অরুণ সেনের কাব্যগ্রন্থ অথচ নীরবতা : একটি নিবিড় পাঠ : ড. অমিতাভ চক্রবর্তী

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৪

অনেকে সা¤প্রতিককালে দুঃখ করে বলেন, এখন দুই বাংলায় কবির চেয়ে অকবির সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে। এই বিতর্কে প্রবেশ না করে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে, শ্রোতা হিসেবে বিভিন্ন উৎসবে যোগদানের পর দেখেছি বাঙালিদের মতন এতো বিচিত্র এমন সুন্দর কবিতা অন্য ভাষায় লেখা হয় না। বিষয়ের গভীরতা, জীবনবোধ, সুখ-দুঃখের অনুভূতি যুগ যুগ ধরে বাংলাভাষার কবিরা হৃদয় উজাড় করে সাজিয়ে চলেছেন। অতিস¤প্রতি সুদূর চট্টগ্রামের কবি এবং দুই বাংলার অন্যতম সেরা কবি অরুণ সেনের একাদশতম কাব্যগ্রন্থ ‘অথচ নীরবতা’ হাতে পেলাম। বহু বছর ধরে কবির লেখনীর সঙ্গে দুই বাংলার পাঠকসমাজ পরিচিত। ধীর-স্থির সরোবরের মতন স্নিগ্ধ-স্বচ্ছ গভীর কবির হৃদয় থেকে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য মর্মস্পর্শী কবিতা। কখনো স্বপ্নের ডানায় আবার কখনো জীর্ণ-দীর্ণ পৃথিবীর রুক্ষ মাটিতে অরুণের নির্ভীক বিচরণ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে বহু রাজনৈতিক এবং সামাজিক ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর বিশ্ব জনতা এগিয়ে চলছে। কখনো সে বিধ্বস্ত আবার কখনো অতন্দ্র বিপ্লবী নির্ভীক সৈনিক। নেরুদা, ব্রেখট, মায়াকোভস্ক, গিটেন্যাবার্গ যে বিচিত্র ধ্যানধারণার বশবর্তী অনেকটা সেই রিয়ালিজম এবং রোমান্টিকতার অপূর্ব মিশ্রণ অরুণের হৃদয়-সিক্ত কবিতায়। এই নবতম কাব্যগ্রন্থে ৪৮টি নতুন ভাবনার কবিতা আছে। বহু বর্ণ গন্ধ শোভিত ফুলের স্তবকের মতন সকল নীরবতা ভঙ্গ করে সুদূর চট্টগ্রামবাসী কবির ভয়হীন হৃদয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। নিজস্ব ব্যঞ্জনায় এবং একা উচ্চারণ করে চলেছেন দীর্ঘ তিন দশক যাবৎ। চট্টলা বন্দরের, বাটিালি হিল এবং কর্ণফুলীর ধ্বনি স্পর্শ করে। এখন দুই বাংলার পাঠক মহলে বারংবার উচ্চারিত কবি অরুণ সেনের নাম। সে এক ঘরানার স্রষ্টা। অন্য যে কোন আধুনিক কবি অপেক্ষা রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দের পথগামী । চিনা শিল্পীর মতন, আলোকচিত্রীর মতন বহু কবিতায় মানুষের পাশাপাশি চারিপাশের প্রকৃতি জগৎ ঠাঁই নিয়েছে। নীল নগ্নতার রক্তাক্ত রাজপথ অতিক্রমকারী আমাদের কবি।

কবি অরুণ শুরু করেছিলেন, ‘শঙ্কায় শঙ্খ বাজিয়ে’। প্রাচীন কাহিনীর সেই পৌরাণিক যুদ্ধের মতন। দেশ থেকে দেশান্তরে পা রেখেছেন। নিজে শুনেছেন ‘শেষ বিকেলে কড়ানাড়া’ আবার অভিমানী কবি প্রিয় মুখ খুঁজতে ‘রুদ্রের মতন’ অন্ধকার রাত্রি নয়, রোদের বাড়ি খুঁজতে একা ভবঘুরে বাউলের মতন একতারা হাতেই বেরিয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের গ্রামের পথে, চেনা শহরের পাষান বাঁধাই পথে, বুকে আজো মেখে আছে ‘মুকুন্দরামের হাটের ছবি’।

প্রকৃত অর্থে কবির কবিতাই কবির জীবনদর্শন। কবিতায় ইহকালের চিরকালের সুখ দেখতে আগ্রহী কবি আয়নার মতন কবিতা কখনো মিথ্যা বলে না। সুন্দরের মুগ্ধ উৎসবের কবি। সেই বিখ্যাত প্রবাদবাক্য মনে পড়ে, ‘কবি ছাড়া জয় বৃথা’ এবং ‘কেউ-কেউ কবি। সবাই কবি নয়’। আমার মতন সাধারণ কবি মুক্ত কন্ঠে স্বীকার করবে অরুণ সেন একজন নবপ্রজন্মের সেরা কবি। হ্যাংরি জেনারেশন এবং এ্যাংরি জেনারেশনের পক্ষমুক্ত খাঁটি ষোলআনা কবি। বৈষ্ণব কবি চণ্ডিদাসের বিরহ ব্যাকুল আর্তি, প্রিয়তমার সান্নিধ্যের জন্য বহু কবিতায় উদ্ভাসিত। আবার বিগত শতাব্দীর গীতি কবিতার জনক বিহারীলাল, অক্ষয় বড়াল, দেবেন সেনের মতন প্রেম, প্রকৃতি এবং আধুনিক জটিল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। কখনো এই কবি হতাশ হয়ে জীবন যুদ্ধ থেকে দূরে সরে থাকেননি, তিনি নিন্দা প্রশংসা এবং জয়-পরাজয়কে সমানভাবে গ্রহণ করেছেন। আলো আঁধারের পারস্পরিক চিরন্তন সত্য ও সম্পর্ক স্বীকার করে আগামীকালের রথে বিজয়ী সেনাপতির মতন গতিশীল যুবক।

কবি নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতার কাঠামো, সুর, ছন্দ, অলংকার এবং বাক্য বিন্যাস প্রয়োগ করেছেন, কখনো বা কবি আল মাহমুদ আবার কখনো কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতন আপন সৃষ্টিকে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ভেঙেছেন ও গড়েছেন। মননে ও বরণে কবির অন্তঃস্থল থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য ঝরনা স্রোতের মতন উচ্ছল সাবলীল কবিতা। ঢাকা এবং কলকাতার পাঠক সমাজ বিশেষত নবীন কবিদের কাছে এক আদর্শ কবি। প্রখ্যাত কবি তুষার রায় এবং বিনয় মজুমদারের মতন একা একা পথ চলায় বিশ্বাসী, অথচ নিজের অজান্তে আমার প্রিয় কবি সাধারণ এক সৈনিক নয়, সে একজন বলিষ্ঠ কবি সেনাপতি। মৌন-ঋষির মতন ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। ব্যক্তিগতভাবে এক দশক যাবৎ কবিকে আমি চিনি। অত্যন্ত সহজ-সরল সুন্দর জীবনযাত্রা। কখনো পৌঁছে যান অজানা জগতের অতল গহরে আবার কখনো দূর গ্রহলোকে স্বর্গের সিঁড়িতে প্রিয়তমাকে খুঁজে বেড়ান স্বভাব কবি। কোথাও অনুকরণ ও অনুসরণ নেই। আছে অপকট ভাবনার খোলা জানালা, খোলা দরজা, কবিতাই তার সংসার। কবিতাই তার শেষ শয্যা। কবিতাই তিন দশক যাবৎ অরুণের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।

এই কারণে, প্রতিদিন তার ‘নরকাগ্নি নির্বিঘ্নে পোড়াচ্ছে প্রাণের ফুয়েল/প্রতিটি মুহ‚র্তে বিশ্বাসের মাথায় পেরেক/ঠোকানোর শব্দে ভাঙে ঘুম’। কবির প্রতিটি কাব্যগ্রন্থ এবং সব কবিতাই অন্যটির চেয়ে পৃথক। এই কারণে তার কবিতা কখনো একঘেয়ে লাগে না। ‘অথচ নীরবতা’ নামক দীর্ঘ কবিতাটি অরুণের এক আশ্চর্য সৃষ্টি। দীর্ঘ কবিতা দিয়ে বই শেষ এবং কাব্য গ্রন্থের সার্থক নামকরণ। লোভনীয় পঙ্ক্তিমালা যেমন- ও আমার ভবিষ্যত বলে না দেয়া স্বপ্নরা শোনো/এতসব বদলের পরও কিন্তু সেই তালগাছ/উঁকি মেরে বলে দিচ্ছে আমার চেনার কথা/সামনে দাঁড়িয়েছে ছায়াধারী হারানো দুয়ার” ‘অথবা মৃতদেহের উপর থেকে উঠে আসা/এই ভদ্রমহিলাকে আমি চিনি/ এই তিনি অনেক অনেক নিষ্ফল ভালবাসার/অপার আক্ষেপ কিন্তু নিবারণ করে ফুটিয়েছেন গোলাপ।’ মোহময় এবং মায়াময় জগৎ দিয়ে এই সংকলন শুরু-“এটাই আসল গাছ/এটাতেই ফোটে নানা রকমের খুশি/বহু বিষাদ কত্থন/শাখায় শাখায় এই/প্রজাপতিরূপী অস্থির ইচ্ছেরা/সমাদরে নাড়ে কত বর্ণের পাখা”। (পৃষ্ঠা-৭) অনেক অপ্রিয় সত্য কথাও বলেছেন কবি, ‘ওমা এতো দেখি ছায়াচ্ছন্ন বখাটের সর্বনাশ ঘটানো সংকল্প ’অথবা ‘জীবিকার জিব বেশি লম্বা হলে ঘটাবে নির্ঘাত অঘটন’। কবি দেহবাদী বাঙালি কবি ভাওয়ালের গোবন্দচন্দ্রের মতন নির্ভীকভাবে, নিষ্ঠুরভাবে বলে ওঠার সাহস নিয়ে লিখেছেন অসাধারণ কবিতার লাইন। “লোকটা বমি করছে রাস্তার উপর/আর বমির সাথে বেরুচ্ছে ভালোবাসা।” ঠিকানা কবিতায় ‘ঝড় বাদলের পাগলামিতে আমি কত আর ঠিকানা হারাবো’ সত্যি কবি বাস্তব জীবনে দেখেছেন বহু সাইক্লোন, সুনামী, আরাকানের ঝড়। এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তার-মাতাল ঢেউ এর নির্মম-নির্ভুল আক্রমণ।

এই যান্ত্রিক আত্মকেন্দ্রিক বহুরূপী সমাজ এবং সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করে কবি লিখেছেন। “মুখ ভেবে বারবার মুখোশেই চুম্বনের পর/শুরু হয় সন্দেহের ঝড়/একই সময়ে আত্মবঞ্চনার সুরে উচ্চারণ-“এবার বিদায় দাও… তুমি কি জান না প্রতিটি মুহ‚র্তে বিশ্বাসের মাথায় পেরেক ঠোকানোর শব্দে ভাঙে ঘুম” (পৃষ্ঠা-১৫)। উৎসবের মধ্যে বিষাদের সুর, সহস্র জনতার মাঝে থেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ কবি। তবু দিগন্ত পাড়ি দেওয়া ভিন দেশি পাখির মতন,অবিরাম পথ চলা। আকাশ পরিক্রমা, অতিকত্থন এবং আত্মকত্থনের মতন বলে ওঠা প্রশ্ন, পেট্রল আর বারুদের খেলা এত ক্ষুধার্ত কেন? ওই দ্যাখ ওই হাঁ করে গিলছে কত অসহায়/শুধু কি জীবন, জীবনের বীজতলা। উপমা এবং অলঙ্কার ব্যবহারে কবি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছেন। ‘আমাকে আমার মুদ্রা দোষ একা তো খায়নি। অন্যকেও খেতে সত্যি দিয়েছে সুযোগ, কবির কাছে ব্যক্তিগত দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সিদ্ধান্ত উন্মাদ পাগলের চেয়ে বৃদ্ধিমান অন্ধকার, অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও বরণীয় ‘গোপন স্বাক্ষর’ কবিতা। আগুনের আঁচ এবং নবীন ঘৃণা কবিতায় মানব চরিত্রের নিষ্ঠুর দিক চিহ্ন বা অভিজ্ঞান। ‘জীবন হে তোমারই তো জন্য মৃত্যু। পেতেছে স্নেহের কোল’ (পৃষ্ঠা-১৯) পৃথিবীর কান্নার সমুদ্রে মিলিয়ে যায় কবির আকুল কান্না। কিন্তু দূরে “ভয়ে আর আনন্দের চেতনা শুধু কাঁপতে থাকে অবিরত।” প্রতিটি মানুষের জীবন নিয়ে পাঁচ খণ্ডের উপন্যাস লেখা যায়। এই চরম সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের পথ চলা। এই চলা মানেই জীবন এবং থামা মানে মৃত্যু। কবি অরুণের মতন বিপত্তির পর বিপত্তি পেরিয়ে- আমাদের বলতে ইচ্ছে করে সহমত প্রকাশ করে- ‘জানার রাস্তায় আমি সময়ের দৃষ্টি ছোঁয়া দূরত্বে দৌড়াচ্ছি, আর ক্রমাগত ঢুকে যাচ্ছি এক অজানার অতল গহŸরে।’ কালের পুতুল’ এবং ‘ঘুঘুর দুপুর’ দুটি চিত্রধর্মী কবিতা। কখনো আত্মাহুতি দিতে উদ্যত কবি ওই নষ্ট হুতাশনে। আবার কখনো কানে আসে হতাশার বিরুদ্ধে সাগর থেকে দূরের গর্জন। আশার ভেলাটি তাতে নিরাশার সাথে খেলে লুকোচুরি খেলা। মানুষের জীবন একটা, সেখানে শুধু নিজের ছায়ার সঙ্গে নিজের কায়ার সঙ্গে দিবরাত্রি ঘুমে ও জাগরণে লুকোচুরি খেলা খেলতে হয়। দার্শনিক কবির মনে সর্বদা ছুঁই ছুঁই অজানা ভয় ভিড় করে থাকে। তাচ্ছিল্যের নির্যাতন এবং মায়ার দড়ি কবির উজ্জ্বল অনুভূতি। প্রকৃতির সন্তান ওয়ার্ডওয়ার্থের লুসি অথবা ওয়াল্টার হুইটম্যান অথবা না জিম হিকমতের মতন কবি অরুণ কখনো বড় একা এবং কখনো আবার মানুষের ভিড়ে জনতার মিছিলে, নির্ভীক পদাতিক। এই প্রসঙ্গে ‘একটি একুশ ও একটি গাছ’। ‘অবুঝ অবাক’ ‘প্রজন্ম চত্বর’ ‘সন্ধিপত্র’ ‘যাত্রা’ ‘শাহাবাগ’ উল্লেখ্যযোগ্য কবিতা যা অনেকক্ষণ মনে রাখা যায়।

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। এই কারণে চারিপাশের ঘটনা প্রবাহ থেকে কিছুতেই সে দুরে থাকতে, মুক্ত থাকতে পারে না, কেননা কবির ভাষায় ‘আজ আমাদের সম্মিলনের সূর্য, উঠেছে লাল/সাফ্ হবে সব হিংসার আর ধূর্তের জঞ্জাল’। জনতার মুখে পড়–ক তাজা ফুল চন্দন। হৈমন্তীকা, শীতে আক্রান্ত সময়, শাম্বত শাসন, আমি শরৎকাল, বৃষ্টিই বৃষ্টির, যাত্রা, প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা। দীর্ঘ নাটকীয় কবিতা, ক্রোধ, দীর্ঘশ্বাস, উদ্বেগের ইঞ্জিন অর্থাৎ কবির কথায় স্টার্ট দিয়ে উদ্বেগের নিষ্ঠুর ইঞ্জিন। ভাবুক ভীরু কবির যথার্থ কালের কাছে গোছানো কংকাল চিতার দূরত্ব খুঁজে কাঁদে। নিজেকে প্রশ্ন- ‘কোথায় আমার দিনের কুসুম, কোথায় আমার ঘর, ডর দিয়ে ডর তাড়াবো কিন্তু ডরের সব ছায়া সর’ (পৃ : ৪৯) রহস্য, ফরিয়াদ, অটুট চুম্বন, শেষ বেলাতে বেশ ভালো কবিতা, অবশেষে বলা যায়, প্রকৃত কবি অরুণের কাছে মুঠো-মুঠো কবিতা ভবিষ্যতেও প্রার্থনা করি, কবির মন ও কলম দীর্ঘজীবী হোক, ছাপা এবং খালিদ আহসনের প্রচ্ছদ খুবই সুন্দর। এই কাব্যগ্রন্থের বহুল প্রচার প্রার্থনা করি। হ

গ্রন্থ সমালোচনা- ড. অমিতাভ চক্রবর্তী, কবি ও গবেষক পশ্চিমবঙ্গ, কলকাতা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj