গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান করুন

আগের সংবাদ

চব্বিশে সমৃদ্ধির হাতিয়ার ডিজিটাল প্রযুক্তি

পরের সংবাদ

মেধা বিচার-বিবেচনায় তিনি প্রশংসার দাবি রাখেন

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১২, ২০১৯ , ৯:৩০ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০১৯, ৯:৩০ অপরাহ্ণ

প্রফেসর ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ

শিক্ষাবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক।

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা দেশের জনগণকে আরো বেশি আস্থাশীল করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি। গ্রামগুলোতে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেয়া, তরুণদের কর্মসংস্থান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে তা সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় আগামীর স্বপ্নে ভাসিয়েছে জনতাকে। সবার চাওয়া একটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে হবে আগে।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর দেশবাসী অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল পরবর্তী চমক দেখার জন্য। গত সোমবার দেশবাসী দেখল সে চমক। একঝাঁক নতুন মন্ত্রী নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের মন্ত্রিসভা। যাদের সবাই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অর্থমন্ত্রী একজন পেশাদার অ্যাকাউন্টেন্ট (এফসিএ), আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক- একজন আর্কিটেক্ট আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী, একজন শিক্ষিকার সন্তান-চিকিৎসা শাস্ত্রের মেধাবী শিক্ষার্থী এবারের শিক্ষামন্ত্রী, একজন কৃষিবিদ এখন কৃষিমন্ত্রী, পেশাদার কূটনীতিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সাবেক আমলা পরিকল্পনামন্ত্রী, নারায়ণগঞ্জের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী, দলের প্রচার সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী, কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা ধান চাল ব্যবসায়ী আজ খাদ্যমন্ত্রী, আইটি বিশেষজ্ঞ ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী, একজন অসমতল অঞ্চলের (পাহাড়ি) মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী, একজন কুরআনের হাফেজ আজ ধর্মপ্রতিমন্ত্রী, শ্রমিক নেত্রী শ্রম কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী, ডাক্তার স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী, রানা প্লাজায় হাসপাতালের দুয়ার খুলে দেয়া ডা. এনাম দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষা উপমন্ত্রী একজন গবেষক। তাঁরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজগুলো অতীতেও করে এসেছেন।

এদের বেশিরভাগই ইয়াং, ডেডিকেটেড, এনারজেটিক এবং পরিশ্রমী। প্রায় সবারই ব্যাকগ্রাউন্ড প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে চুলচেড়া বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আমি দারুণভাবে আশাবাদী নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে। বাংলাদেশকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে নতুন মন্ত্রিসভা তার মেধা, শ্রম আর সততার স্বাক্ষর রাখবেন এ প্রত্যাশা সবার।

যেহেতু আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন ও বিশাল দল। তাই, সবার সমান মূল্যায়ন করাটা দুরূহ। নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি ও মেধার পরিচয় দিতে এ সিদ্ধান্ত যুগোপযোগী মনে হয়েছে আমার কাছে। প্রবীণরা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে শক্ত স্তম্ভ গড়েছেন গত দশ বছরে এবার নবীনেরা উপসংহার টানবেন।

আর সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী তো বটবৃক্ষের মতো সবাইকে আগলে রেখেছেন। আমি বিজ্ঞানের শিক্ষক। তাই শিক্ষা এবং প্রযুক্তি-বিজ্ঞানের দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত হয় তা নিয়ে প্রচ-ভাবে উন্মুখ হয়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি আশ্বস্ত হলাম। এখন আত্মবিশ্বাসী। বুকের ছাতিটা বড় হয়ে গেল।

বঙ্গবন্ধুকন্যার মেধা, বিচার-বিবেচনা সব সময়ই প্রশংসার দাবি রাখে। ধরেই নিয়েছিলাম, অতীতের মতো এবারো ডায়নামিক, দক্ষ, যোগ্য, জনপ্রিয়, ত্যাগীরাই এগিয়ে থাকবেন। শেখ হাসিনার কাছে জনগণের যে চাওয়া, প্রত্যাশা, তার বাস্তব প্রভাব পড়বে এই মন্ত্রিপরিষদের মাধ্যমে। তাই, জনগণ অধির আগ্রহ নিয়ে চেয়েছিলেন নৌকার মাঝির দিকে।

তাদের বিশ্বাস, ওয়াদা পূরণে শেখ হাসিনার বিকল্প এ দেশে কেউ নেই। আগে থেকে শোনা যাচ্ছিল, এবার মন্ত্রিসভায় কয়েকজন নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। নতুন পুরাতন সবাইকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ বাস্তবায়নের যাত্রা শুরু করবেন।

টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার প্রধান লক্ষ্য, সরকারকে দল থেকে আলাদা করে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত, সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ গড়ার। এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার এক সপ্তাহ পর ১২ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল ৪৮ সদস্যর নতুন মন্ত্রিসভা।

এবারের নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে ইতিহাস সৃষ্টি করল আওয়ামী লীগ। কেননা, এত বিপুলসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ দেখেনি আগে। প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এদেশের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিল, ছিনিয়ে এনেছিল চূড়ান্ত বিজয়।

বন্যাসহ চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল তখন। আজ ৪৭ বছর পর ২০১৮ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেল তারই প্রতিচ্ছবি। এ জয় নিয়ে সমালোচকদের কানাঘুষা থাকলেও বাস্তব উপযোগিতা নেই বিন্দুমাত্র। এখন হিসাবটা সামনে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে। মহাজোটের কাঁধে এখন বিশাল দায়িত্ব।

মানুষ বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে মহাজোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। নানা শ্রেণির নানা বয়সের বিভিন্ন পেশার ছোট বড় অসংখ্য স্বপ্নের প্রতিফলন এবারের নির্বাচন। সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়- বিশাল জয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমতা আরো বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার আকাক্সক্ষা থেকে যায়, সেটা যেন না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

কারণ এ দেশের জনগণ তথা তরুণরা শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে নৌকা মার্কায় রায় দিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা- নতুন সরকার তাদের স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকবেন।

আজকের এ অগ্রযাত্রা ও মহাপরিকল্পনার সঙ্গে বিগত বিএনপির জোট সরকারের তুলনা এবং একাদশ নির্বাচন পূর্ববর্তী মূল্যায়ন না করলেই নয়। গত দুই এক মাস ধরে টেলিভিশন, পত্রিকায় দেখেছি ড. কামাল হোসেনের সরব উপস্থিতি। বিএনপির মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করছেন তিনি।

মাঝে মাঝে মান্না, রব সাহেব, সুলতান মনসুরসহ অনেকেই বজ্র বাক্য ছুড়ছেন। তাদের কথায় আমার মতো ষাটোর্ধ্ব নাগরিক ভড়কে যান। এ দেশের মানুষ অপশাসন, অন্যায় কখনোই প্রশ্রয় দেয় না। শেষ পর্যন্ত ৩০ ডিসেম্বর জনগণ তাদের বয়কট করে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিল।

বিএনপির ঠিক বিপরীত চিত্রটি দেখা যাক। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার ৬ বছর পর প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সামরিক জান্তার জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার পরও হাল ছাড়েননি তিনি। জীবন বাজি আর কণ্টকময় সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে স্বৈরাচারের হাত থেকে গণতন্ত্র উদ্ধার করেন।

১৯৯১ সালে সূক্ষ্ম কারচুপি, ভুয়া ভোটার লিস্ট ও নানা চক্রান্তের কারণে ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়েও লক্ষ্য পৌঁছাতে ব্যর্থ হন তিনি। এরপর বিএনপি সরকারের অনিয়মের বিরুদ্ধে চালিয়ে যায় আন্দোলন। ১৯৯৬-এর নির্বাচনে পরাজিত হয় বিএনপি। ক্ষমতায় যাওয়ার পরপরই রচিত হয় সুবর্ণ এক অধ্যায়ের।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটা ছিল প্রথম জয়। এরপর ২০০১ সালের লতিফ-শাহাবুদ্দিন-সায়েদ গং পরিচালিত নির্বাচনে নীল নকশার মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় আসে একাত্তরের পরাজিত শক্তি বিএনপি-জামায়াত। দেশে নেমে আসে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মঙ্গার প্রকোপ, চুরি লুণ্ঠন আর বোমাবাজির রাজনীতি।

গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪টি তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়া হয়। পরম করুণাময়ের অশেষ দয়ায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা। সেই সঙ্গে বেঁচে থাকে লাখো প্রাণের স্বপ্ন। ২০০৮ সালের নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা। আওয়ামী লীগ পায় ২৩০টি আসন, বিপরীতে বিএনপি-জামায়াত জোট পায় ৩০টি আসন।

এরপর শেখ হাসিনা দেশকে নিয়ে যান অনন্য এক উচ্চতায়, যা ছিল জাতির জন্য কল্পনাতীত। দেশজ সম্পদ, মাথাপিছু আয়, শিল্প-কৃষি ও সেবা খাতের উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মহাকাশ বিজয়, ডিজিটাল বাংলাদেশ, সমুদ্র জয়, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন, ছিটমহল সমস্যা, যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাসহ বিশ্বে রোল মডেল হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত সারাদেশে মানুষ পুড়িয়ে মারার রাজনীতি শুরু করে। জনগণের মনে ভয়-আতঙ্ক জন্ম দিয়ে জয়ী হতে চেয়েছিল জোট। কিন্তু এ দেশের মানুষ তাদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। শেখ হাসিনাই মুক্তি দিতে পারে এটা বুঝে গেছে তারা।

এ দেশের জনগণও তাই পুনঃনির্বাচিত করেছে শেখ হাসিনাকে। কারণ জনগণ মনে করে একমাত্র শেখ হাসিনাই পারেন তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে। একটি সমৃদ্ধিশালী, প্রাযুক্তিক, আত্মমর্যাদাশীল জাতি গড়তে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে খালেদা বা তারেক জিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনা বা সজীব ওয়াজেদ জয়ের এখানেই গুণগত, মৌলিক পার্থক্য।

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা দেশের জনগণকে আরো বেশি আস্থাশীল করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি। গ্রামগুলোতে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেয়া, তরুণদের কর্মসংস্থান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে তা সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় আগামীর স্বপ্নে ভাসিয়েছে জনতাকে।

আমাদের বন্ধু, সুহৃদ শুভাকাক্সক্ষী অনেকের সঙ্গে গতকাল কথা হলো, সবার চাওয়া একটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসহ ইশতেহারে বর্ণিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে হবে আগে। সুশাসনের প্রতি জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর থেকে কঠোরতর হতে হবে। সন্ত্রাস, মাদকদ্রব্য নির্মূল ও রাজধানীতে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

দলের নাম ভাঙিয়ে সুবিধাবাদীরা যেন জনগণের ভরসায় চিড় ধরাতে না পারে। দলের ত্যাগী, প্রকৃত কর্মীরা যেন নিরাশ না হয় সে দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে দায়িত্বশীল ভূমিকাই সবার কাম্য।

স্বচ্ছতা, সুনিশ্চিত জবাবদিহির মাধ্যমে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। আপনার নির্বাচিত পেশাদার, পরীক্ষিত মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী মহোদয় জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে। কারণ অতীতে আপনার সিলেকশন বিস্মিত করেছে সবাইকে।

বাঙালি স্বপ্নবান জাতি, তাদের স্বপ্নের কান্ডারি এখন শেখ হাসিনা। তাই সব আবদার, প্রত্যাশা শেখ হাসিনাকে ঘিরেই। এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আপনাকে নিয়ে যাবে মহাকালের চূড়ায়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের রূপ আপনি দিবেন এটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

প্রফেসর ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ : শিক্ষাবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক।