বৃক্ষ ও প্রেমিকের গল্প : নূর কামরুন নাহার

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৪

এটা একটা দুর্ঘটনা। স্রেফ দুর্ঘটনা। আমি আমার এই বত্রিশ বছরকে ধরে বেঁধে রেখেছি। খুব এটা শক্ত করে বেঁধে রেখেছি। এ এক কঠিন সাধনা। আমার শরীর? খুব কঠিনভাবে পবিত্র করে রেখেছি। মন? মনকে আমি চোখ রাঙানি দিয়ে রেখেছি যেমন রাগী শিক্ষক ছাত্রকে দিয়ে রাখে।

আমার এই ব্যুহ অতিক্রম করে এখানে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। আমি কাউকে প্রবেশে করার মতো কোনো ফাঁক রাখিনি। প্রেম বিয়ে এ বিষয়গুলো আমার কাছে অরুচিকর। আমি প্রেমে বিশ্বাস করি না। কেনই বা করবো? ওটা কিছু কথার ফুলঝুরি ছাড়া আর কি? আর ওটা দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করে প্রতারিত করা হয়। তাই প্রেম মূলত প্রতারণা। বিয়ে বিষয়টা আমার কাছে কারাগারের মতো। দুজন মানুষকে আজীবন থাকতে হবে পছন্দ না হলেও, অরুচিকর হলেও। আর একজনের মতামতের ওপর আর একজন এসে চড়াও হবে। এবং মন খুশি করানোর ধামা ধরতে হবে, একটা ভাড় সেজে থাকতে হবে। জঘন্য এককথায় ঘৃণ্য। যদি শরীরের চাহিদার কথা বলা হয় আমি হলফ করে বলতে পারি ওটা আমার কাছে কোনো চাহিদাই নয়। ওটা কখনো এমনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি যে আমাকে এইসব অপ্রীতিকর উটকো বিষয়ের সাথে জড়াতে হবে। আমি আমার জীবনকে গড়েছি সুন্দর দিয়ে। আমি ভালো ছাত্রী। পড়াশোনায় সব সময় মগ্ন থেকেছি। ভালো রেজাল্ট করেছি। আমার প্রচুর ভালো বান্ধবী আছে আমি তাদের সাথে সুন্দর সময় কাটাই। রেজাল্ট হবার সাথে সাথে ভালো চাকরি পেয়ে গেছি। দায়িত্বশীল পদ। আমাকে দায়িত্বের সাথে কাজ করতে হয়। এখানে কাজের পরিবেশ সুন্দর। কাজ করতে পছন্দ করি।

আমি সচ্ছল পরিবারে মেয়ে। জীবনে অভাব দেখিনি। আদরে বড় হয়েছি। বড় ভাই বোনেরা আমাকে খুব আদর করে। ছোট ভাই বোনেরা শ্রদ্ধা করে। সবাই আমাকে ভালোবাসে। ওদের সাথে খুব সুন্দর সম্পর্ক। আর আমি আমার অবসরকে ভরে রেখেছি শিল্পিত সৌন্দর্যে। বাড়ির ছাদে সুন্দর বাগান করেছি। অনেক রেয়ার কালেকশনের গাছ আমার বাগানকে অনন্য করে তুলেছে। গাছ আমি অনেক ভালোবাসি। আমি ওদের যতœ নেই। ওরা আমার প্রাণের বন্ধু। হেলে দুলে মাথা নাড়িয়ে ওরা আমাকে অভিবাদন জানায়। যখন কোনো কারণে মন খারাপ থাকে। আমি ওদের কাছে আশ্রয় নেই। ওদের সাথে কথা বলি। ওরা বাতাসে দুলে দুলে আমার কথার জবাব দেয়। আমাকে জুড়িয়ে দেয়। আমি খুব গোছানো মেয়ে। আমার সব কিছু খুব সুন্দরভাবে গোছানো। সামান্য অবসর পেলেই আমি ঘর গোছাই। আমার আছে পরিষ্কারের বাতিক। আমার ঘর, আসবাবপত্র, ফার্নিচার খুব পরিষ্কার রাখি। সুন্দর ও পরিষ্কার থাকতে প্রচুর সময় ব্যয় করি। আমি গান পছন্দ করি। গান শুনি। প্রচুর না হলেও পড়াশোনা করি। এসব করে আমার হাতে কোনো সময়ই থাকে না। তাই সময় কাটানোর কোনো সমস্যা নেই আমার।

দেশের বাইরে গেছি বেশ কয়েকবার। প্রতিবারই সমৃদ্ধ হয়েছি। দেশের বাইরে আমি বেড়াতে যাইনি। আমার প্রফেশনাল কাজে গিয়েছি। যোগ দিয়েছি কোনো না কোনো সম্মেলন, ওয়ার্কশপ বা সেমিনারে। ওখানে আমি পেপার উপস্থাপন করেছি, কখনো আলোচনায় অংশ নিয়েছি। আমার পেপার প্রশংসিত হয়েছে। দেশের বাইরেও আমার বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব তৈরি হয়েছে। তাদের সাথে ই-মেইলে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়। নিজেকে আপডেট রাখতে আমি সবসময় তথ্যের প্রবাহের সাথে নিজেকে খুব দৃঢ়ভাবে যুক্ত রাখি। তথ্যপ্রযুক্তিতেও আমি নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছি। কম্পিউটার ব্যবহারে আমার দক্ষতা সন্তোষজনক। নিজেকে আমি এভাবেই যুগপোযোগী করে তৈরি করে রেখেছি।

না, আমার নিজের কোনো কমতি নেই। বুকের ভেতর হায় আফসোসের ফোস ফোস নেই। না, আমার কোনো সমস্যাও নেই। হ্যাঁ, সমস্যা যেটা সেটা হচ্ছে এই আমার এতো পূর্ণ, এতো সফল সুন্দর জীবনের পরও মানুষ আমাকে নানাভাবে বিরক্ত করে। ওরা আমাকে বিয়ের কথা বলে পীড়াপীড়ি করে। বিয়ে ছাড়া আমি যে একটা অপূর্ণ এটা বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। মূর্খের দল তাই জানে। জীবনে বিয়ে ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। বিয়ে ছাড়া যে আরো অনেক কাজ আছে এবং বিয়ে ছাড়াও যে একটা পূর্ণ জীবন, একটা কর্মমুখর সুন্দর জীবন কাটানো যায় তা মূর্খদের চোখের সামনে যথার্থভাবে উদাহরণ দাঁড় করালেও তারা তা মানতে পারে না।

তো সমস্যা ওই একটাই। আমার বিয়ে বিষয়ক কচকচানি। আমার বন্ধু স্বজন আত্মীয় শুভাকাক্সক্ষী আমার বিয়ের জন্য হাপিত্যেশ করে মরে। যেখানে যাই সেখানেই তারা আমার জন্য দুঃখে মরে যায়। বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সমস্যা আরো একটা আছে। আমি আবার দেখতে সুন্দরী। ফলে আমার সাথে প্রেম করার খায়েশ জাগে বহুজনের। গাছে বরই থাকলে নাকি সবাই ঢিল ছোড়ে। তারা ও অন্ধের মতো ঢিল ছুড়তে চায়। আমার চারপাশে ঘুরঘুর করে। গুনগুন করে আমার প্রশংসা গায়। আমার বিরক্তি বাড়ায়। আমি তাদের প্রকাশ্য অবহেলা দেখাই। কিন্তু তাদের ধৈর্য আর প্রচেষ্টায় কোনো ক্লান্তি আসে না। কারণ তারা ছোটবেলায় অধ্যবসায় রচনাটি খুব মনোযোগ দিয়ে মুখস্থ করেছিল।

কিন্তু আমি দৃঢ়। ইস্পাত কঠিনসম দৃঢ়। আগেই বলেছি প্রেমে আমার বিশ্বাস নেই। বিয়ে নামক এই কারাগার আমি অপছন্দ করি। আমি আমার স্বাধীনতাকে পুরো ভোগ করতে চাই। আমার বন্ধুরা, হ্যাঁ আমি তাদের শুধু মূর্খ ও উজবুক বলে শুধু করুণাই করতে পারি। ওরা বলে প্রেম ছাড়া নাকি পূর্ণতা হয় না। আমি বুঝতে পারি না প্রেম সাথে পূর্ণতার কি সম্পর্ক? আমি এই মানুষটা আমাকে কি আল্লাহ একটা স্বতন্ত্র মানুষ করে তৈরি করেননি। আমি কি আমাতেই পূর্ণ না? কি ঘাটতি আছে আমার মধ্যে? শুভাকাক্সক্ষীরা আহাজারি করে আমি নাকি আমার সুবর্ণ সময় নষ্ট করে ফেলছি। আশ্চর্য আমি নিজের মতো আমার সময়টাকে কাজে লাগিয়েছি। এই আমার বত্রিশ বছর বয়সে প্রচুর কাজ করতে পেরেছি। সময়টাকে ঈর্ষান্বিত সফল সময়ে পরিণত করেছি। তবে এইসব ধুনফুন বলে আমাকে কেউ টলাতে পারবে না। না, আমি কোনোভাবেই এইসব দুর্বল যুক্তির কাছে নতজানু হতে পারি না। এইসব মানুষরা উদ্ভাবনী শক্তিহীন। তারা শুধু ঘুরপাক খেতে জানে প্রচািলত নিয়মের গন্ডিতে। তাদের নিজস্ব কোনো যুক্তি কোনো বিচার বোধ নেই। অতীতে মানুষ বিয়ে করেছে তাই এখনও সবাইকে বিয়ে করতে হবে। অতীতে মানুষ প্রেম করেছে তাই এখনো সবাইকে প্রেম করতে হবে?মানুষের আর কোনো কাজ নেই, আর কোনো সৃষ্টিশীলতা নেই?

তবে আমি আমার পথে আমার মতে দৃঢ়। আমাকে কেই এক চুলও সরাতে পারবে না। এমনকি আমার মা, যে বৃদ্ধ মহিলাকে আমি সবচাইতে ভালোবাসি, যে অবুঝের মতো প্রায়ই আমার জন্য আঁচলে চোখ মোছেন। আমার ভবিষৎ ভাবনায় অস্থির থাকেন। সেও পারেনি আমাকে এক তিল সরাতে। এই রকম শক্ত কঠিন প্রাচীর অতিক্রম করে প্রেম আমার কাছে পৌঁছোনোর কোনো পথই পাবে না। আর কোনো প্রেমিক? প্রশ্নই ওঠে না। তবু আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটলো। না ঘটনা না, দুর্ঘটনাটা ঘটলো। আমার কাছে প্রেম এলো। আমার এই বত্রিশ বছরের জীবন আর সাধনাকে তছনছ করে দিয়ে প্রেম আসলো।

দুর্ঘটনাটা ঘটলো ঠিক একবছর আগে। আমার অফিসের একটা অনুষ্ঠানে আমাদের দেখা হলো আমার চোখে হঠাৎ যেন টর্চের আলো এসে পড়লো। আর সে বজ্রাহত এক মানুষ স্থানুর মতো দাঁড়িয়েই রইলো। আমার সমস্ত ঘর, অন্তর বলে উঠলো সে এসে গেছে। সে এসে গেছে। সে যদি আসবেই তবে আঠারো তে কেন আসেনি। এই বত্রিশে কেন? এইরকম একটা বিষয় ক্ষণিকের বিভ্রম মনে করে ঝেরে ফেলে দেয়া আর কি এমন কঠিন! সেটা তো আমি ইচ্ছে করলেই করতে পারি। আমার মতো এমন শক্ত প্রাণ! কিন্তু খুব কঠিন হয়ে গেলো সে এসে গেছে এই সত্য অস্বীকার করা। আমার এই বত্রিশ বছর যে তার জন্যই অপেক্ষা করে আছে আর তার উনচল্লিশও যে শুধু আমার অপেক্ষায় তা বুঝতে আর কোনো দেরী হলো না।

আমি বদলে গেলাম। আমরা বদলে গেলাম। প্রতি রাতে আমরা ব্যস্ত থাকি নেটে। একদিন কথা না হলে মনে হয় কতো বছর কথা হয়নি। খুব ভালো লাগে। আহা! প্রেম এতো সুন্দর এতো সৌরভময়। কে আগে জানতো! আহা! কেন প্রেম আসতে বত্রিশ বছর সময় নিলো? কেন সে আরো আগে আসলো না। কেন সে আসলো না আরো আরো আগে? প্রেম আমাকে গ্রাস করে নিলো। কিন্তু সমস্যা হলো প্রেম পুরোপুরি বোঝা গেলো না। প্রেমিককেও না। আহা! প্রেম এতো রহস্যময় তা প্রেম এতো দহনের তা কে জানতো!

প্রেম আমাকে জ্বালিয়ে দিলো, পুড়িয়ে দিলো। আমি জ্বলে পুড়ে গেলাম। আনন্দে আর দহনে। সে আন্তর্জাতিক সম্পদ, আমি জাতীয়। তার আত্মমর্যাদাবোধ প্রখর, আমারও। সে আমার সাথে পুরোপুরি সহজ না, আমিও না। আমাদের ভেতরে এতো কলকল অথচ দুজনের মাঝে সংকোচ আর লজ্জার দেয়াল। আমরা দুজনের কাছে পুরোপুরি প্রকাশিত হতে পারি না। এই প্রকাশ না করা আবার আমাদের অভিমানী করে তোলে। আমরা ভেতরে ভতরে গুমড়ে মরি। আর সে এক অদ্ভুত লোক। তো বড় মাপের একজন মানুষ, এতো প্রতিষ্ঠিত, এতো ব্যক্তিত্ব, মেধা অথচ আমার সাথে সে এক শিশু। সামান্যতেই অভিমান, ভুল বোঝা। তার অভিমান আবার খুব গাঢ়। রূপ নেয় অভিযোগে। সে আমাকেই দায়ী করে। আমি নাকি ভালোবাসার মর্য়াদা বুঝি না। আমি তাকে বুঝি না। আমি নির্লিপ্ত। আমি অহঙ্কারী। আরো আরো কত কি!। স্বীকার করি আমার আত্মমর্যাদা, আত্ম অহংবোধ বেশি। সে যখন আমার কাছে আসে, নিজেকে প্রকাশ করে আমি তখন নিজেকে ওইভাবে প্রকাশ করতে পারি না। আমি পারি না এটা আমার স্বভাব কিন্তু সে তা বোঝে না। সে তা মানে না। সে বলে- আমি যদি তার কাছেই অপ্রকাশিত থাকি, তবে কার কাছে ঘটবে আমার প্রকাশ? যদি তাকেই আমার এতো সংকোচ, তবে এ কিসের প্রেম?

তার অভিমান খুব ভয়ঙ্কর। সে নমনীয় হয় না। সে অভিমান থেকে রাগ করে তারপর আমাকে আঘাত করে। আমি কষ্ট পাই। তারপর জ্বলি পুড়ি। আমার আত্মসম্মানবোধ ভয়ঙ্কর। আমি কষ্টে মরে যাই। তার কাছে ছুটে যেতে চাই। কিন্তু তার কাছে নতি স্বীকার করি না। তাকে বুঝতে দেই না ভেতরের দহন ও ভালোবাসার অস্থিরতা। আমি কেন বুঝতে দেব? আমি নিজেকে পুরোপুরি প্রকাশই বা করবো কেন? সে কেন বুঝতে পারবে না আমাকে। কেন সে বুঝে নেবে না আমার আদি অকৃত্রিম প্রেম? তবে এ কিসের প্রেম?

তার সাথে ভালো থাকা যায় না। খুব চাই ভালো থাকি, তবু থাকা যায় না। তার সাথে ভুল বুঝাবুঝি চলতেই থাকে। সে আমাকে আঘাত করতেই থাকে। আমিও পুড়তেই থাকি আর আমাকে বারবার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এবারই শেষ তার সাথে আর না। তারপর শেষ হতে গিয়েও শেষ হয় না। আর আশ্চর্য! এটা এক অদ্ভুত ব্যাপার। নিয়তিও চায় না সে দূরে যাক। জীবন থেকে সে মুছে যাক। যতবার আমি কঠিন সিদ্ধান্ত নেই, ঠিক যেদিন নিজেকে শক্ত করি। আমার ভেতর আমাকে বাঁধি, ঠিক সেদিনই সে ফিরে আসে। আমার কাছে আশ্রয় খুঁজে। আর এটা অস্বীকার করতে পারি না যে, তার সাথে দেখা হলে আমি সব ভুলে যাই।

তার সাথে মিটে গিয়েও মিটে না। সে আবারও ভুল বোঝে। আবারও অভিমান করে। এখনো তার সাথে ভুল বোঝাবুঝি চলছে। এই তো আজ সাতদিন সে অভিমান করে আছে। আমি কি চেষ্টা করিনি। চেষ্টা করেছি, তাকে ফোন করেছি, ম্যাসেজ করেছি। না, সে কোনো ভালো ব্যবহার করেনি। কঠিন গলায় বলেছে- তার আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। ঠিক আছে নেই। আমারই বা কি প্রয়োজন? তাকে ভালোবাসি। হ্যাঁ বাসি। আর জন্য গভীর অনুভব রয়েছে। হ্যাঁ আছে। থাকবে চিরদিন। কিন্তু তাই বলে আমার সব কিছু কেন বিসর্জন দিতে হবে? তার এই অন্যায় অভিমান মেনে নিতে হবে? সে বলেছিলো- আমি যেন তার রাগ না ধরি। রাগলে সে উন্মাদ হয়ে ওঠে। আমি তাই বিবেচনা করেছি। ধরিনি। কিন্তু ধরবো না কেন? আমি কি রক্তমাংসের মানুষ নই? তার সাথে শেষ। এবারই শেষ। বহুবার শেষ বলেও শেষ করিনি। কিন্তু এবার শেষ। আমি খুব কঠিন। নিজেকে আমি চিনি। একবার যদি মন ওঠে যায় তবে তা আর ফেরে না। যদি মন থেকে শেষ শব্দ উচ্চারণ করি তাহলে আর তা ফেরানো যাবে না। আমি এবার সেই শব্দ উচ্চারণ করবো। কেন করবো না? গত এক বছরে আমি কি কোনো কাজ করেছি? আমি কি ভালো থেকেছি? প্রেম আমার সব কেড়ে নেয়নি। আমার স্বাধীনতা, আমার সময়? তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমার সময় চলে যাইনি? আচ্ছা গেছে। কিন্তু মানসিক পীড়ন? সে যখন অভিমান করেছে রাগ করেছে আমি কি স্বাভাবিক থাকতে পেরেছি? দিনগুলো আমার কাছে পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে ওঠেনি। কালো মেঘে ঢাকা মনে হয়নি? কেন আমি এতো কষ্ট বহন করবো? কেন করবো? আমি কি অপরাধী?

আমার কোনো অপরাধ নেই তবু আমি কষ্ট পাচ্ছি। খুব কষ্ট পাচ্ছি। গত সাতদিন ধরে আমার কোনো স্বাভাবিক জীবন নেই। অফিস করছি কিন্তু ভেতরে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি নেই। ভালো করে কারো সাথে কথাও বলতে পারছি না। কি একটা সর্বক্ষণ আমাকে বিষণœ করে রাখছে। মাঝে মাঝেই অকারণে ভিজে আসছে চোখ। খেতে ইচ্ছে করছে না। কি একটা বিঁধে আছে বুকে। না, আমাকে তো বাঁচতে হবে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে হবে।

আমি নতুন করে আবার সাজাবো। অনেক সময় অপচয় হয়ে গেছে। মানসিক ভার আমাকে কুঁড়ে খেয়েছে। তার প্রতি আমার সমর্পণ আমাকে শেষ করে দিয়েছে, সবকিছু থমকে দিয়েছে। আমি নতুন করে কাজগুলো সাজিয়ে নেবো। নিজেকে আমার কোথাও সমর্পণ করতে হবে। বহুদিন আমার বৃক্ষের কাছে যাওয়া হয় না। আমি আবার আমার বৃক্ষগুলোর কাছে ফিরে যাবো। আমাকে বাঁচার পথ খুঁজে নিতে হবে। অনেকদিন ভালো করে বাগান করি না। ওদের সাথে আমার ভালো করে কথা হয় না। প্রেমিকের চাইতে বৃক্ষ অনেক ভালো। ওরা আমার প্রিয় বন্ধু। ওরা আমাকে বুঝে। অকারণে রাগ করে না। অকারণে কষ্ট দেয় না। ওদের সাথে আমার কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই। ওরা আমাকে মায়ার পরশ বুলিয়ে দেয়। ওরাই আমাকে শীতল করে দেবে। আজ বিকেল পর্যন্ত দেখবো। তারপর বিকেল থেকেই আবার শুরু করবো আমার নতুন জীবন। বৃক্ষের মতো নীরব এক জীবন। আজ বিকেল থেকেই মনকে স্থির করে নেবো। বিকেলেই নিয়ে নেবো কঠিন সিদ্ধান্ত। আর কোনোদিন কোনোভাবেই ফিরবো না তার কাছে। হৃদয়ে দহন থাকবে। ক্ষত থাকবে, থাকুক।

বিকেলটা বিষণœ আলোয় ভরা। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটুট। আমি আমার গাছগুলোর কাছে ফিরে যাবো। পরম স্নেহে ওদের বুকে তুলে নেবো। ওদের ছায়ার নিচেই হবে আমার আশ্রয়। ওরা আমাকে মায়ায় মায়ায় ভরিয়ে দেবে। ছাদের ওপর আসি। ঝারি ভরা পানি নিয়ে আমি দাঁড়াই আমার প্রিয় গাছগুলোর কাছে। ওদের গায়ে হাত বুলাই। মোবাইলটা ম্যাসেজ আসার শব্দে বেজে ওঠে। মনিটারে চোখ আটকে থাকে ‘আমি আসছি তোমার কাছে’ মাত্র একটা লাইন। সে আসছে। সে আসছে। অদ্ভুত সুন্দর আলোয় ভরা এই বিকেল। আমি আমার বৃক্ষগুলোকে জড়িয়ে ধরি। আদরে আদরে ভরে দেই ওদের। আহ! আমার বাগানটা কি সুন্দর। গাছগুলো কি ঘন সবুজ! কি স্নিগ্ধ !

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj