শেরপুরে স্কুলছাত্রীকে চুমু দিয়ে ৩ বন্ধু কারাগারে

আগের সংবাদ

অস্ট্রেলিয়া ফিরে যাচ্ছেন কুমিল্লার অধিনায়ক স্মিথ!

পরের সংবাদ

রাজনীতিতে আজ ও কাল

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ১০, ২০১৯ , ৯:৩৮ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ১০, ২০১৯, ৯:৩৮ অপরাহ্ণ

রাহাত খান

প্রবীণ সাংবাদিক ও কথা সাহিত্যিক

শেখ হাসিনা শুধু বিবৃতি দেয়া রাজনীতিবিদ নন। বহু বৈরী প্রতিকূল অবস্থা তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। তার পিতৃ-স্মৃতি, রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা এবং প্রিয় স্বদেশ ভূমি তাকে বৈরী পরিবেশ মোকাবেলায় প্রেরণা জুগিয়েছে। নেত্রী সাহসিকা তাকে অবশ্যই বলা যায়। সেই যোগ্যতা তিনি অর্জন করেছেন অতি অবশ্যই। দরিদ্র, ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে জর্জরিত, বিশ্বে নিতান্তই কৃপার পাত্র হিসেবে বিবেচিত একটা দেশকে মাত্র দশ বছরের মধ্যে পাল্টে দিয়েছেন।

দেশ কোথায় আর বাংলাদেশের বৃহৎ দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির রাজনীতি কোথায়, পাকে-চক্রে এই প্রশ্ন এসেই যায়। কারণ ষোলো বছর দেশ শাসন করা দলটি সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে ২৯৯ সংসদীয় আসনের মধ্যে জিতেছে মাত্র ছয়টিতে। বিএনপির রাজনীতি সাফল্যের দিকে যাচ্ছে, না আত্মহননের দিকে যাচ্ছে, এই প্রশ্ন তাই মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়।

অনেকের মতো আমারও ধারণা হয়েছিল বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট জাতীয় নির্বাচনে ততটা ভালো করবে না। নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্টের মূল দল বিএনপি প্রাক-নির্বাচনী হোমওয়ার্ক ততটা করছিল না। বিএনপির ধারণা হয়েছিল সম্ভবত এ রকম যে সারা দেশের ভোটার সাধারণ ‘জালিম’ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপে আছে, ভোট হলে একটা নীরব বিপ্লব ঘটে যাবে।

নীরব বিপ্লব ভোটের মাধ্যমে ঘটেছে ঠিকই। তবে ভোটের সেই নীরব বিপ্লব ঘটেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে। বিএনপি পেয়েছে ছয়টা সংসদীয় আসন। বিএনপির রাজনীতি যে আলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে কৃষ্ণপক্ষে এসে পৌঁছেছে, সেটাই জানিয়ে দিল এবারের জাতীয় নির্বাচন।

বিএনপি অবশ্য কোনোদিনই নিজেদের ভুল স্বীকার করে না। নির্বাচনে হারলেই প্রত্যেকটাবার বলে বেড়ায় যে তাদের হারিয়ে দেয়া হয়েছে। ষড়যন্ত্রের নীল নকশা করে বিএনপির নির্বাচনী বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।

বিএনপি রাজনীতির আরেক বৈশিষ্ট্য নির্বাচনের আগে ও পরে বিদেশি শক্তিধর রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের কাছে দৌড়-ঝাঁপ করা। তারা জনগণের কাছে যাওয়াটা রাজনীতিতে তেমন মূল্যবান মনে করে না। নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠনকে মজবুত করার ব্যাপারে কম-বেশি তারা গা-ছাড়া ভাব দেখায়।

যেন তাদের বিশ্বাস শক্তিধর রাষ্ট্রের সমর্থন ও সহযোগিতা পেলেই দুয়ে দুয়ে চারকে পাঁচ করা যাবে। যেন শক্তিধর রাষ্ট্র নির্বাচনে ভোট না পেলেই নির্বাচনে তাদের জিতিয়ে দিতে পারে। শক্তিধর রাষ্ট্রের সম্মতি থাকলেই নির্বাচন জিতে তাদের ক্ষমতায় যাওয়াটা একেবারে নিশ্চিত। আরেকটা জায়গা আছে বিএনপি ও জামায়াতের। যেখান থেকে পরামর্শ ও অর্থ দুই-ই পাওয়া যায়।

তবে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রহিসেবে আগামীতে সূবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। নির্বাচনে হেরে গেলে বিদেশি শক্তির কাছ থেকে কূটনৈতিক সৌজন্য ছাড়া আর কিছু যে পাওয়া যায় না, তা এতগুলো বছরেও বিএনপি হৃদয়ঙ্গম করতে পারল না। পারল না রাজনীতির এই মর্মকাহিনী বুঝতে যে, শক্তিশালী রাজনৈতিক দল এবং জনগণের সমর্থন ছাড়া নির্বাচনী রাজনীতিতে ক্ষমতায় যাওয়ার কোনো পথ নেই।

বিএনপি বারবার একই ভুল করে ফেলেছে। ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার গণতন্ত্রসুলভ চিন্তা-চেতনাও কম। গণতন্ত্রের একটা সংজ্ঞা রাজনীতিতে কোথাও ভুল হলে সেটা স্বীকার করা। প্রয়োজনে জনগণকে তা জানানো। গণতান্ত্রিক রাজনীতির আর একটা সংজ্ঞা হচ্ছে সুবিন্যাস্ত ও শক্তিশালী একটা দল গড়ে তোলা। ষোলো বছর দেশ শাসন করা দলটি ইদানীং যত না রাজনীতি করে, তারচেয়ে বেশি করে রাজনীতির নামে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক নাটক।

এই যেমন সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে মাত্র ছয়টি সংসদীয় আসন লাভ করার লজ্জা ঢাকতেই কিনা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনো সংবাদ সম্মেলন করলেন না, বিক্ষোভ মিছিল করলেন না, সোজা চলে গেলেন ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিলার সাহেবের সঙ্গে দেড় ঘণ্টার এক বৈঠক করলেন।

যেনবা মার্কিন রাষ্ট্রদূত (ঢাকা) ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দিতে পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সেরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তারা সেটা করবেন কেন?

মির্জা ফখরুল কি দেশি-বিদেশি কাগজে বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, সৌদি আরব আর পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে জয়ী পক্ষের নেতা শেখ হাসিনার প্রতি অভিনন্দন ও সাধুবাদ জানানোর সংবাদ দেখেননি? মির্জা ফখরুল কি মনে করেন মহাজোটের কাছে ঐক্যফ্রন্টের শোচনীয় নির্বাচনী পরাজয়কে বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে দৌড়ঝাঁপ করে উল্টে দিতে পারবেন?

পারবেন না। দেশে হোক, বিদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে হোক, নির্বাচনে শতকরা দশভাগ অনিয়ম ঘটেই থাকে। এই ঘটাটা আমি হালাল বলতে চাইছি না। শুধু বলতে চাই, মির্জা ফখরুল রাজনীতির ভুল পথটাই অনুসরণ করে চলেছেন। জনগণের কাছে না গিয়ে শক্তিধর রাষ্ট্রের কাছে প্রতিকার নিয়ে কোনোকালেই হাঁসের ডিম মুরগির ডিম হয়ে যায়নি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্বাচনকে জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলসমূহের জন্য একটা পরীক্ষা বলেই মেনে নিতে হবে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে যারা কাজ করেন, জনগণের ভোটে নির্বাচনে তারাই জয় পান।

একদা বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বড় দলই তো ছিল। কেন জাতীয় নির্বাচনে এবার (৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮) মাত্র ছয়টি সংসদীয় আসন লাভ করে মুসলিম লীগের ভাগ্য বরণ করতে চলেছে এই প্রশ্নের বিশ্লেষণ তো বিএনপিকেই করতে হবে।
আওয়ামী লীগ টানা দশ বছর দেশ শাসনের দায়িত্বে ছিল।

আবার একটানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনে বিপুল ভোট ও সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেছে। এবার তরুণ ও মহিলা ভোট পেয়েছে আওয়ামী লীগ কাস্ট হওয়া ভোটের অন্তত ৮০ শতাংশ। কওমি মাদ্রাসার ভোট ব্যাংক, সংখ্যালঘু ব্যাংক ভোট, ভাসমান ভোটের অধিকাংশই মহাজোট পেয়েছে।

কেন পেয়েছে? কারণ টানা দুই মেয়াদে দেশ শাসনের দায়িত্বে থেকে বিশাল উন্নয়নের পথে থেকে দেশটা তারা বদলে দিয়েছে। গত দশ বছরে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উন্নয়নে উন্নয়নে দেশের এই বদল ঘটিয়েছে। উন্নয়নের সুফল, শহর ও গ্রাম, উভয় জনপদের মানুষই নিজেদের জীবনে ভোগ করছে। বাংলাদেশ এখন বিশে^র ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। চলতি মেয়াদে ২৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার কথা বাংলাদেশের!

অন্যদিকে বিএনপি ষোলো বছর ক্ষমতায় থাকলেও না পেরেছে নিজেদের দলীয় সংগঠনটি শক্তিশালী করতে, না পেরেছে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের ধারায় দেশকে এগিয়ে নিতে। বিএনপি স্বৈরশাসনে অভ্যস্ত ছিল। গণতন্ত্রের ধারেকাছে ছিল না কোনো মেয়াদের বিএনপি সরকার। নেতৃত্ব দেয়া যাকে বলে রাজনীতিতে অপরিহার্য সেই ব্যক্তিত্বের দেখাও বিএনপিকে কদাপি পাওয়া যায়নি।

বিএনপি ও দেশকে যিনি নেতৃত্ব দেবেন বলে স্থিরীকৃত, তিনি সরকারের অংশীদার না হয়েও এনএসআই প্রধানকে নিয়ে দুবাই যান এবং প্রকাশ্যে জানান দিয়ে জঙ্গি নেতা দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইতিহাসের বিরুদ্ধে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অনায়াসে বলেন ‘পাকি বন্ধু’। বিএনপি যাকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়, তার হওয়া উচিত ছিল বিনীত, ধীর স্থির এবং বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে বেশ খানিকটা ওয়াকেবহাল থাকা।

বিএনপির শীর্ষ নেতাদের অনেকে বিষাক্ত বিবৃতি দেয়া ছাড়া আর কিছু করেন না। ধরে নেন নির্বাচনে পাঁচ-সাতটা আসন ছাড়া আওয়ামী লীগ আর কোনো সংসদীয় আসন পাবে না। এখন গত ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বুঝা গেল পাঁচটি সংসদীয় আসন কাদের পাওয়া উচিত ছিল। সুষ্ঠু নেতৃত্ব ও মজবুত সংগঠন না থাকলে এমনটাই হয়। রাষ্ট্রদূতদের দুয়ারে ধরনা দিয়ে আসলে কোনো কাজ হয় না।

অনেকে বিএনপি সম্পর্কে এসব কথা লিখেছেন। আমাকেও লিখতে হলো যা আমার লেখার তেমন ইচ্ছে ছিল না। সুস্থ রাজনীতির একটা ব্যাকরণ আছে। জাতীয়তাবাদী পার্টিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে দোস্তি ছাড়তে হবে সই ব্যাকরণ মেনে। বাংলাদেশের মানুষ ভোট দেবে স্বাধীনতা পক্ষের দলকে। সামরিক গণতন্ত্রের অনুসারীদের ভোট দেবে না।

এসবই বাসি কথা। নতুন দিনর শুরু হওয়ার কথায় আসা যাক। চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেয়া শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভা গঠনে আওয়ামী লীগ পরিবারের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বাঁধা কিছু সংখ্যক প্রবীণ নেতাকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নেতা ও সাংসদদের নিয়ে তার মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন।

সময়ের দাবিকে মূল্য দিতে গিয়ে তিনি যে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী নেতাদের মন্ত্রী করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে নবীনদের প্রাণশক্তির পাশাপাশি প্রবীণদের অভিজ্ঞতাও রাষ্ট্র পরিচালনায় জরুরি হয়ে দেখা দিতে পারে। আমাদের বিশ্বাস, সেই বিবেচনা বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রয়েছে। যথাসময় তিনি সেই বিবেচনা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন হয়তোবা।

শেখ হাসিনা শুধু বিবৃতি দেয়া রাজনীতিবিদ নন। বহু বৈরী প্রতিকূল অবস্থা তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। তার পিতৃ-স্মৃতি, রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা এবং প্রিয় স্বদেশ ভূমি তাকে বৈরী পরিবেশ মোকাবেলায় প্রেরণা জুগিয়েছে। নেত্রী সাহসিকা তাকে অবশ্যই বলা যায়।

সেই যোগ্যতা তিনি অর্জন করেছেন অতি অবশ্যই। দরিদ্র, ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে জর্জরিত, বিশে^ নিতান্তই কৃপার পাত্র হিসেবে বিবেচিত একটা দেশকে মাত্র দশ বছরের মধ্যে পাল্টে দিয়েছেন। উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন। সামনে বাংলাদেশের জন্য বহু সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধি অপেক্ষা করছে। এমন ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্ব পাওয়া বাংলাদেশের জন্য সৌভাগ্য।

রাহাত খান : প্রবীণ সাংবাদিক ও কথা সাহিত্যিক।