউলি ফুলের মত দেখতে।

বললে, নাও । আমার ইতস্তত: ভাব দেখে কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাসে বললে, শম্পার হস্তযুগল ভেবে নাও না আজ ।

আমি হাত বাড়িয়ে নিতে নিতে বলি, শম্পা নেইতো কী হয়েছে? তোমরাতো আছি। অমনি অতনু দুষ্টুমি করে বলে উঠল, এইতো গুরু পথে এসেছ। রুমিকি কী বল?

রুমকিতো আরো এক ধাপ এগিয়ে । ও খুব ভালো নাচে। নাচের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ঈষৎ হেসে বলেছে , হবে ওর হবে অতনু ; লেগে থাক ।

এরা কি সবাই মিলে শম্পার বিরুদ্ধে লেগেছে? নাকি চায় আমি শম্পা মুক্ত হই? কিন্তু কেন?

আমার হাতে তখন মৃদু জোছনার আলোয় দেবযানীর দেয়া কুরচি। আমি কুরচির দিকে তাকিয়ে। ভাবি, কবি কতইনা যতœ করে একে এনে এখানে লাগিয়েছেন। একদা তিনি শিলাইদহ থেকে কলকাতা আসার পথে কুষ্টিয়া ষ্টেশন ঘরের পিছনে ফুল ভারে নত এই কুরচি গাছকে দেখেছিলেন। কুরচিকে সেই বোধ হয় তিনি প্রথম দেখেন। পদ্মা পর্বের অনেক পরে কবি যখন ‘বনবাণী ’ কাব্য গ্রন্থ রচনা করেন তখন তিনি অভিজাত ফুলকে পাশ কাটিয়ে অনভিজাত ফুলকে তাঁর কবিতার বিষয় করে তুলেছিলেন। কুরচির ঠাঁই ছিল বাংলার বনে জঙ্গলে। কবি তাকে সাদরে গ্রহণ করে তার ফুলের সভা শান্তিনিকেতনে সজনে, কন্টিকারি , আকন্দের সাথে ঠাঁই দিয়েছিলেন। যদিও সংস্কৃত কাব্যে কুরচি বা কুটজ অবহেলিত ছিল না, ছিল নন্দিত। রবীন্দ্রনাথের অনুদিত সংস্কৃত কাব্যে —

ভ্রমর একদা ছিল পদ্ম বন প্রিয়

ছিল প্রীতি কুমুদিনী পানে।

সহসা বিদেশে আসি হায়, আজি কি ও

কুটজেও বহু বলি মানে।

সাহিত্য ও বাস্তবে কবি কুরচিকে একদিন অনাদরে ফেলে রাখলেও আভিজাত্য লুপ্ত , গৌরব হারা কুরচিকে কবি বহুদিন পর প্রিয় সম্ভাষণে বলেছেন–

সূর্যের আলোর ভাষা আমি কবি কিছু কিছু চিনি

কুরচি , পড়েছে ধরা , তুমিই রবির আদরিনী।

রবীন্দ্রনাথ পৌরানিক কাহিনীর ঢঙে বলেছেন —

“ পারিজাতের সঙ্গে এই ফুল এককালে নন্দন কাননে স্থান পেয়েছিল।

পৃথিবী সেখান থেকে কুরচিকে চুরি করে এনে আপন কুটির কানাচে কটু নামে লুকিয়ে রেখেছিল।

তাই দেবী ভারতীর পদ্মবন স্বজাতি বলে তাকে গ্রহণ করেনি , কিছু মাত্র সুচিতা দান করেনি।

কিন্তু কুরচি কোন দিনই আত্ম প্রকাশে কুন্ঠা বোধ করেনি। বসন্ত বন্দনাতে সে একাকিনী দক্ষিণ বায়ুর ছন্দে

সুগন্ধকিঙ্কিনী বাজিয়েছে। ” কবি কুরচিকে তাই প্রশংসা করে বলেছেন–

অবজ্ঞিয়া অন্ধ অবজ্ঞারে

ঐশ্বর্যের ছদ্মবেশী ধূলির দু:সহ অহংকার

হানিয়া মধুর হাস্য ; শাখায শাখায় উচ্ছ¡সিত

ক্লান্তিহীন সৌন্দর্যের আত্মহারা অজস্র অমৃত

করেছ নি:শব্দে নিবেদন—

কুরচি নিয়ে পুরাণে একটি সুন্দর গল্প আছে —

“ হনুমানকে বাঁচানোর জন্য রাজা ইন্দ্র তাঁকে অমৃত সেবন করাচ্ছিলেন। তখন কেমন করে যেন এক ফোঁটা

অমৃত স্বর্গ থেকে মর্ত্যে পড়ে যায়। সেই ফোঁটা থেকে যে গাছটি জন্ম হয়েছে মর্ত্য বাসীরা তার

নাম রেখেছে কুরছি । ”

এটি বর্ষার ফুল হলেও রবীন্দ্রনাথ বসন্ত বন্দনা নৃত্যে কুরচিকে স্মরণ করেছেন। সাদা পাঁচ পাপড়ির ফুল , লম্বাটে গড়ণ অনেকে একে গিরি মলিকাও বলে । অসমীয়া নাম দুধঘোরী ।

‘দু:খ হরনীর ’ পথে পথে ফুলের মেলা । এত ফুল, এত গন্ধ, এত বাতাসের প্রবাহ — এত চাঁদ আর জীবনের মাখামাখি সেখানে কারো একক নারী সত্তাকে নিয়েতো যাতনা থাকতে পারে না। আমি ভাবি — ঐ যে ছাত্রীনবাসের প্রবেশ দ্বারে শ্বেত করবীরা দুলছে– এর কি কোন মানে নেই —

কোন গোপন কানাকানি পূর্ণ শশী ঐ যে দিল আনি

আবেশ লাগে বনে শ্বেত করবীর অকাল জাগরণে।

একদিন কবিকেও জানিগেছিল ঐ বুড়ি চাঁদ,বনলতা, ফুল ও ফুলের গন্ধ। তাই কবিকে জাগাতে যখন সম্ভব হয়েছে তখন বস্তুর বস্তুসত্ত্বা আছে। আর তাকে আবেসঘনো শ্বেত করবীর অকাল আবির্ভাবে বনতল পুলকিত । আর এই পুলকময়তা যার চোখে পড়েছে তিনি কবি, তিনি রবীন্দ্রনাথ। তিনি অন্ত:দ্রষ্টা । তাঁর সৃষ্টি কঠিন বাস্তবতাকে ভিন্ন একটি মাত্রা দান করে। সে কারণে সেই বাস্তবতা আমাদের কাছে ভালোলাগার বিষয় হয়ে ওঠে। তা অতি মাত্রায় সত্যতা দান করে ; যা আবিষ্কারের অতিরিক্ত তা মনোঘনো।

কী ভাবে মাধুরী ফুটেছে। এই চাঁদের আলো, আবেগমথিত বাতাস সব যেন মাধবী লতায় এসে ভর করেছে। কী অনাবিল উচ্ছ¡াস। আজ এখানের সব কিছুই অন্য রকমে প্রতিভাত হচ্ছে, সুন্দর ভাবে দেখতে পাচ্ছি সব কিছু —

এসো শরতের অমল মহিমা, এসো হে ধীরে।

চিত্ত বিকশিবে চরণ ঘিরে

বিরহ তরঙ্গে আকুলে সে দোলে

দিবাযামিনী আকুল সমীরে \

শরতের মত এমন এতটা অতলস্পর্শী মায়াবিনী আর কী আছে? কী শান্ত , সৌম্য , পরিশুদ্ধ এক অলৌকিক স্পর্শময়তার নিবিড়।

এ শরতে ফুটেছে মাধবী — অজস্র ধারায়। মনে হয় কর্ণ কুন্তল আর সর্বত্র ছাপিয়ে ফুল আর ফুল– মাধবী এর নাম । এ ফুল বহু রঙের

বহু তপস্যায় মগ্ন —

মাধবীর মধুময় মন্ত্র

রঙে রঙে রাঙালো দিগন্ত

অথবা

হে মাধবী , দ্বিধা কেন আসিবে কি ফিরিবে কি

আঙিনাতে বাহিরিতে মন কেন গেল ঠেকি \

বাতাসে লুকায়ে থেকে কে যে তোরে গেছে ডেকে

পাতায় পাতায় তোরে পত্র সে যে গেছে লেখি।

কখন দখিন হাতে কে দিল দুয়ার ঠেলি

চমকি উঠিল জাগি চামেলি নয়ন মেলি

বকুল পেয়েছে ছাড়া করবী দিয়েছে সাড়া

শিরীষ শিহরি উঠে দূর হতে কারে দেখি \

কবি মাধবীকে তাঁর অন্তরের বিষয় করে তুলেছেন। নিজের মনেই যেন মাধবীকে দ্বিতীয় পক্ষ সাজিয়ে তার সাথে কথা বলছে। পাতায় পত্র লিখে মাধবীকে যখন ডাক দেওয়া হয়েছে। তখন হয়ত দখিন দুয়ার খুলে গেছে। আর অমনি চামেলি , বকুল, করবী, আর শিরীষেরা ফুটবার শিহরণে জেগে উঠেছে। সাথে সাথে কবিও জেগেছেন–

বস্তুগত সীমাবদ্ধতাকে কবি অসীমের মুক্তিতে দেখেছেন । ‘রাঙালো দিগন্ত’ বলে মাধবীর রঙের বিপুলতাকে বোঝাবার পাশাপাশি তার অনন্তপ্রভাবের কথা বলেছেন। দিগন্ত যা দূর– অতি দূর। যার অস্তিত্ব বস্তুগ্রাহ্য নয়, কল্পনা গ্রাহ্য– তাকে মাধবী রাঙিয়েছে।

“ শান্তিনিকেতন ” রবীন্দ্রনাথের আরেক কবিতা। তাঁর স্বপ্নের সৌধ। এখানকার মানুষ ও ছাত্র সমাজের মন ফুল ভরা। মনের ফাঁক ফোকরগুলো ফুল, বৃক্ষ, লতায় , পাতায় ভরিয়ে দেবার আয়োজন করেছেন। তাই এরা সজ্জন । মনের বৃত্তিগুলো ফুটেছে বেশ। এখানেই বোধ হয় তপোবনের শিক্ষা ভিন্ন মাত্রা দান করে — কবি যা এখানে করতে চেয়েছিলেন ।

চৌদ্দ

‘দুঃখ হরণী’র পাশ দিয়ে খেলার মাঠ ঘেঁষে সারি সারি অশোক গিয়ে শেষ হয়েছে সঙ্গীত ভবনের মোড় পর্যন্ত। একটু দূরে কলাভবন। তারপরও সে পথ শাখায় প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পরেছে। অশোকের সাথে কিছু মাদার দাঁড়িয়ে।সম্রাট অশোক এক সময় লোভ ও হিংসা মুক্ত হয়ে রাজ্য শাসনে মন দিয়েছিলেন। গাছটির অনেক ভেষজ গুণ। তাই কি কবির এ নামটি প্রিয় ছিল?

এ অশোকের নিচে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে আমি ও অতনু। পাশে দেবযানী ও রুমকি। অতনু ওর বান্ধবী পাতাকে ডাকছে—পাতা। সেই সশব্দে , জোরে জোরে। যেমন করে বিদ্যাভবন ছাত্রাবাসে ঢুকে আমাকে ডাকে। এখানেই এসব সম্ভব। এখানেতো কেউ কিছু মনে করে না। এমনই একটি ভাব যেন একই আঙ্গীনায় দাঁড়িয়ে একজন আরেক জনকে ডাকছে। সারা দিচ্ছে। নেমেও আসছে।

আমি দেবযানীকে বলি , একটা গান গাবে? জানিনা গলায় কোন বিষন্নতা ছিল কিনা। দেবযানী চমকে আমার দিকে তাকায়। কী জানি কী বুঝেছিল , ভেবেছিল অশোক সংলগ্ন মাঠে ডেকে নিয়ে বসে। আকাশে অ¤ান অমিয় চাঁদ। দেবযানী খুব প্রগাঢ় গলায় গাইতে থাকে – –

চরণ রেখা তব যে পথে দিলে লেখি

চিহ্ন আজি তারি আপনি ঘুচিল কি \

অশোক রেণুগুলি রাঙালো যার ধুলি

তারে যে তৃণতলে আজিকে লীন দেখি \

ফুরায় ফুল ফোটা , পাখিও গান ভোলে,

দখিন বায়ু সেও উদাসী বায় চলে,

তবু কি ভরি তারে অমৃত ছিল না রে-

স্মরণ তারে কি গো মরণে যাবে ঠেকি \

‘মরণে যাবে ঠেকি’। বার বার করে দেবযানী গাইছিল। সত্যিইতো সৃষ্টি স্থিতি স্মরণ সব কিছুই মৃত্যুর চেয়ে বড়। মরণ সব হরণ করলেও স্মরণতো থেকে যায়। একদিন যে ধুলোর পুথিবীতে এসে চরণ রেখা লিখে রেখেছিল তার সে পথের ধুলোয় অশোকের রেণুগুলো ছিল। সে পথের ধুলো লীন হয়ে গেলেও স্মৃতির মনিকোঠায় অথবা সৃজনশীল কর্মের জন্য হলেও পথিক সে মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকবে। এখানে অশোক বৃক্ষের পরাগ রেণুগুলোকে কবি অনুসঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করে গীতি কবিতার মত এ গানটির আবেদনকে আরো বাড়িয়ে দিয়ে মনোমুগ্ধ করে রেখেছেন।

দেবযানীর গান শেষ হতে আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। অতনুর ছটফটানীটাও একটু থিতু হয়েছে। কিন্তু তা কতক্ষণ? পুনর্বার ছাত্রীভবনের দিকে তাকিয়ে পাতা, পাতা বলে হাক ডাক শুরু করে দিয়েছে। অতনুর ডাক যে দুরন্ত শুনতেই হবে। আসতেই হবে- এমন পাগলামো।কী জানি পাতাও ভেবেছিল কিনা , বুঝেছিল কিনা? আজ অতনু আসবে , তার রঞ্জন আসবে।তাই নেমে আসতে সময় নেয়নি। এসেই বলে , শম্পাদি নেই? শম্পাকে ও দিদি বলে। কারণ এক বছরের সিনিয়র সে।

না, নেই অতনু বলে। কী করছিলে , ভ্যারেন্ডা ভাজছিলে? ব্যক্তিত্বের বিশালতা দিয়ে একজন পুরুষ একজন নারীকে অধিকার করে নেবার আদিম কৌশল।

পাতা খুব নরম মেয়ে কিন্তু দুষ্টুমিতে সেরা। না , ভ্যারেন্ডা নয় তবে কাঁথা সেলাই করছিলাম তোমার জন্য , বলতেই অতনু উঠে পাতাকে ধাওয়া। পাতাও দিল দৌড়। এ রকম চলল কিছুক্ষণ।

এও এক রকম আনন্দ শান্তিনিকেতনের। পাতা বসে পরে হাপাতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে টোকর ভরে তুলে আনা মালতী ও কুন্দ কলিগুলো মাটিতে ফেলে গাইতে শুরু করল

তোমার আসন পাতব কোথায় হে অতিথি।

ছেয়ে গেছে শুকনো পাতায় কাননবীথি \

ছিল ফুটে মালতীফুল কুন্দকলি

উত্তরবায় লুঠ করে তায় গেল চলি –

হিমে বিবশ বনস্থলী বিরল গীতি

হে অতিথি \

রবীন্দ্রনাথ কি কোন ফুলকেই তাঁর কাব্যলক্ষীর অগোচরে রাখেন নি? তাঁর অনুভূতির জয়মাল্যে সবাইকে ধন্য করেছেন? বেড়া ঘেঁষা রজনীগন্ধা। পাতা পুনরায় উচ্ছ¡সিত হয়ে গাইতে শুরু করে

চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে

উছলে পরে আলো

ও রজনীগন্ধা , তোমার গন্ধসুধা ঢালো।

পাগল হাওয়া বুঝতে নারে ডাক পড়েছে কোথায় তারে

ফুলের বসে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো।

চাঁদের হাসির সাথে রজনীগন্ধাও তার বুক উজাড় করে দিয়েছে গন্ধ ঢেলে। চাঁদও হাসছে , রজনীগন্ধাও। উভয়ের গন্ধে হাওয়া পাগল হয়ে বুঝতে পারছেনা কে , কোথায় তাকে ডাকে —– এমতাবস্থায় যেখানে যেদিকে যায় , যে ফুলের কাছে ঘেঁষে তাকেই তার ভালোলাগে। এ ফুলের বনে শম্পাকেও মানাতো ভালো। কিন্তু কোথায় সে? রজনীগন্ধার মত সেও হয়ত চাঁদ ফোটার পুলকে রোমাঞ্চিত হত।

আর এখানে নয়। অতনু আমার হাত ধরে টেনে তুলে বলছে , না এদের এখানে আর নয়। চল চল অন্য কোথাও যাই। ওরা পরে থাকল পেছনে। আশা ভঙ্গের কোন বেদনা হয়ত ওদের মনে। কিন্তু অতনু যে কোথাও বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না। সে কথা জেনে ও বুঝে সবাই ওর পাগলামো মেনে নেয়। হয়ত মানতে পারেনি পাতা। পাতা হয়ত ভেবেছিল ওকে নিয়ে মাঠ ঘুরবে রাতের জ্যোৎস্নাবিদ্ধ আকাশ দেখবে। তা আর হল কই? অতনু আমি বাতাস ঠেলে সন্মুখে সংগীতভবনমুখী।

অনেকগুলো কদম এখানে ছড়িয়ে চিটিয়ে। তার একটার নিচে বিশাল আকারের ধ্যানস্থ গৌতম বুদ্ধের কংক্রিটের মহতি অবস্থান। হিন্দু ধর্মের বর্ণ বিদ্বেষের শিকার সাঁওতাল ও অপরাপর অন্ত্যজ শ্রেণী। এরাই ভারতবর্ষের আর্য-পূর্ব অধীবাসীদের পরাজিত জনগোষ্ঠীর কোন অংশ হবে হয়ত। অবহেলা ও বিদ্বেষের কারণে এরা সভ্য শ্রেণীর কাতার হতে দূরে। কিন্তু মাঝে মাঝে এদের মধ্যেও এমন সব ক্ষণজন্মা মানুষের জন্ম হয় যা দেখে রবীন্দ্রনাথও অবাক হয়েছিলেন। শিল্পী রামকিংকর বেইজ তেমনি একজন যিনি রবীন্দ্রনাথ ও নন্দলালের আশ্রয়ে শান্তিনিকেতনে কলাভবনে সৃষ্টি করেন শিল্পের নতুন ধারা।

মহামতী গৌতম বুদ্ধের এই ভাষ্কর্যটি তাঁরই করা। একটু দূরেই মহাত্মা গান্ধীর আরেকটি বিশাল ভাষ্কর্য। সেই লাঠি হাতে হেঁটে চলার দৃঢ় ভঙ্গীমার এক অমর রূপ।

গৌতম বুদ্ধকে ঘিরে আমার আবাল্য সশ্রদ্ধ বিস্ময়। ছোটবেলায় বাবার কাছে শোনা তাঁর জীবন কাহিনী আমাকে অভিভূত করত। জীব সেবা ও জরা ব্যাধির হাত থেকে মুক্তির উপায় অন্বেষনে তাঁর সন্ন্যাস জীবন সম্পর্কে আমাকে ভাবাতো। রাজ্যসুখ , স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে যাওয়ার কাহিনী খুব অবাক করত আমাকে। আমি তাঁর সন্মুখে— দূরে মস্তকে ধারনকৃত পায়েসান্নের পাত্র নিয়ে এক নারী — সুজাতা। শীর্ণকায় , ধ্যানরত , অভুক্ত , কান্তিমান এই অরণ্যবাসী এই মানুসটিকে খাবার এনে যে নারী তাঁকে খাওয়াত , খাদ্যের স্বাদ দিয়েছিল তিনি সুজাতা। দূরে অতীতের এক রোমান্টিক বিষ্ময় বলে মনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাঁদের সবাইকে কদম অরণ্যে প্রতিস্থাপন করে রামকিংকর একটি নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন কদম , রবীন্দ্র কাব্যের ও সঙ্গীতের এক বড় উপাদান। কদমকে নিয়ে তাঁর আবেগের স্ফুরণ ঘটেছে কতভাবে —–

বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান

আমি দিতে এসেছি প্রাণের গান।

মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে

এই যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান।

আজ এনে দিলে , হয়তো হবেনা কাল –

রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।

এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে তব বিস্মৃতি স্রোতের পাবনে

ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরণী বহি তব সম্মান।

কদম বৃক্ষের তলে কত দিন এসে বসেছি — অন্ধকারে ছুঁইয়ে বসেছি এই ধ্যানমৌন মহা তপস্বির শরীর। কেমন কেঁপে কেঁপে উঠতাম। বিস্ময় থেকেই যদি জ্ঞান ও শ্রদ্ধার জন্ম তবে আমারও হয়েছিল তাই। জানিনা এ কদম তলায় এই এঁকে দেখে মন কেবলি দূরে , বহুদূরে অতীতে ফিরে যেতে ইচ্ছে হত কিন্তু তা কী করে সম্ভব?

মৃত্যু কী? জরা-ব্যাধি কেন? এ থেকে নিষ্ক্রমনের কী উপায়?জন্ম জন্মান্তরের পথ চলে কোন এক পুণ্য মুহূর্তে জীবের এক ক্রান্তিলগ্নে তার মুক্তি ঘটেবে । অদৃশ্য এ পথের ধারা কোন উধাও দিগন্ত পানে ছুটে চলবে জীব হয়ত তা জানেনা। বুদ্ধদেব তা জেনেছিলেন।

কিন্তু আমি জানতে চাই সেই ব্যক্তি মানুষটিকে । গৌতম বুদ্ধকে। যার মনে এ প্রশ্ন এসেছিল , যিনি এর উত্তর পেয়েছিলেন।যিনি এ সবের প্রশ্নের অভিঘাতে ছেড়েছিলেন সিংহাসন , ভোগ-বিলাস , নারী — যশোদা কিংবা আরো শত নারীকে যা চাইলেই তিনি , রাজপুত্র পেতেন সব। ছেড়েছিলেন একমাত্র পুত্র , ঘুমন্ত রাহুল ও যশোদাকে। তিনি ঘর ছাড়লেন কিসের টানে কী অদ্ভুত আঁধার তাঁকে ডেকেছিল? কোথায় কে জানে ! অন্বেষণে। হ্যাঁ ,অন্বেষণে। প্রশ্নের তাড়না। তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে এ ঘাট থেকে অন্য ঘাটে। তারপর বোধিত্ব প্রাপ্ত হলেন। এক অশ্বত্থ বৃক্ষের তলে ধ্যান ভেঙ্গে তাকালেন —- দেখলেন সন্মুখে দাঁড়ানো পায়েসান্ন মস্তকে এক নারী — কে তিনি? সুজাতা? কিন্তু এই নারী কি শুধুই সুজাতা? এ রহস্যের উন্মোচন কে ঘটাবে?

দুজন রামকিংকরের প্রস্তরের মধ্যে ধরা পড়েছেন। স্থির , শান্ত। এক জনের মধ্যে মানবীয় আবেদন — প্রেম। কোনো সুদৃশ্য পুরুষের প্রতি নিবেদিত লতাগুল্ম। পুরুষটিকে খাইয়ে পরিয়ে তাঁর নারী সুলভ আনন্দ।

ভাবছি , সব ছেড়ে এসে এ কি কোন নারীর প্রতি মোহ তাঁর? না , জানেন না কে নারী কে পুরুষ? না কি দেহের অবশিষ্ট দহন? কী ছিল এর পরিণতি? যদি জানতাম কোন এক চিরন্তন বেদনা মিশ্রিত আবেগ তাঁকে সুজাতার প্রতি আগ্রহী করেছিল? তবে তা জেনে কি রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হেসে বরণ করে নিতেন না? কবির কাছে শ্রেষ্ঠ মানব বলে পরিচিত বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধার এতটুকু কমতি হত কি? না।

ভাবছি আমি। সব জেনে , বুঝেই কবি গৌতম বুদ্ধকে শ্রেষ্ঠ মানব বলে শ্রদ্ধানত ছিলেন। কারণ , তিনিতো কবি। বুদ্ধ ও সুজাতার দিকে

তাকিয়ে গাইতেন —-

মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে সেদিন ভরা সাঁঝ

যেতে যেতে দুয়ার হতে কী ভেবে ফিরালে মুখখানি –

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj