কবিতার দুর্বোধ্যতা ও পাঠকের দৈন্য : হা সা ন হা বি ব

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৪

সমকালীন কবিতা দুর্বোধ্য, অস্পষ্ট, অর্থহীন, খাপছাড়া- এসব অভিযোগ ছাড়াও অনেকে বলে থাকেন, এখনকার কবিতার পাঠক অপেক্ষা কবিই বেশি অথবা কবিতার সাধারণ পাঠক অপেক্ষা কবিরাই যথেষ্ট ইত্যকার ব্যঙ্গ উক্তি ছাড়াও শোনা যায়, স্বয়ং কোনো কোনো কবির পতœীও নাকি ভ্রæ কুঁচকে বলে বসেন, এখন তোমাদের ‘কবিরা’ই মাত্র পাঠক, তারাই কবিতা বোঝেন-সাধারণ পাঠক এখন আর কবিতা পড়ে না। এসব অভিযোগের বিপরীতে কবিরাও কম যান না- যুক্তি খণ্ডনে কবিদেরও শক্ত অবস্থান লক্ষ করা যায়, কোনোকালেই কবিতার পাঠক বেশি ছিল না-স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও কবিতার জন্য এ ধরনের ‘কিছুই বুঝিলাম না’ অভিযোগ শুনতে হয়েছে। তাছাড়া কবিতা বুঝে উঠতে না-পারার ব্যর্থতা স্বয়ং পাঠকের-এতে কবির কিছুই করার নেই। আসল বিষয় হলো, কবিতার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ সকল যুগেই ছিল এবং থাকবে। তবে এসব অভিযোগ-বিতর্ক বাজারে প্রচলিত থাকলেও সন্দেহ নেই কবিতা এখন অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ। তাছাড়া কবিতার পাঠক সংখ্যা কমেনি বরং বেড়েছে। তার প্রমাণ বইমেলায় কবিতার বইয়ের সংখ্যা এবং বই বিক্রির সংখ্যা বিচার করলেই যথেষ্ট। তবে এ কথা সত্য যে কবিতার পাঠক সকল যুগেই কম ছিল- কম থাকবে সেটিই স্বাভাবিক। তাছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পবির্তনের সাথে সাথে কবির চিন্তা-চেতনারও অনেক পরিবর্তন ও উন্নত হয়েছে। এখন হয়তো কবি সকালে উঠিয়া মনে মনে ‘ভালো’ হয়ে চলিবার ‘পণ’ করা অথবা কল্পনার জগতে ‘বীরপুরুষ’ সেজে ‘টগ্বগিয়ে’ ঘোড়ার খুরে চলিবার পরিবর্তে মেঘাচ্ছন্ন দিনকে (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে) পরিবর্তন করে নির্বিঘ্ন করে ‘গ্যাগ্যা বাইট’ রেসলিংয়ে বেরিয়ে পড়েন।

সমকালীন কবিতার ভাব এবং কাব্যিকতা অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ তাতে সন্দেহ নেই। অনেককে হয়তো কবিতার ক্ষেত্রে দুুর্বোধ্য, জটিল ইত্যাদির কারণে পাঠক কমে যাওয়ার অভিযোগ করতে শোনা য়ায়। কিন্তু আসল সত্যটি যে, কবির আধুনিক চিন্তা-চেতনা অনেক উন্নত ও ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ হওয়ায় কবিতাও অনেক কাব্যিক হয়ে পড়েছে। এতে করে কবি যে শুধু পাঠককে অতিক্রম করেছে তা নয় বরং সাধারণ পাঠক ‘ভাব-শিষ্য’ পর্যায়ে তো মনোনিবেশ করছেই না; তারা যে পাশ্চাত্যের প্রতিযোগিতামূলক সমাজ ব্যবস্থার ‘আঁচে’ আধুনিক জীবন-যাপনের দৌড়ে কবিতা পাঠের মতো মানসিক প্রস্তুতি ও মনোনিবেশমূলক সময় ‘সংকটে’ ভুগছে, সে সত্যটি এড়িয়ে যান। স্বার্থের দ্ব›েদ্ব সাধারণ মানুষের মনোযোগ এখন সৃজনশীলতার পরিবর্তে অর্থ ও প্রতিপত্তি। যার অবক্ষয়ের দায় এখন প্রতি পদে পদে। ফলশ্রæতিতে মানুষ এখন যান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। শিল্প-সংস্কৃতির সাথে মানুষের দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে। কবিতা পাঠ তাদের কাছে ‘অর্থহীন’ ও ‘উদ্ভট’ মনে হবে সেটিই স্বাভাবিক।

আমরা জানি, এ দেশের কবিদের আগেও ‘বটতলার’ কবি বলা হতো। হয়তো অনেকে বলে থাকবেন, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বজয়ী গীতাঞ্জলীতে নোবেল পুরস্কার না পেলে তিনিও হয়তো ‘বটতলার’ কবি(!) থেকে যেতেন। আবার নজরুলের বেলায় বলবেন, তিনি বিদ্রোহী কবিতা না লিখলে ব্রিটিশ রাজাধিরাজ টলেও এ ‘ক্ষ্যাপাটে’ কবির মণ্ডুপাতও কেউ করতেন না-তিনিও ‘বটতলার’ কবি(!) থেকে যেতেন। এসব বক্তব্যের আড়ালে একটি সত্য থেকে যায়-তাহলো রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগেই তাঁর লেখালেখিতে পরিচিতি ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছিলেন। আর নজরুল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বিদ্রোহী কবিতার আগেই বিশ্বমানবতা ও সাম্যবাদের কবি হিসেবে নিজেকে শাণিত করেছিলেন ও পরিচিতি পেয়েছিলেন। আমরা জানি, এ দেশের কবিরা (ও সাহিত্যিক) সকল যুগেই রাষ্ট্র ও সমাজের সংকটে নিজে অভুক্ত থেকেও এগিয়ে এসেছেন কিন্তু রাষ্ট্রের ছায়া ও ছলচাতুরিতে তাঁরা কখনো বেড়েও ওঠেননি। অথচ আমরা দেখি, পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা কলোনিয়াল কৌশলে তাদের ‘অখাদ্য’ও ‘নোবেল’, ‘ম্যান বুকার’ ইত্যাদির তকমা লাগিয়ে বাজারের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। রাতারাতি এসব কবি-সাহিত্যিক আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়ে যান। এসব কবি-সাহিত্যির কটি-কটি কপি বিক্রির মধ্যে আমাদের উৎসুক ও গর্বিত হাতগুলো বাড়িয়েদি’। এসব ‘উৎকৃষ্ট’ খাদ্যের বিপরীতে আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা তাদের সৃজনশীলতা বিকাশের ‘সুযোগ’ গাঁটের পয়সা খরচ করে বই প্রকাশ করতে গিয়ে নাকাল। যাক আমার আলোচনার বিষয় পাশ্চাত্যের কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে ছিল না- ছিল আমাদের বর্তমান কবিদের কবিতার দুর্বোধ্যতা ও পাঠকের অনীহা। আমি এ বিষয়ে পূর্বেও বলেছি, কবিতার পাঠক পূর্বেও কম ছিল এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও এ বিষয়ে ‘কিছুই বুঝিলাম না’ গাল শুনতে হয়েছে। অতএব কবিতা যে পাঠক বুঝিবে না এবং কম পড়বে সেটি আর নতুন কিছু নয়।

কবিতার ক্ষেত্রে এখানে বলে রাখা ভালো যে, কবিতার প্রতিপাদ্যের শর্ত সব সময় কবির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সংযোগ রক্ষার এবং সেটিই কবিকে স্বাতন্ত্র্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে। কিন্তু সেটি কোনোভাবেই চিত্রকল্পের বাইরে নয়। এক্ষেত্রে কবির ব্যক্তিজীবনের সৌকর্যকে তিনি যদি সর্বজনীনে নিয়ে যেতে পারেন তাহলে সেটি পাঠককে নাড়া দিতে পারবেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কবি যদি ব্যক্তিজীবন ‘যাপনের’ উৎপ্রেক্ষাকে শুধুমাত্র ব্যক্তি কেন্দ্রীকতায় ভাস্বিক করে তোলেন সেটি কোনো পাঠকের কাছে আবেদন সৃষ্টি তো করবেই না বরং এ ধরনের কবিতা পাঠককে বিরক্ত ও বিব্রত করতে পারে। কবিতাকে সব সময় উৎকৃষ্ট কাব্যিক সৌকর্যে নির্মাণ করতে হবে। আবার কবিকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে নন্দন বাক্যের ছলে কবিতা যেন অশালীন হয়ে না পড়ে। কারণ হৃদয় ক্ষরিত কবি জানেন সৌন্দর্য ভোগ করা তার যতোটা কাম্য তার চেয়ে সেটি রক্ষা করাও জরুরি। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অনন্ত প্রেম’ কবিতার কথা মনে পড়ে-

তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শত বার

জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।

চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয়

গাঁথিয়াছে গীতহার-

কত রূপ ধরে পরেছ গলায়,

নিয়েছ সে উপহার

জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার।

রবীন্দ্রনাথ প্রেমিকার সৌন্দর্যকে মুগ্ধ হৃদয়ে ‘গীতহার’ করেছেন কিন্তু সেটি তার সৌকর্যের চোখ ‘হৃদয়’ দিয়ে ধারণ করেছেন যুগে যুগে। সেটি প্রকাশের ভঙ্গি প্রেমিকার চেয়েও অনেক সৌন্দর্যময়। আমরা এখানে কবি জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতা দুটির কথা উল্লেখ করতে পারি। বাংলায় এ দুটি কবিতা যে কতো পাঠকের মুখে পঠিত হয়েছে তার হিসাব রাখা কঠিন। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্যে’ যে নাটরের বনলতা সেনকে পেয়েছিলেন, পাঠক ও গবেষকরা যুগ যুগ ধরেও সেই বনলতা সেনের দেখা পাননি। বনলতা সেন রহস্যাবৃত্তই থেকে গেছে। আবার কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি হৃদয় ক্ষরিত কতো তরুণ-তরুণীর হৃদয় কেড়ে নিয়েছে তার হিসাব নেই। এ ক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখা দরকার- তাহলো যুগে যুগে কবিতা তার বাঁক নিয়েছে এক-একটি বিষয়কে অনুকল্পের মেলবন্ধনে। তবে সেটি প্রয়োজনের তাগিদে হয়েছে। ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে এ দেশের কবিরা তাঁদের লেখনীকে বিদ্রোহের আগুনে শাণিত করেছেন আবার ১৯৪৩-এর মন্বন্তরে এ দেশের কবিদের হাতে আর্তমানবতা ও মানবিক চেতনা সমৃদ্ধ ‘ফ্যান দাও’(!) জাতীয় কবিতা উঠে এসেছে। এরপর ভাষা আন্দোলন তৎপর আশির দশকে কবিরা প্রেমকে প্রতিপাদ্য করেছে আবার এ সময় সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁরা লিখেছে। এ দশকে কবিরা উপজীব্য হিসেবে প্রেমকে যেমন কবিতার রঙতুলিতে আবশ্যিক করে তুলেছে আবার সেই প্রেমকে সংহার করেছে দ্রোহের আগুনে। এ প্রসঙ্গে কবি মোশাররফ হোসেন খানের একটি কবিতার কথা মনে পড়ছে-

আমার কবিতা পড়ে যদি কোন রমণী

প্রসব করে বসে হিং¯্র শাবক

যদি কোন শিকারী কৃষকের গান ভুলে

যুদ্ধের গান গাইতে গাইতে তাক করে বসে

পাপিষ্ঠ বুক

তবে আমার কি দোষ?

সর্বশেষ কবিতাকে দুর্বোধ্য বলা হলো। কেউ কেউ কবিতার দুর্বোধ্যতাকে কবিতার দুর্বলতা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু কেউ স্বীকার করবেন না- পাঠকের দৈন্য এবং পাঠ-দৈন্যই কবিতার দুর্বোধ্যতাকে উৎসাহিত করে। তবে কবিতার ক্ষেত্রে এ কথাই বলতে হবে-

‘বয়স আমার হাজার হাজার বছর

যদিও নব-জাত আমি পৃথিবীতে’।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj