নতুন জুটি হাসান-সুস্মিতা

আগের সংবাদ

সড়ক যোগাযোগ আধুনিকায়নে বিস্তৃত হচ্ছে বিআরটি প্রকল্প

পরের সংবাদ

চা শ্রমিকদের বঞ্চনা ও লড়াইয়ের নাটক ‘মুল্লুুক’

প্রকাশিত হয়েছে: জানুয়ারি ৫, ২০১৯ , ৪:৫৩ অপরাহ্ণ | আপডেট: জানুয়ারি ৫, ২০১৯, ৪:৫৩ অপরাহ্ণ

‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও, দুর্জয় মহা আহবান তব বাজাও’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নাটক ‘মুল্লুক’। শুরুতেই অসাধারণ এই সঙ্গীতের সঙ্গে শিল্পীদের আঙ্গিক অভিনয়ের মেলবন্ধনে দশর্কদের মনকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন নির্দেশক। চা শ্রমিকদের জীবনকে উপজীব্য করে লেখা এই নাটকে লেখক তিনটি সময়কে তুলে ধরেছেন। শুরুতেই দেখা যায় এক বৃদ্ধাকে। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের জন্য হাপড়ে টান তুলছেন তিনি। তার বয়স দেখে অনুমান করা যায় আশির কোঠায় বা তার বেশি। নাট্যকার সুভ্যিনিরে উল্লেখ করেছেন- ‘প্রত্নবয়সী এই নারী শেকড়ছিন্ন কতিপয় মানুষের সময়-সাক্ষী।’ তখন বুঝতে সমস্যা হয় না সময়কে বয়ে নিয়ে চলা এই বৃদ্ধা আসলে ইতিহাসেরই উল্টোরূপ। সেই ঘন রাতে দৈবলোকের মতো বৃদ্ধার সামনে দৃশ্যমান হতে থাকে তার খণ্ড খণ্ড অতীত। আর সেই বৃদ্ধার চোখ দিয়েই দর্শক দেখতে থাকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে থাকা একদল মানুষের শৃঙ্খল ভাঙার লড়াই, তাদের মমত্ববোধ, প্রেম কিংবা প্রেমহীন জীবন। বৃদ্ধার শৈশব চলে যায় ব্রিটিশ শাসনামলের অতীতে ভারতের কুন্দলিকা নদীর পাড়ে। দেশভাগের পর পূর্ববাংলায় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) দেখে সে যৌবন। বৃদ্ধকালকে বয়ে বেড়ায় বৃদ্ধা বর্তমান সময়ের মাঝে। শৈশবেই বৃদ্ধা দেখেছে মানবিক মূল্যবোধের অভাবে একদল মানুষ কীভাবে আরেক দল মানুষের ওপর নিপীড়ন চালায়। কীভাবে একজন স্বাধীন মানুষ একজন দাসে পরিণত হতে বাধ্য হয়। নিজের স্বার্থরক্ষায় অন্যকে বলি দেয়া কতটা কুরুচিপূর্ণ তা সহজেই নির্দেশক তুলে ধরেন দর্শকের সামনে। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে নিজেদের মুক্তি দিতে যখন একদল তরুণ মরিয়া হয়ে ওঠে নিজেদের মুল্লুকে যাবে তখনই নতুন সংকটে তারা বাধা পড়ে আরেকবার। নিরলস পরিশ্রম করেও তারা তাদের পাওনা পায় না। বরং অচল মুদ্রা পায় মালিক পক্ষ থেকে। এখানে দেখা মেলে শোষণের আরেক চিত্র। শত কষ্টের মধ্যে থেকেও তারা স্বপ্ন দেখে নিজ দেশে যাওয়ার। কিন্তু ভাগ্যে তাদের নিদারুণ কষ্ট লেখা। এসব চা শ্রমিক নিজেদের জন্ম ভিটায় আর ফিরে যেতে পারে না।
দেশভাগের পর পূর্ব বাংলাকে লেখক বৃদ্ধার যৌবনকালরূপে চিত্রিত করেছেন। ভরা যৌবনে বৃদ্ধা যখন সংসার করার স্বপ্নে বিভোর ঠিক তখনই শুরু হয় আরেক যুদ্ধ, যার পরিণতি আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চা শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন, মুক্তিযুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধপরবর্তী স্বজন হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরেছেন লেখক বৃদ্ধার যৌবনকালের মধ্য দিয়ে। যখন বৃদ্ধার বৃদ্ধলোক তখন সে যেন বর্তমান বয়ে চলা সময়ের যোদ্ধা। এভাবেই শোষন বঞ্চনায় নিপীড়িত এক বৃদ্ধার জীবন থেকে উঠে আসে সংগ্রামী জনতার প্রতিচ্ছবি। দর্শকের সামনে উঠে আসে যুগের পর যুগ চা-শ্রমিকদের ওপর নিপীড়নের চিত্র। যেখানে নির্যাতিত হয় বৃদ্ধার মতো শত শত মানুষ। আবার তৈরি হয় মঙ্গলের মতো নির্ভীক বীর সেনানী। যারা স্বপ্ন দেখে দাসত্তে¡র শৃঙ্খল ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার। ‘বিপ্লবী মরে বিপ্লব মরে না’ বরং তারা যুগের পর যুগ আরো শত শত বিপ্লবীর জন্ম দিয়ে চলে এমনি এক ধারাবাহিতার মধ্য দিয়ে শেষ হয় নাটক ‘মুল্লুুক’। আঙ্গিক অভিনয়ের অনন্য ব্যবহার নাটকটিকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। তবে বাচ্যিক অভিনয়ে কখনো কখনো ব্যর্থ হয়েছেন শিল্পীরা। তবে সংলাপের সঙ্গে সঙ্গীতের ব্যবহার মুগ্ধ করেছে। নাটকটির রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন বাকার বকুল। এতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবিউল ইসলাম, শশাংক শাহা, রুনা কাঞ্চন, সোহেল মণ্ডল, শারমীন আক্তার, শফিকুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, সোহেল রানা, হাফিজা আক্তার ঝুমা, ইন্দ্রানী ঘটক, শামীম শেখ, আকাশ সরকার, তানবীর লিমন ও শান স্বপন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজিত এই নাটকটির শেষ মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হয় গত ১৮ ডিসেম্বর জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটার মিলনায়তনে।