শিক্ষকতার পেশায় নৈতিকতা খুবই জরুরি

আগের সংবাদ

অরিত্রীর আত্মহত্যা এবং অসংখ্য প্রশ্ন

পরের সংবাদ

শিক্ষক অভিভাবক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের করণীয়

প্রকাশিত হয়েছে: ডিসেম্বর ৭, ২০১৮ , ৯:১২ অপরাহ্ণ | আপডেট: ডিসেম্বর ৭, ২০১৮, ৯:১২ অপরাহ্ণ

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য। শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা

শিক্ষা নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো রক্ষণশীল বলা চলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এখন প্রয়োজন প্রগতিশীল পদক্ষেপের। পশ্চাৎপদতা ও প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে কাক্সিক্ষত পদক্ষেপ গ্রহণ আমাদের অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত ও ত্বরান্বিত করবে। উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না যে, শিক্ষা হবে তার প্রধান বাহন ও ভিত্তি। শুধু সরকার ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষ নয়, শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বের দাবিদার শিক্ষক সংগঠনগুলোর যে এক্ষেত্রে করণীয় রয়েছে… ইউনেস্কোর সুপারিশমালায় তার উল্লেখ সুস্পষ্ট।

এ লেখাটি ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সাম্প্রতিক দুঃখজনক, হৃদয়স্পর্শী ঘটনা নিয়ে। স্বাভাবিকভাবে যে প্রশ্নটি এখন সর্বস্তরের মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছে তা হলো শিক্ষক অভিভাবক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের করণীয় কী? সর্বশেষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে ওই স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে নির্দিষ্ট করে কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একজন শিক্ষক গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষসহ তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের এমপিও বাতিল হয়েছে।

এ ব্যবস্থা সাময়িক প্রশমনে কাজ দেবে, না দীর্ঘমেয়াদে ফলদায়ক হবে সে প্রশ্ন উঠতে পারে। ভিকারুননিসার মতো সম্পদশালী স্কুলে এমপিও কেন দেয়া হয়েছে এবং পরিচালনা কর্তৃপক্ষও তা কেন নিয়েছেন সে প্রশ্ন উত্থাপন কেউ কেউ করতে পারেন। যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যাপারে ভিন্নমতের অবকাশ নেই। তবে আবেগের বশবর্তী হয়ে কেউ যেন নতুন কোনো ভুল না করেন সেদিকেও সবার চোখ-কান খোলা রাখা দরকার।

অরিত্রীর আত্মহত্যার পর যে বিষয়টি এখন বিশেষ করে শিক্ষক অভিভাবক অনেকের মধ্যে, তা হলো এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ কীভাবে সম্ভব হবে? বলাবাহুল্য এর কোনো স্বল্পমেয়াদি বা তাৎক্ষণিক সমাধান দেয়া সম্ভব নয়। আমার দৃষ্টিতে মর্মান্তিক ঘটনাটি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত, দীর্ঘদিন ধরে বিরাজিত জটিল ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বলা হয়েছে- ‘শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে যেন তারা কোনোভাবেই কোনোরকম শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের শিকার না হয়। শিশুদের স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসা ও কৌতূহলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাদের স্বাভাবিক প্রাণশক্তি ও উচ্ছ্বাসকে ব্যবহার করে আনন্দময় পরিবেশে মমতা ও ভালোবাসার সঙ্গে শিক্ষা প্রদান করা হবে।’ কিন্তু কাজটি অসম্ভব না হলেও খুব যে সহজ নয় অরিত্রীর ঘটনা তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

নিজেদের মূল্যায়নে শিক্ষকরা : ক্যামব্রিজ অ্যাসেসমেন্ট ইন্টারন্যাশনালে প্রকাশিত ২০১৮ সালের গ্লোবাল এডুকেশন সেন্সাস রিপোর্টে জানা যায়, বিশ্বের ১৪ শতাংশ শিক্ষকই মনে করেন যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের একাডেমিক সাফল্য যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। রিপোর্টে উঠে এসেছে শিক্ষকরা কীভাবে নিজেদের সাফল্য বা শিক্ষক হিসেবে অর্জনকে মূল্যায়ন করেন। শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফলকে ৬৮ শতাংশ, উচ্চতর স্তরে ভর্তি হতে পারাকে ৩৭ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানে নিয়োজিত হওয়াকে ১৫ শতাংশ শিক্ষক তাদের একাডেমিক সাফল্য বা অর্জন হিসেবে বিবেচনা করেন।

শিক্ষার্থীর সঙ্গে আচরণ নিয়ে শুধু আমাদের দেশে নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা বিতর্ক আছে। অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের সামাল দিতে না পেরে বের করে দেয়ার বা পাঠদান বন্ধের প্রবণতা রয়েছে। কয়েকটি ধাপে তা অনুসরণ করা হয়। প্রথমে সতর্কতা নোটিস, এরপর শ্রেণিকক্ষে অন্য শিক্ষার্থীদের থেকে আলাদা করে রাখা ও পরবর্তী সময়ে ক্লাস থেকে বের করে দেয়া হয়।

এক জরিপে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়ার ৮৫ শতাংশ শিক্ষক এ পন্থার অনুসারী। কিন্তু অতিসম্প্রতি এর বিপক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে জনমত গড়ে উঠছে। কথা উঠেছে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা এর শিকার হচ্ছে। শুধু তাই নয়, শিক্ষকের দৃষ্টিতে কোনো শিক্ষার্থী ভালো-মন্দ যাই থাক তার শিক্ষালাভের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ক্ষমতা কাউকে দেয়া হয়নি।

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সৃজনধর্মিতায় বৈচিত্র্য নিরূপণে শিক্ষকের অসক্ষমতার দায় শিক্ষার্থীর ওপর চাপানো অসঙ্গত। তার ফলও নানা ক্ষতির কারণ হয়। সে জন্য শিক্ষার্থীদের দূরে ঠেলে দেয়ার পরিবর্তে কাছে টানার, অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে ব্যস্ত ও নিয়োজিত রাখার বিষয় সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় এসেছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার পরিণাম শুভ হয় না। শিক্ষার্থীর প্রতি অমনোযোগ ও যত্নভাব তাদের আবেগ তাড়িত ভুল পথে ঠেলে দেয়। অস্ট্রেলীয় সরকারের আনুকূল্যে অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল ২০১২ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের প্রচলিত ও কাম্য আচরণ নিয়ে ‘পানিশ দেম অর এনগেজ দেম?’ শিরোনামে যে গবেষণা কর্ম পরিচালনা করে তাতে দেখা যায় প্রাথমিক শিক্ষায় পাঠদানকারী শিক্ষকরা মধ্যম/মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষার্থীর সঙ্গে আচরণগত সমস্যা বা জটিলতায় বেশি ভোগেন। দেশের দূরবর্তী অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষক যারা বয়সে নবীন ও শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতা কম তারাও এ ধরনের সমস্যায় বেশি পড়েন। আমাদের দেশে এ ধরনের গবেষণা বেশি করে হওয়ার দরকার।

ইউনেস্কোর সুপারিশ : প্রসঙ্গক্রমে শিক্ষকের মর্যাদা সংক্রান্ত ইউনেস্কোর বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলনের ১৯৬৬ সালের সুপারিশ উল্লেখ্য। এর শিক্ষার উদ্দেশ্য ও নীতিমালার ১০ ধারার ঙ-তে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু শিক্ষা একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া, সুতরাং শিক্ষাসেবার বিভিন্ন শাখাকে এমনভাবে সমন্বিত করতে হবে যাতে সব ছাত্রছাত্রী শিক্ষার মান উন্নয়ন করা যায় এবং শিক্ষকদের অবস্থানও উন্নীত হয়।’

একই ধারায় চলতে বলা হয়েছে, ‘সঠিকভাবে আন্তঃসম্পর্কিত নমনীয় স্কুল ব্যবস্থার অবাধ সুযোগ থাকতে হবে, যাতে প্রত্যেক শিশুর যে কোনো প্রকার ও পর্যায়ের শিক্ষার সুযোগ লাভের ক্ষেত্রে কোনো কিছুই বাধা সৃষ্টি না করে।’ ইউনেস্কোর ওই সুপারিশের ৬৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘শিক্ষার্থীদের স্বার্থে শিক্ষক ও মা-বাবা মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য সম্ভাব্য সব রকম প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে;…’।

৭০ ধারায় শিক্ষকের দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘মনে রাখতে হবে যে, পেশার মর্যাদা অনেকাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের নিজেদের ওপর। তাই নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে শিক্ষকদের সচেষ্ট থাকতে হবে।’

৭৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘শিক্ষক সংগঠনসমূহের উচিত নৈতিকবিধি বা আচরণবিধি প্রতিষ্ঠা করা, যাতে গৃহীত নীতিমালা অনুযায়ী এসব বিধি পেশার মর্যাদা এবং পেশাগত কর্তব্য সাধনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।’ শিক্ষক ও শিক্ষাসেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যকার সার্বিক সম্পর্ক নিয়ে ৭৫ ধারায় রয়েছে, ‘শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনকে অবাধ করার জন্য কর্তৃপক্ষের এমন একটি উপায় চালু ও নিয়মিত প্রয়োগ করা উচিত, যাতে শিক্ষানীতি, বিদ্যালয় সংগঠন এবং শিক্ষাসার্ভিস বিষয়ক নতুন নতুন বিকাশ বিষয়ে শিক্ষকদের সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ করা যায়’।

৭৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘শিক্ষাসার্ভিসের মান বৃদ্ধি, শিক্ষা গবেষণা এবং নতুন পদ্ধতির উন্নয়ন ও বিস্তরণের জন্য পরিকল্পিত বিভিন্ন পদক্ষেপে শিক্ষকদের তাদের সংগঠনের মাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়ে অংশগ্রহণের গুরুত্ব শিক্ষক এবং কর্তৃপক্ষের কাছে স্বীকৃত হতে হবে।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু অধিকার প্রসঙ্গ : আঠারো বছর পর্যন্ত সবাইকে আন্তর্জাতিক নিয়মে শিশু হিসেবে ধরা হয়। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ সব শিশুদের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের মানসিক বিকাশের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সরকার যে আন্তরিক তা নিয়ে খুব একটা বিতর্ক নেই। মতাদর্শ নির্বিশেষে সবাই এক মত যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তির ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়, অন্যদিকে ছাত্রছাত্রীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দঘন পরিবেশ বজায় থাকবে এবং শিশুরা সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে।

এ লক্ষ্যে শিক্ষামন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত যে নীতিমালা ২০১১ প্রণয়ন করে তা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তবে প্রণীত নীতিমালা শিক্ষক অভিভাবক কতজন জানেন তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ কথা সত্য আমাদের দেশে ভালো আইনের অভাব নেই। কিন্তু অভাব আছে তার বাস্তব কার্যকারিতার।

চাই প্রগতিশীল পদক্ষেপ : শিক্ষা নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো রক্ষণশীল বলা চলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এখন প্রয়োজন প্রগতিশীল পদক্ষেপের। মানবিক, সামাজিক ও দেশাত্মবোধসম্পন্ন মূল্যবোধ তৈরি, জীবন জীবিকার জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ, পাঠক্রমের বিষয় নির্বাচন, পাঠদান পদ্ধতি যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞানের বিজ্ঞানসম্মত মূল্যায়ন থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীর উন্নয়ন ভাবনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পাঠদানকারী শিক্ষক ও পাঠগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, সর্বোপরি দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। পশ্চাৎপদতা ও প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে কাক্সিক্ষত পদক্ষেপ গ্রহণ আমাদের অগ্রযাত্রাকে নিশ্চিত ও ত্বরান্বিত করবে। উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না যে, শিক্ষা হবে তার প্রধান বাহন ও ভিত্তি। শুধু সরকার ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষ নয়, শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বের দাবিদার শিক্ষক সংগঠনগুলোর যে এক্ষেত্রে করণীয় রয়েছে…ইউনেস্কোর সুপারিশমালায় তার উল্লেখ সুস্পষ্ট।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য। শিক্ষা ও শিক্ষক আন্দোলনের প্রবীণ নেতা।