রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত ও কবিতায় স্বদেশপ্রেম

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪

রামমোহন রায়ের ভারত চেতনায় ভারতীয় সকল সংস্কৃতির মিলন চিন্তায়ই শুধু স্থান পায়নি, তিনি ভারত ঐক্যের মধ্য থেকেই মানবজাতির ঐক্যের আদর্শ লাভ করেছিলেন। রামমোহনের সেই উদার ও মৈত্রী বোধের দ্বারা অনুপ্রাণিত রবীন্দ্রনাথ বারবার বলেছেন, ভাবের দিক থেকে ভারতের সত্য হচ্ছে বিশ্ব মৈত্রী। তিনি বলেছিলেন, দেশ কেবল ভৌগোলিক নয়, মানবিক। রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ- এই দীর্ঘকালের সাধকদের সাধনা দিকে লক্ষ্য করলে আমার দেখতে পাই এঁদের ভারত চেতনা তথা স্বদেশ চেতনা কত মানবিক

রবীন্দ্রনাথের প্রধান পরিচয় তিনি স্রষ্টা। সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশই তার নিজের ধর্ম। জগত ও জীবনের বিশিষ্ট উপলব্ধিতেই সেই আত্মপ্রকাশের বিশিষ্টতা এবং দেশ ও কালের আশ্রয়েই সেই অভিজ্ঞতার উদ্ভব। রবীন্দ্রনাথের ভারতবোধের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে দেশ ও কালের পটভূমি, রয়েছে অতীত ভারত বর্ষের ইতিহাস, রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্য। যে পরিবার পরিবেশে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাতে ভারতপ্রীতি ছিল জন্মগত সংস্কার। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা, ঔপনিষদীয় ধ্যান-ধারণা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথের কালিদাশ প্রীতি, সত্যেন্দ্রনাথের বুদ্ধের জীবন ও বৌদ্ধ সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সংস্কৃতি কাব্য সাহিত্যের চর্চা এবং এদের স্বাদেশিকতা প্রভৃতি রবীন্দ্র হৃদয়ে ভারতভোধ উদ্ভবে প্রেরণা দিয়েছে। আরো একজন আছেন, ভারত প্রথিক রামমোহন রায়, যাঁর সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আমার পরম পূজনীয় যাঁর কাছ থেকে আমার জীবনের পূজা আমার সমস্ত জীবনের সাধনা আমি গ্রহণ করেছি।’ রবীন্দ্রনাথের ভারত বোধের স্বরূপ অন্বেষণে অপ্রাসঙ্গিক হবে না রামমোহন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধাঞ্জলি থেকে উদ্ধৃতি প্রদান :

আমাদের ইতিহাসের আধুনিক পর্বের আরম্ভ কালেই এসেছেন রামমোহন রায়। তখন এ যুগকে কি বিদেশী কি স্বদেশী কেউ স্পষ্ট করে চিনতে পারেনি। তিনিই সেদিন বুঝিয়েছিলেন, এ যুগের যে আহ্বান সে সুমহত ঐক্যের আহ্বান। তিনি জ্ঞানের আলোকে প্রদীপ্ত আপন উদার হৃদয় বিস্তার করে দেখিয়েছিলেন সেখানে হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান কারও সংকীর্ণতা নেই। তাঁর সেই হৃদয় ভারতেরই হৃদয়, তিনি ভারতের সত্য পরিচয় সেই মানুষে, যে মানুষের মধ্যে সকল মানুষে সম্মান আছে, স্বীকৃতি আছে।

রামমোহন রায়ের ভারত চেতনায় ভারতীয় সকল সংস্কৃতির মিলন চিন্তায়ই শুধু স্থান পায়নি, তিনি ভারত ঐক্যের মধ্য থেকেই মানবজাতির ঐক্যের আদর্শ লাভ করেছিলেন। রামমোহনের সেই উদার ও মৈত্রী বোধের দ্বারা অনুপ্রাণিত রবীন্দ্রনাথ বারবার বলেছেন, ভাবের দিক থেকে ভারতের সত্য হচ্ছে বিশ্ব মৈত্রী। তিনি বলেছিলেন, দেশ কেবল ভৌগোলিক নয়, মানবিক। রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ- এই দীর্ঘকালের সাধকদের সাধনা দিকে লক্ষ্য করলে আমার দেখতে পাই এঁদের ভারত চেতনা তথা স্বদেশ চেতনা কত মানবিক। দৃষ্টির সংকীর্ণতা চিত্তের দীনতা এবং ক‚পমণ্ডুকতা তাঁদের ছিল না। সামগ্রিক কল্যাণবোধের আদর্শই ছিল তাঁদের জীবনের লক্ষ। এই অর্থে রবীন্দ্রনাথের ভারতবোধ তাঁর জীবনাদর্শের অভিব্যক্তি।

রবীন্দ্রনাথের ভারতবোধের সঙ্গে ভারতবর্ষের যে ইতিহাস সম্পৃক্ত, ইতিহাসের পাতায় রবীন্দ্রনাথ তেমন করে তা পাননি, যেমন করে পেয়েছেন দেশের ঐতিহ্যে, সাহিত্যে, কর্ষনজীবী সভ্যতার ঘাত-প্রতিঘাতে। দেশের ইতিহাস যে মানুষের জীবনধারা, মানুষের জীবনযাত্রা ছাড়া আর কিছু নয়, তা রবীন্দ্রনাথ হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন। ভারতবর্ষের ইতিহাস পর্যালোচনায় তাই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন :

ভারত বর্ষের যে ইতিহাস আমরা পড়ি এবং মুখস্ত করিয়া পরীক্ষা দিই, তা ভারতবর্ষের নিশীথকালের একটা দুঃস্বপ্ন কাহিনী মাত্র। …পাঠান মোগল পর্তুগিজ ফরাসি ইংরাজ সকলে মিলিয়া এই স্বপ্নকে উত্তরোত্তর জটিল করিয়া তুলিয়াছে। …ঘরের কথা কিছুমাত্র পাই না। সেই ইতিহাস পড়িলে মনে হয়, ভারতবর্ষ তখন ছিল না, কেবল মোগল-পাঠানের গর্জন মুখর বাত্যাবর্ত শুষ্কপত্রের ধ্বজা তুলিয়া উত্তর হইতে দক্ষিণে এবং পশ্চিম হইতে পূর্বে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল।

কিন্তু বিদেশ যখন ছিল দেশ তখনো ছিল, নহিলে এই সমস্ত উপদ্রব্যের মধ্যে কবীর নানক চৈতন্য তুকারাম ইহাদিগকে জন্ম দিল কে? তখন যে কেবল দিল্লি এবং আগ্রা ছিল তাহা নহে, কাশী এবং নবদ্বীপও ছিল। তখন প্রকৃত ভারতবর্ষের মধ্যে যে জীবনস্রোত বহিতেছিল, যে চেষ্টার তরঙ্গ উঠিতেছিল, যে সামাজিক পরিবর্তন ঘটিতেছিল, তাহার বিবরণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না।

ভারতবর্ষের প্রধান সার্থকতা কি এরও উত্তর রবীন্দ্রনাথ খুঁজেছেন ভারতবর্ষের ইতিহাসের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :

ভারতবর্ষের চিরদিনই একমাত্র চেষ্টা দেখিতেছি, প্রভেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা, নানা পথকে একই লক্ষের অভিমুখীন করিয়া দেওয়া এবং বহুর মধ্যে এককে নিঃসংশয় রূপে অন্তরতররূপে উপলব্ধি করা, বাহিরে যেয়ে সকল প্রার্থক্য প্রতীয়মান হয় তাকে নষ্ট না করিয়া তার ভিতরকার বিমূঢ় যোগকে অধিকার করা।

এই ‘ঐক্যকে প্রত্যক্ষ করা’ এবং ঐক্য বিস্তারের চেষ্টাকে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় সংবেদনশীল মনের সূ² অনুভূতিতে। এই ঐক্যবোধ মূলত ভাবরূপী এবং অন্তরমুখী, সবর্দা বাহ্যদৃষ্টি গোচর নয়। এর আভাস পাওয়া যায় কবির কল্পনায় এবং সাধকের ধ্যানে। রবীন্দ্রনাথের ভারত বোধে রয়েছে এককে প্রত্যক্ষ করার সাধনা এবং ঐক্য বিস্তারের চেষ্টা। তাঁর সঙ্গীত কবিতায় এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্মে এই প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। এই সূত্রে আলোচিত হতে পারে উপনিষদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা এবং অনুরাগ এবং কিভাবে উপনিষদের ভাবসম্পদ রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেছিলেন তার তথ্য ও তত্ত্ব; আলোচিত হতে পারে বুদ্ধদেবের জীবন সাধনা ও আদর্শ যা রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। যাতক ও অবদানের গল্প, ধম্মপদ প্রভিতি রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় ছিল। কালিদাশের কাব্য নাটকাদির মধ্যে রয়েছে যে সৌন্দর্যের অলকাপুরী, প্রাচীন প্রশান্ততপোবন, তার দ্বারা রবীন্দ্রনাথের কবিকল্পনা কতখানি অনুপ্রণিত হয়েছিল সেই প্রসঙ্গের আলোচনাও অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তাছাড়া মধ্যযুগীয় ভারত ঐতিহ্যের একটি দিক- নানক কবির দাদু রজ্জব প্রভৃতি- রবীন্দ্রনাথকে স্পর্শ ও উদ্দীপ্ত করেছিল, তার পরিচয় গ্রহণ ও ভারত বোধের অন্তর্গত।

বাংলাদেশের আউল-বাউলেরা তাদের সঙ্গীতে যে অধরা মানুষের কথা বলেছে, রবীন্দ্রনাথ তার সঙ্গে নিবিড় আত্মীয়তায় যুক্ত করেছিলেন তাঁর ভারত বোধ আর এর এও আর এক অনুষঙ্গ। আসলে রবীন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম সেই আর্যপূর্ব অনার্য ভারতবর্ষ থেকে শুরু করে বেদ-উপনিষদ-রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ বৌদ্ধ ধর্ম-সংস্কৃত সাহিত্য ইত্যাদি থেকে শুরু করে তাঁর নিজের সমসাময়িক কাল পর্যন্ত ভারত সংস্কৃতির সকল অর্থ গর্ভ পর্বের ঘনিষ্ঠ পরিচয় গ্রহণ করেছিলেন এবং জীবনের প্রায় সকল স্তরে এই সমগ্র পরিচয় থেকেই তিনি ভারত ঐতিহ্যের একটি সামগ্রিক রূপ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন, তারই ধ্যান আমাদের মনে ও হৃদয়ে সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন।

ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবের প্রাক্কালে স্বদেশ বোধের দ্বিবিধ রূপ প্রবল হয়ে উঠেছিল। এই দ্বিবিধ রূপ হলো বঙ্গবোধ ও ভারতবোধ। লক্ষ করার বিষয়, স্বদেশ বোধ বাঙালির মনে প্রথম থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল যুগপথ বঙ্গবোধ ও ভারতবোধ রূপে তাঁর প্রমাণ মেলে কবি ঈশ্বর গুপ্ত, কবি মধুসূধনের কবিতায়। রবীন্দ্রনাথের মনোলোকে স্বদেশ বোধের উদ্বোধনে হিন্দু মেলার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু মেলা তথা জাতীয় মেলায় গাওয়া সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গানটি- ‘মিলে সব ভারতসন্তান’ -এর প্রবল উদ্দীপনার আবেগে স্পন্দিত। গানটিতে প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য ও কীর্তিস্মৃতি ফুটে উঠেছে। উঠেছে।

মিলে সব ভারতসন্তান

একতান মনপ্রাণ

গাও ভারতের যশোগান

——————–

——————–

——————–

ছিন্ন ভিন্ন হিনবল ঐক্যেতে পাইবে বল

মায়ের মুখ উজ্জ্বল হইবে নিশ্চয়

হোক ভারতের জয়

জয় ভারতের জয়।।

এই গানটি (কবিতাও) সম্বন্ধে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় (১২৭৯, চৈত্র) বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন :

এই মহাগীত ভারতের সর্বত্র গীত হোক, হিমালয় কন্দরে প্রতিধ্বনিত হোক। গঙ্গা-যমুনা-সিন্ধু-নর্মদা গোদাবরী তটে বৃক্ষে বৃক্ষে মর্মরীত হোক। পূর্ব-পশ্চিম সাগরের গম্ভীর গর্জনে মন্দ্রীভূত হোক। এই বিংশতি কোটি ভারতবাসির হৃদয় যন্ত্র বাজিতে থাকুক’।

শৈশব সঙ্গীত রবীন্দ্র রচনাবলীর অচলিত সংগ্রহে সংকলিত, ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত’ থেকে ‘শেষ লেখা’ রবীন্দ্রনাথের এই বিশাল কাব্যসম্ভার রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক স্বীকৃত, যদিও শেষ লেখা রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছে। এই কাব্যসম্ভারে রবীন্দ্রনাথের ভারতবোধ বিভিন্ন কবিতার আধারে রক্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারত বর্ষের ভাবরূপ তাঁর সৌন্দর্য মাধুর্য ও ঐশ্বর্য প্রকাশ করেছেন ‘চৈতালী’ (১৯৯৬) ‘কথা’ (১৯০০) ‘কল্পনা’ (১৯০১) ‘বৈবেদ্য’ (১৯০১) এবং ‘গীতাঞ্জলীর’ (১৯১০) গীতাঞ্জলীর ‘ভারতীর্থ’ কবিতায়। স্বপ্নময় প্রাচী ভারতের প্রতি রবীন্দ্রনাথ যে হিন্দু মেলার যুগেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন তার নিদর্শন হিন্দু মেলায় পঠিত কবিতার মধ্যেই রয়েছে, পরবর্তীকালে সেই আকর্ষণ, অনুরাগ নানাভাবে উৎসারিত হয়েছে কবিতায়, সঙ্গীতে, প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনায়। প্রাচীন ভারতের প্রতি রবীন্দ্রনাথের কবিচিত্তের যে মুগ্ধতা রয়েছে তার আশ্রয় হয়েছে উপনিষদ, প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্য, কালীদাশের কাব্য নাটক, মধ্যযুগের শিখ মারাঠা ও রাজপুতের ঐতিহাসিক কাহিনী। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য চৈতালীর তপোবন প্রাচীন ভারত ‘ঋতুসংহার’, ‘মেঘদুত’ ‘কালীদাশের প্রতি’ ‘কুমার সম্ভব গান’ ‘কল্পনার- ‘স্বপ্ন’, মদনভষেœর পূর্বে এবং মদনভষেœর পর’ কথা কাব্যের বাহ্মণ, শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা, (অবদানশতক), পূজারিনী, (অবদানশতক), ‘অভিশাপ’ (বোধিসত্তাবদানকল্পলতা) পরিশোধ, (মহাবস্তুবদান), সামান্য ক্ষতি (দিব্যাবদানমালা), বন্দীবীর, মালী, গুরুগোবিন্দ, শেষ শিক্ষা, হোরিখেলা, পণরক্ষা ইত্যাদি কল্পনায় কবি প্রাচীন ভারতের তপোবন আশ্রমের নিঁখুত চিত্র এঁকেছেন ব্রাহ্মণ কবিতায় :

অন্ধকারে বনচ্ছায়ে সরস্বতী তীরে

অস্ত গেছে সন্ধ্যা সূর্য্য; আসিয়াছে ফিরে

নিস্তব্ধ আশ্রম মাঝে ঋষিপুত্রগণ

মস্তকে সমিধ্ভার করি আহরণ

বনান্তর হতে; ফিরায়ে এনেছে ডাকি

তপোবন গোষ্ট গৃহে স্নিগ্ধ শান্ত আঁকি

শ্রান্তহোম ধেনুগনে; করি সমাপন

সন্ধ্য¤øান সবে মিলি লয়েছে আসন

গুরু গৌতমেরে ঘিরি কুটির প্রাঙ্গণে

হোমগ্নি আলোকে

শান্তি রসাম্পদ তপোভূমিকে ঘিরে জেগে উঠেছিল ক্ষত্রিয় গরিমার কর্মকোলাহল, ‘প্রাচীন ভারত’ কবিতাটি তাঁরই কাব্যায়ন:

দিকে দিকে দেখা যায় বিদর্ভ বিরাট

অযোদ্ধা পাঞ্চাল কল্কী উদ্বাত ললাট

স্পর্ধিছে অম্বরতল অপাঙ্গ ইঙ্গিতে

অশ্বের হ্রেসায় আর হস্তির বৃংহিতে

অসির ঝনঝনা আর ধনুর টংকারে

বীণার সঙ্গীত আর নূপুর ঝংকারে

বন্ধির বন্দনা রবে উৎসব উৎছাসে

উম্মাদ সঙ্খের গর্ভ, বিজয় উল্লাসে

রথের ঘর ঘর মন্ত্রে পথের কল্লোলে

নিয়ত ধ্বনিত স্নাত কর্ম কলোরলে।

বাহ্মণের তপোবন অদূরে তাহার

নির্বাক গম্ভির শান্ত, সংযত উদার।

হেথামত্ত স্ফীত স্ফুর্ত ক্ষক্রিয় গরিমা

হোথা স্তব্ধ মহামৌন বাহ্মণ মহিমা

একদিকে ক্ষত্রিয় অন্যদিকে বাহ্মণ, একদিকে কর্মকোলাহল অন্যদিকে ত্যাগের মহিমা———- এই দুয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটেছিল—- ‘ত্যাগের মহিমাজ্যোতি লয়ে শান্তভালে’। (তপোবন চৈতালি)ালি)

রবীন্দ্রকাব্যে ভারত চেতনার আরো এক দিক আছে। ভারতবর্ষের পুরানে এবং ইতিহাসে মনুষ্যত্বের সর্বোত্তম প্রকাশ যেখানেই রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন, তাকেই তিনি কাব্যরূপ দিয়েছেন। মহাভারতের কাহিনী নিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন ‘গান্ধারির আবেদন’ এবং ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’। দুই কবিতায় অপরাজেয় আদর্শ এবং নৈতিক মহিমার জয়গাথা। বৌদ্ধযুগের কাহিনী নিয়ে লেখা ‘পূজারিণী’ ‘অভিসার’ প্রভৃতি কবিতাও নৈতিক সৌন্দর্য বোধের কবিতা। মধ্যযুগ অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ মনুষত্ব্যের আদর্শকেই তুলে ধরেছেন। ‘বন্দীবীর, ‘হোরিখেলা’ প্রভৃতি এই জাতীয় কবিতা। রাজপুত্র মারাঠা এবং শিখ এই তিন জাতিরই ইতিহাস-কাহিনী রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধুদ্ধ করেছিল। গুরুগোবিন্দ সমগ্র শিখ জাতির উদ্দেশ্যে আহব্বান জানিয়েছিলেন-

তোমরা সকলে এসো মোর পিছে,

গুরু তোমাদের সবারে ডাকিছে,

আমার জীবনে লভিয়া জীবন

জাগোরে সকল দেশ। (গুরুগোবিন্দ)

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ‘শীজাবী উৎসব’ কবিতায়টি এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

‘নৈবেদ্য’ ভারতাত্মার কাব্য। নৈবেদ্য ভারতাত্মার বাণী। কবি এখানে প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক আদর্শকে পরিস্ফুট করতে চেয়েছেন। নিজে তা হৃদয়ঙ্গম করেছেন এবং বর্তমান ভারতকে, ভারতীয় সমাজকে, সেই উপলব্ধি থেকে দেখতে চেয়েছেন পাশ্চাত্য আদর্শ ও মনুষ্যত্বের আদর্শকে।

প্রাচীন ভারতের এই আধ্যাত্মিক সাধনার বিপরীত চিত্র আধুনিক ভারতের সমাজে, পাশ্চাত্য সভ্যতার সংঘাতে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন এবং তাতে তার মনোভাবের মধ্যে কখনো কখনো দ্বিধা দ্ব›দ্ব শংসয় দেখা গেলেও প্রাচীন ভারতের শাশ্বত আদর্শ সম্বন্ধে তাঁর মনের মধ্যে ছিল গভীর শ্রদ্ধা। আসলে এই আধ্যাত্মিক আদর্শ রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাধনায় কেবল তথ্য বা তত্ত্ব ছিল না, তার সত্যে, উপলব্ধির আনন্দে পরিণত হয়েছিল। এখানে হিন্দু মেলার যুগের কবিদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পার্থক্য, পার্থক্য রবীন্দ্রপূর্বযুগের অন্যান্য কবির সঙ্গেও যাঁরা প্রাচীন ভারতের গৌরবের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক ভারতবর্ষের মানুষের চিত্তে ইংরেজদের শাসন ও শোষণের বন্ধন থেকে দেশদ্বারের অনুপ্রেরণা জাগানো। প্রাচীন ভারতের মর্মবাণী বা তার আধ্যাত্মিক চেতনাকে তাঁরা ঠিক আবিস্কার করতে পারেননি। কিন্তু রবীন্দ্রকাব্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যেমন ‘নৈবেদ্য’ কাব্যে। এখানে অনেকগুলো কবিতা রস-গভীরতায় রবীন্দ্রনাথের ভারতবোধকে উজ্জ¦ল করেছে। এই পর্যায়ের কবিতা ‘নৈবেদ্য’ কাব্য থেকে:

২৩: আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে,

২৩: এ আমার শরীরের শিরায় শিরায়,

২৮: তুমি তবে এসো না; বোসো শুভক্ষণে

৩০: বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়,

৩১: তোমার ভুবন মাঝে ফিরি মুদ্ধসম

৪৭: আঘাত সংঘাত মাঝে ফিরি দাঁড়াইনু আমি

৬০: একদা এ ভারতের কোন বনতলে

৭২: চিত্র যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা শির

৯৪: হে ভারত, নৃপতিরে শিখায়েছ তুমি,

৯৫: হে ভারত, তব শিক্ষা দিয়েছে যে ধন,

৯৯: তব কাছে এই মোর শেষ নিবেদন

ভারতবর্ষের ইতিহাস আলোচনা করার সময়ে রবীন্দ্রনাথ মনে রেখেছিলেন, খণ্ডতা, বৈচিত্র্য ও বহুত্বের মধ্যে ভারত বর্ষের সাধনা একটি পরম সমন্বয়ের অনির্বাণ আলোক শিখায় আলোকিত হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের ভারত বোধে সর্ব জাতি এবং সর্ব শ্রেণীর মানুষ সমাদৃত হয়েছে। গীতাঞ্জলির ‘ভারততীর্থ’ কবিতাটি এই পর্যায়ের। সাময়িক পত্রে (প্রবাসী, শ্রাবণ, ১৩১৭) প্রকাশের সময় ভারততীর্থের নাম ছিল ‘মাতৃ অভিষেক’। ভারত ভূমিকে কবি বলেছেন ‘পুণ্যতীর্থ’। পুণ্যতীর্থ কারণ ভারত ভূমির বহু জাতি এবং বহু মানুষের মিলনস্থল। কবির ধর্ম ‘মানুষের ধর্ম’ কবির ঈশ্বর ‘নরদেবতা’ সুতরাং সেই মানুষের আবাস ভূমি পুণ্যতীর্থ হবেই। ভারতভূমি পুণ্যতীর্থ এই চিন্তা রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব নতুন কিছু নয়। কিন্তু ভারতবর্ষ মহামানবের সাগরতীর এবং এই মহামানবের আরাধ্য দেবতা হচ্ছেন ‘নরদেবতা’ এই কল্পনা ররীন্দ্রনাথের নিজস্ব। তাঁর এই ভাব কল্পনার ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন : দেশ বলতে কেবল তো মাটির দেশ নয়। সে যে মানবচরিত্রের দেশ। দেশের বাহ্য প্রকৃতি আমাদের দেহটা গড়ে বটে, কিন্তু আমাদের মানব চরিত্রের দেশ থেকেই প্রেরণা পেয়ে আমাদের চরিত্র গড়ে ওঠে।

ভারত বর্ষ মহমানবের সাগর তীর কেন? রবীন্দ্রনাথের রচনাতেই এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে। তিনি লিখেছেন :

কবির নিজেকে বলেছিলেন ভারত পথিক, ভারতকে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন মহাপথ রূপে। এই পথে ইতিহাসের আদিকাল থেকে চলমান মানবের ধারা প্রবাহিত। এই পথে স্মরণাতীতকালে এসেছিল যারা, তাদের চিহ্ন ভূগর্বে। এই পথে এসেছিল হোমাগ্নি বহন করে আর্যজাতি। এই পথে একদা এসেছিল মুক্তি তত্ত্বের আশায় চীন দেশ থেকে তীর্থ যাত্রী। আবার কেই এসেছে সা¤্রাজ্যের লোভে, কেই এল অর্থ কামনায়। সবাই পেয়েছে আতিথ্য। এ ভারত পথের সাধনা, পৃথিবীর সকল দেশের সঙ্গে যাওয়া-আসার নেয়া-দেয়া সম্বন্ধ, এখানে সকলের সঙ্গে মেলবার সমস্যা সমাধান করতে হবে। এই সমস্যার সমাধান যতক্ষণ না হয়েছে ততক্ষণ আমাদের দুঃখের অন্ত নেই। এই মিলনের সত্য সমস্ত মানুষের চরম সত্য, এই সত্যকে আমাদের ইতিহাসে অঙ্গীভূত করতে হবে।

এই মিলনের সত্য সমস্ত মানুষের চরম সত্য। এই সত্যকে আমাদের ইতিহাসে অঙ্গীভূত করতে হবে; এ কারণেই ‘ভারতীর্থ’কবিতার শেষ স্তবকে এই উদার উদাত্ত আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে :

এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু মুসলমান

এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খ্রিস্টান

এসো ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন, ধরো হাত সবাকার

এসো হে পতিত, হোক অপনীত সব অপমানভার।

মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা

মঙ্গল ঘট হয়নি যে ভরা

সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীড়ে-

আজি ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।।

বস্তুতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের ভারতবোধ এখানে বিশ্ব চেতনায় উন্নীত হয়েছে। এরই নাম বিশ্বমৈত্রী।

রবীন্দ্রকবিতায় ভারতবোধ ও স্বাদেশিকতা বিষয়ে আলোচনায় কবিতায় ভারত বোধের যে পরিচয় আমরা পেয়েছি, তা গভীর, ব্যাপক এবং বিশ্বমৈত্রির নামান্তর। সমগ্র গীতবিতানে এ রূপ গভীরতা ও ব্যাপকতা থাকলেও ‘স্বদেশ’ পর্যায়ের সঙ্গীতে এতটা ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য আছে বলে মনে হয় না। অবশ্য এই স্বদেশ পর্যায়ের সঙ্গীত ভারতীর্থ।

‘গীতবিতান’ এবং জাতীয় সঙ্গীত পর্যায়ে ১৬টি গান রয়েছে (গীতবিতান, অখণ্ড সংস্করণ, পৌষ ১৩৮০) ‘ভারত রে তোর কলঙ্কিত পরমানুরাশি, অয়ি বিষাদিনী বীণা আয় সখী, গানো সেইসব পুরানো গান’ ‘এ কি অন্ধকার এ ভারত ভূমি’ ঢাকো রে মুখ, চন্দ্রমা জলদে, দেশে দেশে ভূমি তব দুখ গান গাহিয়ে, ‘হে ভারত আজি তোমারই সভায় শুন এ কবির গান, ‘নব বৎসরে করিলাম পণ লব স্বদেশের দিক্ষা। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন রবীন্দ্রনাথকে স্বদেশের সঙ্গীত রচনায় অনুপ্রাণিত করলেও উদ্ধৃত গানগুলোতে মাতৃভূমি তথা ভারত ভূমির প্রতি কবি প্রাণের মমতা প্রকাশ পেয়েছে। গানগুলোতে জাতীয়তা বোধের স্ফুরণ লক্ষণীয় হিন্দু মেলার সংস্পর্শে এবং ঠাকুর বাড়ির পরিবেশে তের বছর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এই বোধের স্ফুরণ হয়েছিল। একে আমরা ভারত বোধ বলতেই পারি। ‘নব বৎসরে করিলাম পণ’ নব স্বদেশের দীক্ষা/তব আশ্রমে তোমার চরণে, হে ভারত, লব শিক্ষা, সঙ্গীতটিতে স্বদেশ শব্দটি সুচিন্তিত প্রয়োগ, এখানে ‘স্বদেশ’ এবং ‘ভারত’ সমার্থক। আলোচ্য সঙ্গিতগুলোতে ভারত জননীর অতীত গৌরবের কথা কবি স্মরণ করেছেন এবং তিনি নতুন জীবনের জন্য দীক্ষা নিতে চেয়েছেন ভারতের কাছে।

গীতবিতানের এই সঙ্গিতটি নিশ্চয়ই আমাদের মনে করিয়ে দেবে ‘নৈবেদ্য’ কাব্যে একাধিক কবিতা, যেখান ‘হৃদয়রাজ’ শব্দটি প্রতিধ্বনি রয়েছে এবং কবির প্রাণের বেদনা একই সুরে তালে ধ্বনিত হয়েছে।

তবে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী সঙ্গীত রচনার শ্রেষ্ঠকাল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের যুগ। এই যুগে আসমুদ্রহিমাচল বঙ্গভূমির সমাবেত ব্রিটিশ বিরোধিতায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। ১৩০৫ সালে ২০ জুলাই লর্ড কার্জনের ব্যবস্থাপনায় বঙ্গভঙ্গের অনুমতি দেয়া হয়েছিল এবং ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ হয়। ১৯০৩ সালে ৩ ডিসেম্বর বঙ্গদেশে প্রস্তাব প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯০৩ থেকেই সমগ্র বাংলায় বিদ্রোহ বিক্ষোভ দেখা দেয়। স্বদেশী আন্দোলন কালে রচিত রবীন্দ্রসঙ্গীত গুলোর একটি তালিতা দিয়েছেন রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপ্যাধ্যায়। যেমন:

‘এবার তোর মরা গাঙ্গে বান এসেছে’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘আজ বাংলাদেশের হৃদয় হতে’, যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, বাংলার মাটি বাংলার জল, বিধির বাঁধন কাটবে তুমি, আমার সোনার বাংলা, ও আমার দেশের মাটি, নিশি দিন ভরসা রাখিস, আমি ভয় করবো না, এখন আর দেরি নয়, ইত্যাদি।

১৯০৫-এর ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ দিবসে দেশব্যাপী রাখিবন্ধন ও অরন্ধনব্রোতের একামাত্র সঙ্গীত ছিল “বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল/ পুণ্য হউক পুণ্য হউক পুণ্য হউক হে ভগবান, এবং ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে ততই বাঁধন টুটবে’ —-এই গান ২টি রবীন্দ্রনাথের এই স্বদেশী সঙ্গীতগুলিতে দেশ মাতৃকা অত্যন্ত নিরাকার হলেও এরই মধ্যে রয়েছে

‘বিশ্বময়ীর, বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা,

আর রবীন্দ্রকবিতায় ভারতবর্ষের যে আশ্চর্য সুন্দর ভৌগোলিক রূপ ফুটে উঠেছে, ভারতের ধর্ম সংস্কৃতির যে ধ্যান মূর্ত হয়েছে, তার প্রকাশ হয়েছে সমন্বিত অবস্থায় এই গানটিতে-

অয়ি ভূবনমনোমহিনী, মা

অয়ি নির্মলসূর্যকরোজ্জ্বল ধরনী জনক জননী জননী

– – – – –

– – – – –

– – – – –

চিরকল্যাণময়ী তুমি ধন্য, দেশ বিদেশে বিতরিছ অন্ন

জাহ্নবীযমুনা বিগলিত করুণা পুণ্য পিযুষ স্তন্য বাহিনী।

:: ড. গা জী র হ মা ন

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj