স্মরণ : সংগ্রাম, সৃজন ও বোধের শিল্পী নিতুন কুণ্ডু

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও বাঙালির স্বদেশ-চেতনা ও দেশ ভাবনা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এক স্বপ্নময় রাষ্ট্র নির্মাণের। এ রাষ্ট্রের রুচি ও সাংস্কৃতিক প্রতিমান নিতুন কুণ্ডু গড়তে চেয়েছেন। সে জন্য তাকে লড়াই করতে

হয়েছে নিজের সঙ্গে।

বাংলাদেশে চিত্রকলা আন্দোলনে নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল হয়ে আছেন শিল্পী নিতুন কুণ্ডু। সৃজন ও বোধের প্রতীক অমরশিল্পী নিতুন কুণ্ডু। ২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যু নামের জমদূত তাকে কেড়ে নিয়েছে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি জগৎসংসার থেকে। তার মহাপ্রয়াণ দিবস উপলক্ষে জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি। নিতুন কুণ্ডুর সৃষ্টি এ দেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে। তিনি জ্যামিতিক গড়নে ফুটে তুলেছিলেন এ দেশের অপার সৌন্দর্যকে। মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় করে অজস্র চিত্রকল্প রচনা করেছিলেন। যা মুক্তিকামী মানুষকে আন্দোলিত করতো। অরণ্যের শস্যগন্ধা নদীমাত্রিক স্বপ্ন রেখায় রাঙিয়েছেন জীবনের বর্ণিল রঙ। তাই মানুষের মনে-প্রাণে রয়েছেন সবসময়।

শিল্পী নিতুন কুণ্ডু বাংলাদেশের সংস্কৃতির অন্তর্ভুবনকে নানা ধরনের কর্মপ্রবাহ, উদ্ভাবনী শক্তি, সৃজন-তৎপরতা দ্বারা সমৃদ্ধ ও উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধিই শুধু করেননি, তিনি শিল্পের সকল শাখায় বিচরণ করেছিলেন। নিতুন কুণ্ডুর চিত্রকল্প এ দেশের মানুষের কাছে অগ্রগণ্য শিল্পী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। তিনি জ্যামিতির ফর্মের ভেতর দিয়ে সৌন্দর্যকে সন্ধান করেছেন। এ অন্বেষণে তিনি সফল এক মানুষ। তার শিল্পকর্মে আবিষ্কার করেছেন বিষয়ের পরিবর্তনশীল আর্তি, গতি ও রূপান্তর। এই অনুষঙ্গই তাকে ফর্ম ভাঙার খেলায় প্রণোদনা জুগিয়েছে। জ্যামিতি ও ফর্ম তার ছবিকে বিশিষ্ট করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার চিত্রভাষা। ভাস্কর্য, ফোয়ারা, মঞ্চ ও তোরণ নির্মাণেও নিতুন কুণ্ডু অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যান। শিল্পে নতুন মাত্রা সঞ্চার করেছিলেন।

বাঙালির জীবন-সংগ্রাম ও প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যেও ব্যঞ্জনা রূপায়ণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজস্ব শৈলী ও চিত্রভাষা নির্মাণেও সমর্থ হন। বাঙালির প্রবহমান ঐতিহ্য ও ছন্দের সঙ্গে আধুনিক শৈলীর সম্মিলনে সৃষ্টির উদ্যানকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। সমকালীনদের মধ্যে তার এই শিল্পকুশলতা বিশিষ্ট বলে চিহ্নিত হয়েছে। ষাটের দশকে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সৃষ্টিকর্ম আলোড়িত করেছে। সৃজনীবৃত্তির একটি প্রবল নতুন মাত্রায় তিনি পদার্পণ করেছিলেন। তাই প্রাণের শক্তিতে তিনি মজবুত ও ঔজ্জ্বল্য হয়ে উঠেছিলেন।

ষাটের ও সত্তরের দশকে করা তার চিত্রসমূহে সৃজনী উৎকর্ষের স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি ছিলেন আর্ট ইনস্টিটিউটের মেধাবী ও উজ্জ্বল ছাত্র। তার ড্রইং ছিল শক্তিশালী ও তেলরঙের কাজে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ে ইউসিসে তিনি ছাপাই ছবির যে প্রদর্শনী করেছিলেন নান্দনিক বৈভব ও চিত্রশৈলীতে তা অভিনব বলে বিবেচিত হয়েছিল। তাইতো তিনি ১৯৬৫ সালে জাতীয় চিত্রকলা পুরস্কার ও ১৯৯৭ সালে সর্Ÿোচ্চ জাতীয় বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। চিত্রকলার পাশাপাশি শিল্পের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সমান ভূমিকা পালনকারী শিল্পী নিতুন কুণ্ডুর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পোস্টার ডিজাইন, ১৯৯২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সাবাস বাংলাদেশ’ নির্মাণ, ১৯৯৩ সালে ঢাকায় নির্মিত ‘সার্ক ফোয়ারা’। মেধা মননে তিনি অটবিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ তিন দশক অটবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাই তো শিল্প সমালোচক মাহমুদ আল জামান তার শিল্প সম্পর্কে বলেছেন, নিতুন কুণ্ডু বিমূর্ততায় চিত্র-সাধনা করেছেন। ষাটের দশকে এ ধারায় তিনি ছাপাই ছবি ও চিত্র রচনা করলেও পরবর্তীকালে স্বাধিকারের প্রমত্ত চেতনা তার মানসে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও বাঙালির স্বদেশ-চেতনা ও দেশ ভাবনা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এক স্বপ্নময় রাষ্ট্র নির্মাণের। এ রাষ্ট্রের রুচি ও সাংস্কৃতিক প্রতিমান নিতুন কুণ্ডু গড়তে চেয়েছেন। সে জন্য তাকে লড়াই করতে হয়েছে নিজের সঙ্গে। পরিবেশের সঙ্গে ও শিল্পের সঙ্গে। এ কাজ করতে গিয়ে সাময়িকভাবে তার চিত্রচর্চায় ছেদ পড়েছিল সন্দেহ নেই।

ষাটের কিংবা সত্তরের দশকে তিনি যে বিমূর্ত অভিব্যক্তি দ্বারা আলোড়িত ছিলেন আশির দশকে এসে যখন চিত্র-সাধনায় নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সঁপে দিলেন তখন তার চিত্রে জ্যামিতি ও ফর্ম যেন আরো বলীয়ান হয়ে উঠলো। এ জ্যামিতি তার চিত্রে নবযাত্রা সংযোজিত করেছে। রেখার সম্মিলনে, রঙের নানাবিধ ব্যবহারে বিমূর্ত প্রকাশবাদী এই চিত্রগুচ্ছ বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলায় সূ² বোধে সংবেদনময় হয়ে উঠলো। জ্যামিতিক আকৃতিসমূহ শূন্য পরিসরে প্রধানত দ্বিমাত্রিক অবয়বে এক নতুন ইমেজ নিয়ে ধরা দিলো। এই চিত্রসমূহে বস্তুর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকে তিনি আশ্চর্য মমতায় উন্মোচিত করেছেন। এই উন্মোচনের মধ্যে আমরা মানবিক অনুভূতির তীব্রতা ও নিতুন কুণ্ডুর সৌন্দর্যানুভূতিকে ব্যাপক পরিসরে প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি জ্যামিতিক অবয়ব গঠন করেছেন রেখা ও রঙের বিন্যাসে। কখনো প্রকৃতির ছন্দোময় রূপকেও তুলে ধরেছেন।

নিতুন কুণ্ডু নিজের একাগ্রতা, লক্ষ্যভেদী দূরদৃষ্টি ও অনুপম সৃষ্টিশীলতা নিয়ে তিনি কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে তিনি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছিলেন। মূলত তিনি একজন প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী ছিলেন। পাশাপাশি ভাস্কর্যে তাঁর ঈর্ষণীয় ক্ষমতাও প্রকাশ করেছেন। আজীবন জেদি, সংগ্রামী ও লড়াকু জীবন কাটিয়েছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান ও মরমী শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদেরও প্রিয় ছাত্র ছিলেন।

শিল্পী নিতুন কুণ্ডু ১৯৩৫ সালে দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভকারী এ শিল্পীর জীবদ্দশায় চারটি একক প্রদর্শনী হয়েছে। এছাড়া তার চিত্রকল্প বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে স্থান পায়। সর্বোপরি নিতুন কুণ্ডু জীবন সংগ্রামে বিজয়ী বীর। তার সৃষ্টিকর্ম জাতি অনন্তকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

:: আ বু ল কা লা ম আ জা দ

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj