প্রতিহিংসা নয়, সম্প্রীতির রাজনীতি চাই

আগের সংবাদ

লালমনিরহাটে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত ২

পরের সংবাদ

চালকের আসনে আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্তহীন বিএনপি

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১১, ২০১৯ , ৮:৪৬ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ১১, ২০১৯, ৮:৪৬ অপরাহ্ণ

বিভুরঞ্জন সরকার

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

জনগণ যে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি এটা কীভাবে বুঝালেন বিএনপি মহাসচিব? দেশের কোথাও কি কোনো ধরনের গণবিক্ষোভ হয়েছে? মানুষ যদি ফলাফল না মেনে থাকে তাহলে বিএনপি কেন ‘জনগণ’কে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নামল না। বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট কিংবা ২০ দলীয় জোটকে মানুষ আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে ভাবেনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার বিকল্প কারো কথা মানুষের বিবেচনায় নেই। তার সমান জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেশে নেই।

নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতি একটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। মন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করেছেন, দায়িত্ব পালনও শুরু করেছেন। মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে নতুনদের নিয়ে। পুরনো প্রায় সবাই বাদ গিয়েছেন। আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতারা যেমন বাদ পড়েছেন, তেমনি মন্ত্রিসভায় নেই ১৪ দলীয় জোটের শরিকরাও।

এ নিয়ে কারো কারো মধ্যে হয়তো চাপা ক্ষোভ বা দুঃখ আছে। কিন্তু আপাতত কারো কিছু করার নেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মন্ত্রী বানানোর শর্তে কাউকে জোটে নেয়া হয়নি। জোটের শরিক নেতাও সেটা অস্বীকার করবেন না। খাওয়া এবং পাওয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। তাই খাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হলে বিষণ্নবোধ করাই স্বাভাবিক। এবার সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী নতুন ধারায় চলবেন। অনেক ক্ষেত্রেই নতুনত্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। মন্ত্রী নিয়োগে চমকের পর পিএস নিয়োগেও দেখা যাচ্ছে চমক। আরো চমক সামনে আছে।

তবে ১৪ দলের শরিকদের মধ্য থেকে কাউকে ভবিষ্যতে মন্ত্রী করা হবে না। এটাও জোর দিয়ে বলা যায় না। বর্তমান মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত হবে। বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ৪৭। এটা সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এবার যারা মন্ত্রী হয়েছেন, তাদের পারফরমেন্স ভালো না হলে বিদায় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ এবার শেখ হাসিনা শক্তভাবেই সব কিছু সামলাবেন বলে মনে হচ্ছে। এর মধ্যেই তিনি বলে দিয়েছেন, মন্ত্রীরা সবাই তার কড়া নজরদারির মধ্যে থাকবেন। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছে।

এবার একেবারেই আওয়ামী লীগের সরকার। এবার সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। এবার কারো ওপর দোষ চাপানো যাবে না। কারণ বিরোধী দল কার্যত অকার্যকর। সরকারের কাজে বাধা দেয়া বা প্রতিন্ধকতা তৈরির ক্ষমতা বিএনপির নেই। সংসদে যোগ দেয়ার প্রশ্নে বিএনপির নেতিবাচক মনোভাবের মুখে জাতীয় পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দলে থাকার ইচ্ছা পোষণ করে ভালো করেছে।

গত সংসদে জাতীয় পার্টি সরকারেও ছিল, বিরোধী দলেও ছিল। এবার তারা সরকারে নেই। দলীয় প্রধান এইচ এম এরশাদ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। তার ছোট ভাই জি এম কাদের উপনেতা। গত সংসদে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। এবার তিনি নেপথ্যে চলে গেছেন। তার কোনো কথা শোনা যায় না।

অন্যদিকে এরশাদ তার ভাই জি এম কাদেরকে জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ মালিক বানিয়ে দিয়েছেন। সরকারে না থাকা নিয়ে জাতীয় পার্টির ভেতরেও অসন্তোষ আছে বলে শোনা যায়। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি নৈতিকভাবে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় পার্টি মহাজোটের অংশ হিসেবে নির্বাচন করেছে। সংসদে তারা সরকারবিরোধী ভূমিকা কতটুকু নিতে পারবে তা নিয়েও সন্দেহ আছে। এরশাদ নিজ সিদ্ধান্তে কতটুকু অটল থাকতে পারবেন, তাও দেখায় বিষয়। এরশাদের ঘন ঘন মত বদল তার দলের জন্য শুভ হয়নি।

তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় পার্টি যদি সঠিকভাবে দায়িত্বশীল বিবোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারে তবে সেটা দলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্র যেমন প্রাতিষ্ঠানিক শক্ত ভিত পায় না, তেমনি সরকারি দলেরও স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। আমাদের দেশের মানুষ সরকারের পক্ষে থাকা পছন্দ করে না। তাদের সরকার বিরোধিতা ভালো লাগে।

আবার সন্ত্রাস-সহিংসতাও মানুষ পছন্দ করে না। মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে থাকতে চায়, স্বস্তিতে থাকতে ভালোবাসে। বিএনপি সহিংস আন্দোলন করতে গিয়েই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় জাতীয় পার্টি যদিও এখন খুব জনপ্রিয় দল নয়, তবু এই দলকে ঠিকমতো চালাতে পারলে সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আওয়ামী লীগ এখন দেশের রাজনীতির চালকের আসনে। গত বেশ কিছুদিন ধরেই এই অবস্থা চলে আসছে। তাদের কোনো যোগ্য প্রতিপক্ষ নেই। বিএনপি নিঃসন্দেহে একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। কিন্তু ভুল রাজনৈতিক নীতি-কৌশলের কারণে বিএনপি এখন রাজনীতির মাঠে নাজুক পরিস্থিতিতে আছে, কঠিন পরীক্ষার মধ্যে আছে। দলটি মুসলিম লীগের পরিণতির দিকে যাচ্ছে কিনা সেটা মানুষের আলোচনায় আসছে। বিএনপির মতো একটি বিশাল দল, একাধিকবার সরকারে থাকার অভিজ্ঞতার পরও দলটি এবার নির্বাচনে একেবারে প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে। বিএনপি এখন কি করবে? আন্দোলন করে সুবিধা করার সম্ভাবনা কম। নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি করেছে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন না জানানো হয়েছে। বিএনপির এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে বাধ্য। সংসদ বর্জন করে এখন রাজনীতিতে বিশেষ কিছু অর্জনের অবস্থা বিএনপির নেই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থগিত আসনেও বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এখন বিএনপির ছয়জন এবং গণফোরাম, ঐক্যফ্রন্টের দুজন মিলে মোট আটজন সংসদ সদস্য বিএনপির। সংসদে গিয়ে সোচ্চার থাকলে বিএনপি রাজনীতিতে দৃশ্যমান থাকবে। না হলে কী হবে সেটা নিয়ে পূর্বাভাস না করাই শ্রেয়। ঐক্যফ্রন্টের এমপিরা যদি শেষ পর্যন্ত শপথ না নেন তাহলে সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। সেটা হবে নির্বাচিত এমপিদের সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলার শামিল। তাই অনেকেই মনে করছেন, বিএনপি শপথ না নিলে তাদের পথ নির্ধারণ করা কঠিন হবে। ড. কামাল হোসেন ধারণা দিয়েছিলেন, তাদের দুজন সদস্য শপথ নেবেন। কিন্তু একদিন পরেই বিএনপির চাপে সিদ্ধান্ত বদল করেন।

বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল আন্দোলনের অংশ হিসেবে। কিন্তু নির্বাচনে চরম ভরাডুবির পর বিএনপি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছে। কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

তারা নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে বিদেশিদের কাছে অভিযোগ করছে। তাদের ধারণা, বিদেশিদের চাপে সরকার হয়তো পিছু হটতে পারে। বিএনপির এই ধারণা ভুল। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের বিদেশিদের কাছে অনুযোগের রাজনীতি দেশের মানুষ কি খুব ভালোভাবে নিচ্ছে? আবার বিদেশিরা সরকারকে বিব্রত করতে চায় বলে মনে হয় না। নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে কিছু অভিযোগ থাকলেও তা নিয়ে বিদেশিদের বড় মাথাব্যথা নেই। এ ছাড়া শেখ হাসিনা যে এসব তোয়াক্কা করেন না, এটা অন্তত বিএনপির বোঝা উচিত।

সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি নানামুখী তৎপরতা চালিয়েও আগে সফল হয়নি। এখনো হওয়ার কোনো কারণ দেখা যায় না। বিএনপিকে আবেগনির্ভরতা কমাতে হবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘জনগণ নির্বাচনকে বর্জন করেছে বলা যেতে পারে। জনগণ নির্বাচনের ফলাফল কখনই মেনে নেয়নি। সেই নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে কোনো পার্লামেন্ট বা সরকার গঠন তো হাস্যকর ছাড়া কিছু না’। জনগণ যে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি এটা কীভাবে বুঝালেন বিএনপি মহাসচিব? দেশের কোথাও কি কোনো ধরনের গণবিক্ষোভ হয়েছে? মানুষ যদি ফলাফল না মেনে থাকে তাহলে বিএনপি কেন ‘জনগণ’কে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নামল না।

নির্বাচনে যে মাত্রায় কারচুপির অভিযোগ করা হচ্ছে, সেটা সত্য হলে নির্বাচনের পর নানা জায়গায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটত। কিছু কিছু অনিয়ম হয়েছে, কেউ কেউ হয়তো ভোটও দিতে পারেননি। কিন্তু তার জন্য ‘জনগণ’ নির্বাচনের ফলাফল না মেনে বিদ্রোহ করেনি। মানুষের মনে কিছু কষ্ট থাকতে পারে কিন্তু মানুষ বিএনপির বক্তব্যের সঙ্গে যে একমত নয়, তার প্রমাণ শান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

বিএনপি, ঐক্যফ্রন্ট কিংবা ২০ দলীয় জোটকে মানুষ আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে ভাবেনি। ক্ষমতায় গেলে কে সরকার প্রধান হবেন সেটা বিএনপি ও তার মিত্ররা স্পষ্ট করে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার বিকল্প কারো কথা মানুষের বিবেচনায় নেই। তার সমান জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেশে নেই।

মানুষের মনোভাব বুঝতে বিএনপি ভুল করছে বলেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আওয়ামী লীগের কাছে হেরে যাচ্ছে। মানুষ ঢালাও অভিযোগ পছন্দ করে না। তথ্য-প্রমাণসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করে তার প্রতিকার চাইলে সেটা অনেকের কাছেই হয়তো সমর্থনযোগ্য হতো। কিন্তু সবগুলো আসনে পুনর্র্নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা নিজেরাই জনগণের কাছে হাস্যকর হয়ে উঠেছেন।

ফাঁকিঝুকি দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ ক্রমাগত কমে আসছে। সরকার বড় ধরনের ভুল না করলে মানুষ সরকারের পক্ষেই থাকবে। নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার বিভিন্ন পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সরকার এতদিন উন্নয়নের রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।

এবার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করা হবে। উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও মানুষ কেন কাক্সিক্ষত মাত্রায় আওয়ামী লীগকে সমর্থন করছে না সেটাও আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর আচরণগত সমস্যা আছে। তাদের কেউ কেউ সাধারণ মানুষকে অসম্মান করে মজা পায়। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সাফল্য ও অর্জনকে কারো ত্রুটির কারণে ম্লান হতে দেবেন না। ছাত্রলীগের বাড়াবাড়িকেও নিশ্চয়ই কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া হবে না।

বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আওয়ামী লীগ ধারায়, কোন পথে চলছে সেটা দেখে। আগে থেকে ঠিক করে রাখা পরিকল্পনা নিয়ে চলতে গেলে হোঁচট খেতে হবে। বিএনপিকে রাজনীতি শুরু করতে হবে নতুনভাবে। গৎবাঁধা কথা বলে, হাওয়ায় গদা ঘুরিয়ে বাজিমাৎ করার রাজনীতি আর বোধহয় বাংলাদেশে চলবে না।

বিভুরঞ্জন সরকার: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।