অন্ধ কারার অন্তরালে

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪

(পূর্ব প্রকাশের পর)

হৃদয়সঞ্জাত অভিমানের ওপর ভালোবাসার প্রলেপ লেগে আবেগমথিত করে তুলেছে তাকে। অন্তরের নিত্য ভালোবাসা থেকেই সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে তাই এই অভিযোগ। তার উচ্চশিক্ষিত যৌক্তিক মন শৈশব থেকে শেষ কৈশরের নিদারুণ অভিজ্ঞতায় তাকে বহুভাবে জানিয়ে দিয়েছে বহুবার, নিত্য কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, নিষ্ঠুরতা, নৈতিক স্খলনে মানুষ যেখানে অন্ধকারের আব্রু পরে থাকে নিরন্তর, সেখানে আলোর আশীর্বাদ তাদের পক্ষে লাভ করা সম্ভব নয়

ফেটে পড়ছে জীর্ণ শরীরের রেখা ভেদ করে দুঃখ ব্যথার উদগ্র ইতিহাস। এসব দৃশ্যপাট চোখে পড়লেই অশ্রæর অস্তিত্ব দেখা দেয় অবিন্নার দুই চোখ জুড়ে। নিরাশার অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠে বুকের তলে তলে।

জেসানের কানের কাছে বুকভরা ব্যথা নিয়ে ফিসফিস করে সে- দেখেছো জেসান, ওরা গরু দুটোর গলার কাছে ফুটো করে কিভাবে রক্ত পান করে তৃষ্ণা মেটাতে চাইছে? জেসানও ফিসফিস করে কথা বলে জবাবে- দেখেছি! তবে এসব দৃশ্য কোনো নতুন ঘটনা নয় আমার কাছে অবিন্না! ফাদারের সঙ্গে প্রত্যন্ত গাঁয়ে কাজ করতে গিয়ে এর আগেও বুভুক্ষু মানুষগুলোকে গরুর রক্ত আমি পান করতে দেখেছি! তাই বলে এভাবে শরীর ফুটো করে রক্ত টেনে নেয়া? সে যে বড় নিষ্ঠুরতার কাজ! প্রয়োজন মানুষকে দিয়ে সব করাতে পারে অবিন্না! তবে শুধু তৃষ্ণা নিবারণ নয়, গরুর রক্ত থেকে এভাবেই নিজেদের খাদ্য আর পুষ্টি সংগ্রহ করে ওরা! কিন্তু এমন করে কতদিন বেঁচে থাকা চলবে? অভুক্ত গরুগুলো নিজেদের দেহের রক্ত দিয়েই বা কতদিন নিবারণ করবে এদের নিত্য ক্ষিধে তৃষ্ণার যন্ত্রণা? যতদিন সম্ভব হবে। ঘাসের সন্ধান যতদিন না মিলবে, এভাবেই দিনের পর দিন ঘুরে বেড়াবে ওরা। চলতি পথের মাঝখানে চলতে চলতে মারা পড়বে অনেক গরু, ছাগল কিংবা মেষ! কুড়িটা সঙ্গে থাকলে এক সময় তার সংখ্যা হয়তো পাঁচে এসে দাঁড়াবে! আহা! ওই যে পথের পাশে অনেক মরে পড়ে আছে, ওরাও বোধকরি এককালে …! হ্যাঁ। অবিন্না হঠাৎ অদ্ভুত এক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে এরপরে- কেন আমার স্বদেশভূমি এমনভাবে অভিশপ্ত হলো জেসান? ফাদার যে ছেলেবেলা থেকেই আমাদের শুনিয়ে এসেছেন, ঈশ্বর দয়াময়! তাঁর প্রেমের ধারা জগতের সর্বত্র সঞ্চারিত! সে কি সত্যি কথা? নিশ্চয়ই! তাহলে কেন দীর্ঘ অনাবৃষ্টিতে আমাদের জন্মভূমি এভাবে উষর হয়ে উঠছে ক্রমাগত? এই যে বৃষ্টির অভাবে মাইলের পর মাইল জুড়ে জলহীনতা, তার জন্যইতো এই প্রাণীগুলো অসহায়ভাবে ধুঁকেধুঁকে মরছে! ঘাসহীন হয়ে পড়ে আছে শূন্য প্রান্তর! ফসলহীন আমাদের ফসলের মাঠ! আমরা ঈশ্বরকে কেন তারপরেও দয়াময় বলবো?

জেসান জানে, এসব জিজ্ঞাসার সব উত্তরই জানা আছে অবিন্নার। তার জিজ্ঞাসা অনভিজ্ঞতার কারণে নয়। হৃদয়সঞ্জাত অভিমানের ওপর ভালোবাসার প্রলেপ লেগে আবেগমথিত করে তুলেছে তাকে। অন্তরের নিত্য ভালোবাসা থেকেই সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে তাই এই অভিযোগ। তার উচ্চশিক্ষিত যৌক্তিক মন শৈশব থেকে শেষ কৈশরের নিদারুণ অভিজ্ঞতায় তাকে বহুভাবে জানিয়ে দিয়েছে বহুবার, নিত্য কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, নিষ্ঠুরতা, নৈতিক স্খলনে মানুষ যেখানে অন্ধকারের আব্রু পরে থাকে নিরন্তর, সেখানে আলোর আশীর্বাদ তাদের পক্ষে লাভ করা সম্ভব নয়। উটের পিঠে পথ চলতে চলতে অনেক সময় নিঃশব্দ থেকে সে নিজেই এরপরে তাই কথা বললো বাস্তব পদক্ষেপের অভিপ্রায় নিয়ে- আমি একটা কথা ভাবছি জেসান। মরুভূমিতেও বেঁচে থাকতে পারে এমন কিছু গাছ যতটা পারি আমরা এখানে রোপণ করার ব্যবস্থা করবো শিগগিরিই। সবুজের কিছুটা আয়োজন করা গেলে মৌসুমের মাসে কিছুটা বৃষ্টি অন্তত পাওয়া যাবে। তৃণভোজী প্রাণীরাও খেয়ে বাঁচতে পারে, এমন গাছ লাগিয়ে দিলে…। হ্যাঁ আইডিয়াটা যথেষ্ট পজিটিভ অবিন্না। মরুভূমির তীব্র তাপ সয়ে বেঁচে থাকতে পারে, এমন কিছু সবজি আর ফসল চাষের ব্যবস্থা নিলেও আশা করি সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাহলে আর দেরী করা চলবে না। মানুষ খেয়ে পরে বাঁচতে পারলে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা আমাদের পক্ষে অনেকখানিই সহজ হয়ে উঠবে, দেখো। পেটের নিত্য ক্ষিধে যেখানে এত প্রবল সেখানকার মানবসমাজে তো ভালো কিছু প্রত্যাশা করা চলে না। শিক্ষা দীক্ষা সবই দান করা সম্ভব হয়, ক্ষিধের জ্বালা নিভে গেলে!

অবিন্নার আশায় উতরোল মুখের দিকে না তাকিয়েও জেসান ওকারো এক ঝলক উষ্ণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস শূন্যতার হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো। মেয়েটার বুকের মধ্যে মাতৃভূমির জন্য কী অতল প্রেমই না দাপাদাপি করে বেড়ায় সারাক্ষণ, ভাবলো সে। কথাগুলো অবিন্না এমন করে বলছে, যেন সফলতার গ্রাফিক চিত্র এক্ষুনি সে দেখতে পাচ্ছে। জীবনের সব রকম সফলতার দরজাগুলো যেখানে এমন বিস্তীর্ণ হতাশায় রুদ্ধ হয়ে আছে, ভালোবাসার আবেগ সেখানে কতটা পাবে স্বপ্ন সফলের সার্থকতা? অবিন্না ওকারো কতখানি পেরে উঠবে আবুজান উথমানের স্বপ্নের রূপকার হয়ে উঠতে? অবিন্না উত্তর না পেয়ে এবার জিজ্ঞেস করলো- আমার প্রস্তাবটাকে তুমি সিরিয়াসলি নিচ্ছো তো জেসান? অবশ্যই। কিন্তু এসব তো আর দুচার বছরের কাজ নয় অবিন্না। যুগ যুগ ধরে এখানে যেভাবে সবুজ বনভূমি ধ্বংস করে মরুকরণ তরান্বিত করা হয়েছে, তাকে কিছুটা সহনশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেও যে অনেক সময়ের প্রয়োজন! জানি। কাজটা আমরা বেঁচে থাকতে সম্পূর্ণ করতে পারবো না। তবু কাজটা শিগগিরই শুরু করে দিতে চাই। আর একই সঙ্গে আগ্রহ সৃষ্টি করতে চাই সব সাধারণ মানুষের মধ্যে। যাতে তাদের দাবি অনুযায়ী ভবিষ্যতে সরকারি পর্যায়েও এই পদক্ষেপগুলো কাজে লাগানো চলে।

একটি পরিত্যক্ত পল্লীর ভুতুড়ে পরিবেশের ভেতর দিয়ে এখন এগিয়ে চলেছে ওদের ক্লান্ত উট। বছর দশেক আগেও যেখানে লোকের বাসস্থান ছিল। এখন বিস্তৃত বালির ধূধূ জুড়ে দূরে এবং অদূরে বিক্ষিপ্ত, ইতস্তত দুচারখানা কুটির ভগ্নদশা নিয়ে সেই অতীতের চিহ্ন বহন করে চলেছে। যেখানে একদিন প্রাণচাঞ্চল্য ছিল জীবনের বৈচিত্র্য নিয়ে। ছিল ফসলের চাষভূমি। সবুজ ঘাসে গরু, ছাগল, উট, মেষ প্রভৃতি তৃণভোজী প্রাণীরা চড়ে বেড়াতো জীবন স্পন্দন ছড়িয়ে রেখে। তারপরে এলো অনাহূত, অপ্রতিরোধ্য দুঃসহ সেই মুহূর্তগুলো। এসেই ঝাঁপিয়ে পড়লো যুদ্ধবিক্রম শত্রুদলের সৈন্যদের মতো। তাতেই মানুষগুলো দলে দলে গ্রাম ছেড়ে উদ্বাস্তু হলো স্বপ্নভঙ্গ হয়ে। খাদ্যাভাবে, জলাভাবে পশুরা মরলো দলে দলে। পাঁচ বছরের অনাবৃষ্টি আর দীপ্ত সূর্যের নিত্য অগ্নি¯œানে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেল চারপাশ। মাইলের পরে মাইল জুড়ে প্রাণহীন সাহারা তার প্রাণহীনতার সা¤্রাজ্য ছড়ালো নির্বিচারে। সাহারার সেই প্রাণহীন অন্তর জুড়েই অবিন্না ওকারো আজ প্রাণ সঞ্চারণের স্বপ্ন দেখছে। উত্তপ্ত বালিরাশির বুকে সবুজ বিপ্লবের প্রত্যাশা এখন ব্যাকুল করছে তাকে।

মৃত গ্রাম ছেড়ে ওরা এখন জউরাত গাঁয়ের সীমানায়। দূর থেকেই চোখে পড়লো কুয়ো থেকে পানীয় জল তুলছে মেয়েরা। দূর দূরান্ত থেকে এখানেই ওরা রোজ আসে পানীয় জল সংগ্রহ করতে। সে দৃশ্য চোখে পড়তেই অবিন্না সেখানে উট থামাতে বললো- জেসান, ওখানেই আমাদের থামতে হবে। আজ পাঁচদিন হলো ওর পেটে জল পড়েনি। ওই দেখো, কাছেই উটদের জল খাওয়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েকজন লোক জল খাওয়াচ্ছে ওদের। জেসান সঙ্গে সঙ্গেই উটের মুখ ডানদিকে ঘোরালো এবং কয়েক কদম সামনে এগিয়েই উৎফুল্ল হয়ে উঠলো সে-মনে হচ্ছে ক্যারাভান ট্রেডারদের উট ওগুলো! তবে তো ভালোই হলো! দেখো ওদের কাছে আমাদের প্রয়োজনীয় কোনো জিনিসপত্র যদি পাওয়া যায়! অবিন্নার কণ্ঠস্বরেও তরঙ্গ তুললো খুশির ঢেউ।

ক্যারাভান ট্রেড মূলত পাহাড়ে বসবাসকারী বেদুইনদের একচেটিয়া ব্যবসা। সাহারা মরুর বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে নানান জিনিসপত্র বিক্রি করে ওদের যেমন সংসার চলে, নানা গাঁয়ের মানুষগুলোও তেমনি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করার সুযোগ পায়। চাকাওয়ালা কাঠের গাড়ি উটের পিঠে চাপিয়ে দ্রব্য বোঝাই করে দিনের পরে দিন ওরা ঘুরে বেড়ায় শুকনো মরুর বুক জুড়ে। জেসানের অনুমান মিথ্যে নয়। কাছে আসতেই ঢালু স্তরে কয়েকটা খেজুর গাছের নিচে দুটো ক্যারাভান গাড়ি ওদের চোখে পড়লো। কিছুটা উঁচুতে এক বালির ঢিবির কাছেই পাশাপাশি দুটো মেটে চৌবাচ্চা। এসব চৌবাচ্চা সরকারি কিংবা বেসরকারি দুভাবেই তৈরি করা হয় মরুভূমির চলতি পথে উট কিংবা অন্যান্য প্রাণীদের তৃষ্ণা নিবারণের উদ্দেশ্যে। মরুভূমির দীর্ঘ পথে উট ছাড়া অন্য প্রাণীদের চলাচল অবশ্য অত্যন্ত কম। অনেকগুলো উট একসঙ্গে জলপান করছিল যেখানে, সেখানে উট থামিয়ে নেমে দাঁড়ালো দুজনে। অবিন্নার পরিধানে শহুরে নারী সমাজের ভদ্রোচিত পোশাক আপাদমস্তকে আব্রু হয়ে ছড়িয়ে ছিল।

তারপরেও তার দিকে পলকহীন তাকিয়েই উপস্থিত পুরুষগুলোর চোখে অশ্রদ্ধা এবং অবজ্ঞার বিতৃষ্ণা যেন ফুটে বেরুলো স্পষ্ট রেখায়। পুরুষের সঙ্গে উটের পিঠে সওয়ার হয়ে এভাবে খোলা মরুতে ঘরের আউরাতদের ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য সম্ভবত অত্যন্ত নিন্দনীয় এখানকার জনসমাজে। অবিন্না তৃষ্ণার্ত উটটির জন্য জল প্রার্থনা করলো। বছর ভরে মরু প্রাণীদের জল পান করানোর উদ্দেশ্যে যে লোকগুলো চাকরি নিয়েছে সেখানে, তাদের কেউ সাড়া দিল না তার অনুরোধে। তার চেতনাবোধ জাগ্রত হলো সঙ্গে সঙ্গে। অবিন্না দ্রুত সরে গিয়ে কুয়োর ধারে সমবেত রমণীদের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো।

জেসান এরপরে জল প্রার্থনা করলো তৃষ্ণার্ত উটের জন্য। মুনিষগুলোর ভেতর থেকে এবার একজন উঠে এলো। সে মৃদু কিন্তু রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলো- তোমরা কি শহরবাসী লোক? হ্যাঁ। সে জন্যই হয়তো জানো না, ভিন পুরুষদের কাছে জেনানাদের এভাবে জল চাইতে নেই! তাতে পুরুষকে আপমান করা হয়! ও কি তোমার বিবি নাকি? আমার বিবি। তোমার বিবিকে তাহলে জানিয়ে দেবে কথাটা! নিশ্চয়ই। আর কখনো এ রকম ভুল হবে না! জেসানের বিনয়ীভাবে খুশি হলো মানুষটা। তারপর উটটাকে টেনে এনে চৌবাচ্চার ভেতর মুখটাকে নামিয়ে দিল। এবার তার মুখের ওপর হাসির আভাস স্পষ্ট হলো- শহর থেকে এতদূরে তোমরা কী করতে এসেছো? আসল উদ্দেশ্যের কথা চেপে গেল জেসান। কারণ ছেলেবেলা থেকেই এই অভিজ্ঞতা তার সঞ্চিত, এখানে বাইরে থেকে যে কোনো বিষয়ে শিক্ষাদান করতে এলে তাদের সম্বন্ধে বন্ধুত্বসুলভ ধারণা এদের মধ্যে জন্মায় না। এরা ধর্মগ্রন্থকেই একমাত্র সব শিক্ষাদানের বিষয় বলে জানে ও মানে। এমনকি পুরুষের বহুবিবাহ, মেয়েদের খৎনা অথবা ওষুধ খাইয়ে বাল্যকালেই মেয়েদের বেড়ে ওঠার কুফল সম্পর্কে অবিন্না কাজের ফাঁকে ফাঁকে গল্পচ্ছলে যে ব্যাখ্যাগুলো শোনায়, সে সম্বন্ধেও যে কোনো রকম বাক্য উচ্চারণ করা চলবে না, সে সম্পর্কেও সতর্ক হলো সে। লোকটি তার মুখের দিকে নিরীক্ষণের ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে এবার জানতে চাইলো- এখানে তোমরা কোথায় যেতে চাও? খায়েদি। বাপ্ রে! সে তো এখনো আট দশ মাইলের পথ! সেখানে যাচ্ছো কী উদ্দেশ্যে? এবার জেসানের কণ্ঠস্বরে উত্তরদানের আগ্রহ ঝরলো উৎসাহের ফুলকি হয়ে। সে বললো- সাহারা যাতে গ্রামের পর গ্রাম গিলে খেতে না পারে, যাতে তোমাদের ফসলের মাঠে ফসল ফলাতে পারো, কিছু কিছু বৃষ্টিপাত হয়ে যাতে গাছ আর ঘাস জন্মায়, যাতে তোমাদের গৃহপালিত তৃণভোজী জীবগুলো সেসব খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে, তার জন্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।

জবাব শুনে কেবল মানুষটা নয়, তার সহকর্মীরাও অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইলো জেসানের মুখের দিকে। কী বলছে শহুরে মানুষটা? এমন অদ্ভুত কথা জিন্দেগীতে শোনেনি তারা। এ কি বিশ্বাসযোগ্য নাকি আগন্তুক মানুষটা মস্করা মারছে তাদের সঙ্গে? লোকগুলোর মুখে তাকিয়েই জেসান অনুভব করলো, তার কথা এদের কাছে বোধগম্য হয়নি। নিতান্ত এই বুনো মানুষগুলো প্রকৃতির নির্মমতার ভাষা যতটা বোঝে, ততটাই কম বোঝে আধুনিক বিজ্ঞানের মর্মকথা। জেসান সেখানে দাঁড়িয়েই বুনো মানুষগুলোর পরিচিত ভাবনার পথ ধরে, তাদের অনুভবযোগ্য ভাষায় এরপরে অবিন্নার স্বপ্নের কথা শিক্ষাদানের বিষয় করেই যেন পাঠ শোনালো তাদের।

অবশ্যই তার নাম উহ্য রেখে। শুনতে শুনতে মানুষগুলোর মুখে সন্তুষ্টির হাসি ফুটলো। তারা রাতে অতিথি হতে আমন্ত্রণ জানিয়ে বসলো তাকে। অবিন্না রাজি হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। যদিও এখানকার সমাজ, বিশেষত পল্লী অঞ্চল নানান গোষ্ঠী, ক্লাস আর ভাষাভাষীদের কারণে অনির্বাণ সংঘর্ষে অস্থির, উত্তাল, তারপরেও অবিন্না রাতটা সেখানে কাটিয়ে যাওয়াই মনস্থ করলো। মরুভূমির বুক জুড়ে ঘণ্টা দুয়েক পরেই নেমে আসবে শীতল রাত। দিনের প্রচণ্ড ঊষ্ণতা থেকে হঠাৎই হিম হয়ে যাবে চরাচর। তখন অচেনা পরিবেশে খোলা প্রান্তরে ভয়ানক বিপদ ঘনিয়ে আসা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। বিশেষত ট্রাইব আর গ্রামবাসীদের সংঘাত তো প্রায় নিত্যদিনেরই ঘটনা। সে রাতে যে মানুষটার বাড়িতে তারা অতিথি হলো, সেটা এক গ্রাম প্রধানের বাড়ি। গ্রাম প্রধান আনান ইগবো অতিথি আপ্যায়নে ত্রুটি রাখলেন না কোনো। আহারপর্ব সমাপ্ত হলো, ছাগ মাংস আর কুচকুচ দিয়ে।

অনেক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল অবিন্নার। যে ঘরে তাদের ঘুমুতে দেয়া হয়েছে, গ্রাম প্রধানের মূল বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা বাইরে সেটা। খেজুর পাতার ছাউনি আর ডাল দিয়ে তৈরি। ঘরের দরজাখানাও নড়বড়ে। বাইরে থেকে দুচারবার ঘা খেয়েই খসে পড়লো অগোছালো হয়ে। সামনেই ভয়াল ভয়ের মতো দুজন আরব চেহারার মানুষ তখন খোলা মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের একজন ভেতরে ঢুকে রুক্ষ স্বরে প্রায় হিসহিস করে আরবি ভাষায় প্রশ্ন করলো- তোমরা কারা? কী উদ্দেশ্য নিয়ে এ অঞ্চলে প্রবেশ করেছো? অবিন্না মুহূর্তেই অনুভব করলো কী জবাব তার দেয়া উচিত। কারণ লোকটার মুখের চেহারা থেকে সে নিশ্চিত হয়েছিল এখানকার সাধারণ গ্রামবাসী সে নয়। আসার পথে দূরে যে পাহাড়শ্রেণী তাদের চোখে পড়েছিল, সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দাও নয় সে। গত মাসে ‘মৌরিতানিয়া এন্টারপ্রাইজ’ নামের নিউজপেপারে এর ছবিই সে দেখেছিল দুজন জার্মান ও চার ফ্রেঞ্চ টুরিস্টের কিডন্যাপার হিসেবে। মৌরিতানিয়া থেকে নিগার, সুদান হয়ে যে ইসলামিক রেডিক্যাল গ্রুপ সাহারা মরুর সীমান্ত জুড়ে দাপিয়ে বেড়ায়, হত্যা করে অমুসলিম টুরিস্টদের, লোকটা সেই গ্রুপেরই এক দীক্ষিত কর্মী। সে সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল- আমার নাম অবিন্না নিজোকু। এ আমার স্বামী, জামিক নিজোকু। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে হাতে ধরে থাকা অক-৪৭ সোজা করে জানতে চাইলো-সত্যি কথা বলছিস তো? ততোক্ষণে বাইরের লোকটাও উঠে এসেছে ভেতরে। জেসানের কপালের মাঝখানে তাক করে নিয়েছে তার অস্ত্র। অবিন্নার বুকের ভেতর হৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে ছিঁড়ে খুঁড়ে। জেসানের মুখের দিকে তাকানোর সাহস হারাচ্ছে সে। জেসান তখন নির্বিকার। মৃত্যুর স্পর্শ তাকে শীতল করে দিয়েছে সম্পূর্ণ। সহসা কী মনে হতে আগন্তুক তার অস্ত্র নামিয়ে বলে উঠলো- সালাফিস্ট, এদের কাউকেই তো কাফের খেরেস্তান বলে মনে হচ্ছে না! ভুল সংবাদ পেলাম নাকি? বলেই সে জেসানের কাঁধের ওপর আঘাত করলো প্রচণ্ড- এই শালা, সত্যি কথা বল! জেসান মৃত্যুর শীতলতা থেকে যেন মুহূর্তের জন্য ফিরে এলো জীবনে এবং পরক্ষণেই যন্ত্রণার প্রবল ঝড়ে সে সংজ্ঞা হারিয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়লো।

:: দীপিকা ঘোষ

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj